18/01/2022
"হ-য-ব-র-ল"
নিচের লেখাটি মুনীর চৌধুরীর রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য লাইন নিয়ে লেখা তাই নাম দিয়েছি "হ-য-ব-র-ল"। একটা লাইন তো দূরের কথা একটা বর্ণ পর্যন্ত আমার নিজের না, যা কিছু তার সবই মুনীর চৌধুরীর। আমি শুধু আমার মতো করে সাজিয়েছি।
রক্ত। মানুষের রক্ত মানুষে খায়। খেয়ে মাতাল হয়। মাতাল হয়ে উৎসবে মেতে ওঠে। মানুষকে খুন করে মানুষ। মানুষের রক্তে পিয়াস মেটায় মানুষ। জানোয়ার চাটে জানোয়ারের রক্ত। শরীরের চামড়া ফুটো করে নল ঢুকিয়ে, চোঁ চোঁ করে কেবল রক্ত টেনে চলেছে। কিছুতেই যেন পিয়াস মেটে না। পেট ভরে না। লাল না নীল, সাদা না কালো, এই অন্ধকারে তা কী করে মালুম করবো। লাল টকটকে চেহারা। বাচ্চা ছেলের মতো কচিমুখ। কী তেজ, কী সাহস! কোনো কিছুই নিরর্থক নয়। আক্রমণ করার মধ্যে যদি মস্ত কোনো কারণ থাকতে পারে, তাহলে না করার মধ্যেও নিশ্চয়ই কোনো কারণ লুকিয়ে আছে। আমার পক্ষে অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত উদাসীন থাকা সম্ভব নয়। মানুষ মরে গেলে পঁচে যায়। বেঁচে থাকলে বদলায়। কারণে-অকারণে বদলায়। সকালে বিকালে বদলায়। আগামী দিনের কথা কে বলতে পারে। একজন মানুষের জীবনেও কোনো দুটো মুহূর্ত এক রকম নয়। আমি কাপুরুষ। নিজেকে এবার চিনে ফেলেছি। আর সাহসের বড়াই করি না! ছদ্মবেশ। সব ছদ্মবেশ। বিশ্বাস করো, সব ছদ্মবেশ।
আমি পরীক্ষা করতে আসিনি, গ্রহণ করতে এসেছি। যে ফিরে যাবে সে আমি হবো না। সে হবে বিশ্বাসঘাতক। আমি নিশ্চিত জানি, জয়-পরাজয় যাই আসুক, মৃত্যু ভিন্ন আমার মুক্তির অন্য কোন পথ নেই। শক্তির যে সুশিক্ষা তোমার কাছ থেকে লাভ করেছি তার ক্ষমতাকে অত অবহেলা করো না।
ঢেউয়ের দোলায় আমি কেবলই নিচের দিকে তলিয়ে যাচ্ছি। তোমাকে দেখবো বলে যতোবারই চোখ খুলতে চাইছি ততোবারই রক্তের ঝাপটায় সব গুলিয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কতোদিন তোমাকে দেখিনি। তৃষ্ণায় দু’চোখ আমার পুড়ে খাক হয়ে গেছে। কতোকাল তোমার এই রূপ আমি দেখিনি। অশ্বপৃষ্ঠে নয়, মাটির ওপর দাঁড়িয়ে তুমি। রক্তাক্ত তরবারি নয়, হাতে তোমার মেহেদিপাতা। ঐ আনত মুখ, ঐ নির্মিলিত চোখে এত রূপ তোমার, একবার মুখ তুলে তাকাও আমার দিকে। আজকে তোমার যে রূপ আমি আমার মনের মধ্যে এঁকে নিয়ে গেলাম, রক্তের উদ্ভাসে আমার চোখ যদি ঢেকেও যায়, তবুও সে আলো নিভবে না, থাকবে। মিলবে-লড়বে, মারবে-মরবে। কেবল আমাদের দু’জনারই আর কখনো দেখা হবে না, এও কি সম্ভব? আমি হয়তো সত্যি অন্ধ। কিন্তু তুমি আমার চেয়েও অন্ধ। কী কঠিন! কী পাষাণ তুমি! তুমি আরো ভীরু, আরো দুর্বল, আরো সামান্য হলে না কেন? আজ আমরা জয়ী। সম্পূর্ণ জয়ী। রক্তে রক্ত মিশেছে। কার সাধ্য এই রক্ত-মাংস অস্থি হাতড়ে শত্রু-মিত্র বেছে বেছে আলাদা করে।
তুমি কেন সাড়া দিলে না? কেন জেগে উঠলে না? কেন ঘুমিয়ে পড়লে? আমি এত কষ্টের আগুণে পুড়ে, মনের বিষে জরজর হয়ে এত রক্তের তপ্তস্রোত সাঁতরে পার হয়ে তোমাকে পাবার জন্য ছুটে এলাম। আর তুমি কিনা ঘুমিয়ে পড়লে। কষ্ট, ঘুমের বড় কষ্টে ভুগেছো তুমি। ঘুমাও। আরো ঘুমাও! প্রাণ ভরে ঘুমাও! আমি আর একজনের জন্য অপেক্ষা করবো। আমি হারিয়ে যাবো না। আমি নিজেকে জয় করেছি। আজ আমি পরিপূর্ণ, আজ আমি সত্যি জয়ী। তোমাকে চিনেছি, নিজেকেও চিনেছি। তুমি মায়া-মমতাশূন্য। তুমি ভয়াবহ। তোমাকে আমি চিনি না। তুমি আমার শক্তি, আমার গর্ব, আমার রাণী।
তোমাকে অদেয় কিছুই নেই। মরণ যেখানে বাসা বেঁধেছে তার নাম কারাগার নয়। তুমি সর্বনাশ করেছো। তুমি জানো না তুমি কী সর্বনাশ করেছো। আমার ব্যগ্রতার কারণ আপনি বুঝবেন না। অনেক গুনাহ্ করেছি, আজ তার কিছু স্খালন করতে চাই।