29/08/2026
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ:
আশীর্বাদ নাকি দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন গলার কাঁটা?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিদ্যুৎ খাত নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি নতুন প্রকল্প—চীন থেকে বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে সেই বিদ্যুৎ কেনা। শুনতে দারুণ মনে হলেও, একটু গভীরভাবে খতিয়ে দেখলে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা বিরাট আর্থিক ঝুঁকি ও লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলো পরিষ্কার হয়ে যায়। চলুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক এই প্রজেক্টের লাভ, লস এবং সামগ্রিক ভবিষ্যৎ।
(১) ইতিবাচক বা লাভের দিকগুলো:
বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান: ঢাকা শহরের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো ময়লা-আবর্জনার পাহাড়। আমিনবাজারের এই প্রজেক্টের ফলে প্রতিদিনের বিশাল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য সরাসরি প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হবে, যা পরিবেশ দূষণ কমাতে দারুণ ভূমিকা রাখবে।
পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য শক্তি: জীবাশ্ম জ্বালানি বা কয়লার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব বিদ্যুতের দিকে যাওয়ার এটি একটি চমৎকার উদ্যোগ।
স্থানীয় গ্রিড সুরক্ষা: বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি না করে সরাসরি ঢাকার ভেতরে প্ল্যান্ট স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত করা হবে।
(২) নেতিবাচক দিক ও আর্থিক ক্ষতি:
অত্যন্ত উচ্চ মূল্য (প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা): যেখানে সাধারণ বা অন্য উৎসের বিদ্যুতের দাম অনেক কম, সেখানে প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দামে বিদ্যুৎ কেনা বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের (BPDB) ওপর বিশাল বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে। এর শেষ পরিণতি গিয়ে পড়বে সাধারণ জনগণের কাঁধেই।
ডলারের দাম ও পুরোনো চুক্তি: প্রজেক্টটির প্রাথমিক দর নির্ধারিত হয়েছিল বহু আগে। কিন্তু বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বড় পতনের কারণে এখন স্থানীয় মুদ্রায় এর খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে।
(৩) সবচেয়ে বড় আশঙ্কা:
কাঁচামালের সংকট ও চুক্তির ফাঁদ! এই প্রজেক্টের সবচেয়ে বড় লজিক্যাল এবং টেকনিক্যাল দুর্বলতা হলো কাঁচামাল বা ময়লার জোগান।
ঢাকা শহর থেকে প্রতিদিন সরাসরি ৩ হাজার টন তাজা বা কাঁচা বর্জ্য সরবরাহ করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। কারণ আমাদের দেশে ময়লা ফেলার আগেই হকার ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্লাস্টিক, লোহা বা রিসাইকেলযোগ্য জিনিসপত্র আলাদা করে ফেলেন।
তাছাড়া ল্যান্ডফিলে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ময়লা দিয়ে বিদ্যুৎ বানানো যায় না, কারণ সেগুলোর দাহ্য ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।
চীনা কোম্পানির সাথে চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ ময়লা সরবরাহ করতে না পারলে সরকারকে উল্টো জরিমানা বা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। ময়লা না দিতে পারলেও টাকা গুনতে হবে—ঠিক যেমনটা অতীতে রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে।
ভবিষ্যতের চিত্র কী হতে পারে?
কাঁচামালের ঘাটতি এবং চড়া দামের এই চুক্তিগুলো যদি সঠিকভাবে পরিকল্পনা না করে এগিয়ে নেওয়া হয়, তবে শুরুতে ঢাকঢোল পেটানো হলেও পরবর্তীতে প্ল্যান্টগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চলতে ব্যর্থ হবে। ফলশ্রুতিতে হয় এগুলো মাঝপথে বন্ধ হয়ে থাকবে, নয়তো সরকারের বিশাল অংকের ভর্তুকি বা জরিমানের বোঝা টানতে হবে।
পরিবেশ রক্ষার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হলেও, চুক্তির শর্ত এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা কঠোরভাবে পর্যালোচনা না করলে শেষ পর্যন্ত এটি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের আরও বেশি দূরদর্শী হওয়া জরুরি।