08/12/2025
বাংলাদেশের 'দেশপ্রেমিক' সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমের আমলনামা
আমাদের সেনাবাহিনীর নামের আগে একটি বিশেষণ লাগানো হয়; তা হলো দেশপ্রেমিক। সেনাবাহিনী মাত্রই দেশপ্রেমিক হবে, নাকি দেশাদ্রোহী সেনাবাহিনী হয়? এ তকমা কখন লাগানো হয়েছিলো? ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর এ তকমা চালু হয়। কারণ, এ জঘন্য কাজের পক্ষে কুযুক্তি দাড় করানোর জন্য দেশপ্রেমিক তকমার আমদানি। এখন আসুন দেখা যাক দেশপ্রেমিকদের কাজ কারবার।
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের সেনাবাহিনীর জন্ম। তৎকালীন বাঙ্গালী সেনা অফিসারদের একটি ক্ষুদ্র অংশ অসীম সাহসিকতার সাথে মার্চ-এপ্রিলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়। বাকিরা তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থান করে পাকিস্তানীদের আদেশ মেনে বাঙালি নিধনে দায়িত্ব পালন করতে থাকে। এরা কখনই বিশ্বাস করেনি যে বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। তবে এদের মধ্যে একজন ভিন্ন ছিলেন। ১৯৭১ এর এপ্রিলে ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে নিয়াজি অফিসারদের এক সভায় বাঙালী নারীদের ধর্ষণের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের Race বদলে দেয়ার নির্দেশ দেয়। এ কথা শুনে পাকিস্তানি অফিসাররা ও হতভম্ব হয়ে যায়। এ সভায় উপস্থিত একজন বাঙালী অফিসার মেজর মুশতাক (যিনি তখনও পাকিস্তানিদের পক্ষে কাজ করছিলেন) সভা থেকে বের হয়ে বাথরুমে ডুকে নিজের সার্ভিস পিস্তল মাথায় ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন (পাকিস্তানী জেনারেল খাদিম হোসেন রাজার বইয়ে ঘটনাটির বিস্তারিত বর্ণনা আছে)। তৎকালীন বাঙালি সেনা অফিসাররা চাকুরিতে যোগদানের পর থেকে সামরিক শাসনের অংশ হিসেবেই কাজ করত। কারণ সিভিল শাসন কি, তারা তা কক্ষনো দেখে নাই এবং তাদের ধারনাও ছিল না। তারা সবসময় নিজেদেরকে শাসক হিসেবেই বিবেচনা করতো। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার ছিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সিভিল সরকার। ফলে যুদ্ধচলাকালীন এ সরকারকে হটিয়ে সামরিক অফিসারদের নেতৃত্বে একটি অথরিটি গঠনের চেষ্টা করে জিয়াউর রহমান ও কেউ কেউ। কিন্তু, তখনকার বিশ্ব জনমতের কারণে তা হয়নি। নভেম্বর এর মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যায় বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। তখন মধ্যপ্রাচ্যে চাকুরীরত পাকিস্তান সেনাবিহিনীর কয়েকজন বাঙালি অফিসার কলকাতায় এসে প্রবাসী সরকারের কাছে যোগ দেয় (বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের দল)। এরা একদিনের জন্য ও যুদ্ধ করে নাই, মুজিবনগর সরকারের অফিসের কাজ করত। ওসমানী এদের সবাইকে খেতাব ও দেয়!
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, পা'কিদের পক্ষে কাজ করা সকল বাঙালি অফিসার সেনাবিহিনীতে যোগ দেয়ার সুযোগ পায়। এরা সেনাবাহিনীর সকল পর্যায়ে এবং বিশেষ করে প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত দায়িত্ব পালনের সুযোগ পায়। এরা মন থেকে কক্ষনো বাংলাদেশকে মেনে নিতে পারেনি। শুধু সময়ের অপেক্ষা করেছে। এ সকল অফিসাররা সেনাবাহিনীকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা কক্ষনো করেনি। সিভিল সরকারের কতৃত্ব ক্ষমতালোভী সেনাবাহিনীর এসব লোকজন কক্ষনো মেনে নেয়নি। এর সাথে যুক্ত হয় বিদেশি ষড়যন্ত্র। পরিনামে বঙ্গবন্ধু হত্যা। এ বাহিনী কক্ষনো পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠতে চায়নি। তারা সবসময় পৃথিবীর নিকৃষ্ট পা'কিস্তানি সেনাদের মতোই রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হতে চেয়েছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৭৫-১৯৯০ তারা দেশের শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। এ পনেরো বছরে সেনা দুঃশাসন আর দুর্নীতিতে দেশের অর্থনীতি তলানিতে গিয়ে ঠেকে। ১৯৯১-৯৬ সেনাবাহিনী পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন করে। ১৯৯৬ তে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করলে বাংলাদেশ সত্যিকার সিভিল শাসন প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু, সেনাবাহিনী তাদের পছন্দমত সরকার আনার জন্য ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। ২০০১ এ লতিফুর রহমানের কেয়ারটেকার সরকারের সময় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সেনাবাহিনী স্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে কাজ করে। মাঠ পর্যায়ে সেনাবাহিনী আওয়ামীলীগ নেতা কর্মীদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন এবং হয়রানীমূলক কাজ করে স্থানীয়দের ধারনা দেয়ার চেষ্টা করে যে তারা বিএনপির পক্ষে। ফলে আওয়ামীলীগ নির্বাচনী প্রচারনায় পিছিয়ে পড়ে। উপজেলায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা অফিসাররা, সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিস থেকে ভোটারতালিকা সংগ্রহ করে, হিন্দু ভোটারদের আলাদা ডাটাবেস করে, তাদের ভয়ভীতি দেখায় এবং কেন্দ্রে আসা থেকে বিরত রাখে। এরপরও যখন দেখে আওয়ামীলীগ প্রার্থীদের বিজয় ঠেকানো যাচ্ছিলো না, তখন ডিসিদের মাধ্যমে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে এরূপ কেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করে পরবর্তীতে সেনা প্রহরায় নির্বাচন করে বিএনপি প্রার্থীদের বিজয়ী করা হয়। মুন্সিগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলায় এ ঘটনা ঘটে। উক্ত নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষিত হওয়ার দশদিন পর বিএনপি সরকার গঠন করে। এ দশদিনে প্রায় ত্রিশ হাজার আওয়ামীলীগ কর্মী সমর্থক খুন করা হয়, পঞ্চাশ হাজারের অধিক নারী ধর্ষিত হয়, বিএনপি ও জামাত জ'ঙ্গিদের দ্বারা। ঐ সময় সেনাবাহিনী মাঠে মোতায়েন ছিল। সিভিল প্রশাসনের অনুরোধেও সেনাবাহিনী এ সকল ঘটনা নিয়ন্ত্রনে নিষ্ক্রিয় থাকে। পেশাদার আর 'দেশপ্রেমিক' বলে কথা।
২০০৪ এ বিএনপি সরকার র্যাব সৃষ্টির মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগ দেয়। ঐ সময় সেনাবাহিনীর মত একটি নিয়মিত বাহিনী দেশের নাগরিকদের উপর অবর্ণনীয় নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। র্যাব কমান্ডারগনও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সাথে অবৈধ সিন্ডিকেটে অংশ নেয়। এর মাধ্যমে র্যাব কমান্ডারগন প্রচুর অর্থ বিত্তের মালিক হয়।
ঐ সরকারের শেষে বিএনপির জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকে। দুর্নীতিতে টানা ৫ বার বাংলাদেশ শীর্ষে অবস্থান করে। সেনাবাহিনী এবং পশ্চিমাদেশগুলো ও জ'ঙ্গিদের মদতদাতারা, কোনভাবেই যেনো আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসতে না পারে সে জন্য ১/১১ এর সরকার আনে। এ সরকার মূলত সেনা সরকার। এরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার লক্ষেই ক্ষমতা দখল করে। এ সরকারের কোড নেম ছিল “অপারেশন আলোর সন্ধানে” যার ইংরেজি “Operation Search Light”। কি; মিলাতে পারেন? ২৬শে মার্চের পা'কি বাহিনীর বাঙালি হত্যার কোড নেম ছিল “Operation Search Light”। এ সময় সেনাবিহিনী উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উপর নির্যাতন চালায় এবং তাদের চরিত্র হননে নামে। তাদের ক্ষমতা ছাড়ার কোন ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু, অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয় হলে তাদের উপায় ছিল না। এ সময়ে টাস্কফোর্স এর মাধ্যমে সেনাবাহিনীর মাঠ পর্যায়ের অফিসাররা; ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, দুর্নীতিবাজ আমলা ও রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন করে। এর দালিলিক প্রমাণ আছে। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জোর করে নেয়া টাকার পরিমাণ এতোই বেশি ছিলো যে, ১২০০ কোটি টাকা এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মুচলেকা দিয়ে এ টাকা ফেরত নেয়ার অনুরোধ করলেও তারা মুচলেকা দিয়ে টাকা ফেরত নিতে রাজি হয়নি।
শেখ হাসিনা সরকার গঠনের পর এ মার্সেনারী বাহিনীর কোন গুণগত পরিবর্তন এর চেষ্টা করেছেন বলে দেখা যায় না। এটাই তার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। শেখ হাসিনা তার সরকারকে সিভিল সরকারের আদলে পরিচালনা করতে চেয়েছেন। কিন্তু, কোভিডের পর নিরাপত্তার ধুঁয়া তুলে তারা তাঁকে জনগন থেকে বিছিন্ন করে ফেলে। সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করা বন্ধ হয়ে যায়।
অনলাইনে রাজনৈতিক মিটিং চালুর মাধ্যমে এ জনবিছিন্নতা আরও বৃদ্ধি পায়। একটি সিভিল সরকারের জন্য বেশি প্রয়োজন দক্ষ পুলিশ বাহিনী। কিন্তু, শেখ হাসিনা সামরিক বাহিনীর বরাদ্দ অযৌক্তিকভাবে বহুগুণ বাড়ালেও পুলিশ এর বরাদ্দ সে অনুপাতে বাড়েনি। ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশে কমপক্ষে ০৯ লক্ষ পুলিশ দরকার, বাস্তবে তার অর্ধেকও নাই। শেখ হাসিনার শেষ ০৩ বছরে আর্মির বরাদ্দ ছিল এক লক্ষ পনের হাজার কোটি টাকা। পুলিশের বরাদ্দ এর তিন ভাগের এক ভাগ ও ছিল না। তার এ বরাদ্দ ক্যান্টনমেন্টগুলোতে জ'ঙ্গি উৎপাদনে ব্যয় হয় এক যুগ ধরে। তিনি এটা রোধ করতে পারেন নি। এটাই তার অমার্জনীয় ব্যর্থতা।
রাষ্ট্রের রেভিনিউ বাজেটের টাকায় সেনাবাহিনী পালতে হয়। এর জন্য কোন বিদেশি সাহায্য ও ঋণ পাওয়া যায় না। সেনা বাহিনীকে সিভিল সরকারের আওতায় মোতায়েন করা হলে, তারা এ সংক্রান্ত SOP মানতে বাধ্য। কিন্তু, গত আগস্টে তারা খোলাখুলি জঙ্গিদের পক্ষে লড়েছে। সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসাররা জঙ্গিদের গাইড করে সরকার উচ্ছেদ করে। এটা গোপন কিছু নয়। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাক। আইজি প্রিজন একজন সেনা কর্মকর্তা। নরসিংদী জেলে কেনো তিনি সকল জ'ঙ্গিকে একত্রে রেখেছেন। জেল ভেঙ্গে এ জ'ঙ্গিরা পলায়ন করার পর তিনি কি ব্যবস্থা নিয়েছেন? না; তিনি কোন ব্যবস্থা নেননি। বিজিবির সকল কমান্ড পোস্টে সেনা অফিসার। জ'ঙ্গি ইউনুস ক্ষমতা দখলের পর ০২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ডুকে যায়। তারা কি ব্যবস্থা নিয়েছে? কোথায় তাদের পেশাদারিত্ব? তারা গোপাালগঞ্জে গুলি ছুড়ল – এর কি কোন নির্বাহী তদন্ত হয়েছে? প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন একটি Key Point Installation (KPI)। এর নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর। আরো স্পেসিফিক বললে পিজিআর এর। কিন্তু, তারা তা না করে জ'ঙ্গিদের কাছে তা উন্মুক্ত করে দেয়। সেনাবাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতায় হাজার হাজার পুলিশ করুন মৃত্যুবরণ করে। আর আমরা দেখলাম মাঠ পর্যায়ের সেনা অফিসাররা জামাতের জ'ঙ্গিদের ফুল দিচ্ছে, মিষ্টি খাচ্ছে! বর্তমানে তারা দীর্ঘসময় মাঠ পর্যায়ে ম্যজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ আছে। অথচ, হাজার হাজার মানুষ, যারা অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য প্রতিদিন খুন হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থান পর্যন্ত পুড়িয়ে দিচ্ছে। এতে 'দেশপ্রেমিক' সেনাবাহিনী সহায়তাই করছে। এই তালিকা অনেক লম্বা। যতদিন পরেই হোক, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি দেশ চালাবে। পাই পাই করে হিসাব দিতে হবে। আর এ ধরনের একটি জ'ঙ্গি ও দানবীয় সেনাবাহিনীকে বাড়তে দেয়ার দায় যাদের আছে তাদের ও দেশের জনগনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে অবশ্যই।
আরো অনেক বড় আলোচনা করা যায়। এখন আপনারা বলুন এরা কি কোনভাবে পেশাদার? এরা কি দেশপ্রেমিক? পরিবার পরিজনকে এরা কীভাবে মুখ দেখায়?
20251218