05/05/2026
🟥সুন্নাহ সম্মত তালাক প্রদানের পদ্ধতি এবং রাজআত🟥
✅জবাবঃ
এক. তালাকের সুন্নত তরীকা হল, স্ত্রীর হায়েজ বা নিফাস না থাকা অবস্থায় পবিত্রতার সময় সহবাস করা ছাড়াই তাকে এক তালাক দিয়ে পৃথক করে দেয়া। এই ধরনের তালাককে 'আহসান' তালাক বলে।
✅নির্ভরযোগ্য ফাতাওয়াগ্রন্থ ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়াতে উল্লেখ করা হয় যে, তালাক তিন প্রকার।
(ক) আহসান (বেশ ভালো)
(খ) হাসান (ভালো)
(গ) বিদআত
অতপর হাসান তালাকের ব্যাখ্যায় বলা হয়,
والحسن أن يطلقها واحدة في طهر لم يجامعها فيه ثم في طهر آخر أخرى ثم في طهر آخر أخرى كذا في محيط السرخسي
তালাকে হাসান হলো, সহবাসমুক্ত তুহুরে (তুহুর হল, স্ত্রী মাসিক অবস্থা মুক্ত পবিত্রতম সময়) তালাক প্রদান করা। অতঃপর দ্বিতীয় সহবাস মুক্ত তুহুরে দ্বিতীয় তালাক দেয়া। অতঃপর তৃতীয় সহবাসমুক্ত তুহুরে তৃতীয় তালাক প্রদান করা।
📚 (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া-১/৩৪৮)
তালাকে হাসান এবং তালাকে আহসানের মধ্যে পার্থক্য-
(أَمَّا) الطَّلَاقُ السُّنِّيُّ فِي الْعَدَدِ وَالْوَقْتِ فَنَوْعَانِ حَسَنٌ وَأَحْسَنُ فَالْأَحْسَنُ أَنْ يُطَلِّقَ امْرَأَتَهُ وَاحِدَةً رَجْعِيَّةً فِي طُهْرٍ لَمْ يُجَامِعْهَا فِيهِ ثُمَّ يَتْرُكُهَا حَتَّى تَنْقَضِيَ عِدَّتُهَا أَوْ كَانَتْ حَامِلًا قَدْ اسْتَبَانَ حَمْلُهَا وَالْحَسَنُ أَنْ يُطَلِّقَهَا وَاحِدَةً فِي طُهْرٍ لَمْ يُجَامِعْهَا فِيهِ ثُمَّ فِي طُهْرٍ آخَرَ أُخْرَى ثُمَّ فِي طُهْرٍ آخَرَ أُخْرَى كَذَا فِي مُحِيطِ السَّرَخْسِيِّ
«الفتاوى الهندية» (1/ 348)
তালাকে আহসান হল, সহবাস মুক্ত তুহুরে (তুহুর হল, স্ত্রী মাসিক অবস্থা মুক্ত পবিত্রতম সময়) তালাক প্রদান করা। অতঃপর আর কোনো তালাক প্রদান না করা। যে পর্যন্ত না ঐ স্ত্রীর ইদ্দত খতম হয়ে যায় এবং গর্ভবর্তী থাকলে তার গর্ভ ভুমিষ্ট হয়ে যায়। তালাকে হাসান হলো, সহবাস মুক্ত তুহুরে (তুহুর হল, স্ত্রী মাসিক অবস্থা মুক্ত পবিত্রতম সময়)তালাক প্রদান করা। অতঃপর দ্বিতীয় সহবাস মুক্ত তুহুরে দ্বিতীয় তালাক দেয়া। অতঃপর তৃতীয় সহবাস মুক্ত তুহুরে তৃতীয় তালাক প্রদান করা।
📚 (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া-১/৩৪৮)
দুই. স্বামী সুস্পষ্ট শব্দে এক তালাক দেবে। এরপর স্বামী যদি স্ত্রীকে ইদ্দত চলা অবস্থায় ফিরিয়ে নেয় তাহলে ভালো। পুনরায় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কায়েম হয়ে যাবে। নতুন করে বিবাহের প্রয়োজন হবে না। আর যদি ইদ্দত চলাকালে স্বামী স্ত্রীকে ফিরিয়ে না নেয়, তাহলে ইদ্দত (তিন ঋতুস্রাব বা তিন মাস) শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। স্ত্রী স্বামী থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, তালাকের পরে উভয়েই অনুতপ্ত হয় এবং বৈবাহিক সম্পর্ক পুনর্বহাল করার আপ্রাণ চেষ্টা করে। যদি ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী এক তালাক দেওয়া হয়, তাহলে এ আশা পূরণের সুযোগ থাকে এবং তারা পুনরায় বৈবাহিক জীবন শুরু করতে পারে। কিন্তু স্বামী একসঙ্গে তিন তালাক দিলে ইদ্দত চলাকালেও স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। ইদ্দতের পরেও নতুনভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অবকাশ থাকে না। তারা একে অন্যের জন্য সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। এমতাবস্থায় অনুতপ্ত হওয়া এবং আপসের জন্য আগ্রহী হলেও তা কোনো কাজে আসে না।
প্রথম ও দ্বিতীয় তালাকের পর রাজআত করা যায়। তথা ইদ্দতের ভিতর স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে। এর জন্য কোনো আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন নেই।
রাজআতের পদ্ধতি সম্পর্কে ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়ায় উল্লেখ করা হয়,
الرجعة إبقاء النكاح على ما كان ما دامت في العدة كذا في التبيين وهي على ضربين: سني وبدعي (فالسني) أن يراجعها بالقول ويشهد على رجعتها شاهدين ويعلمها بذلك فإذا راجعها بالقول نحو أن يقول لها: راجعتك أو راجعت امرأتي ولم يشهد على ذلك أو أشهد ولم يعلمها بذلك فهو بدعي مخالف للسنة والرجعة صحيحة وإن راجعها بالفعل مثل أن يطأها أو يقبلها بشهوة أو ينظر إلى فرجها بشهوة فإنه يصير مراجعا عندنا إلا أنه يكره له ذلك ويستحب أن يراجعها بعد ذلك بالإشهاد كذا في الجوهرة النيرة.
রাজআত হল, ইদ্দতের ভিতরে বিয়েকে টিকিয়ে রাখা, স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসা।রাজআত দুই প্রকার
✅(ক) সুন্নাহ সম্মত- এর ব্যখ্যা হল, কথার মাধ্যমে রাজআত করা হবে এবং রাজআত করার সময় দুইজন সাক্ষীকে উপস্থিত রাখা হবে এবং তাদেরকে রাজআতের বিষয় সম্পর্কে অবগত করা হবে। যখন কথার মাধ্যমে রাজআত করা হবে, তখন স্বামী বলবে-আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম বা বলবে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম।
✅(খ) যদি দুজন সাক্ষীর অনুপস্থিতিতে বা উপস্থিত তবে তাদেরকে অবগত না করে কেউ রাজআত করে নেয়, তাহলে এটা রাজআত হবে। তবে বিদআত হবে।
যদি কেউ কথার পরিবর্তে কাজের মাধ্যমে রাজআত করে নেয়।যেমন স্বামী তার ঐ স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়ে গেল,বা তাকে চুমু দিয়ে দিল,বা তার লজ্জাস্থানের দিকে কামভাব নিয়ে থাকিয়ে রইলো,তাহলে এমতাবস্থায়ও রাজআত হয়ে যাবে।তবে হানাফি মাযহাব মত এমনটা করা মাকরুহ।
মুস্তাহাব হল,তালাক পরবর্তী দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে রাজ'আত করা।
📚 (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া ১/৪৬৮)
তিন. যদি তারা চায় যে আর কোনো দিন তারা একে অন্যের সংসারে ফিরে আসবে না, সে ক্ষেত্রেও ইসলাম একসঙ্গে তিন তালাক দিতে নিষেধ করেছে। তাই হায়েজের পর প্রত্যেক পবিত্রতার সময় এক তালাক করে তিন তালাক দেবে। এভাবে তিন তালাকের মাধ্যমে তারা সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যাবে। এ পদ্ধতিতে তালাক দিলে তালাক-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ পাওয়া যায়। ধীরস্থিরভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তাড়াহুড়া করে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না। পক্ষান্তরে একসঙ্গে তিন তালাক দিলে এই অবকাশগুলো থাকে না এবং তা কোনো সুফলও বয়ে আনে না; বরং স্বামী-স্ত্রী উভয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়ে।
عن ابراهيم قال: كانوا يستحبون أن يطلقها واحدة، ثم يتركها حتى تحيض ثلاث حيض (مصنف ابن ابى شيبة، كتاب الطلاق، ما يستحب من طلاق وكيف هو-9/512، رقم-18040، مصنف عبد الرزاق-6/302، رقم-10926)
ইবরাহীম (রহ.) বলেন:
“সাহাবীগণ পছন্দ করতেন যে, স্ত্রীকে এক তালাক দেওয়া হবে, তারপর তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে—যতক্ষণ না সে তিনটি হায়েয অতিক্রম করে।”
📚 (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা-৯/৫১২, হাদীস নং-১৮০৪০; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক-৬/৩০২, হাদীস নং-১০৯২৬)
فالأحسن أن يطلق الرجل أمرأته تطليقة واحدة فى طهر لم يجامعها فيه ويتركها حتى تنقضى عدتها (هداية، كتاب الطلاق، باب طلاق السنة-2/354)
উত্তম হলো—
স্বামী তার স্ত্রীকে এমন পবিত্র অবস্থায় (যে তুহরে সহবাস হয়নি) এক তালাক দেবে এবং তাকে ছেড়ে দেবে—যতক্ষণ না তার ইদ্দত শেষ হয়।
📚 (হেদায়া, কিতাবুত তালাক-২/৩৫৪)
أما الأحسن: أن يطلقها واحدة فى وقت السنة، ويتركها حتى تنقضى العدة، وروى عن إبراهيم أن أصحاب النبى صلى الله عليه وسلم كانوا يستحبون ان لا يزاد فى الطلاق على واحدة حتى تنقضى العدة، وهذا افضل عندهم من ان يطلق الرجل امرأته ثلاثا عند كل طهر تطليقة (تاتارخانية-4/378، رقم-6472)
আরও উত্তম হলো—
সুন্নতসম্মত সময়ে এক তালাক দেওয়া এবং তাকে ছেড়ে দেওয়া—যতক্ষণ না ইদ্দত শেষ হয়। এবং ইবরাহীম (রহ.) থেকে বর্ণিত আছে যে,
রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীগণ পছন্দ করতেন—ইদ্দত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এক তালাকের বেশি না দেওয়া।
তাদের কাছে এটি বেশি উত্তম ছিল — প্রতি পবিত্র সময়ে (তুহরে) এক একটি করে তিন তালাক দেওয়ার তুলনায়।
📚 (ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়া-৪/৩৭৮, ফতোয়া নং-৬৪৭২)
والله اعلم بالصواب