16/05/2026
স্কুল শেষ করতে না পারা মেয়ে ঝৌ কিভাবে চীনের শীর্ষ ধনী?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের চীন সফরের এক নৈশভোজে, ইলন মাস্ক, টিম কুকের মাঝখানের আসনে বসা সবচেয়ে দৃষ্টি-কাড়া ব্যক্তিটি হচ্ছেন ঝাউ কুনফেই। গ্রামাঞ্চলের এক কারখানার শ্রমিক থেকে চীনের সবচেয়ে ধনী নারী। যাঁর বেড়ে ওঠার গল্পে কোনো পারিবারিক প্রভাব, অবস্থা ছিল না। ছিল না কোন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বা বিশেষ সুবিধা। ছিল শুধু নিজের পরিশ্রমে শূন্য থেকে উঠে দাঁড়ানোর বিরল গল্প।
ঝাউ জন্মেছিলেন চীনের হুনান প্রদেশের একটি ছোট গ্রামে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তার মা মারা যান। তার বাবা কর্মস্থলের দুর্ঘটনায় পঙ্গু ও অন্ধ হয়ে যান। ফলে পরিবার চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যায়। ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে গুয়াংডংয়ে গিয়ে একটি কারখানায় কাজ নিতে হয়। সেখানে তিনি কাচ ঘষার কাজ করতেন। দিনে দীর্ঘ সময় কাজ করার পর রাতে নিজে নিজে হিসাবরক্ষণ, কম্পিউটার চালানো ও অন্যান্য কাজ শিখতেন।
কয়েক বছর এভাবে কাজ করে তিনি প্রায় ২০ হাজার ইউয়ান সঞ্চয় করেন। এরপর ভাই, বোন, ভাবী ও দুলাভাইসহ আটজন আত্মীয়কে নিয়ে শেনজেনে ঘড়ির কাচ তৈরির একটি ছোট ওয়ার্কশপ শুরু করেন। মেশিন মেরামত থেকে শুরু করে বিক্রির কাজ সবই তিনি একাই সামলাতেন। চার বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
২০০০ সালে মোবাইল ফোন শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করতে থাকে। ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায় যখন তার ঘড়ির কাচের কারখানা TCL-এর ফোন স্ক্রিনের অর্ডার পায়। তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন যে ফোনের কাচের বাজার বিশাল হতে যাচ্ছে। এরপর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন লেনস টেকনোলোজি। যাদের কাজ হয় ফোনের কাচ উৎপাদন ও গবেষণা করা।
শুরুর দিকে তারা স্থানীয় বাজারের জন্য নকল ফোনের কাচ তৈরি করত। কিন্তু বড় পরিবর্তন আসে যখন তিনি মটোরোলার অর্ডার পেতে চেষ্টা করেন। বিদেশি কোম্পানিগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ ছিল অত্যন্ত কঠোর। তিনি তাদের মান পূরণ করেন এবং বিখ্যাত V3 ফোনের অর্ডার পেয়ে যান। সেই ফোন বিশ্বজুড়ে ১০ কোটির বেশি বিক্রি হয় এবং লেন্স টেকনোলজিকে শিল্পের শীর্ষে তুলে দেয়। এরপর তাঁকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি তার ধারাবাহিকভাবে নোকিয়া, স্যামসুঙসহ বড় বড় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে হন।
সবচয়ে বড় ঘটনাটি ঘটে যখন ২০০৭ সালে স্টিভ জবস প্রথম বাজারে আইফোন নিয়ে আসেন। সম্পূর্ণ গ্লাস টাচস্ক্রিনভিত্তিক এই ফোন পুরো শিল্পকে বদলে দেয়। জবসের নিখুঁত কারিগরি মানদণ্ড পূরণ করতে সক্ষম সরবরাহকারী খুঁজে পেতে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ঝৌ ছুনফেই বুঝতে পারেন, এটি এক বিশাল সুযোগ। তিনি তার দলকে নিয়ে তিন মাস ধরে অ্যাপেল প্রকৌশলীদের সঙ্গে কাজ করেন এবং প্রথম প্রজন্মের আইফোনের গ্লাস প্যানেল উৎপাদনে সক্ষম হন।
এর ফলে অ্যাপলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নিশ্চিত হয়। পরে আইপ্যাড থেকে ম্যাকবুক—অ্যাপলের প্রায় সব ডিভাইসের গ্লাস উৎপাদনের দায়িত্ব যায় লেন্স টেকনোলজির হাতে। কোম্পানিটি বিশ্বের শীর্ষ টাচ গ্লাস নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই কারণেই তিনি টিম কুকের পাশে বসেছিলেন। কিন্তু তার পাশে ইলন মাস্ক কেন ছিলেন? ছিলেন কারণ –
গ্লাস প্যানেল বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর লেন্স টেকনোলজি স্মার্ট ডিভাইস, গাড়ির ককপিট এবং রোবোটিক্সে প্রবেশ করে। অটোমোবাইল খাতে তারা ইতোমধ্যে টেসলা, বিএমডাব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, ও লি অটোসহ প্রায় ৩০টি গাড়ি নির্মাতার সঙ্গে জানালা, সেন্টার কনসোল ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ সরবরাহের চুক্তি করেছে। রোবোটিক্স খাতে তারা জয়েন্ট, সেন্সর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরি করছে—যেগুলোর সঙ্গে মাস্কের ব্যবসারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
একজন কিশোরী, যিনি মাত্র মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে ১৫–১৬ বছর বয়সে অভাব-দারিদ্রতার কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, হুনানের গ্রাম থেকে উঠে আসা একটি মেয়ে শূন্য থেকে এক শিল্প সাম্রাজ্যের মালিক হয়ে উঠলেন। চল্লিশ বছর পর সেই নারী যুক্তরাষ্ট্র চীনের শীর্ষ বৈঠকের কেন্দ্রীয় আসনে বসে আছেন তাও আবার ইলন মাস্ক ও টিম কুকের মাঝখানে!
@ Monjure Khoda Torik