01/12/2025
মনভোলানো এক দিনের গল্প
সুশান্ত রায়
সেদিন সকালটা যেন অন্য রকম ছিল। ভেতরে একটা অজানা শূন্যতা—কেবলই মনে হচ্ছিল, কোথাও যেন কিছুই ঠিক নেই। চারপাশে এত মানুষের ভিড়, ব্যস্ত রুটিন… তবুও মনে হচ্ছিল আমি নিজের ভেতরেই হারিয়ে যাচ্ছি।
সবাইকে এড়িয়ে বিকেলের দিকে চুপচাপ বেরিয়ে পড়লাম। ভাবলাম, দাদার বাড়িতে গেলে হয়তো একটু হালকা লাগবে। সূর্য্য প্রায় ডুবে গেলো আমি পৌঁছে গেলাম দাদার বাড়ি।
গিয়ে বসতেই ভাইজি চা এনে দিল। চায়ের গরম ধোঁয়াটাও যেন মনকে একটু নরম করছিল। চা শেষ হতেই দাদা বলল,
“চল, নদীতে মাছ ধরতে যাই!”
বৌদি হেসে বলল, “দেখবি, আজ একটু হলেও মনটা ভালো হবে।”
তিনজন মিলে নদীর ধারে পৌঁছলাম। নিস্তব্ধ নদীর বুক ভেঙে জাল বসাতেই এক-একটা করে মাছ উঠে আসতে লাগল। কতক্ষণ যে সেই খেলায় মেতে ছিলাম, বুঝতেই পারিনি। মনে হচ্ছিল, সারারাত নদীর পাড়েই বসে থাকি। কিন্তু চারদিকে অন্ধকার ঘনিয়ে এলে বৌদি ফিসফিস করে বলল,
“চল এবার, রাতের জঙ্গল যে সবসময় আপন নয়… হাতি-বাঘের আনাগোনা আশেপাশে।”নিঃশব্দ নদীর পাড়ে সত্যিই তখন একটা ভয় ভাসছিল। তাই দ্রুত বাড়ি ফিরে এলাম। আর নিয়ে আসলাম টাটকা মাছ।
পরদিন সকালটা ছিল একেবারে অন্যরকম। সূর্যের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ছিল। ছোট্ট ভাইজিদের হাত ধরে রওনা দিলাম চা-বাগানের দিকে। বাগানের সবুজ সমুদ্রের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চা ফুল তুললাম। সেই হাসিমুখগুলো দেখে মনে হচ্ছিল, যেন প্রকৃতি আমাদের খেয়াল রাখছে।
বাড়ি ফিরতেই বৌদি বলল,
“আজ যেহেতু তুই এসেছিস, চল নদীর ডোবাগুলোতে জল ছেকে মাছ ধরি!”
আমরা আবার ছুটলাম নদীর দিকে। ঠাণ্ডা জলে পা ডুবিয়ে ডোবার জল ছেকে ছেকে উঠিয়ে আনলাম টাটকা মাছ।
তুলে নিলাম নদীর ধারে জন্মানো হেলেঞ্চা আর কলমিশাক।
দুপুরে ফিরে আমি নিজেই মাটির উনুনে ভাত বসালাম। ছোট মাছ দিয়ে মজাদার চর্চরি হলো, আর বড়ো মাছ আলু-ফুলকপি দিয়ে ঝোল। চা ফুলের বড়া, হেলেঞ্চা শাকের ভাজা, আলু দিয়ে কলমি শাক—সব মিলিয়ে যেন একটা ঘরোয়া ছোট্ট পিকনিকই হয়ে গেল।
দাদা-বৌদির ভালবাসা, ভাইজিদের দৌড়াদৌড়ি—সব মিলে যেন মেঘলা মন পুরোপুরি সরে গেল।
বিকেল শেষে যখন সূর্য আড়ালে নামতে শুরু করল, আকাশটা কমলা রঙে রাঙিয়ে উঠল। সেই আলোতে বাড়ির দিকে ধীরে ধীরে বাইক স্টার্ট দিলাম ।
কখনো কখনো সুখ খুঁজে পাওয়া যায় খুব সামান্য কিছুতে… একটু পথ হাঁটলে, একটু নদীর গন্ধে, আর আপনজনের স্নিগ্ধ ছোঁয়ায়।
এইভাবেই এক বিষণ্ন দিনের ভেতর লুকিয়ে ছিল এক টুকরো সুন্দর স্মৃতি।
30/11/2025