06/09/2026
১৯০২ সালে সিস্টার নিবেদিতার স্কুলে ভর্তি হই। স্কুল তখন ১৭ বোসপাড়া লেনে। সিস্টারের স্কুলে স্বামীজী প্রায়ই আসতেন, কিন্তু আমরা তখন খুবই ছোট', তাই বেশি কিছু মনে নেই। শুধু খুব লম্বা-চওড়া চেহারা আর বড় বড় চোখ-দুটি বেশ মনে আছে। ঐবছর বোধহয় ঠাকুরের তিথিপূজার দিন সিস্টার আমাদের দশ-বারজন ছোট মেয়েকে নিয়ে নৌকায় করে বেলুড় মঠে গিয়েছিলেন। আমরা সব্বাই স্বামীজীকে প্রণাম করি-এসব কথা খুবই অস্পষ্ট মনে আছে। তখন স্কুলে সন্ধ্যার পর শরৎ মহারাজ এসে মেয়েদের কাছে গীতাপাঠ করতেন। শরৎ মহারাজের মুখে তখন লম্বা দাড়ি। পুরস্ত্রীদের দালানে চিকের আড়ালে বসবার ব্যবস্থা ছিল। আমরা ছোটরা উঠানে বসতুম, সিস্টার আমাদের কাছে বসতেন। সবাইকে ঘোড়ার গাড়ি করে সিস্টার নিয়ে আসতেন। সিঁড়ির গায়ে ছোট জায়গাটিতে শরৎ মহারাজ বসে পাঠ করতেন। আমরা তো ঘুমিয়ে পড়তুম, সিস্টার কোলে করে আবার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যেতেন।
যোগীন-মা, গোলাপ-মাকেও প্রায়ই স্কুলে দেখতে পেতুম। তাঁরা প্রায় রোজই বলরাম-মন্দিরে আসতেন আর ফেরার পথে সিস্টারকে দেখে যেতেন। সিস্টার সাষ্টাঙ্গে তাঁদের প্রণাম করতেন, তাঁরাও চিবুক ধরে সিস্টারকে আদর করতেন আর জিজ্ঞেস করতেন : "নিবেদিতা, তুমি কেমন আছ?”
একদিন সিস্টার আমাদের ক'জনকে নিয়ে শ্রীশ্রীমার কাছে গেলেন, সেই প্রথম মাকে দেখি। তিনি তখন বাগবাজার স্ট্রীটের ভাড়াবাড়িতে। আমরা প্রণাম করে বাইরে দাঁড়াই, সিস্টার মার কাছে বসে কথা কইতে লাগলেন। তারপর প্রসাদ নিয়ে ফিরে আসা।
১৯০৯ সালে মা উদ্বোধন-বাড়িতে আসেন, তখন সিস্টার একদিন মাকে স্কুলে নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন সিস্টারকে কী আনন্দিতই না দেখেছিলুম! ছোট বালিকাটির মতো চারদিকে ছুটোছুটি করে স্কুলবাড়ি সাজিয়েছিলেন।
তখন মাঝে মাঝে আমাদের মার কাছে নিয়ে যেতেন। আমরা তখন কিছুই জানতুম না বা বুঝতুম না। তবু সিস্টারের সঙ্গে ঘোরা, মার কাছে যাওয়া এসব খুব ভাল লাগত।
স্কুলের ওপর ভীষণ টান হয়েছিল। স্কুল ছেড়ে বাড়ি যেতে ইচ্ছে করত না। বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে টান যেন বাড়তে লাগল। যখন সুধীরা-দি এলেন তখন আমরা একটু ওপরের ক্লাসে। তিনি আমাদের খুব ভালবাসতেন। আমাদেরও তাঁর ওপর অদ্ভুত ভালবাসা পড়েছিল।
সকলের মধ্যে ধর্মভাব জাগিয়ে দেবার চেষ্টাটা সুধীরা-দির খুব ছিল। আমার বাড়ির নাম ছিল পারুল। সুধীরা-দি নাম বদলে 'সরলা' রাখলেন। মাঝে মাঝে সুধীরা-দি আমাকে শ্রীশ্রীমার কাছে নিয়ে যেতেন।
সেই বছর পুজোর ছুটিতে ১৯১১ সালের ১৩ অক্টোবর সিস্টার নিবেদিতা মারা যান। সুধীরা-দির ভীষণ লেগেছিল। তিনি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
পূজনীয় স্বামী প্রজ্ঞানন্দ তখন উদ্বোধনে। একদিন আমাকে বললেন: "শ্রীশ্রীমাকে একদিন দেখে এসো।” তিনিই সব ব্যবস্থা করে দিলেন। ডাক্তার দুর্গাপদবাবুর স্ত্রী মাকে দেখতে যাবেন, তাঁকে বলে দিলেন তিনি যেন যাবার পথে তাঁদের গাড়িতে আমাকে তুলে নিয়ে যান। আমি তাঁদের সঙ্গে উদ্বোধনে গেলুম। কিন্তু সেদিন মার বলরাম-মন্দিরে নিমন্ত্রণ ছিল। তিনি যখন ফিরলেন তখনই আবার আমরা বাড়ি ফিরব, তাই কথাবার্তা কিছুই হলো না। মা-ও দুঃখ করে বলতে লাগলেন: “তাই তো মা, তুমি এলে আর বসে দুটি কথা কইতে পেলুম না।” খুব সস্নেহ আশীর্বাদ করলেন।
সেবার বেলুড় মঠে পুজোয় পূজনীয় বাবুরাম মহারাজ মাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সুধীরা-দি পুজোর পর পুরী যাবেন ঠিক করলেন। পুজোর ক'দিন মার সঙ্গে মঠে ছিলেন, একাদশীর দিন ফিরে এসে ত্রয়োদশীর দিন পুরী রওনা হন।
স্বামী প্রজ্ঞানন্দ একদিন এসে বললেন: “মহাষ্টমীর দিন বেলুড় মঠে গিয়ে মাকে একবার নিশ্চয়ই প্রণাম করে এসো।” আমার ভাগ্য মন্দ। মনে মনে ঠিক করেছিলাম ঝিয়ের সঙ্গে যাব, কিন্তু তার সেদিন ভীষণ হাঁপানি হয়েছে। যাওয়া না হতে হাপুস নয়নে কাঁদছি-সেইদিনটি কেবল কেঁদেই কাটিয়েছিলুম। মহাষ্টমীর দিন মাকে দর্শন করতে পেলুম না! মনে বড্ড লেগেছিল। রাত্রে কিন্তু খুব সুন্দর স্বপ্ন দেখলাম, যেন মঠে গিয়েছি আর মাকে প্রণাম করছি।
পুজোর পরই কিন্তু আশাতীত আনন্দের সুযোগ এসে গেল। শ্রীমা কাশীতে গেছেন আর সুধীরা-দির তখনো ছুটি ছিল, উনি আমাকে নিয়ে কাশী গেলেন; সঙ্গে নরেশ-দি, প্রফুল্ল-মাসীমা আর বাণী ছিল। শ্রীমা লক্ষ্মী দত্তের বাড়িতে ছিলেন। আমরা রামাপুরার কাছে একটা বাড়িতে। সকাল-বিকাল মার কাছে যাওয়া হতো। কালীপুজোর সময় মা কাশী ছিলেন, আমরা জগদ্ধাত্রী-পুজোর পর গিয়েছিলুম। ওরা সব ঘুরে ঘুরে বেড়াত, আমি বেশিরভাগ সময় মার কাছে থাকতাম। ওর মধ্যে মার জন্মতিথি পড়েছিল। পৌষের শেষে আমরা কলকাতা ফিরলুম।
জয় মা জয় জয় মা ♥️♥️🙏🙏🌹🌹
শ্রী শ্রী মায়ের চরণ প্রান্তে
প্রবাজিকা ভারতীপ্রাণা 🙏🙏 ( প্রথম পর্ব )
আসুন আমরা জেনে নেই, কে ছিলেন এই প্রবাজিকা ভারতীপ্রাণা।
'শ্রীশ্রীমায়ের কথা'র দ্বিতীয় ভাগে এবং স্বামী চেতনানন্দ সঙ্কলিত 'মাতৃদর্শন'-এ প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণার দুটি মাতৃস্মৃতি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই দুটি স্মৃতিকথা যথাক্রমে শ্রীমতী সরলাবালা দেবী এবং শ্রীভারতী (সরলা দেবী) লিখিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণার পূর্বাশ্রমের নাম ছিল পারুল। সিস্টার নিবেদিতার সহকারিণী সুধীরা বসু তাঁর নাম বদলে রেখেছিলেন 'সরলা'। স্বামী সারদানন্দ তাঁকে গৈরিক দান করে নাম দিয়েছিলেন 'শ্রীভারতী'।
পরবর্তী কালে সরলা দেবী সারদা মঠের প্রথম অধ্যক্ষা হন এবং বেলুড় মঠের তদানীন্তন অধ্যক্ষ স্বামী শঙ্করানন্দ তাঁকে যথারীতি বিরজা হোম পূর্বক সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষিত করেন। সন্ন্যাসের পর তাঁর নাম হয় প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা। পূর্ব-উল্লিখিত দুটি স্মৃতি-নিবন্ধ ছাড়া সারদা মঠ প্রকাশিত ও প্রব্রাজিকা নির্ভয়প্রাণা সম্পাদিত 'ভারতীপ্রাণা স্মৃতিকথা' গ্রন্থে (১ম সং, ১৯৮৮) তাঁর একটি 'আত্মস্মৃতি' সঙ্কলিত হয়েছে। সেখানে শ্রীশ্রীমায়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি যা বলেছেন তাতে পূর্ব-প্রকাশিত স্মৃতি-নিবন্ধ দুটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি এমন কিছু উপাদান রয়েছে। এখানে সেই অতিরিক্ত অংশগুলি উক্ত গ্রন্থ থেকে সঙ্কলন করে উপস্থাপন করা হলো। সম্পাদক