31/07/2026
দেশের বাজারে প্রচলিত ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত: ৮টিতে মেলেনি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দৈনন্দিন ব্যবহারের অত্যন্ত জরুরি পণ্য টুথপেস্ট নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে। দেশের বাজারে প্রচলিত জনপ্রিয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টুথপেস্টে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত ৩৪টি টুথপেস্টের ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য এক বড় ধরনের হুমকি।
গবেষণার আদ্যোপান্ত: কতটি ব্র্যান্ড এবং কোথায় পরীক্ষা?
পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ইএসডিও (ESDO - Environment and Social Development Organization) টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করে।
মোট সংগৃহীত নমুনা: দেশজুড়ে বিভিন্ন খুচরা বাজার ও সুপারমার্কেট থেকে ১৯টি প্রধান ব্র্যান্ডের মোট ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষা: সংগৃহীত এই নমুনাগুলোর বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের 'ল্যাবরেটরি অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি' (Laboratory of Environmental Health and Ecotoxicology)-তে। প্লাস্টিক কণা শনাক্তকরণে স্টেরিওমাইক্রোস্কোপি এবং এফটিআইআর স্পেকট্রোস্কোপির মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
পরীক্ষার ফলাফল: ২৬টিতে উপস্থিতি, ৮টিতে নেই
মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে: ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টি টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন গবেষকরা। অর্থাৎ, বাজারে প্রচলিত সিংহভাগ টুথপেস্টই এই দূষণে আক্রান্ত।
মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি: বাকি ৮টি টুথপেস্টের নমুনায় কোনো ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি, যা তুলনামূলক নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
গবেষকদের মতে, প্রতিদিন দাঁত ব্রাশ করার সময় অজান্তেই এই মাইক্রোপ্লাস্টিক কণাগুলো মুখের লালার সাথে মিশে পেটে চলে যায়। এছাড়া মাড়ির টিস্যুর মাধ্যমেও এটি রক্তে প্রবেশ করতে পারে। শরীরে নিয়মিত মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, অন্ত্রের প্রদাহ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস এবং যকৃৎ ও কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অবস্থা
বর্তমানে বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অনুমোদিত মাত্রা বা নির্দিষ্ট কোনো জাতীয় নিয়ন্ত্রণমূলক মানদণ্ড (Standard limit) বা নীতিমালা নেই। এমনকি পণ্যের প্যাকেটে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা প্লাস্টিক পলিমারের উপস্থিতির কোনো তথ্যও উল্লেখ থাকে না।
তবে এই গবেষণা প্রকাশের পর জনস্বার্থে আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। টুথপেস্টে ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনায় হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত স্বাস্থ্য সচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিএসটিআইকে (BSTI) প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, বুয়েটের একজন শিক্ষককে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে দ্রুত আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
এই সংবাদটি প্রকাশের জন্য উপযুক্ত একটি ছবি: