31/12/2025
দিরাই উপজেলায় পিআইসি প্রকল্পে ভয়াবহ লুটপাটের অভিযোগ
বরাদ্দ দ্বিগুণ, কাজ উধাও—পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা প্রশ্নের মুখে
দিরাই (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি: কামরুল হাসান মিটু।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) প্রকল্পে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রকল্পের বরাদ্দ কয়েকগুণ বাড়ানো হচ্ছে এবং সেই অর্থের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের পকেটে। ফলে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প পরিণত হয়েছে প্রকাশ্য লুটপাটে।
অভিযোগের তীর দিরাই পানি উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুমের দিকে। স্থানীয়দের দাবি, তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই একাধিক পিআইসি প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। মাত্র ১ লক্ষ টাকার প্রকল্প কীভাবে কাগজে-কলমে ৩ লক্ষ টাকায় রূপ নেয়—দিরাই উপজেলার একাধিক প্রকল্পে তার বাস্তব উদাহরণ মিলেছে বলে অভিযোগ।
এর জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে এলাকাবাসী উল্লেখ করছেন দিরাই উপজেলার ৭০ নং পিআইসি প্রকল্প, যা ৪ নং চরনারচর ইউনিয়নের ‘আলিপুর বেরিবাঁধ’ নামে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই প্রকল্পে কাজের পরিমাণের সঙ্গে বরাদ্দের কোনো মিল নেই—বরং বরাদ্দ যত বেড়েছে, কাজ ততই কমেছে।
বরাদ্দ বেড়েছে দ্বিগুণ, কাজ কমেছে ৬০ শতাংশ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যে প্রকল্পে গত বছর বরাদ্দ ছিল ১৪ লক্ষ টাকা, সেই একই প্রকল্পে চলতি বছরে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে প্রায় ২৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪১৩ টাকা ৪২ পয়সা। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। এলাকাবাসীর দাবি, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে প্রকল্পের বাস্তব কাজ হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ কম।
অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ স্থানে আরসিসি ঢালাইয়ের কাজ দেখানো হলেও বাস্তবে কাজের মান ও পরিমাণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কাজের ওপর সামান্য সংস্কার দেখিয়ে নতুন করে মোটা অঙ্কের বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন।
বিশেষ করে ‘আলিপুরের কাল’ নামে পরিচিত এলাকায় মাত্র ২০০ মিটার রাস্তার কাজে বিপুল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেখানো হয়েছে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন,
“এখানে এত টাকার কাজ হওয়ার কোনো সুযোগই নেই। কাগজে যা দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার অর্ধেকও হয়নি।”
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম একজন পরিচিত আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। জানা গেছে, তিনি গত বছর নেত্রকোনা জেলায় কর্মরত ছিলেন এবং সেখানেও তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
রহস্যজনকভাবে গোপন পিআইসি কমিটি
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—জেলার অন্যান্য উপজেলার পিআইসি কমিটির তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ করা হলেও দিরাই উপজেলার পিআইসি কমিটির তালিকা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এতে কমিটির গঠন, সদস্যদের নাম ও দায়িত্ব নিয়ে জনমনে ব্যাপক সন্দেহ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সচেতন মহলের ধারণা, এই গোপনীয়তার আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে বড় ধরনের অনিয়ম।
তদন্তের দাবি, প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ
দিরাই উপজেলার সচেতন নাগরিক, সামাজিক সংগঠন ও এলাকাবাসী অবিলম্বে এ বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
৪ নং চরনারচর ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে দিরাইয়ের উন্নয়ন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে।”
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।