30/12/2025
বেগম খালেদা জিয়ার বিদায়
একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি, রয়ে গেল ইতিহাস
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু বিদায় শুধু একজন মানুষের প্রস্থান নয়, বরং একটি সময়ের সমাপ্তি নির্দেশ করে। বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় তেমনই এক ঘটনা। তাঁর চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ, জটিল ও বহুমাত্রিক অধ্যায়, যার প্রতিটি পাতায় রয়েছে ক্ষমতা, ত্যাগ, ঐক্যের চেষ্টা, বঞ্চনা এবং নীরব সহনশীলতার ইতিহাস। তিনি ছিলেন তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু তাঁর জীবনকে কেবল ক্ষমতার পালাবদলের হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও তিনি কখনো ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ বানাতে চাননি। বরং রাজনীতিকে তিনি দেখেছিলেন একটি দায়িত্ব হিসেবে, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রতিশোধ বা রাগের কোনো স্থান নেই।
ঐক্যের রাজনীতিতে তাঁর বিশ্বাস
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল একটি মৌলিক ধারণা, সবাইকে একসাথে নিয়ে চলা। ভিন্নমত থাকা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য গড়ে তোলাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এই দর্শনের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর, যখন তিনি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সরকার গঠন করেন। এটি ছিল সদ্য স্বৈরশাসনমুক্ত একটি দেশের স্থিতিশীলতার প্রশ্নে নেয়া একটি বাস্তব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের সঙ্গেও ন্যূনতম সৌহার্দ্য বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নিজের সন্তানকে তাঁর সমাধিতে পাঠানো, বাংলাদেশের প্রতিহিংসাপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছিল একটি বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি প্রমাণ করে, তিনি সম্পর্ক ছিন্নের রাজনীতিতে নয়, সহাবস্থানের রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন।
ক্ষমতায় থেকেও সরে যেতে চাওয়া এক ব্যতিক্রমী ইচ্ছা
কম মানুষই থাকে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর থেকেই বেগম খালেদা জিয়া দলের দৈনন্দিন নেতৃত্ব থেকে ধীরে ধীরে সরে যেতে চেয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি রাজনৈতিক দল ব্যক্তি বা পরিবার নির্ভর হলে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল হয়ে পড়বে। সে কারণেই তিনি চেয়েছিলেন বিএনপি পরিচালিত হোক সিনিয়র নেতাদের সম্মিলিত নেতৃত্বে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল নির্মম। দলের ভেতরে শুরু হয় নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা, ঠেলাঠেলি ও পারস্পরিক অবিশ্বাস। কেউ কাউকে মানতে রাজি ছিলেন না। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে দলকে একটি গোছানো কাঠামোর মধ্যে ধরে রাখা তাঁর জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। আর এই সুযোগেই সামনে আসে সুবিধাবাদী রাজনীতি।
পরিবারতন্ত্রের বাইরে তাঁর দৃঢ় অবস্থান
ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর বোনের ছেলে ইঞ্জিনিয়ার তুহিন আমার সম্পর্কে খালু হওয়ায়, অনেক বিষয় আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি ও জেনেছি। দৃঢ়ভাবে বলা যায়, বেগম খালেদা জিয়া কখনোই চাননি তাঁর পরিবার রাজনীতিতে যুক্ত হোক। পরিবারতন্ত্র তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের পরিপন্থী ছিল।
কিন্তু দলীয় সংকট যখন গভীর হয়, তখন কিছু সুযোগসন্ধানী নেতা একটি ভয়ের বয়ান তৈরি করেন, পরিবারের কেউ সামনে না এলে দল ভেঙে পড়বে। এই আশঙ্কাকে সামনে রেখে একপর্যায়ে তারেক রহমানকে রাজনীতির মূলধারায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এটিতে বেগম খালেদা জিয়ার কোনো উৎসাহ ছিল না, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তিনি তার বড় সন্তানকে দলে নেতৃত্বে টেনে আনার বিষয়ে তিনি অনেকটা নিরব হয়ে যান, আর এ সুযোগটি কাজে লাগায় সেইসব সুবিধাবাদীরা।
সুবিধাভোগীদের উত্থান ও চরিত্রহননের রাজনীতি
এরপর যে অধ্যায়টি শুরু হয়, তা বিএনপির ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ও ক্ষতিকর অধ্যায়গুলোর একটি। অভিযোগ রয়েছে, কিছু নেতা ও মন্ত্রী তারেক রহমানের নাম ও তার আশেপাশে থাকা বন্ধুদেরকে ব্যবহার করে ক্ষমতা, ব্যবসা ও দুর্নীতির এক বিপজ্জনক মেলবন্ধন ঘটান। আর পরবর্তীতে এর সকল বদনামের ফল ভোগ করতে হলো তারেক রহমানকেই। গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ পেতে থাকে। বাস্তবতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার সীমারেখা ধীরে ধীরে মুছে যায়। একসময় দেশের বড় একটি অংশের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন বিতর্ক ও দুর্নীতির প্রতীক।
বহিরাগত প্রভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
একই সময়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পার্শ্ববর্তী একটি দেশের প্রভাব বাংলাদেশের মিডিয়া ও রাজনৈতিক বয়ানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেখানে একটি দলকে রাষ্ট্রের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং অন্য পক্ষকে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ, এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলেই বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নীতিনির্ধারণে পড়শী দেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, এমনটাই মনে করেন সমালোচকেরা।
ত্যাগ, নিপীড়ন ও নীরব দৃঢ়তা
এই সবকিছুর মাঝেও বেগম খালেদা জিয়া প্রতিহিংসার ভাষা বেছে নেননি। তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে, স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সহ্য করেছেন বড় সন্তানের পঙ্গুত্ব ও ছোট সন্তানের মৃত্যু, অপরিসীম শোক ও বেদনা। শারীরিক অবস্থার চরম অবনতির সময় বিদেশে উন্নত চিকিৎসার প্রস্তাব তিনি বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর কথায় ছিল গভীর দৃঢ়তা, “এই দেশ ছেড়ে, এই দেশের মানুষকে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।” এই একটি বাক্যের মাধ্যমেই ফুটে ওঠে তাঁর দেশপ্রেম ও দেশের মানুষের প্রতি তার কমিটমেন্ট।
ইতিহাসের পাতায় তাঁর স্থান
বেগম খালেদা জিয়া নিখুঁত ছিলেন না, এ কথা সত্য। কিন্তু তিনি ছিলেন নৈতিকভাবে স্পষ্ট, ক্ষমতার মোহে নয়, দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে রাজনীতি করা একজন মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন ঐক্যের রাজনীতি। তিনি চেয়েছিলেন পরিবারকে রাজনীতির বাইরে রাখতে। তিনি চেয়েছিলেন সময়মতো সরে যেতে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি। আজ তাঁর বিদায়ে একটি অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া গল্প, ত্যাগ ও দর্শন, ইতিহাস হয়ে রয়ে গেছে। ইতিহাস একদিন নিরপেক্ষভাবে কথা বলবেই। আর তখন বেগম খালেদা জিয়ার নাম সম্মানের সাথেই উচ্চারিত হবে। একজন ক্ষমতাবান নেত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন দায়িত্ববান রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে।
পাবদা মাছ খেতে বেগম জিয়া খুব পছন্দ করতেন। বর্ষায় ডুবে যাওয়া ঢাকার বাজার ঘুরে ঘুরে মাজা পানিতে নেমে উনার জন্য ভালো পাবদা মাছ কেনার সেই স্মৃতি আজ খুব বেশি মনের কোনায় উঁকি দিচ্ছে। উনার দেশপ্রেম ও ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা আমাকে সব সময় খুব বেশি মুদ্ধ করতো। তাই আজ বারবার মনে হচ্ছে খালেদা জিয়া মরে নাই, উনি বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন হাজারো বাঙালির মানষপটে। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা যেন এই মহান দেশপ্রেমিক মায়ের ভুলগুলিকে ক্ষমা করে তাকে জান্নাতের মেহমান করে নিন। আমিন