12/04/2026
কুড়িগ্রামের সড়ক এখন 'ডেথ জোন': প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ফিটনেসবিহীন যান সহ অটোরিকশা, মিশুক, নসিমন, করিমন আর দানবীয় ট্রাক্টর যানের রাজত্ব।
কুড়িগ্রাম জেলার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনপথ—সবখানেই এখন রাজত্ব করছে অটোরিকশা, মিশুক, নসিমন, করিমন আর দানবীয় ট্রাক্টর। আইনত নিষিদ্ধ ও লাইসেন্সবিহীন এসব যান চলাচলের কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ উঠেছে, জেলা পুলিশ ও ট্রাফিক বিভাগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রছায়ায় লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে এসব অবৈধ যানকে 'বৈধতা' দিয়ে সড়কে নামানো হয়েছে। আর এই দুর্নীতির চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে—নিজেদের পঙ্গুত্ব বরণ করে অথবা প্রিয়জনের লাশ কাঁধে নিয়ে।
টাকার বিনিময়ে জিম্মি সাধারণ মানুষ
সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী নসিমন-করিমন বা ট্রাক্টরের মতো কৃষি ও পণ্যবাহী যানের যাত্রী পরিবহন বা মূল সড়কে চলাচলের কোনো অনুমতি নেই। কিন্তু কুড়িগ্রামে এই আইন কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিটি মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক ও পুলিশের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা নির্দিষ্ট মাসোহারা বা টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে এসব মৃত্যুবাহী যানকে অবাধে চলার সুযোগ করে দিচ্ছে। প্রশাসনের পকেট ভারী হলেও সাধারণ মানুষ আজ সড়কে চলাচলের অধিকার হারিয়েছে।
নিয়ন্ত্রণের বাইরে অবৈধ যানের ভিড়
শহর ও গ্রামের সংযোগ সড়কগুলোতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করা অটোরিকশা ও মিশুকের কোনো শৃঙ্খলা নেই। যে কেউ চাইলেই একটি যান কিনে সড়কে নামিয়ে দিচ্ছে। ট্রাফিক বিভাগের চোখের সামনেই উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র পার্কিং এবং অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রশাসনের পক্ষ থেকে লোকদেখানো দু-একটি অভিযান চালানো হলেও পরক্ষণেই আবার সবকিছু পুরনো রূপে ফিরে আসে।
প্রতিদিনের রক্তপাত ও পঙ্গুত্ব
সড়কে এই বিশৃঙ্খলার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জনজীবনে। গত কয়েক মাসে কুড়িগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অবৈধ নসিমন-করিমনের ধাক্কায় প্রাণ হারাচ্ছে স্কুলগামী শিশু থেকে শুরু করে বয়োবৃদ্ধরা। অনেক পরিবার তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পথে বসেছে। অথচ এসব দুর্ঘটনার পর মামলা বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের অনীহা জনমনে ক্ষোভের দানা বাঁধছে।
নাগরিকদের আক্ষেপ: "আমরা কি কর দিয়েছি প্রশাসনকে কেবল আমাদের মৃত্যুর দৃশ্য দেখার জন্য? যেখানে পুলিশের কাজ শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সেখানে তারাই যদি অবৈধ যানের রক্ষক হয়ে দাঁড়ায়, তবে বিচার চাইব কার কাছে?"
প্রশাসনের নিরবতা ও দায়বদ্ধতা
কুড়িগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, অবিলম্বে এই 'টোকেন বাণিজ্য' বন্ধ করতে হবে। অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কেবল জরিমানা নয়, স্থায়ী উচ্ছেদ অভিযান প্রয়োজন। পুলিশের যে অংশটি টাকার বিনিময়ে এই বিশৃঙ্খলাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
উপসংহার
কুড়িগ্রামের সড়ককে মরণফাঁদ বানিয়ে যারা পকেট ভারী করছে, সময় এসেছে তাদের রুখে দাঁড়ানোর। প্রশাসন যদি এখনই কঠোর না হয়, তবে এই জনপদে লাশের মিছিল আরও দীর্ঘ হবে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এই পকেট ভরার রাজনীতি কুড়িগ্রামবাসী আর বরদাশত করবে না।
মুহিবুল হুদা রবিন