Itinéraire

Md Helal Md Helal Uddin !
01301304436
Sahasrail, Boalmari, Faridpur !!!

অপেক্ষার শেষ প্রহর_____ মোঃ হেলাল উদ্দিনদ্বিতীয় পর্ব...সৌদি আরবের আল-খাৰ্জ এলাকার ধুধু মরুভূমি। আকাশে কোনো মেঘের চিহ্ন ন...
13/08/2026

অপেক্ষার শেষ প্রহর

_____ মোঃ হেলাল উদ্দিন

দ্বিতীয় পর্ব...

সৌদি আরবের আল-খাৰ্জ এলাকার ধুধু মরুভূমি। আকাশে কোনো মেঘের চিহ্ন নেই, মাথার ওপর যেন এক প্রকাণ্ড আগুনের কুণ্ডলী জ্বলছে। দুপুরের কড়া রোদের তাপে বাতাস পর্যন্ত থরথর করে কাঁপছে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত লালচে বালুর রাশি, যেখানে কোনো সবুজ গাছের পাতা নেই, পাখির ডাক নেই, একফোঁটা সুপেয় পানির জলাশয় নেই। রহমতের পরনে একটা মোটা কালচে জুব্বা, মাথায় রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে একটা সুতির গামছা শক্ত করে বাঁধা। তার পা দুটো বালুর উত্তাপে যেন সিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। সামনে বিশ পঁচিশটা উট আলসে ভঙ্গিতে হেঁটে চলেছে। রহমত কাঠের একটা প্রকাণ্ড পাত্রে উটগুলোর জন্য পানি ঢালতে ঢালতে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল, হে আল্লাহ... তুমি আমারে এ কোন দূর অজানায় আনলা? চারদিকে খালি বালু আর বালু। গাছের একটা ছায়াও তো কোথাও নাই।
কাজের তীব্র ক্লান্তিতে সে বালুর ওপর বসে পড়ল। বুকের কাছে রাখা পকেটটা খুলল সাবধানে। ভেজা হাতে পকেট থেকে বের করল সেই পরম যত্নে রাখা ছবিটা আয়েশার ছোট ছবি, আর তার সাথে এক টুকরো খবরের কাগজে মোড়ানো চরভাগা গ্রামের সামান্য শুকনো মাটি।
রহমত সেই মাটির টুকরোটা নাকের কাছে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মাটির গন্ধ আর আয়েশার ছবির দিকে তাকিয়ে তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল।
ও আয়েশা... রহমত ছবিতে হাত বুলাতে বুলাতে ফিসফিস করে বলল, তোরে একা ফেলে আমি এই বালুর সাগরে এসে বন্দি হইলাম রে! তুই কি এখন দুপুরে ভাত খাইছোস? শাশুড়ি মায়ের শরীরটা কেমন আছে? কালাম কি ঠিকমতো খেয়াল রাখছে তোদের?
আকাশের দিকে মুখ তুলে রহমত হাত জোর করল, ও আসমানের মালিক! আমার মা আর বউয়েরে ভালো রাইখো। তোমার রহমতেই তো এই অচেনা দেশে দিন কাটাচ্ছি।
রাত হলে মরুভূমির রূপ বদলে যায়। দিনের চড়া রোদ উধাও হয়ে নেমে আসে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা।
একচালা একটা পুরোনো টিনের ব্যারাকে রহমতের ছোট ঘর। কাঠের একটা খাট বা চকিতে শুয়ে রহমত হারিকেনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিল। বালিশের পাশ থেকে একটা খাতা আর কলম বের করল সে। এটি তার গোপন ডায়েরি তার বিরহ ও অপেক্ষার এক নীরব সাক্ষী।
কলম হাতে নিয়ে রহমত লিখতে শুরু করল
আজ ৩০ দিন পার হলো। কাল রাতে স্বপ্নে দেখলাম, আয়েশা কামরাঙা গাছের তলে বসে আমার জন্য চালের পায়েস রান্না করছে। কালাম হাতে বই নিয়ে হাসতে হাসতে কলেজে যাচ্ছে। আর মা উঠানে বসে রোদে পিঠ দিয়ে সুতো কাটছে... আহা! কবে আমি আবার চরভাগায় ফিরব? কবে তোদের চোখের সামনে দেখব ?মরুভূমির ওপারে যখন রহমতের দিন কাটে চরম একাকীত্বে, তখন চরভাগা গ্রামেও সময় থেমে নেই। ছয়টি মাস কেটে গেছে রহমত বিদেশে যাওয়ার পর। অগ্রহায়ণ শেষে এখন পৌষের শীত চেপে বসেছে গ্রামে। বিকেলের রোদে আয়েশা উঠানে বসে একটা নকশী কাঁথা সেলাই করছিল। সুচ আর লাল নীল সুতোর প্রতিটি ফোঁড়ে যেন রহমতের স্মৃতি গাঁথা হচ্ছিল।
তবে আয়েশার চেহারায় এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে। তার গায়ের রং একটু ফ্যাকাশে, শরীরটা দুর্বল ও ক্লান্ত, কিন্তু তার পেটের গোল ভাবটা এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে সন্তানসম্ভবা।
পাশে বসে খোদেজা বেগম ছাঁচে পান ছেঁচছিলেন। বউয়ের দুর্বল চেহারা দেখে তিনি কপালে হাত দিয়ে চিন্তিত মুখে বললেন, ও বউ, তুই দিন দিন এমন শুকাচ্ছিস কেন রে? দুপুরে তো দুই লোকমা ভাতও মুখে তুললি না। এভাবে না খেলে পেটের সন্তানটা পুষ্টি পাবে কীভাবে বল তো? আয়েশা কাঁথার ওপর থেকে চোখ তুলে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হাসি হাসল, কী করব বলুন মা? উনি কাছে নাই, একা একা কোনো কিছু খেতেই মন চায় না। গলা দিয়ে ভাত নামতে চায় না আমার।
ঠিক সেই মুহূর্তে সাইকেলের বেল বাজিয়ে ঘরে ঢুকল কালাম। হাতে তার কলেজের বই আর একটা খাতা। পরনে সাধারণ একটা জ্যাকেট।
ভাবি! ও ভাবি! কালাম উত্তেজিত গলায় বলল, কী রান্না করছ আজ? খুব খিদে পেয়েছে! আর শোনো, ভাইজান কি আজ কোনো ফোন করছিল?
আয়েশা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, না রে ভাই। বিদেশে ফোন করার তো কত খরচ! মাসে হয়তো একবার একটু কথা হয়। তাও নেটওয়ার্ক থাকে না বলে কেটে কেটে যায়। কী যে মরার বিদেশে গেছেন উনি!
হঠাৎ কালামের পকেটে থাকা পুরানো ছোট মোবাইল ফোনটা বাজতে শুরু করল। সুর শুনেই আয়েশার হাতের সুচ হাত থেকে পড়ে গেল। কালাম দ্রুত পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
ভাইজান! ভাইজানের ফোন! কালাম চিৎকার করে উঠেই ফোনটা লাউডস্পিকারে দিয়ে দিল।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো ঝিঁঝিঁ ধরা, সামান্য অস্পষ্ট রহমতের গলা, হ্যালো... কালাম? কালাম শুনতে পাচ্ছিস? মা কেমন আছে রে? আর... তোর ভাবি কই?
কালাম আনন্দের আতিশয্যে বলল, ভাইজান! আমরা সবাই ভালো আছি! মা পাশে বসা। আর ভাবি... ভাবি তোমাকে একটা খুব বড় খুশির খবর দেবে!
কালাম ফোনটা আয়েশার হাতে তুলে দিল। আয়েশার হাত থরথর করে কাঁপছে। সে ফোনটা কানের কাছে নিয়ে বুজে আসা গলায় বলল, হ্যালো... আপনে কেমন আছেন? ঠিকমতো খান তো?
ওপাশ থেকে রহমতের কণ্ঠ ভিজে উঠল, তোর গলা শুনেই আমার সব কষ্ট দূর হয়ে গেল রে আয়েশা! আমি ভালো আছি। তুই কেমন আছিস বল? শরীর ভালো তো?
আয়েশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল তার গালে। সে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, আমি... আমি মা হতে যাচ্ছি... আপনার সন্তান আমার পেটে...
ফোন লাইনের ওপারে কয়েক সেকেন্ডের এক দীর্ঘ ও গভীর নিস্তব্ধতা। তারপরই ভেসে এলো রহমতের গলার এক আনন্দঘন চিৎকার।
কী বললি আয়েশা! সত্যি? আমি... আমি বাপ হচ্ছি?! আলহামদুলিল্লাহ! ইয়া আল্লাহ, তোমার দরবারে হাজার শুকরিয়া! রহমত ওপাশ থেকে কেঁদে ফেলল, আয়েশা, তুই একদম ভারি কাজ করবি না! একদম সাবধানে থাকবি। মা, ও মা! তুমি বউয়ের খেয়াল রাইখো। আমি কালই অতিরিক্ত কিছু টাকা পাঠামু। বউকে যেন প্রতিদিন দুধ আর ডিম খাওয়ানো হয়!
আয়েশা হাসতে হাসতে চোখের পানি মুছল, আপনে সত্যি খুশি হয়েছেন তো?
খুশি মানে? রহমত আনন্দে ব্যাকুল হয়ে বলল, আমার কলিজা ঠান্ডা হয়ে গেছে আয়েশা! শোন, ছেলে হোক কিংবা মেয়ে হোক সন্তানের নাম কিন্তু আমি দেশে ফিরে এসে নিজে রাখব! তুই খালি নিজের আর আমার সন্তানের খেয়াল রাখবি।
হঠাৎ নেটওয়ার্কের গোলযোগে ফোনটা কেটে গেল টুট টুট শব্দে। আয়েশা ফোনটা বুকে চেপে ধরে শাশুড়ির কোলে মাথা রেখে কেঁদে ফেলল।
খোদেজা বেগম বউয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে চোখের জল মুছে দিয়ে বললেন, দেখলি তো বউ? আল্লাহ মুখ তুলে চেয়েছেন। এবার তোকে নিজের শরীরের আরও বেশি যত্ন নিতে হবে।
কিন্তু আনন্দের খবরের সাথে সাথে বিপদের কালো ছায়াও কিন্তু চরভাগা গ্রাম থেকে দূর হয়নি। আয়েশাদের বাড়ির পেছনের বাঁশঝাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে শমসের আহমেদ সব কথা শুনছিল। রহমতের বাবা হওয়ার খবর শুনে শমসেরের ফর্সা মুখটা রাগে ও হিংসায় কালচে হয়ে গেল। সে পানের কষ মাটিতে থু থু করে ফেলে দিয়ে বাঁশের বেড়ায় একটা সজোরে লাথি মারল।
পেট বাঁধাইছে! শমসের দাঁত কামড়ে মনে মনে গর্জে উঠল, রহমত তুই বিদেশে বসে ভাবছিস কত সুখে আছিস? দাঁড়া... তোর এই সুখ আমি বেশিদিন থাকতে দিমু না। তুই দেশে ফের, তোরে এমন শিক্ষা দিমু যে তোর বংশের সবাই মনে রাখবে!
মাস কাটতে লাগল। রহমতের প্রবাস জীবনের কঠিন লড়াই অব্যাহত রইল।
এক বছর পার হয়ে ঈদ এলো। ঈদের দিন চরভাগায় যখন আনন্দ, মরুভূমির মাঝে রহমত তখন একা একটা উটের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে আছে। তার হাতে আয়েশার চিঠির সাথে পাঠানো একটা নতুন সুতির সবুজ পাঞ্জাবি।
রহমত পকেট থেকে ফোনের বাটন টিপে সদ্য পাওয়া তার ছেলের ছবিটার দিকে তাকাল। তার ছেলের নাম রাখা হয়েছে হামীম । গোলাকার মুখ, কুতকুতে চোখ ঠিক যেন ছোটবেলার রহমত!
রহমত ফোনের স্ক্রিনে ছেলের ছবিতে পরম মমতায় চুমু খেল।
আমার বাজান রে... রহমত কাঁদতে কাঁদতে বলল, তোর বাপে মরুভূমিতে উট চড়ায়, রোদ মাথায় নিয়ে খেটে মরে। কিন্তু কথা দিচ্ছি সোনা, তোকে আমি কোনোদিন অভাব বুঝতে দিমু না। তোকে বড় স্কুলে পড়ামু, মস্ত বড় মানুষ বানামু... সময় তার নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে। দেখতে দেখতে প্রবাসের দীর্ঘ তিনটি বছর পেরিয়ে গেল।
তিন বছর পর, একদিন মরুভূমিতে হঠাৎ এক কালবৈশাখী তুফান উঠল। ধুলা আর বালুর ঝড়ে চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। উটগুলো ভয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি শুরু করল। রহমত একাই বিশাল সেই উটগুলোকে সামলাতে গিয়ে এক প্রকাণ্ড পাথরের ওপর আছড়ে পড়ল।
তার ডান পাটা পাথরের কোণায় লেগে মারাত্মকভাবে কেটে গেল। হাড় পর্যন্ত যেন কেঁপে উঠল ব্যথায়। সে রাতে ব্যারাকের ঠান্ডা ঘরে রহমত প্রচণ্ড জ্বরে কাতরাতে লাগল। ঘরের কোণে কোনো ডাক্তার নেই, ব্যান্ডেজ বাঁধার কেউ নেই। পানির ঘটিটা একটু দূরে রাখা, কিন্তু ওঠার মতো শক্তিও রহমতের গায়ে নেই।
জ্বরের ঘোরে রহমত ভুল বকতে শুরু করল, মা... ও মা... একটু পানি দাও... আয়েশা! আমার বাজানরে দেখে রাইখো... আমার পা টা যে ছিঁড়ে যাচ্ছে রে আয়েশা...
পরদিন সকালে অন্য এক বাংলাদেশী প্রবাসী এসে রহমতকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিল। সাত দিন শয্যাশায়ী থাকার পর রহমত আবার উঠে দাঁড়াল, আবার সেই মরুভূমির রোদে পা বাড়াল। কারণ, সে জানে তার ঘরে সন্তান বড় হচ্ছে, মায়ের ওষুধ দরকার, আর ভাই কালামের কলেজের পড়ার খরচ চালাতে হবে।
চারটি বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর রহমতের কাজের চুক্তি শেষ হতে চলল। সে যা বেতন পেত, তার সিংহভাগই দেশে পাঠিয়ে দিত।
প্রতি রাতে হারিকেনের আলোয় রহমত তার পুরোনো ডায়েরিতে হিসাব কষত
ঘরের নতুন চালের টিন কেনার টাকা হয়েছে... কালামের বিএ পরীক্ষার ফি পাঠানো শেষ... আয়েশার জন্য একটা সোনার নাকফুল আর লাল শাড়ি কেনার টাকা জমেছে... আর হামীমের জন্য একটা লাল রঙের খেলনা গাড়ি। আর মাত্র একটি বছর! মাত্র ১২টা মাস অপেক্ষা। তারপরই আমি আমার সোনার বাংলায় ফিরে যামু।
ডায়েরির শেষ পাতায় সে লিখল:
আজ হামীম নাকি নিজের পায়ে হাঁটতে শিখেছে! কালাম ফোনে বলল। আফসোস, আমি নিজের চোখে বাপের প্রথম হাঁটা দেখতে পারলাম না... এটাই আমার কপাল।
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। দীর্ঘ পাঁচটি বছরের কঠিন প্রবাস জীবনের ইতি ঘটল।
সৌদি মালিকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রকাণ্ড অফিসে দাঁড়িয়ে আছে রহমত। তার পরনে পরিষ্কার জামা, চুল দাড়ি সুন্দর করে ছাঁটা।
আরবি মালিক রহমতের কাঁধে হাত রেখে আন্তরিকভাবে বলল, রহমত, তোমার পাঁচ বছরের কাজের সততায় আমি খুব খুশি। এই নাও তোমার শেষ হিসাবের রিয়াল, আর সাথে আমার পক্ষ থেকে বোনাসের কিছু রিয়াল। দেশে যাও, তোমার পরিবারকে সময় দাও।
রহমত দুই হাত তুলে মালিকের জন্য খোদার দরবারে দোয়া করল, কফিল সাহেব, আপনি আমার বাবার মতো খেয়াল রেখেছেন। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন।
ব্যারাকে ফিরে রহমত তার বড় দুটো ট্রাভেল লাগেজ গুছাতে বসল।
সেই লাগেজে রয়েছে আয়েশার জন্য সেই বহু কাঙ্ক্ষিত লাল টকটকে সুতির শাড়ি, সোনার কানের দুল ও নাকফুল, ছেলে হামীমের জন্য একটা চাবি দেওয়া লাল প্লাস্টিকের খেলনা গাড়ি, বৃদ্ধা মায়ের জন্য নতুন চশমা আর থানের কাপড়, ছোট ভাই কালামের জন্য একটা হাতঘড়ি, আর মাতব্বরের জন্য খাঁটি আরবের আতর। সবকিছুর ওপরে, পরম মমতায় রহমত আবার সেই আয়েশার ছবি আর দেশের মাটির টুকরোটা রেখে জিপার টেনে দিল।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে রহমত একগাল হেসে বলল, আয়েশা রে... আর আর মাত্র ২ দিন! তোর আর আমার দীর্ঘ পাঁচ বছরের অপেক্ষার শেষ প্রহর চলে এসেছে। দেশে ফিরে তোর হাতের চালের পায়েস খামু, পোলাডারে বুকে জড়িয়ে ধরমু। আর কোনোদিন তোদের ছেড়ে এই বিদেশের মাটিতে আসমু না...
এদিকে চরভাগা গ্রামে আয়েশা তখন নতুন উদ্যোমে বাড়ি সাজাতে ব্যস্ত। চার বছরের ছোট হামীম রঙিন জামা পরে উঠানময় দৌড়াদৌড়ি করছে। আয়েশা হামীমকে ডেকে পরম মমতায় কোলে তুলে নিল, হামীম! বাজান রে, আস্তে দৌড়াও। পড়ে গেলে যে ব্যথা পাবে! জানো, কাল তোমার বাবা আসতেছে!
ছোট হামীম নিষ্পাপ চোখে মায়ের দিকে তাকাল, মা, বাপে কেডা? বাপে আমার জন্য কী আনবে?
আয়েশার বুকটা এক অজানা আনন্দে মোচড় দিয়ে উঠল। সে হামীমের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, তোর বাপে হলো আমার জান, তোর বাপে তোর জন্য দুনিয়ার সব আনন্দ নিয়ে আসতেছে সোনা... ।

চলবে...

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত মোঃ হেলাল উদ্দিন +৮৮০১৪০৬৪২৭৫৩৪// ০১৩০১৩০৪৪৩৬ সহস্রাইল, বোয়ালমারী, ফরিদপুর। শেয়ার করুন নামসহ | কমার্শিয়াল ব্যবহারে অনুমতি নিন | গল্পের কোনো অংশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃত করে প্রকাশ করা যাবে না। জীবিত বা মৃত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে এই গল্পের কোন মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

অপেক্ষার শেষ প্রহর ____ মোঃ হেলাল উদ্দিন প্রথম পর্ব...চরভাগা গ্রামের বাতাস এই অগ্রহায়ণে এক অদ্ভুত মিষ্টতায় ভারাক্রান্ত থ...
07/08/2026

অপেক্ষার শেষ প্রহর
____ মোঃ হেলাল উদ্দিন

প্রথম পর্ব...

চরভাগা গ্রামের বাতাস এই অগ্রহায়ণে এক অদ্ভুত মিষ্টতায় ভারাক্রান্ত থাকে। ধান কাটা শেষ হয়েছে সবেমাত্র। ফাঁকা মাঠের বুকের ওপর রোদের নরম আলো যখন গড়িয়ে পড়ে, মনে হয় যেন সারা গাঁয়ে সোনা ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। নদীর ওপার থেকে আসা হিমেল বাতাস কামরাঙা আর নিমগাছের পাতায় লেগে এক ধরণের উদাস গুঞ্জন সৃষ্টি করে। কিন্তু আজকের চরভাগার দক্ষিণ পাড়ার হাওয়া অন্যদিনের মতো চুপচাপ নয়। আজ সেখানে উৎসবের তোড়জোড়।
​উঠানে টাঙানো হয়েছে বাঁশের খুঁটিতে লাল নীল কাগজের শৃঙ্খল। রোদের তাপে পাতলা কাগজের সেই শেকলগুলো থেকে কাঁচা আঠার গন্ধ ছড়াচ্ছে। উঠানের এক কোণে চালের কুঁড়োর ওপর পাতা বড় কাঠের পিঁড়ি। সেই পিঁড়ি ঘিরে গাঁয়ের প্রবীণ আর নবীনাদের কোলাহল।
​হুলদি বাটো মেন্দি বাটো, বাটো রে ফুলের মৌ...
আইজ রহমতের বিয়া হইবে, আয়েশারে করবো বউ...
​খোদেজা বেগমের মুখের পানের পানের খিলিটা বাম গালে চেপে বসেছে। তিনি হাত নেড়ে বাড়ির পেছন দিকের ধানের মটকার পাশ দিয়ে যাওয়া সামাদ মাতব্বরকে ডেকে উঠলেন, ও সামাদ কাকা! একটু নজর দিয়া দেহেন তো চালচলনটা। এক-দুইজন না, একেবারে তিরিশডা মানুষের রান্দন! ডাল, সুগন্ধি চালের ভাত, আর ছাগলের খাসির গোস্ত। গরিবের সংসার, টানটান অবস্থা, তাও মনে বড় শান্তি কাকা। পোলাডার হাতডা তো শেষমেশ শক্ত হইলো!
​সামাদ মাতব্বর তাঁর প্রকাণ্ড বাবরি চুলে হাত বুলিয়ে হাতে থাকা পিতলের পুরোনো হুক্কায় সজোরে একটা টান দিলেন। হুক্কার তলানি থেকে গড়গড় শব্দ উঠে বাতাসে তামাকের ঝাঁঝালো ধোঁয়া ছড়িয়ে দিল। মাতব্বর ধোঁয়া ছেড়ে একটু হাসলেন। মুখের বলি রেখাগুলো সেই হাসিতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।
​বুঝলা রহমতের মা, মাতব্বর একটু থেমে কাসলেন, টাকা-পয়সা দিয়া যদি সংসারের সুখ মাপা যাইত, তবে শহরের বড় বড় মহাজনরা রাইতে না খাইয়া চিল্লাইত না। মানুষের বুকের ভেতর নিয়াৎ যদি পরিষ্কার থাকে, তবে সামান্য শাঁক-ভাতেও আসমানের বরকত নাইমা আসে। রহমত ছেলেডা তোমার সোনা। কোনোদিন পাড়ার কোনো মেয়ের দিকে নজর তুইলা চায় নাই, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজটা পড়ে। আল্লায় উহার মুখ পানে চাইবোই।
​ঠিক সেই মুহূর্তেই কাঁচা উঠানের ওপর ধুলো উড়িয়ে দৌড়ে এলো আঠারো-উনিশ বছরের কালাম। রহমতের ছোট ভাই। পরনে হালকা আসমানি রঙের তোয়ালে পেঁচানো, খালি গা, মুখে তার একগাল অমলিন হাসি।
​মা! মা গো! কালাম হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ভাবিরে হলুদ দিতে কখন যামু? আমারে কাঁচা হলুদের বাটিডা দাও। সবার আগে আমি হলুদ মাখামু ভাবির কপালে! ও বুড়ি চম্পা, তুই কিন্তু আমার আগে যাবি না কয়া দিলাম!
​কালামের কথায় উঠানের মহিলা মহলে হাসির রোল উঠে গেল।
​উঠানের অন্যপাশে বাঁশের বাঁকার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল রহমত। বয়স বাইশ বা তেইশ। গায়ে একটা পুরোনো সাদা ধুতি আর সুতির মেরুন রঙের ফতুয়া। রোদে পুড়ে তার গায়ের রং একটু তামাটে, কিন্তু চোখ দুটো টলটলে পানির মতো পরিষ্কার। ছোট ভাইয়ের কথা শুনে রহমতের ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে খালি পায়ে মাটির ওপর বুড়ো আঙুল দিয়ে আঁচড় কাটতে লাগল।
​আরে পাগলা, রহমত নিচু গলায়, যেন গলার আওয়াজ বেশি দূরে না যায়, বলল, এত তাড়াহুড়া কিসের তোর? যা, হলুদ নিয়া যা। গিয়া তোর ভাবিরে বলবি... আমি উঠানে খাড়ায়া আছি। তারে যাতে একটু সাবধানে পিঁড়িতে বসায়।
​কালাম একগাল হেসে হলুদের বাটিটা একরকম ছিনিয়ে নিয়ে দৌড় দিল কনের ঘরের দিকে।
​চরভাগা গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় আয়েশাদের ছোট টিনের ঘর। উঠানে মেহেদি আর নিম গাছের বড় বড় ডালপালা ছায়া ফেলে রেখেছে। আয়েশাকে একটা কাঠের তৈরি নিচু পিঁড়িতে বসানো হয়েছে। তার পরনে একটা হলুদ রঙের সুতির শাড়ি, শাড়ির আঁচলে লাল সুতোর নকশা করা। আয়েশার দুই হাত কনুই পর্যন্ত মেহেদির কালচে লাল রসে রাঙানো।
​কালাম দৌড়ে গিয়ে সেই কাঁচা হলুদের পেস্ট বাটি থেকে খানিকটা আঙুলে তুলে সোজা আয়েশার দুই গালে ছোঁয়ায়ে দিল।
​এই যে ভাবি! আমার হলুদ ছোঁয়া শেষ! এবার ভাইজানের কথা শোনো ভাইজান তোমারে দেখার লাইগা উঠানে খাড়ায়া রইছে। কালাম ফিসফিস করে বলে আবার দৌড়ে পালাল।
​আয়েশা লজ্জায় মাথা একবারে বুকের কাছে নামিয়ে আনল। তার চোখের পলক কাঁপছে। ওড়না দিয়ে মুখ আড়াল করার চেষ্টা করেও আয়েশা পারল না। পাশে বসা তার শৈশবের সই, সাকিনা, তার কাঁধে একটা হালকা ধাক্কা দিয়ে হেসে উঠল।
​ওলো আয়েশা! ঢং দেখিয়া আর বাঁচি না! তোর রহমত তো একেবারে আসমানের চাঁদের মতো দেখতে। গায়ের জোর যেমন, মনডাও তেমনই সাদা। তুই যে কী কপাল কইরা আসছিলি রে বাপু! গাঁয়ের কত মেয়ের চোখ আছিল রহমতের ওপর, কিন্তু রহমতের মন ভিজলো তোর এই চুপচাপ চোখের জল দেইখা।
​আয়েশা দুই হাতের রাঙা আঙুলগুলো বুকের কাছে চেপে ধরে একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার হৃদপিণ্ড তখন দ্রুত তালে নাচছে। সে খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, সব আল্লার ইচ্ছা রে সাকিনা। আলহামদুলিল্লাহ... আল্লায় যেন ওনারে দীর্ঘ হায়াত দেয়। উনি সুস্থ থাকলে আমার ভাঙা কপালও সোনা হইয়া যাবো।
​দূর থেকে, বেড়ার ফাঁক দিয়ে এই আনন্দঘন দৃশ্য দেখছিল একজন।
​চরভাগার কুখ্যাত লম্পট ও সুদের কারবারি, শমসের আহমেদ। মুখে তার কটু পান জর্দার দুর্গন্ধ, চোখে এক হিংসুটে চাতুরী। বনের শিয়ালের মতো চোখ দুটো ছোট ছোট করে সে আয়েশার দিকে তাকিয়ে রইল। শমসেরের হাতটা বেড়ার একটা বাঁশে শক্ত হয়ে চেপে বসল।
​মনে মনে গরগর করে উঠল শমসের, হুঁ! রহমতের কত বড় কপাল! গাঁয়ের সবচেয়ে সুন্দরী ও শান্ত মেয়েডারে বুক পকেটে পুরে নিচ্ছিস? এই আয়েশারে তো আমার নিজের ঘরে আনার কথা আছিল। বাপডা ঋণের টাকায় দেউলিয়া আছিল, ভাবছিলাম টাকা ছাইড়া দিয়া মেয়েডারে খরিদ করমু। আর মাঝখান দিয়া রহমত আইসা ভালোমানুষির ঢং দেখায়ে সব ভেস্তে দিল! দাঁড়া রহমত... কতদিন এই আনন্দ ধরে রাখিস, আমিও দেহুম। চরভাগা গ্রামে শমসেরের চোখ এড়ায়ে কেউ সুখে থাকতে পারে নাই।
​থুতু ফেলে শমসের অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল।​দুপুরের সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর থেকে একটু পশ্চিমে হেলে পড়ল, তখন কাজী সাহেব এলেন। সাদা জুব্বা আর মাথায় জালি টুপি পরা কাজী মাতব্বরের উঠানের তক্তপোশে গিয়ে বসলেন। লাল কালির বড় বাঁধাই করা নিকাহনামার খাতাটা খোলা হলো।
​রহমত মিয়া, পিতা মৃত হাসেম শেখ... আপনি কি আয়েশা খাতুনকে ৫০ হাজার টাকা দেনমোহর ধার্যে, নিজ আকলে, স্বেচ্ছায় স্ত্রী হিসেবে কবুল করছেন?
​রহমতের বুকের ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। সে একবার নিজের মা খোদেজা বেগমের দিকে তাকাল, মা চোখে অশ্রু নিয়ে মুচকি হাসছেন। তারপর রহমত আস্তে করে বলল, কবুল।
​বলো, কবুল! কাজী আবার বললেন।
​কবুল... কবুল।
​তিনবার কবুল বলার সাথে সাথেই উঠানজুড়ে একটা আনন্দের তরঙ্গ খেলে গেল। দোয়া মোনাজাত শেষ হতেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাতাসা আর মুড়ির মুড়কি নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে দিল। উঠানের এক কোণে বড় কড়াইতে ফুটতে থাকা খাসির মাংসের ঝোলের মনমাতানো সুবাস পুরো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের মানুষরা একসাথে পাতা পেড়ে খেতে বসলো। সামাদ মাতব্বর নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সবাইকে ডাল-ভাত বেড়ে খাওয়াতে লাগলেন।
​সাঁঝের অন্ধকার যখন চরভাগা গ্রামকে ধীরে ধীরে গ্রাস করল, তখন কনে আয়েশাকে রহমতের ঘরে তুলে আনা হলো।
​রহমতের ঘরটা একচালা টিনের। বেড়াগুলো বাঁশের চাটায়ের, অনেক জায়গায় ছোট ছোট ছিদ্র। ঘরের কোণে একটা কাঠের পুরোনো চকি, তার ওপর বিছানো নতুন কাথা—যা খোদেজা বেগম গত বর্ষায় নিজের হাতে সেলাই করেছিলেন। ঘরের মাঝখানে একটা কাঠের টেবিলে হারিকেন জ্বলছে। হারিকেনের কাঁচটা একটু ধোঁয়াটে, তাই তার থেকে এক ধরণের উষ্ণ, মৃদু হলুদ আলো ঘরের চার দেয়ালে ছড়িয়ে পড়ছে।
​বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক। মাঝে মাঝে সুপারি গাছের পাতা বাতাসের ধাক্কায় দোলে উঠছে।
​রহমত আস্তে করে বাঁশের দরজার খিলটা এঁটে দিল। দরজার আওয়াজে চকিতে বসে থাকা আয়েশা শিউরে উঠল। তার মাথায় লাল সুতির ঘোমটা টানা।
​রহমত খুব সাবধানে, যেন আয়েশা ভয় না পায়, ধীরে ধীরে হেঁটে এসে চকিতে বসল। আয়েশার গায়ের সাথে তার গায়ে একটুখানি দূরত্ব।
​আয়েশা... রহমত খুব মৃদু গলায় ডাকল, তুই কি ভয় পাইছোস?
​আয়েশা মাথার ঘোমটাটা এক সেন্টিমিটার সরাল। তার টলটলে দুই চোখ হারিকেনের আলোয় জ্বলজ্বল করে উঠল। সে রহমতের পানে তাকিয়ে আস্তে করে বলল, আপনে পাশে থাকতে আমার আবার কিসের ভয়? আল্লায় তো আমারে আপনার ছায়ায় এনে রাখছেন।
​রহমত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে ঘরের টিনের চালের দিকে তাকাল। টিনের একটা কোণে একটু খাঁজ কাটা, যেখান দিয়ে রাতের আকাশ আর দু-একটা তারা দেখা যাচ্ছে।
​দেখ আয়েশা, রহমত গম্ভীর গলায় বলল, আমার এই ঘরটা ভাঙা। বর্ষা এলে টিনের ফাঁক দিয়ে চালের পানি পড়ে। ঘরে ধান রাখার মতো বড় মটকা নাই, ব্যাংকে জমানো টাকা নাই। আমি সাধারণ কামলার কাজ করি, অন্যের জমিতে ধান কাটি। কিন্তু আমি তোরে একটা কথা দিয়ে রাখলাম... একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তোরে আমি রাজরানির মতো রাখুম। তুই খালি আমাকে দুইটা বছর সময় দে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে আমি বিদেশে যাওয়ার একটা চেষ্টা করমু।
​আয়েশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে রহমতের শক্ত, খসখসে হাত দুটো দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরল।
​আমার পাকা দালানের দরকার নাই, আয়েশা নরম সুরে বলল, এই ভাঙা টিনের ঘরই আমার সোনার মহল, যদি আপনে ভালো থাকেন, সুস্থ থাকেন। আপনার মুখে যদি হাসি থাকে, তবে আমার এই কুঁড়েঘরই বেহেশত।
​রহমত আয়েশার হাতের ওপর নিজের অন্য হাতটা রাখল। দুজনই নীরব হয়ে গেল। ঘরের ভেতরে তখন শুধু দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আর বাইরে রাতের নীরব প্রকৃতি।
​পরদিন ফজরের আজানের সুর যখন দূর মসজিদ থেকে ভেসে এলো, তখন পুরো চরভাগা গ্রাম তখনও ঘন কুয়াশায় ঢাকা।
​আয়েশা ঘুম থেকে উঠে সুতির একটা সাধারণ শাড়ি পেঁচিয়ে নিল। সে চুপিচুপি ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে নামল। বাঁশের ঝাড়ু দিয়ে সে পরম মমতায় পুরো উঠান পরিষ্কার করল। তারপর গোয়ালঘরের পাশ থেকে মাটির গামলা তুলে নিয়ে রান্নাবাড়ির উঠানে চুলা ধরাতে বসল।
​খোদেজা বেগম সকালে ঘর থেকে বের হয়েই অবাক হয়ে গেলেন। তকতকে পরিষ্কার উঠান, আর রান্নাঘর থেকে কাঠ পোড়ার ধোঁয়া উঠছে।
​ও বউ? খোদেজা বেগম আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে ডাকলেন, তুই এত সকালে উঠছোস ক্যান? নতুন বউয়ের তো এত সকালে কাজ করার কথা না!
​আয়েশা আঁচল দিয়ে মুখের ঘাম মুছে হেসে বলল, মা, আপনে এত বছর একা একা সব করছেন। এখন তো আমি আসছি। আপনে আমার মায়ের মতোই। আজ থেকে আপনের সব সেবা করার দায়িত্ব আমার।
​খোদেজা বেগম চোখের কোনায় জমে ওঠা একফোঁটা জল আঁচলে মুছে মনে মনে বললেন, আমার রহমতের ঘর আল্লায় আলো করে দিছে।
​এভাবেই দেখতে দেখতে ছয়টি মাস কেটে গেল।
​সংসারটা ছোট, অভাব-অনটন আছে, কিন্তু সেখানে কোনো অশান্তি ছিল না। সকালে রহমত কাস্তে আর গামছা নিয়ে অন্যের মাঠে ধান কাটতে চলে যেত। আর আয়েশা সারাদিন শাশুড়ির সাথে ধান ভানত, শুকাত, ঘরের কাজ করত। বিকেলের দিকে যখন সূর্যটা কামরাঙা গাছের পেছনে গিয়ে লুকাত, তখন আয়েশা আর রহমত গাঁয়ের শেষ প্রান্তে থাকা পুরোনো পুকুরঘাটে গিয়ে বসত।
​পুকুরের স্থির পানিতে তখন আকাশের লালচে আলো ঠিকরে পড়ত।
​এক সন্ধ্যায় রহমত আয়েশার দিকে তাকিয়ে বলল, জানোস আয়েশা, সৌদি আরবে আমার এক দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই আছে। মান্নান ভাই। কাল রাতে ফোন করছিল। বলছিল একটা ভিসার কথা। অনেক টাকা লাগবে, কিন্তু যদি একবার যেতে পারি, তবে আমাদের জীবনের সব অভাব মুছে যাবে।
​আয়েশা পানিতে চোখ রেখে চুপ করে রইল। তার বুকটা ধক করে উঠল।
​বিদেশ? আয়েশার গলা কেঁপে উঠল, আপনে এত দূরে চলে যাবেন? অচেনা দেশে আপনে একা থাকবেন কীভাবে? আমি আপনে ছাড়া একদিনও তো থাকি নাই!
​রহমত আয়েশার এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটু চাপ দিল, পাগলি আমার! আমি তো তোর জন্যই যামু। একটু কষ্ট না করলে কীভাবে আমাদের একটা নিজস্ব পাকা ঘর হবে? একটা নিজস্ব টিউবওয়েল বসামু উঠানে, যাতে তোরে আর দূরে খালপাড়ে পানি আনতে যেতে না হয়। আর... তোকে ঢাকা শহর থেকে আনা একটা সুন্দর লাল শাড়ি কিনে দিমু।
​আয়েশা চোখ তুলে রহমতের কাঁধে মাথা রাখল। বাতাসে তার চুল রহমতের গালে এসে লাগছিল।
​ঠিক আছে, যান... আয়েশা ভিজে ওঠা গলায় বলল, কিন্তু আমারে কথা দিতে হবে, বেশিদিন থাকবেন না। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন।
​​কিন্তু ভাগ্য সব সময় এত সহজে পথ ছেড়ে দেয় না। বিদেশ যাওয়ার খরচের জন্য রহমত যখন দরজায় দরজায় ঘুরছিল, ঠিক তখনই ঘরে চরম অভাব নেমে এলো।
​বর্ষার শুরুতে নদী উথলে উঠে চরের অনেকটা জমি ভাসিয়ে নিল। কাজকাম একরকম বন্ধ। তার ওপর খোদেজা বেগম হঠাৎ শক্ত অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বুকে কাফ জমে ধুঁকছেন, সঙ্গে প্রচণ্ড জ্বর। ডাক্তার এসে বলল, ওষুধ আর পথ্য ছাড়া বুড়িকে বাঁচানো শক্ত। কিন্তু রহমতের পকেটে তখন একটা ফুটো পয়সাও নেই।
​ঘর অন্ধকার। হ্যারিকেনের সলতে কম দেওয়া। খোদেজা বেগম কাঁপছেন।
​আয়েশা চুপচাপ নিজের ঘরের এক কোণে গেল। কাঠের ছোট্ট বাক্সটা খুলল। তার ভেতর থেকে বের করল নিজের একমাত্র অলংকার—বিয়ের সময় বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া একজোড়া ছোট সোনার কানের দুল।
​সে দুলজোড়া এনে রহমতের হাতে দিল।
​এইডা বিক্রি করে দাও, আয়েশা শান্ত গলায় বলল, এই টাকা দিয়ে মায়ের ওষুধ আর পথ্য নিয়ে এসো।
​রহমত কানের দুলের দিকে তাকাল, তারপর আয়েশার দিকে। তার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল।
​না আয়েশা, না! রহমত মাথা নাড়ল, এইডা তোর বিয়ের একমাত্র চিহ্ন। তোর বাপের স্মৃতি। আমি পুরুষ মানুষ হয়ে তোকে একরত্তি সোনা দিতে পারি নাই, তোর গহনা বেইচা আমি কীভাবে মায়ের ওষুধ আনমু?
​খোদেজা বেগমও খাট থেকে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, না রে মা! তুই এই কাজ করিস না। আমার আয়ু শেষ হলে মরে যামু, তাও বউয়ের গহনা বেইচা ওষুধ খামু না।
​আয়েশা রহমতের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সে খুব দৃঢ় গলায় বলল, আপনার মায়ের চেয়ে, আমার শাশুড়ির জীবন থেকে এই একরত্তি সোনা বড় না! মানুষ বাঁচলে সোনা অনেক হবে। আপনে যান, বাজারে গিয়া সেকের দোকানে এটা বিক্রি করেন।
​রহমত আয়েশাকে এক টানে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। দুইজনের চোখ দিয়েই পানি গড়িয়ে পড়ল।
​রহমত পরম মমতায় আয়েশার কপালে চুমু খেয়ে বলল, আল্লাহ তোরে আমার ঘরে কেন পাঠাইছে, আজ আমি বুঝতে পারলাম আয়েশা। তুই সাধারণ কোনো মেয়ে না, তুই আমার কপাল।
​​রহমত যখন বিদেশের টাকা জোগাড় করতে আর পাসপোর্ট জমা দিতে শহরে ঘন ঘন যাতায়াত শুরু করল, ঠিক তখনই চরভাগার লম্পট শমসের আহমেদের উৎপাত বাড়তে লাগল।
​একদিন দুপুরবেলা। চরভাগা গ্রাম নিঝুম। পুরুষেরা সব মাঠে বা শহরে কাজে গেছে। রহমতও বাড়ি ছিল না।
​আয়েশা বাড়ির পেছনে কলপাড়ে গিয়ে বাসন মাঝছিল।
​হঠাৎ বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে লুঙ্গি গুটিয়ে হেঁটে এলো শমসের আহমেদ। তার চোখে বাজে হাসি।
​ও ভাবি! শমসের গলার স্বর মিষ্টি করার চেষ্টা করে বলল, আপনার কলডা তো দেহা যায় খুব শক্ত। টিউবওয়েলের হাতল চাপতে কষ্ট হইতেছে? পানি একটু দিলে আমি খেতাম। বড় তৃষ্ণা পাইছে।
​আয়েশা চমকে উঠে দাঁড়িয়ে মাথার ঘোমটাটা বুকের ওপর টেনে দিল। তার চোখ লাল হয়ে উঠল।
​কল একদম ঠিক আছে শমসের ভাই, আয়েশা কঠোর গলায় বলল, পানি খেতে মন চাইলে নিজের বাড়ি যান। অন্যের বাড়ির কলপাড়ে দুপুরে পুরুষ মানুষের আসা ভালো না। আপনে এহন যান।
​শমসের একধাপ এগিয়ে এলো, আহা! এত রাগ কেন ভাবি? রহমত তো শুনলাম বিদেশের টিকিট কাটতেছে। কদিন পর সে মরুভূমিতে চলে যাবে, একলা ঘরে আপনে কীভাবে থাকবেন? রাইতে যদি ভয় লাগে, তবে আমার বাড়িতে চলে আইসেন। আমি তো আপনার ভাইয়ের মতোই... খেয়াল রাখুম।
​আয়েশার পুরো শরীর রাগে কাঁপতে লাগল। সে থালাটা হাত থেকে রেখে দিয়ে কঠিন গলায় বলল, ভাই হলে ভাইয়ের মতো মর্যাদা বজায় রেখে চলেন শমসের ভাই! নাইলে কিন্তু বিষয়ডা আমি সামাদ মাতব্বর কাকা আর গাঁয়ের মুরুব্বিদের জানামু। তখন আপনার পিঠের চামড়া থাকবে না!
​ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁশঝাড়ের ওপাশ থেকে দৌড়ে এলো কালাম। তার হাতে একটা শক্ত বাঁশের লাঠি।
​ঐ শমসেররা! কালাম চিৎকার করে উঠল, ভাবির কাছে তুই কী করিস? সাহস থাকে তো দাঁড়া, তোর ঘাড়ের রগ আজ আমি খসায়া দিমু! যা এখান থেকে!
​কালামের চেঁচামেচিতে আশপাশের দু-একজন প্রতিবেশী মুখ বাড়াল। শমসের পরিস্থিতি সুবিধাজনক নয় দেখে চোখ পাকাল।
​হুঁ! বড় কথা বলিস না ছোকরা, শমসের ফিসফিস করে বলল, আজ বাঁচলি আয়েশা। কিন্তু দিন তো সামনে পইড়া আছে। শমসের হনহন করে হেঁটে চলে গেল।
​কালাম আয়েশার কাছে এসে বলল, ভাবি, এই লম্পটটার দিকে নজর রাইখো। ভাইজান বাড়ি না থাকলে দরজার খিল শক্ত করে দিবা।
​​দেখতে দেখতে আরও পাঁচ মাস কেটে গেল। শেষ পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি এলো।
​রহমতের হাতে এখন সবুজ রঙের পাসপোর্ট আর সৌদি আরবের ভিসার বিমান টিকিট। কিন্তু আনন্দের চেয়ে চরভাগার এই ছোট পরিবারটিতে কান্নার রোল বেশি ভারী হয়ে উঠল। প্রবাসে যাওয়া মানে শুধু টাকা নয়, প্রবাসে যাওয়া মানে ভালোবাসার মানুষকে হাজার হাজার মাইল দূরে এক অজানা অনিশ্চয়তায় রেখে যাওয়া।
​বিদায়ের দিন সকালে সামাদ মাতব্বর এলেন। রহমতের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।
​দাদাভাই রহমত, মাতব্বর আবেগপ্লুত গলায় বললেন, বিদেশে যাচ্ছিস। ওখানকার মাটি বড় শক্ত, মানুষগুলো অচেনা। হালাল উপায়ে ঘাম ঝরিয়ে কামাই করবি। মায়ের মান রাখবি, আর এই লক্ষ্মী বউটার যত্ন নিবি। মনে রাখবি, দেশের মানুষ তোর পথের দিকে তাকাইয়া থাকবে।
​দোআ করবেন কাকা, রহমত নিচু হয়ে মাতব্বরের পা ছুঁয়ে সালাম করল।
​খোদেজা বেগম দরজার খুঁটি ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন, ও রে বাজান রে! আমার বুকটা যে খালি হয়ে গেল রে! তুই সাবধানে থাকিস বাজান, ঠিকমতো খাইস...
​রহমত মা-কে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল, মা, তুই নিজের যত্ন নিবি। ওষুধগুলো সময়মতো খাবি। কালাম তোরে দেখবে।
​তারপর রহমত কালামের কাঁধে হাত রাখল, কালাম, আমি চললাম। মায়ের আর তোর ভাবির সব দায়িত্ব তোর ওপর। কোনো ভুলত্রুটি হতে দিবি না।
​কালাম চোখের জল মুছে শক্ত গলায় বলল, আপনি চিন্তা করবেন না ভাইজান। ভাবি আমার নিজের মায়ের মতো। তার ওপর কোনো আঁচ আসতে দিমু না।
​সবশেষে রহমত ঘরে গেল।
​আয়েশা ঘরের কোণে একটা খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সেই পুরানো সুতির শাড়ি। চোখের জলে তার গাল ভেসে যাচ্ছে, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। আয়েশা কথা বলতে পারছে না, কথা বলতে গেলে যেন বুক ফেটে কান্না চলে আসবে।
​রহমত আয়েশার সামনে এসে দাঁড়াল। সে আয়েশার দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
​আয়েশা রে... রহমতের গলা ধরে এলো, মাত্র তো দুইটা বছর! চোখের পলকে কেটে যাবে। তুই ঘরটা ধরে রাখিস। নিজেকে সাবধানে রাখিস।
​আয়েশা রহমতের বুকের ওপর মাথা ঢলে দিয়ে ফুঁপিয়ে উঠে বলল, আপনে ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচমু... আমার তো মনে হচ্ছে পরানটা বের হয়ে যাচ্ছে...
​রহমত নিজের পকেট থেকে একটা ছোট্ট মাটির দলা বের করল। চরভাগার কাঁচা মাটির দলা। আর বের করল আয়েশার একটা ছোট পাসপোর্ট সাইজ ছবি, যা বিয়ের সময় তোলা হয়েছিল।
​এই দ্যাখ আয়েশা, রহমত ছবি আর মাটিটা আয়েশাকে দেখিয়ে বলল, আমি এই দেশের মাটি আর তোর ছবি সাথে নিয়ে যাচ্ছি। যখনই মন খারাপ হবে, যখনই মরুভূমির বালুতে মন হাঁসফাঁস করবে, আমি এই ছবিতে তোর মুখটা দেখুম আর দেশের মাটির গন্ধ নেব। তুই কাঁদিস না...
​বাইরে থেকে ভ্যানওয়ালার হাঁক শোনা গেল, রহমত ভাই! বেলা হয়ে গেল, স্টেশনে গাড়ি মিস হবে!
​রহমত এক মুহূর্তে আয়েশাকে বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা শেষ চুমু এঁকে দিল। তারপর এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তরতর করে ঘর থেকে বের হয়ে ভ্যানে উঠে বসল।
​ভ্যান চলতে শুরু করল। কাঁচা রাস্তার ধুলা উড়িয়ে ভ্যানটি দূরে চলে যেতে লাগল।
​আয়েশা পাগলের মতো ঘর থেকে দৌড়ে বের হয়ে এসে রাস্তার সীমানায় গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
​ও... আমার সোনা পাখি রে...! আয়েশা চিৎকার করে কেঁদে উঠল, খোঁজখবর রাইখেন! তাড়াতাড়ি ফিরে আইয়েন...!
​ভ্যানটি ধুলোর আড়ালে হারিয়ে গেল। আয়েশা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, সে মাটিতে ভেঙে পড়ল। কালাম দৌড়ে এসে ভাবির কাঁধ ধরে তুলে ধরল।
​ভাবি, ওঠেন... ভাইজান কেঁদে মন খারাপ করতে নিষেধ করছে। উঠেন তো ভাবি... ।
​

চলবে...

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত মোঃ হেলাল উদ্দিন +৮৮০১৪০৬৪২৭৫৩৪//০১৩০১৩০৪৪৩৬ সহস্রাইল, বোয়ালমারী, ফরিদপুর । শেয়ার করুন নামসহ | কমার্শিয়াল ব্যবহারে অনুমতি নিন | গল্পের কোনো অংশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃত করে প্রকাশ করা যাবে না। জীবিত বা মৃত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে এই গল্পের কোন মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

নয়নের মা _____ মোঃ হেলাল উদ্দিন শেষ পর্ব ফজরের আজান শেষ। ধলেশ্বরীর পাড়ে আজ কোনো কান্না নেই। কোনো চিৎকার নেই। শুধু নদীর ...
24/07/2026

নয়নের মা

_____ মোঃ হেলাল উদ্দিন

শেষ পর্ব

ফজরের আজান শেষ। ধলেশ্বরীর পাড়ে আজ কোনো কান্না নেই। কোনো চিৎকার নেই। শুধু নদীর পানির শব্দ। খুপরির চটের দরজা খোলা। ভেতরে শাহিনা বসে আছে। কোলে কিছু নেই। শুধু একটা পুরান ঝুড়ি। নয়নের ঝুড়ি। গতকাল রাত থেকে সে কিছু খায়নি। ঘুমায়ওনি। শুধু বসে ছিল। কাশেম মিয়া এসে ডাকল,
কাশেম: মা... একটু পানি খা।
শাহিনা মাথা তুলল। চোখ দুইটা লাল। কিন্তু চোখে পানি নেই।
শাহিনা: নয়ন কাঁহা হ্যায় চাচা? ও কা লঞ্চ দেরি সে আতা হ্যায় না?
কাশেমের গলা বুজে এলো।
সকাল ৮টায়। প্রথম লঞ্চ ভিড়ল। শাহিনা খুপরি থেকে বের হয়ে সোজা পন্টুনে গিয়ে বসল। যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে আছে।
শাহিনা: নয়ন... নয়ন বেটা...
একজন বাদামওয়ালা ছেলে ব্যাগ নিয়ে নামল। শাহিনা দৌড়ে গেল।
শাহিনা: নয়ন! তু আ গ্যয়া!
ছেলেটা ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল।
ছেলেটা: আমি নয়ন না খালা। আমি সুমন।
শাহিনা ২ সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর খিলখিল করে হাসল।
শাহিনা: ও... তু সুমন... নয়ন তো বড়া লঞ্চ চালা রাহা হ্যায়... ও দেরি সে আয়েগা...
বলে আবার গিয়ে বসল।
ঘাটের মানুষ ফিসফিস করে, পাগলীটা পুরাই পাগল হইয়া গেছে।
দুপুরে রোদ মাথার উপর। রহিমা এসেছে। হাতে ভাতের পাতিল।
রহিমা: বইন, উঠ। দুইটা ভাত খা।
শাহিনা ঝুড়িটা বুকে জড়িয়ে ধরল।
শাহিনা: নয়ন কে লিয়ে রাখা হ্যায় আপ্পি। ও আয়েগা তো ভুখা হোগা।
রহিমা: নয়ন... নয়ন তো...
কথা শেষ করতে পারল না।
শাহিনা হঠাৎ গান ধরল। খুব আস্তে। সেই ঘুমপাড়ানি।
শাহিনা:সো যা রে লাল মেরি... আঁখে মিচ যা...
গাইতে গাইতে সে ঝুড়ির ভেতর হাত ঢুকিয়ে বাদাম বের করার ভান করল।
শাহিনা: লে বেটা... গরম বাদাম... বেচ কে আয়ি?
তারপর নিজেই উত্তর দিল,
শাহিনা: হাঁ মা... ৪৭০ রুপিয়া কামায়ি...
বলে আবার কাঁদল। আবার হাসল।

শেষ লঞ্চ। শাহিনা আজও পন্টুনে। আজ আর কারো ব্যাগ ধরে না। শুধু তাকিয়ে থাকে।
লঞ্চ চলে গেলে সে উঠে দাঁড়ায়। খুপরিতে যায়। মাটিতে নয়নের নাম লিখে। আঙুল দিয়ে।
N O Y O N
রাত ১০টা বাজে । ঘাট নিস্তব্ধ। খুপরির ভেতর হ্যারিকেনের আলো।
শাহিনা ঝুড়িটা সামনে রেখে বসে আছে। সে ঝুড়ির সাথে কথা বলছে।
শাহিনা: শুন বেটা... আজ কিতনা কামায়া? মা কে লিয়ে কেয়া লায়া?
একটু থেমে,
শাহিনা: হাঁ... পাউরুটি... শুকরিয়া বেটা...
তারপর মাটিতে শুয়ে পড়ল। ঝুড়িটা বুকের উপর। বাইরে কাশেম মিয়া দূর থেকে বিড়বিড় করল,
কাশেম: আল্লাহ... খুপরিটা খালি হইয়া গেল।
মা পোলা দুইজনই খালি হইয়া গেল।
ধলেশ্বরী নদী বয়ে যাচ্ছে। খুপরির ভেতর একটা মা তার মৃত ছেলের ঝুড়ি বুকে নিয়ে ঘুমের ভান করছে।

১ বছর পর ।
ধলেশ্বরীর পানি ১২ বার বাড়ছে কমছে। খুপরির টিনে মরিচা ধরেছে।
সকাল ৭টা বাজে। বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চালে টপটপ। খুপরির সামনে একটা প্লাস্টিকের বাটি। ভেতরে ভাত আর ডাল। কে দিয়ে গেছে কেউ জানে না। শাহিনা বসে আছে। গায়ে একটা ছেঁড়া শাল। চুল একদম সাদা। বয়স ৪৩, দেখে মনে হয় ৬০। কোলে সেই ঝুড়ি। নয়নের ঝুড়ি। এখন ঝুড়ির ভেতর একটা পাথর। নয়ন বলে সে পাথরটাকে ডাকে।
সকাল ৯টায়। লঞ্চ ভিড়ল। ঘাটের নতুন পোলাপানরা শাহিনাকে পাগলী মা বলে ডাকে। কেউ ভাত দেয়, কেউ ২ টাকা দেয়, কেউ আবার ইটের টুকরা মারে।
পোলা ১: এই পাগলী, নে ভাত খা।
শাহিনা: নেহি খায়েঙ্গি। নয়ন কে লিয়ে রাখো। ও রাত কো আয়েগা।
পোলা ২: তোর নয়ন মইরা গেছে। নদী খাইয়া ফেলাইছে।
শাহিনা চোখ লাল করে তাকাল।
শাহিনা: খবরদার! মেরা নয়ন সারেং হ্যায়! বড়া লঞ্চ চালাতা হ্যায়!
বলে সে ঝুড়ির পাথরটাকে চুমু খেল।
শাহিনা: দেখো বেটা... লোগ কেয়া কেহ রাহে হ্যায়...

দুপুরে বৃষ্টি থেমেছে। কাদা জমেছে। রহিমা মাসে একবার আসে। আজও এসেছে।
রহিমা: বইন, কেমন আছো?
শাহিনা উত্তর দিল না। সে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে।
রহিমা: এই নাও, নতুন শাড়ি। আর এই ওষুধ। জ্বরের জন্য।
শাহিনা শাড়িটা নিল। নাকের কাছে নিয়ে শুঁকল।
শাহিনা: নয়ন কে লিয়ে লায়ি হো? উসকো নয়া কাপড়া পছন্দ হ্যায়।
রহিমার চোখে পানি এসেগেল।
রহিমা: হ বইন। নয়নের লাইগাই। তুমি পইরো।
শাহিনা শাড়িটা খুপরির এক কোণে যত্ন করে রেখে দিল। নয়ন আইসবে এ জন্য।

সন্ধ্যা হয়েছে শাহিনার রোজকার কাজ। পন্টুনে বসে থাকা। লঞ্চ আসা যাওয়া দেখা।
আজ একটা ১৭-১৮ বছরের ছেলে নামল। গায়ে লঞ্চের খালাসির ড্রেস। মুখটা নয়নের মতো।
শাহিনা উঠে দাঁড়াল। পা কাঁপছে।
শাহিনা: নয়ন... তু... তু আ গ্যয়া বেটা?
ছেলেটা অবাক।
ছেলেটা: খালা, আমি নয়ন না। আমি হেলাল। নতুন খালাসি।
শাহিনা ১০ সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ হাসি।
শাহিনা: ও... হেলাল... নয়ন তো উপর সে দেখ রাহা হ্যায়... ও কেহ রাহা থা... মা, ম্যায় ঠিক হুঁ...

রাত ১টা বাজে। ঘাট ফাঁকা। শাহিনা খুপরিতে। ঝুড়ির পাথরটাকে বুকের উপর রেখে শুয়ে আছে। বাইরে আবার বৃষ্টি হচ্ছে।
সে বিড়বিড় করছে,
শাহিনা: এক সাল হো গ্যয়া বেটা... তু বিনা এক সাল... মা কেসে জিয়ে...
চোখ বন্ধ করল।
শাহিনা: কোই বাত নেহি... কাল সুবাহ তু আয়েগা... হমারা লিয়ে বাদাম লায়েগা...
ধলেশ্বরী নদী বয়ে যাচ্ছে। ঘাটের সবাই জানে শাহিনার নয়ন আর ফিরবে না।
কিন্তু শাহিনা জানে না। আর জানতেও চায় না। কারণ জানলে বাঁচার শেষ কারণটাও মরে যাবে।

৫ বছর পর। নয়ন হারিয়ে গেছে ৬ বছর হলো। শাহিনার বয়স এখন ৪৮। পিঠ কুঁজো। হাত পা কাঁপে। চোখে ছানি পরেছে।
খুপরিটা এখন প্রায় ভেঙে পড়েছে। বাঁশ পচে গেছে। টিন উড়ে গেছে অর্ধেক।
সন্ধ্যা ৬টা বাজে। মাঘ মাস। কুয়াশা আর হিম। ধলেশ্বরীর নদীর পানি কালো। শাহিনা আর কথা বলে না। কারো সাথে না। শুধু বসে থাকে। কোলে সেই ঝুড়ি। ভেতরে পাথরটা এখন মসৃণ। রোজ হাতের ঘষায়। রাত ৮টা বাজে। শেষ লঞ্চের হুইসেল। হুইসেল শুনলেই শাহিনা উঠে দাঁড়ায়। লাঠিতে ভর দিয়ে টলতে টলতে পন্টুনে যায়।
ঘাটের মানুষ এখন আর কিছু বলে না। অভ্যাস হয়ে গেছে।
কাশেম চাচা: বয়স ৭০। লাঠি নিয়ে বসে থাকে।
কাশেম: আয় মা। ভিতরে যা। বাইরে ঠান্ডা।
শাহিনা শুনে না। সে লঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্ধকারে লঞ্চের আলো দেখে। লঞ্চ চলে গেলে আবার খুপরিতে ফিরে আসে। ঝুড়ির পাথরটাকে বলে,
শাহিনা: দেখা বেটা... আজ ভি নেহি আয়া...

গভীর রাত কুয়াশা গাঢ় হয়েছে। হঠাৎ শাহিনার শরীর কাঁপল। জ্বর। ১০৩। সে খুপরির মেঝেতে বসে পড়ল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। বুকে ঘড়ঘড় শব্দ। তবুও ঝুড়িটা ছাড়ল না। বিড়বিড় করল,
শাহিনা: রফিক... নয়ন... তুম লোগ... আ গ্যয়ে?
চোখের সামনে দুইটা অবয়ব। একজন সারেং এর টুপি। আরেকজন ১৭ বছরের ছেলে। হাসছে।
শাহিনা: হমারা ইন্তেজার মত করো... ম্যায় আ রাহি হুঁ...
রাত ৪টা বাজে। কুয়াশার মধ্যে আজান ভাসছে।
কাশেম চাচা ভোরে উঠে দেখতে এসেছিল। খুপরির দরজা খুলতেই দেখল।
শাহিনা মাটিতে শুয়ে আছে। মুখে শান্তির হাসি। কোলে ঝুড়ি। ঝুড়ির ভেতর পাথর। নিঃশ্বাস নেই।
কাশেম কাঁদল না। শুধু বিড়বিড় করল,
কাশেম: যাক... মা পোলা এক লগে হইলো। আল্লাহর কাছে।
সকালে। ঘাটের মানুষ জানল। পাগলী মা মারা গেছে। কেউ কাঁদল। কেউ বলল ভালোই হইছে, বাঁচলো। জানাজা হলো না। কেউ ছিল না। কাশেম আর রহিমা মিলে ঘাটের পাশেই মাটি দিল। মাথার কাছে একটা বাঁশের খুঁটি। তাতে কয়লা দিয়ে লেখা: (নয়নের মা - শাহিনা)

ধলেশ্বরী নদী বয়ে যাচ্ছে। আগের মতোই।
খুপরিটা খালি। ঝুড়িটা খালি। ঘাটটা খালি।
শুধু মাঝে মাঝে নতুন খালাসিরা বলে, ওই যে কবরটা, ওইখানে একটা পাগলী মা শুয়ে আছে। যে ১০ বছর ধরে ছেলের লঞ্চের অপেক্ষা করছিল।

সমাপ্ত
______________________________

জীবন কখনো কখনো মানুষকে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়, যেখানে হারানোর আর কিছু থাকে না। শুধু থেকে যায় স্মৃতি, আর সেই স্মৃতিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকার অদম্য প্রয়াস। ( নয়নের মা ) শাহিনা তেমনই এক চরিত্র। সমাজের চোখে সে পাগলী। কিন্তু তার পাগলামির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক মায়ের অসীম ভালোবাসা, হারানোর বেদনা, আর শেষ সম্বলটুকু আগলে রাখার যুদ্ধ। এই গল্প কোনো বড় ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে নয়। এটি ধলেশ্বরীর নদীর পাড়ে, একটা টিনের খুপরিতে বেঁচে থাকা অসংখ্য শাহিনা র গল্প। যাদের কথা কেউ লেখে না, যাদের কান্না কেউ শোনে না। নয়ন ফেরেনি। কিন্তু শাহিনার অপেক্ষা থেমে থাকেনি। কারণ মায়ের কাছে সন্তান মরে না, যতক্ষণ না মা নিজে মরে যায়। এই গল্প যদি আপনার বুকের ভেতর এক ফোঁটা পানি এনে দেয়, যদি আপনি ঘাট দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো অসহায় মানুষের দিকে একবার ফিরে তাকান, তবে আমার লেখা সার্থক।

__ মোঃ হেলাল উদ্দিন

© সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত মোঃ হেলাল উদ্দিন +৮৮০১৪০৬৪২৭৫৩৪ // ০১৩০১৩০৪৪৩৬ সহস্রাইল, বোয়ালমারী, ফরিদপুর | শেয়ার করুন নামসহ | কমার্শিয়াল ব্যবহারে অনুমতি নিন | গল্পের কোনো অংশ পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃত করে প্রকাশ করা যাবে না। জীবিত বা মৃত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে এই গল্পের কোন মিল থাকলে তা নিতান্তই কাকতালীয়।

Adresse

সহস্রাইল, শেখর, বোয়ালমারী, ফরিদপুর
Democratic Republic Of The
৭৮৬০

Site Web

Notifications

Soyez le premier à savoir et laissez-nous vous envoyer un courriel lorsque Md Helal publie des nouvelles et des promotions. Votre adresse e-mail ne sera pas utilisée à d'autres fins, et vous pouvez vous désabonner à tout moment.

Raccourcis

Partager