10/09/2025
"লেখক আর লেখা : এক অনন্ত ভুল বোঝাবুঝি"
মানুষের একটা স্বভাবজাত অভ্যাস আছে। তারা লেখক আর লেখাকে একসাথে মিশিয়ে ফেলে। কোনো কবিতায় যদি কান্নার গন্ধ থাকে, পাঠক ধরে নেয় কবি নিশ্চয়ই কেঁদেছেন। কোনো উপন্যাসে নায়ক প্রেমে ব্যর্থ হলে বলা হয় আহা, লেখকের প্রেমও বুঝি ভেঙে গেছে। অথচ সত্যিটা ভিন্ন। লেখক সবসময় নিজের গল্প লেখেন না; তিনি লেখেন গল্পের গল্প, মানুষের গল্প, কখনোবা সম্পূর্ণ কল্পনার গল্প।
ভুল বোঝাবুঝির কিছু দৃশ্য
একটা ছোট উদাহরণ দিই। কেউ ফেসবুকে লিখল “আজ মনটা অদ্ভুত খালি খালি লাগছে।” সাথে সাথে তার বন্ধুরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবে। কেউ ইনবক্সে জিজ্ঞেস করবে, “মন খারাপ কেন?” আবার কেউ ধরে নেবে “নিশ্চয়ই প্রেমে ঝামেলা চলছে।” অথচ বাস্তবে হতে পারে, সে কোথাও একটি লাইন পড়ে মুগ্ধ হয়ে সেটা ক্যাপশন বানিয়েছে। কিংবা পাশের বাড়ির ছেলেটাকে একা বসে থাকতে দেখে মাথায় এসেছে কথাটা। তার জীবনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই।
আবার ধরুন, একজন তরুণী লিখল
“ভালোবাসা মানে প্রতীক্ষা,
ভালোবাসা মানে দীর্ঘশ্বাস।”
পড়েই পাঠকেরা বলবে “আহা, মেয়েটা প্রেমে ব্যর্থ।” অথচ মেয়েটিকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, হয়তো হেসে বলবে “না, আমার এক বন্ধু প্রেমে কষ্ট পেয়েছে, তার কথা ভেবেই লিখেছি।”
এই ভুল বোঝাবুঝি কেবল পাঠকের নয়, অনেক সময় পরিবারের ভেতরেও ঘটে। কোনো লেখক যদি উপন্যাসে দাম্পত্য কলহের দৃশ্য আঁকেন, আত্মীয়স্বজন সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন তুলবেন “তোমাদের বাসায় কি সবসময় এমন হয়?” লেখক যদি স্ত্রীকে নিয়ে গল্প লেখেন, সবাই ধরে নেবে চরিত্রটা তার স্ত্রীরই প্রতিচ্ছবি। অথচ লেখক তো মানুষের জীবনের হাজারো গল্প শুনে থাকেন, দেখেন, কল্পনা করেন। সেই সবকিছু মিলিয়েই দাঁড়িয়ে যায় একটি চরিত্র, যাকে পাঠকেরা লেখকের ছায়া ভেবে ভুল করেন।
চিত্রশিল্পী বনাম লেখক
ভাবুন তো, একজন চিত্রশিল্পী নদীর ছবি আঁকলেন। ছবিতে দুঃখ আছে, একাকিত্ব আছে, ভোরের আলো ফুটে উঠেছে। কেউ কি তখন তাকে জিজ্ঞেস করে “আপনার জীবনে কি এমন নদী আছে?” না। কিন্তু লেখকের ক্ষেত্রে সবাই ভাবে, তিনি যা লিখেছেন, সেটাই তাঁর জীবনের হুবহু প্রতিচ্ছবি।
বৃষ্টির গল্প
ধরুন, একজন লেখক বৃষ্টি নিয়ে গল্প লিখলেন। সেই গল্পে হয়তো থাকবে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় হেঁটে যাওয়া এক তরুণীর কথা, কিংবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধের নিঃসঙ্গতা। পাঠক ধরে নেবে “আচ্ছা, লেখক নিশ্চয়ই বৃষ্টিভেজা রাস্তায় কোনো প্রেমের স্মৃতি খুঁজেছেন।” অথচ বাস্তবতা হলো, লেখক হয়তো সেদিন একফোঁটাও ভিজেননি। তিনি শুধু দূর থেকে মানুষকে দেখে ভেবেছেন, বৃষ্টির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন হতে পারে।
আবার যদি কোনো চরিত্র মৃত্যুর ভয়ে কাঁপে, পাঠক ধরে নেবে লেখকের জীবনে নিশ্চয়ই কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। অথচ লেখক হয়তো কেবল হাসপাতালের সামনে বসে মানুষদের মুখভঙ্গি লক্ষ্য করেছিলেন, আর সেই থেকে জন্ম নিয়েছে চরিত্রের ভয়।
লেখক বনাম লেখা
সত্যিটা হলো লেখক আর লেখা আলাদা সত্তা। লেখক এক রকমের কারিগর। তিনি চারপাশের ঘটনা, অন্যের অভিজ্ঞতা, নিজের কল্পনা সবকিছু মিলিয়ে গল্প তৈরি করেন। তাঁর লেখা চরিত্ররা হাসে, কাঁদে, প্রেমে পড়ে, ভেঙে যায় কিন্তু তাদের জীবন সবসময় লেখকের জীবন নয়। তারা আলাদা, স্বাধীন, নিজেদের অস্তিত্বে টিকে থাকে।
তবু পাঠকেরা লেখকের ভেতরে লেখাকে, আর লেখার ভেতরে লেখককে খুঁজে ফেরে। কেন? কারণ পাঠক গল্পকে নিজের জীবনের সঙ্গে মেলাতে ভালোবাসে। গল্পে যে কষ্টের কথা লেখা আছে, পাঠক ভাবে এটাই লেখকের কষ্ট। গল্পে যে প্রেম, পাঠক ভাবে এটাই লেখকের প্রেম।
হয়তো এটাই সাহিত্যর সবচেয়ে বড় জাদু যা লেখক লিখেছেন, তা পাঠকের কাছে হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মতো। লেখক চরিত্রকে পাঠকের হাতে তুলে দেন, আর পাঠক সেই চরিত্রে নিজের ছায়া খুঁজে পায়।
শেষ কথা
একজন লেখক আসলে আলোকচিত্রীর মতো। তিনি চারপাশ থেকে ছবি তোলেন, কিন্তু ছবির ভেতরে সবসময় তাঁকে দেখা যায় না। তিনি চরিত্র গড়েন, অনুভূতিকে আঁকেন, কিন্তু প্রতিটি অনুভূতি তাঁর নিজের নয়।
তবু পাঠক ভুল করে ভাবেন চরিত্রই লেখক, লেখকই চরিত্র। অথচ লেখক তখন দূরে বসে নিরীহ ভঙ্গিতে হাসেন
“আমি তো শুধু গল্প বলেছি, তোমরা কেন আমাকে সেই গল্পে খুঁজে বেড়াচ্ছ?”
_❐ নাসির উদ্দিন নাস
নাস বর্ণালেখ্য
#দৃশ্যপটের_অন্তর্জগৎ #নাস_বর্ণালেখ্য
- #নাসের_ছন্দে_নিরন্তর_বর্ণাভাষা।
নৈকট্য সংকল্প!