27/08/2025
পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনা (এপ্রিল ১১, ১৯৭৪, নিউইয়র্ক টাইমস)
অনুবাদ: ফাহাদ ইবনে ইলিয়াস (পরিভাষা সংস্করণ)
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহিংসতার জন্য অবশেষে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে। এই ঘোষণা আসে তখনই, যখন বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের আওতায় না আনার সিদ্ধান্ত নেয়। গতরাতে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে হওয়া এক চুক্তি প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে। পাঁচ দিনব্যাপী বৈঠকের মাধ্যমে এমন এক সমঝোতা হয়, যেখানে দুপক্ষই নিজের কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছে—পাকিস্তান সব যুদ্ধবন্দী ফেরত পাবে, আর বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে প্রকাশ্য ক্ষমা আদায় করতে সক্ষম হয়।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের যৌথ ঘোষণা
চুক্তিটি একসঙ্গে ঢাকা, দিল্লি ও ইসলামাবাদে প্রকাশ করা হয়। এতে ভারতের স্বরন সিং, বাংলাদেশের কামাল হোসেন এবং পাকিস্তানের আজিজ আহমেদ সই করেন। চুক্তিতে বলা হয়, পাকিস্তান সরকার “যে কোনো অপরাধ হয়ে থাকলে তার নিন্দা করছে এবং গভীর দুঃখ প্রকাশ করছে।” একইসঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো বাংলাদেশের জনগণকে অতীত ভুলে মিলনের পথে এগোনোর আহ্বান জানান।
শেখ মুজিবুর রহমানও জানান, তিনি চান ১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞ ভুলে গিয়ে জনগণ নতুন করে শুরু করুক। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ‘দয়া প্রদর্শনের ভিত্তিতে’ আর বিচার চালিয়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ১৯৫ জন সেনাসহ সব পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীকে দেশে ফেরত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
পাকিস্তানের স্বীকারোক্তি
যদিও ক্ষমা চাওয়াটা বাংলাদেশের প্রত্যাশামতো স্পষ্ট ছিল না, ভারত ও বাংলাদেশের মতে পাকিস্তান পরোক্ষভাবেই স্বীকার করেছে যে তাদের সেনারা সীমালঙ্ঘন করেছে। বাংলাদেশের দিক থেকে উল্লেখ করা হয় যে ১৯৫ সেনা যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল। এই চুক্তির ফলে মোট ৯৩ হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর মধ্যে যারা বাকি ছিল তারাও দেশে ফেরত যেতে পারবে। অন্যদিকে পাকিস্তানে আটকে থাকা প্রায় ১.৭৫ থেকে ২ লাখ বাংলাদেশির মধ্যে ১.১৭ লাখ ইতিমধ্যেই ফিরে এসেছে।
বিহারি ইস্যু
সবচেয়ে জটিল প্রশ্ন ছিল বিহারিদের ভবিষ্যৎ। তারা মূলত ভারতের বিহার রাজ্য থেকে আসা মুসলিম, যারা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বসতি স্থাপন করে। যুদ্ধের পর তাদের অনেকেই নিজেদের পাকিস্তানি নাগরিক দাবি করে এবং পাকিস্তানে যেতে চায়। প্রায় পাঁচ লাখ বিহারি পাকিস্তানে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, তবে পাকিস্তান এ পর্যন্ত মাত্র এক লাখকে গ্রহণ করেছে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, পাকিস্তান আরও বেশি বিহারি নিতে রাজি হয়েছে।
চুক্তিতে চার শ্রেণির বিহারিকে পাকিস্তানে নেয়ার কথা বলা হয়:
১. যারা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসেছিল,
২. যাদের পরিবার পশ্চিম পাকিস্তানে আছে,
৩. যারা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে ছিল,
৪. এবং যারা বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতায় আছে, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগী ছিল।
এছাড়া পাকিস্তান যদি কারও আবেদন প্রত্যাখ্যান করে, তবে কারণ জানাতে হবে, এবং নতুন প্রমাণ হাজির করলে আবেদন পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকবে। ফলে আশা করা হচ্ছে, অনেক বেশি সংখ্যক বিহারি পাকিস্তানে যেতে পারবে।