21/01/2026
আমি ঠিক জানি না—কী বলা উচিত, আর কী বলা উচিত না। এই দোটানার ভেতরেই যেন কথা বলার শক্তিটা ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতি নিয়ে কখন ভাবতে হয়, কখন লিখতে হয়—সেই ব্যাকরণ আমার কোনোদিনও জানা ছিল না। তবুও আজ লিখছি। কারণ আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, নিজের বিবেককে আড়াল করাটাও এক ধরনের অপরাধ।
ক্লাস সিক্স বা সেভেনে পড়ি তখন। পাশের বাড়ির এক বড় ভাই অবজ্ঞার সুরে বলেছিলেন, “পড়াশোনা করে কী হবে? পড়াশোনা করে কে কী উল্টাতে পারছে?” সেদিন উত্তর দিতে পারিনি। বয়সের দোষ ছিল, অভিজ্ঞতার অভাব ছিল। যিনি বলেছিলেন, তিনি নিজেও ছাত্র হিসেবে ব্যর্থ ছিলেন।
আজ এত বছর পর রাজনীতির এই নগ্ন রূপ দেখে মনে হয়—সেই অশিক্ষিত মানুষটির কথার ভেতরেই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি লুকিয়ে ছিল।
আমরা আজ কাদের হাতে দেশ তুলে দিচ্ছি? আমাদের পাড়ার মেম্বার থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক পর্যন্ত—তাকিয়ে দেখুন। মেধা আর শিক্ষার বদলে সেখানে জায়গা করে নিয়েছে পেশিশক্তি আর চাটুকারিতা। কিন্তু দায় কি শুধু তাদের?
না। দায় আমাদেরও।
যে সমাজে এক বেলা বিরিয়ানি বা ৫০০ টাকার বিনিময়ে মানুষ মিছিলে যায়, যে সমাজে ভোটটা অধিকার নয় বরং সস্তা সওদা—সেখানে দেশ বদলাবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। আমরা তো পরিবর্তনের দাবি করি, কিন্তু পরিবর্তনের জন্য যে 'চিন্তাশক্তি' দরকার, সেটা কি আমাদের আছে?
আমরা আজ রাজনৈতিক সমর্থক নই, আমরা একেকজন 'অন্ধ ভক্ত'। আমরা যে দলকে ভালোবাসি, তাদের অন্যায়গুলোকে 'কৌশল' বলে চালিয়ে দেই। আর তাদের দুর্নীতিকে ঢেকে রাখি 'উন্নয়নের' চাদরে।
কেন আমি আমার দলের ভুলকে ভুল বলতে পারব না? সমালোচনা করলেই কেন 'বেঈমান' বা 'বিপক্ষ' তকমা লেগে যায়?
• নেতা যখন ভুল করেন, কর্মী তখন হাততালি দেয়।
• নেতা যখন লুটপাট করেন, সমর্থক তখন যুক্তি সাজায়।
এই অন্ধ সমর্থনই রাজনীতিকে সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করেছে। আমাদের দলগুলো জানে—তারা যাই করুক না কেন, একদল মানুষ কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই 'নিশ্চয়তা' তাদের আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
দল করাটা নাগরিক অধিকার, কিন্তু বিবেক বন্ধক রাখাটা দাসত্ব। আপনি যে দলই করুন না কেন, আগে মানুষ হোন। ভুলকে ভুল বলার সাহস অর্জন করুন। যদি আমরা আমাদের দলের ব্যর্থতাকে আড়াল করি, তবে মনে রাখবেন—আমরা শুধু একটা দলকে নয়, একটা পুরো প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি।
আসুন, অন্ধ হওয়া বন্ধ করি। প্রশ্ন করতে শিখি। কারণ প্রশ্নহীন আনুগত্য শেষ পর্যন্ত একনায়কতন্ত্রই জন্ম দেয়।