25/12/2025
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও প্রশ্নবিদ্ধ বাংলাদেশের রাজনীতি: রাষ্ট্রকেন্দ্রিক হবে বাংলাদেশ, নাকি দলকেন্দ্রিকই থেকে যাবে?
১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ— একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর, ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে: আমরা কি সেই স্বপ্নের বাংলাদেশের দিকে এগোতে পেরেছি, নাকি রাজনীতির এক দীর্ঘ অচলাবস্থায় আটকে গেছি?
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে— ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্র পরিচালনার চেয়ে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা, রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা এবং ক্ষমতা আঁকড়ে ধরাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে।
রাজনীতির কেন্দ্রে রাষ্ট্র নয়, দলই প্রাধান্য পেয়েছে
১৯৭১ সালের পর থেকে যে দলই ক্ষমতায় এসেছে, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। উন্নয়ন হয়েছে— কিন্তু তা হয়েছে খণ্ডিতভাবে, পরিকল্পনাহীনভাবে এবং অনেক সময় রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি দমন কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার—এসব বিষয় কখনোই রাজনীতির মূল আলোচ্য হয়ে ওঠেনি।
রাজনৈতিক নেতারা রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় না থেকে ক্রমে পরিণত হয়েছেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক সুবিধাভোগীতে। রাজনীতি জনগণের সেবা হিসেবে নয়, হয়ে উঠেছে ব্যক্তিগত প্রভাব, সম্পদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যম হিসেবে।
বিরুদ্ধাচরণের রাজনীতি ও তার পরিণতি
এক দল ক্ষমতায় থাকলে অন্য দল রাজপথে—এই চক্র বহু বছর ধরে চলমান। বিরোধিতা প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা যখন কেবল প্রতিহিংসা, সহিংসতা ও অচলাবস্থার জন্ম দেয়, তখন রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংসদ অকার্যকর হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়, আর সাধারণ মানুষ রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। একটি দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করতে যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, ধারাবাহিক নীতি ও জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন—তা আমাদের দেশের রাজনীতিতে অনুপস্থিত একেবারেই নেই বললেই চলে।
তাহলে সামনে পথ কোথায়?
বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত দেশে রূপান্তর করতে হলে রাজনীতির মৌলিক রূপান্তর করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রথমত, রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ক্ষমতায় কে থাকবে—এই প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে হবে, রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও জলবায়ু অভিযোজন— এসব বিষয়ে সরকার পরিবর্তন হলেও নীতির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, যোগ্য ও সৎ নেতৃত্বের বিকাশ জরুরি। রাজনীতিতে প্রবেশের মানদণ্ড হতে হবে সততা, দক্ষতা ও জনসেবার মন মানসিকতা— পেশিশক্তি বা বংশ পরিচয়ে নয়।
চতুর্থত, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গুলোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন ব্যবস্থা, কার্যকর সংসদ, মুক্ত গণমাধ্যম ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা ছাড়া উন্নত রাষ্ট্র কল্পনা করা যায় না।
সবশেষে, যুবসমাজকে রাজনীতির মূল স্রোতে আনতে হবে। কারণ ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দায়িত্ব তাদের কাঁধেই পড়বে।
ইতিকথা
বাংলাদেশের সমস্যা সম্পদের অভাব নয়, সম্ভাবনার অভাব নয় — সমস্যা নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক মানসিকতার। আমরা যদি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রকে ভাবতে না পারি, তাহলে স্বাধীনতার আরও শত বছর পরও আমরা একই প্রশ্নে ঘুরপাক খাব।
আমরা উন্নত বাংলাদেশ চাই এটা কোনো স্লোগান হিসেবে নয় — বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জনগণের উচিৎ এই স্লোগানকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা। প্রশ্ন হলো, সেই দায়িত্ব পালনের মতো রাজনীতি কি আমরা গড়ে তুলতে পারব?