04/06/2026
একটা জাতিকে ধ্বংস করতে যুদ্ধ সবসময় প্রয়োজন হয় না। একটি জাতিকে পিছিয়ে দিতে হলে শুধু তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করলেই যথেষ্ট। হানাহানি, মারামারি, সংঘাত, ষড়যন্ত্র, দলাদলি ও অশিক্ষা একটি জাতির সবচেয়ে বড় শত্রু। আর একটি জাতিকে উন্নত করতে হলে দরকার শিক্ষা, জ্ঞান, শৃঙ্খলা, বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মানবিকতা ও কঠোর পরিশ্রম।
আজ পৃথিবীর যেসব দেশ উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত, তারা রাতারাতি উন্নত হয়নি। চীন কয়েক দশক আগেও ছিল একটি দরিদ্র কৃষিনির্ভর দেশ। কিন্তু তারা নিজেদেরকে উৎপাদন, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও শিল্পে এত বেশি মনোযোগ দিয়েছে যে আজ তারা বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক হামলার পর জাপান প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু সেই জাপানই তাদের শৃঙ্খলা, মেধা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও পরিশ্রমের মাধ্যমে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আজ তারা বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও সম্মানিত জাতি।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কেন পারবে না?
এই দেশের মাটিতে কী নেই? এ দেশের উর্বর জমিতে যা বপন করা হয় তাই জন্মায়। নদী আছে, সাগর আছে, মাছ আছে, কৃষি আছে, প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, শ্রমশক্তি আছে, তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ অঞ্চল এই বাংলাদেশ। আমাদের আছে বিশাল সমুদ্রসীমা, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, প্রাকৃতিক গ্যাস, পর্যটনের সম্ভাবনা এবং কোটি কোটি পরিশ্রমী মানুষ।
তারপরও কেন এ দেশের বহু মানুষ এখনও তিনবেলা খাবারের নিশ্চয়তা পায় না?
কেন এখনও মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যায়?
কেন এখনও টাকার অভাবে অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়?
কেন এখনও অনেক মা-বাবা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে থাকে?
কেন এখনও এই দেশে অনাহার, বেকারত্ব ও হতাশা মানুষের জীবনকে গ্রাস করে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের নিজেদের কাছেই খুঁজতে হবে।
আমরা যদি জাতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি, যদি জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে বিভেদে জড়িয়ে পড়ি, যদি বিজ্ঞান ও শিক্ষার চেয়ে হিংসা ও বিদ্বেষকে বড় করি, তাহলে কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হবে না। উন্নত রাষ্ট্র গড়তে হলে শুধু রাস্তা বা বড় বড় ভবন তৈরি করলেই হবে না, মানুষের মানসিকতা, শিক্ষা ও নৈতিকতারও উন্নতি করতে হবে।
একসময় বাংলা, বিহার ও ওড়িশা ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষার জন্য আসতো। নালন্দার মতো বিশ্ববিদ্যালয় হাজার বছর আগে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছিল এই ভূখণ্ডে। কিন্তু দীর্ঘ উপনিবেশিক শাসন, শোষণ ও বিভক্তির কারণে আমরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়েছি।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসার নামে এই অঞ্চলে এসে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শক্তি দখল করে। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার স্বাধীনতার পতন শুরু হয় এবং পরে পুরো ভারতবর্ষ দীর্ঘদিন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়। তারা শুধু সম্পদ লুট করেনি, এমন একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করে গেছে যার প্রভাব আজও আমাদের সমাজে রয়ে গেছে।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের আরেকটি শিক্ষাও দেয় , কোনো জাতি চিরদিন পিছিয়ে থাকে না, যদি সেই জাতি নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং জ্ঞান ও পরিশ্রমের পথে ফিরে আসে।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো জাতীয় ঐক্য, দক্ষতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও মানবিক নেতৃত্ব। তরুণ সমাজকে শুধু চাকরির পেছনে নয়, নতুন কিছু সৃষ্টি করার দিকেও এগিয়ে যেতে হবে। কারণ পৃথিবী এখন জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের যুগে প্রবেশ করেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার প্রাকৃতিক সম্পদে নয়, সেই দেশের মানুষের চিন্তা, শিক্ষা, সততা ও কর্মে।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা অসীম। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, সুশিক্ষা, সততা, ন্যায়বিচার এবং নিজেদের দেশকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসার মানসিকতা।
বিভেদ নয়, জ্ঞান হোক আমাদের শক্তি। হিংসা নয়, মানবিকতা হোক আমাদের পরিচয়। অলসতা নয়, পরিশ্রম হোক আমাদের ভবিষ্যৎ।