02/09/2026
ওমর সানির হাহাকার, ‘আহ মান্না ভাই, এইভাবে চলে যাবেন ভাবতেও পারিনি’
ঢাকাই চলচ্চিত্রের একসময়কার দাপুটে নায়ক মান্নাকে আজও ভুলতে পারেননি তার সহকর্মী ও বন্ধুরা।
সম্প্রতি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্নাকে নিয়ে একটি পুরোনো ছবি প্রকাশ করেন ওমর সানি।
ছবিতে দেখা যায়, মান্নার সঙ্গে তার স্ত্রী শেলী মান্না ও ছেলে সিয়াম ইলতিমাস। একই ফ্রেমে রয়েছেন ওমর সানির স্ত্রী চিত্রনায়িকা মৌসুমী এবং তাদের দুই সন্তান। ছবিটি ‘আমি জেল থেকে বলছি’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় তোলা বলে জানা গেছে।
ছবিটি প্রকাশ করে মান্নাকে উদ্দেশ করে ওমর সানি লেখেন, ‘আহ মান্না ভাই, এইভাবে চলে যাবে ভাবতেও পারিনি। আপনার শূন্যতা বাংলা চলচ্চিত্রে। মান্না ভাইয়ের পরিবার এবং আমার।
’ তার এই সংক্ষিপ্ত কথার মধ্যেই যেন ফুটে উঠেছে বহু বছরের বন্ধুত্ব, পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা এবং প্রিয় মানুষকে হারানোর দীর্ঘশ্বাস।
মান্না ও ওমর সানির সম্পর্ক ছিল শুধু চলচ্চিত্রের পর্দায় সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তিজীবনেও তাদের মধ্যে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। একইভাবে মান্নার সঙ্গে মৌসুমীর সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত গভীর।
মৌসুমী একাধিকবার সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, মান্না ছিলেন তার খুব কাছের বন্ধু।
‘লুটতরাজ’ সিনেমায় তাদের একসঙ্গে কাজের পর দুজনের মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তারা অসংখ্য সিনেমায় জুটি হয়ে অভিনয় করেন।
একসময় চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার প্রকোপ এবং ওমর সানির কাজ কমে যাওয়ার কারণে মৌসুমীরও কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছিল। সেই সময় মান্না তাকে একের পর এক ভালো সিনেমায় কাজের সুযোগ করে দিয়েছিলেন বলেও স্মৃতিচারণ করেছেন মৌসুমী।
এস এম আসলাম তালুকদার, চলচ্চিত্রে যিনি ‘মান্না’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন, ১৯৮৪ সালে বিএফডিসির ‘নতুন মুখের সন্ধানে’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেন।
শুরুতে নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করলেও নব্বইয়ের দশকে এসে তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় নায়ক। অ্যাকশনধর্মী ও সামাজিক গল্পের সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষ করে সাধারণ ও বঞ্চিত মানুষের গল্পে তার অভিনয় তাকে ‘গণমানুষের নায়ক’ হিসেবে আলাদা পরিচিতি দেয়।
‘আম্মাজান’সহ বেশ কিছু সিনেমা তাকে দর্শকের কাছে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। পর্দায় তার সংলাপ বলার ধরন, অ্যাকশন দৃশ্যে উপস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো চরিত্র তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
ওমর সানির প্রকাশ করা ছবিটি যে সিনেমার শুটিংয়ের সময় তোলা, সেটিও মান্নার ক্যারিয়ারের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর একটি। ‘আমি জেল থেকে বলছি’ সিনেমাটি পরিচালনা করেন মালেক আফসারী। ২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটিতে মান্নার পাশাপাশি অভিনয় করেন মৌসুমী, ওমর সানি ও মিশা সওদাগর। সিনেমাটিতে মান্না শ্রেষ্ঠ অভিনেতা এবং ওমর সানি শ্রেষ্ঠ খল অভিনয়শিল্পী হিসেবে চলচ্চিত্র দর্শক পুরস্কারও পান।
সেই সিনেমার শুটিংয়ের একটি পারিবারিক মুহূর্তের ছবি এত বছর পর সামনে এনে ওমর সানি যেন আবারও পুরোনো দিনের স্মৃতিতে ফিরে গেলেন।
২০০৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আচমকাই না ফেরার দেশে চলে যান মান্না। হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তার আকস্মিক মৃত্যু তখন পুরো ঢালিউডে গভীর শোকের ছায়া তৈরি করেছিল।
মান্নার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার অসংখ্য ভক্ত ও সহকর্মী শোকে ভেঙে পড়েন। চলচ্চিত্রে তখনও তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ফলে এত অল্প বয়সে তার চলে যাওয়া ছিল পুরো ইন্ডাস্ট্রির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
তার পরিবার পরবর্তী সময়ে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগও তুলেছিল। তবে এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তথ্য ও দাবি সামনে এসেছে।
মান্নার চলে যাওয়ার ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। সময়ের হিসাবে প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও তার জনপ্রিয়তায় যেন ভাটা পড়েনি। পুরোনো সিনেমা, সংলাপ কিংবা গান সামনে এলেই নস্টালজিয়ায় ফিরে যান নব্বই ও দুই হাজার দশকের দর্শকেরা।
মান্নার স্ত্রী শেলী মান্নাও বহু বছর ধরে স্বামীর স্মৃতি ও তার রেখে যাওয়া কাজকে আগলে রেখেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, মান্নার স্মৃতি নিয়েই তিনি বেঁচে আছেন এবং তার রেখে যাওয়া কাজগুলো এগিয়ে নেওয়া তার জন্য বড় দায়িত্ব।
মান্নার একমাত্র ছেলে সিয়াম ইলতিমাসও বাবার চলচ্চিত্রজগতের আবহে বড় হয়েছেন। তার চলচ্চিত্রে আসা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও গুঞ্জন তৈরি হলেও পরিবার থেকে এ বিষয়ে নানা সময়ে ভিন্ন অবস্থান জানানো হয়েছে।
ওমর সানির একটি বাক্যই যেন আমাদের সবার দীর্ঘশ্বাসকে সবচেয়ে ভালোভাবে প্রকাশ করে,
‘আহ মান্না ভাই, এইভাবে চলে যাবেন ভাবতেও পারিনি।’💔
#সংগৃহীত