27/08/2024
নদভী নামা
•••••••••••
এক প্রিয়জনের হাতে নিগৃহিত হওয়ার এক করুণ কাহিনী
-----------------
লিখেছেন :
ড. মাওলানা আবু বকর রফিক আহমদ।
সাবেক প্রোভিসি, আইআইউসি।
---------
প্রসিদ্ধ জাহলী কবি 'ত্বারাফাহ ইবন্ আল 'আবদ্' এর একটি পঙতি আরবী ভাষায় প্রবাদরূপে পরিচিত। পঙতিটি নিম্নরূপ:
وظلم ذوي القربى أشد مضاضة
على المرء من وقع الحسام المهند.
অর্থাৎ:
প্রিয় জনের যুলুম তা তো যন্ত্রনায়,বেশি কার্যকর,
ভারতীয় তরবারির আঘাতের তুলনায়।
তারই এক তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলছি আজ,যার ভুক্তভুগী আমি নিজেই।
আমারই এক প্রিয় ছাত্রের কাহিনী।যার পিতা ছিলেন আমার উস্তাদ এবং সহকর্মী।একই প্রতিষ্ঠানে আমি ছিলাম প্রিন্সিপাল আর উনি ছিলেন নাজেম (তত্ত্বাবধায়ক)। আমি যখন এক বিদেশি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম তখন ঐ ছাত্রটি একটি কওমী মাদ্রাসার চাঁদা সংগ্রাহক ছিল।
সে প্রতিবছর রামাদান মাসে ঐ দেশ সফর করত চাঁদা সংগ্রহের উদ্দেশ্যে।আমার সাথে তার সম্পর্কের কারণে সে সেখানে গিয়ে আমার বাসাতেই উঠতো, আমিও বিদেশের বুকে আমার এক প্রিয় ছাত্রকে কাছে পেয়ে খুবই পুলকিত বোধ করতাম।
এক পর্যায়ে আমি দেশে ফিরে এসে এক নব প্রতিষ্ঠিত উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে যোগদান করলে সে উক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রভাষক পদে যোগদান করে।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা লাভ করলে সে জামায়াত ঘরানার জার্সি বদল করে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাধর নেতাদের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করে এবং তাতে সফল হয়।
তার মনে আসল : "আমি যে ক্ষমতার সংস্পর্শ লাভ করেছি তার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো উচিত। এর প্রথম টার্গেট হিসেবে চিহ্নিত করা হলো আমাকে।প্রশ্ন করতে পারেন কীভাবে? তাই বলছি, শুনুন।
দিবসটি ছিল ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১১। সেদিন আমার প্রতিষ্ঠানের কাজে আমার কুয়েত যাবার কথা। আমার সফর সঙ্গী হচ্ছে উক্ত প্রতিষ্ঠানের আর এক সহকর্মী। নির্ধারিত সফরের একদিন আগে ঐ সহকর্মী কুয়েত থেকে আমাকে ফোন করে বলল: আমাকে একটি বিশেষ জরুরী কারণে একদিন আগে চলে আসতে হলো, আপনার টিকেট অমুকের হাতে রেখে এসেছি। আমি আপনাকে রিসিভ করার জন্য এখানকার বিমান বন্দরে উপস্থিত থাকবো।
নির্দিষ্ট তারিখে আমি বিমানের চেকিং ইন করে যখন সিকিউরিটির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে যাই তখন আমাকে বিমানে আরোহণ করতে না দিয়ে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় ডি,বি, অফিসে। সেখান থেকে পরের দিন আদালত হয়ে একেবারে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে ভি,আই,পি, স্টাটাস চেয়ে আবেদন করা হলেও তা দেয়া হয়নি। ৩৮ দিন কারাগারে অবস্থানের পর কোন অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় মুক্তি লাভ করি।
আমি মনে করি আমার এ প্রিয় ছাত্র আমার প্রতি যে উপকারটা করেছ তা হচ্ছে এই, সে আমাকে চার চার জন নবীর সুন্নত আদায় করার সুযোগ করে দিয়েছে, যা অর্জন করা আমার কপালে জুটতো না।
২০১১ সালে কোন অপরাধে আমাকে জেলে যেতে হয়েছিল সে বিষয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করে আমার কাছে একটি কারণ ধরা পড়েছে। তা হলো: ৫/৬ বছর আগে আমার এ প্রিয় ছাত্রটি একটি জঘন্য অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিল। অপরাধটি ছিল নৈতিক স্খলনের অভিযোগ,যার বাস্তবতা প্রমাণিত হয়েছিল।তখন আমার পরামর্শ ছিল 'তাকে চাকুরী থেকে অব্যাহতি দান'। কারণ আমার সামনে ছিলো আল্লাহর সেই নির্দেশ: "আল্লাহর দীনের বিষয়ে করুনা যেন তোমাদেরকে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অন্যান্যরা এ সিদ্ধান্তে একমত না হওয়ায় ও অব্যাহতি পেয়েছিল। যারা সেদিন তার প্রতি দয়াপরবশ হয়েছিল তাদেরকে এ লোকটি প্রথম সুযোগেই বিতাড়িত করে তাদের প্রতিষ্ঠান দখল করেছিল।
ক্ষমতার সংস্পর্শে আসার উদ্যেশ্য অব্যাহত প্রচেষ্টার এক পর্যায়ে আমার এ প্রিয় ছাত্রটি সফল হয়, এবং চুনতির এক সন্তান যে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এক গুরুত্বপূর্ণ পদবীর অধিকারী ছিল তাকে ধরে একটি সংসদ সদস্য পদ বাগিয়ে নিলে যারা দীর্ঘদিন ধরে এ পদটি অর্জনের লক্ষ্যে রাজনীতি করছিল তারা এ সিদ্ধান্তটি স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা এ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটালো ভিন্নভাবে। সংসদ সদস্যপদ লাভ করার পর সর্বপ্রথম ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটালো একটি বিশাল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করার আদেশ দানের মাধ্যমে। যেদিন আমার এ প্রিয় ছাত্রটি প্রধান অতিথি হিসেবে এ সম্মেলনে যোগদান করে সেদিন তার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীরা যারা তার কারণে সংসদ সদস্য পদ হতে বঞ্চিত হয়েছিল তারা সিদ্ধান্ত নিল যে এ সংসদ সদস্যকে জুতার মালা পরিয়ে বরণের উদ্যোগ নেয়া হবে। যেমন পরিকল্পনা তেমন কর্ম। নবনির্বাচিত (?) এ সংসদ সদস্য স্টেজে উঠার সাথে সাথেই বাহিরে অবস্থানরত একটি গোষ্ঠীর মাধ্যমে তার প্রতি শত শত জোড়া জুতা নিক্ষেপ করে তাকে সংবর্ধিত করা হল। কিন্তু কপাল খারাপ আমাদের মত ২০০/২৫০ নিরপরাধ মানুষের। যারা আমার এ প্রিয় ছাত্রটিকে চরমভাবে বেইজ্জত করল তাদের কেশাগ্র ছুঁইতে না পেরে আমি সহ আড়াইশ নির্দোষ নিরপরাধ মানুষকে আসামি করে তাদের বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি মামলা রুজু করা হলো। এদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যারা জীবনে কোনদিন এ অঞ্চলে পদার্পণ করেনি। আপনারা হয়ত ভাবছেন এত নিরপরাধ লোকদেরকে এ মিথ্যা মামলায় জড়ানোর কারণ কী ছিল? এর কারণ আমি বলছি, শুনুন। বিগত দশ-বার বছরে যারা কোনদিন তার সাথে কোনোরূপ অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছিল তাদেরকেই এ মামলার আসামি করা হয়েছিল।এর বাইরে রয়েছে চুনতির নাম না জানা শতাধিক নিরীহ মানুষ, বিগত দশ বছর ধরে যাদের আহাজারিতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছিল।
প্রশ্ন করতে পারেন আপনার কী অপরাধ? এর উত্তর হলো: আমার অপরাধ ছিল অনেক বড় এবং আমাকে শায়েস্তা করার জন্য এর চাইতে উত্তম কোনো পথ তার হাতে আসেনি।
২০১২ সালে আমি উক্ত প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য হিসেবে কর্মরত ছিলাম। এ সময়কালে আমার এ প্রিয় ছাত্রটি প্রফেসর পদের জন্য আবেদন করে। প্রফেসর পদে উন্নীত হওয়ার জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই PhD ডিগ্রি অর্জন করতে হয়, তদুপরি কমপক্ষে ৭টি নির্দিষ্ট মানের প্রবন্ধ প্রকাশ করতে হয়। সে দাবি করল তার ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করা হয়েছে। যখন তাকে এর সপক্ষে ডকুমেন্ট প্রদর্শন করতে বলা হলো তখন সে তা পেশ করতে ব্যর্থ হলো। যখন তাকে বলা হলো : তুমি ডক্টরেট থিসিস জমা দাও, সে তা জমা দিতে অস্বীকৃতি জানালো। তাছাড়া সে যে প্রবন্ধগুলো জমা দিয়ছিল এর অধিকাংশই নিজের প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থ। এর বাইরে দুটি প্রবন্ধও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। নিরপেক্ষ নিরীক্ষা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে এ প্রবন্ধগুলো বাইরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক উপাচার্যের কাছে পাঠানো হলে তিনি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সাথে কুয়েত হতে প্রকাশিত একটি সংস্থার একটি পুস্তিকা সাথে প্রেরণ করে দেখিয়ে দিলেন যে পূর্ববর্তী সময়ে প্রকাশিত উক্ত প্রবন্ধটি আবেদনকারী হুবহু নিজের নামে প্রকাশ করেছে।
এহেন পরিস্থিতিতে তাকে প্রফেসর পদে প্রমোশন দেয়ার কোনই সুযোগ ছিল না। আমরা নিশ্চিত ভাবে জানতাম যে সে ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে PhD রং জন্য রেজিস্ট্রেশন করালেও সে কখনও এক নাগাড়ে এক সপ্তাহের জন্যও সেখানে অবস্থান করেনি।
তাকে প্রফেসর পদে প্রমোশন না দিয়ে যে অপরাধটি আমি সংঘঠিত করেছিলাম তার প্রতিশোধ নেয়া হলো সে সংসদ সদস্য পদ লাভ করার প্রথম সুযোগেই। শুধু তাই নয়, ২০১৬ সালে আমি যখন আমার অসুস্থ মেয়েকে দেখার জন্য অস্ট্রেলিয়া গমন করলাম তখন আমার নামে এ প্রিয় ছাত্রটি একটি লিফলেট বিতরণ করেছিল এ মর্মে যে " অমুক যুদ্ধাপরাধীর বেহাই (অর্থাৎ আমার ছেলের শ্বশুর জনাব মুজাহিদ ভাই) অমুক ব্যক্তিটি দেশের বাইরে গিয়ে এ দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে বেড়াচ্ছে, দেশে ফেরার পথে বিমান বন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে"। (তার বক্তব্যের প্রমাণ স্বরূপ মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী ছাত্রদের এক সমাবেশে বক্তব্যরত আমার এক ছবিও তার ভাগ্নের মাধ্যমে সংগ্রহ করে উপর্যুক্ত মন্তব্য সংযোজন করে গোয়েন্দা দপ্তরে পাঠিয়ে দেয়া হয়)। তার এ ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতিতে আমাকে ২০১৬-২০২০পর্যন্ত দীর্ঘ চার বছর বিদেশে কাটাতে হয়েছিল।।এর বাইরেও আমার বিরুদ্ধে আরো কয়েকটি মামলা রুজু করা হয়েছিল এগুলোর একটি ছিল বিস্ফোরক দ্রব্য বহন মামলা। ৫ই আগস্ট ২০২৪ তথা হাসিনা সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত এ মামলাগুলো সচল ছিল এবং চুড়ান্ত রায়ের পর কারাগারে গমনই ছিল এর অবধারিত পরিনতি।
আলহামদুলিল্লাহ সম্প্রতি সংঘঠিত ছাত্র-জনতার মহা বিপ্লব আমাদেরকে যেমন স্বৈরাচারী শাসকের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে তদ্রূপ এসব মিথ্যা মামলা থেকেও অব্যাহতি দান করেছে।
হয়তো কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এখন আপনার এ ছাত্রের প্রতি আপনার অবস্থান কী হবে? এর উত্তরে আমি বলবো:
"আমার এ প্রিয়জন আমার প্রতি যে আচরণ করেছিল আমিও অনুরূপ ভাবে এর প্রতিকার চেয়ে আদালতের স্মরণাপন্ন হতে পারি এবং মান- হানির মামলা করে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করতে পারি"। কারণ শারী'আহ আমাকে এর অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হচ্ছে ক্ষমার নীতি অবলম্বন। আমি যদি প্রতিকার চাই, আল্লাহ বলবেন: তুমি তো তোমার প্রাপ্য দুনিয়াতেই উসুল করে নিয়েছো, এখন তোমার আর কোন দাবি অবশিষ্ট নেই। যদি ক্ষমা করে দেই তা হচ্ছে আল্লাহর পছন্দ। আল্লাহ বলেন "والكاظمين الغيظ والعافين عن الناس والله يحب المحسنين" তাছাড়া আল্লাহর রসূলের নির্দেশ হচ্ছে: "صل من قطعك واعف عمن ظلمك وأحسن الى من أساء إليك" অর্থাৎ:যে তোমার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছে তার সাথে সম্পর্ক যুক্ত কর, যে তোমার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছে তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও এবং যে তোমার প্রতি জুলুম করেছে তুমি তার প্রতি সদাচরণ কর"। আমি চাই আল্লাহর কাছে এর পুরষ্কার পেতে, দুনিয়াতে নয়।
উপরুল্লিখিত আমার প্রত্যেকটি কথা বাস্তব সত্য, তাই কেউ চাইলে এ বার্তাটি তার কাছে অথবা তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে শেয়ার করে দিতে পারেন।
ছবি : ড. মাওলানা আবু বকর রফিক আহমদ ও তাঁর সম্ভ্রান্ত পাঁচ সহোদর।