09/10/2026
বাংলাদেশের বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি দেখতে দেখতে মানুষ আজ ক্লান্ত, বিরক্ত এবং ক্ষুব্ধ। এত বছর ধরে কত সরকার এলো-গেল, অথচ বিমানবন্দরে প্রবাসীদের ভোগান্তি কমানোর বিষয়টি যেন কারও মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠল না!
অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। দেশের অবকাঠামো থেকে শুরু করে অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সেই প্রবাসীরাই যখন নিজের দেশে ফিরে বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হন, তখন প্রশ্ন জাগে তাঁদের অপরাধটা কী?
প্রবাসীরা কি VIP এন্ট্রি চান? VIP সার্ভিস চান? না, তাঁরা শুধু চান সম্মানজনক আচরণ, নিরাপদ লাগেজ এবং হয়রানিমুক্ত একটি স্বাভাবিক যাত্রা। তাঁরা চান, দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে নিজের দেশে ফিরে যেন লাগেজ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে না হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে না হয় এবং বিমানবন্দরের কর্মীদের কাছ থেকে অসম্মানজনক আচরণ পেতে না হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, বিমানবন্দরে কর্মরত কিছু মানুষের বিরুদ্ধে লাগেজ চুরি, ব্যাগ কাটা, লাগেজ ভাঙচুর কিংবা যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তার যথাযথ তদন্ত হয় না কেন?
যাঁরা বিমানবন্দরে চাকরি করেন, তাঁরা কি একবারও ভাবেন না যে একজন প্রবাসী কত কষ্ট করে বিদেশে উপার্জন করেন? কত স্বপ্ন, কত ত্যাগ আর কত পরিশ্রমের বিনিময়ে নিজের পরিবারের জন্য জিনিসপত্র কেনেন? সেই জিনিসগুলোই যদি বিমানবন্দরে এসে চুরি হয়, নষ্ট হয় কিংবা ব্যাগ কেটে মূল্যবান জিনিস নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে সেই কষ্টের দায় কে নেবে?
সরকারি চাকরি করে নিয়মিত বেতন পাওয়ার পরও যদি কেউ অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ দেখান, তাহলে তাঁর জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে না কেন? অবশ্যই মনে রাখতে হবে, অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না; সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমার প্রশ্ন, বাংলাদেশের এত বড় একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত CCTV ক্যামেরা স্থাপন করা কি এতটাই কঠিন? ক্যামেরার সামনে যাত্রীদের লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা যায় না? গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় ডিসপ্লে বসানো যায় না, যাতে যাত্রীরা নিজেদের লাগেজের গতিবিধি দেখতে পারেন?
যদি কোথাও লাগেজ চুরি, ব্যাগ কাটা, ভাঙচুর কিংবা কর্মীদের অসদাচরণের ঘটনা ঘটে, তাহলে CCTV ফুটেজের মাধ্যমে তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত করা সম্ভব হওয়ার কথা। তাহলে এত দিন ধরে এসব সমস্যা নিয়ে কথা বলার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এত দেরি হচ্ছে কেন?
বিমানবন্দরের কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, পেশাদার আচরণ, যাত্রীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং লাগেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়? অভিযোগ তদন্তের জন্য দক্ষ কর্মকর্তা, কার্যকর অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং জবাবদিহির সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া কি নিশ্চিত করা যায় না?
আমরা কি এমন একটি বিমানবন্দর চাইতে পারি না, যেখানে একজন প্রবাসী দেশে ফিরে স্বস্তি পাবেন, আতঙ্ক নয়; সম্মান পাবেন, অপমান নয়; নিরাপত্তা পাবেন, হয়রানি নয়?
প্রবাসীরা কোনো বিশেষ সুবিধা চাইছেন না। তাঁরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার চাইছেন। তাঁরা চাইছেন, নিজের দেশে ফিরে যেন নিজেদের অসহায় মনে না হয়।
যাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, তাঁদেরই যদি দেশের বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে?
আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছি বাংলাদেশের বিমানবন্দরে CCTV নজরদারি জোরদার করুন, লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করুন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করুন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিন। পাশাপাশি বিমানবন্দরের সব কর্মীর জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ ও পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করুন।
প্রবাসীরা বাংলাদেশের সম্পদ। তাঁদের কষ্টার্জিত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবে, অথচ নিজের দেশে ফিরে তাঁরা হয়রানির শিকার হবেন এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
দেশের বিমানবন্দর শুধু প্রবেশ ও প্রস্থানের স্থান নয়; এটি বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। তাই আসুন, প্রবাসীদের নিয়ে শুধু প্রশংসার কথা না বলে তাঁদের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করি।
প্রবাসীদের সম্মান দিন, তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। কারণ, নিজের দেশে ফিরে সম্মান পাওয়া কোনো বিশেষ সুবিধা নয় এটি তাঁদের ন্যায্য অধিকার।
ক ল মে : Rumana Yasmin ✍️