Basu Continuum

Basu Continuum Basu Continuum

লাল বলের প্রতিধ্বনি: ভালোবাসা ও হারানোর এক ভৌতিক কাহিনিরাজরতন বসু২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি আমেরিকার এক ঝকঝকে শনি...
19/07/2026

লাল বলের প্রতিধ্বনি: ভালোবাসা ও হারানোর এক ভৌতিক কাহিনি

রাজরতন বসু

২০২৪ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি আমেরিকার এক ঝকঝকে শনিবার। বাতাসে হালকা ঠান্ডা, রোদে শরতের নরম সোনা, আর আমাদের কলাম্বিয়া, মেরিল্যান্ডের বাড়িটা তখন দশমীর আনন্দে গমগম করছে। দুর্গাপুজোর শেষ দিন—বিদায়ের মনখারাপ আর উৎসবের উষ্ণতা যেন পাশাপাশি বসে আছে।

ঝিলিক আর আমি অনেক দিন ধরেই ঠিক করেছিলাম, এ বছর বাড়িতে কাছের বন্ধুদের নিয়ে দশমী উদ্‌যাপন করব। শুধু আড্ডা দেওয়া বা একসঙ্গে খাওয়াদাওয়ার জন্য নয়—দেশ থেকে এত দূরে থেকেও আমাদের ছেলেমেয়েদের কাছে বাঙালিয়ানার রং, গন্ধ আর আবেগটুকু বাঁচিয়ে রাখার জন্য। আমাদের চার বছরের আদি আর দু’বছরের অভি অবশ্য সংস্কৃতি রক্ষার এত বড় উদ্দেশ্য বুঝত না; ওদের কাছে দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বন্ধুদের সঙ্গে বাধাহীন দৌড়ঝাঁপ।

সেদিন আমাদের সঙ্গে উৎসব ভাগ করে নিতে এসেছিল আরও তিনটি পরিবার। অর্ণব আর দেবারতির সঙ্গে তাদের চার বছরের চঞ্চল মেয়ে অহনা; সমীর আর অর্পিতার সঙ্গে পাঁচ বছরের আকাশ ও তিন বছরের অনিক; আর প্রণব ও বনলীর সঙ্গে তাদের তিন বছরের মেয়ে ঈশানী। সব মিলিয়ে ছ’টি বাচ্চা—একসঙ্গে হলেই যেন বাড়ির ভিতর ছোটখাটো ঝড় বয়ে যেত।

দুপুরের খাওয়া শেষ হওয়ার পরও ঘরের মধ্যে মাছের কালিয়া, মাংস, ভাত আর মিষ্টির গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছিল। বাচ্চারা আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে সিঁড়ি বেয়ে বেসমেন্টে নেমে গেল। একটু পরেই নিচ থেকে ওদের হাসি, চিৎকার আর দৌড়ঝাঁপের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। কল্পনার রাজ্যে কখনও ওরা জলদস্যু, কখনও সুপারহিরো, কখনও বা অজানা গ্রহের অভিযাত্রী।

উপরে আমরা বড়রা গরম চায়ের কাপ হাতে গোল হয়ে বসেছিলাম। গল্প, খুনসুটি, পুরনো স্মৃতি—সব মিলিয়ে একেবারে নির্ভার বিকেল। কথায় কথায় সমীর বলল, ‘এ বছর ফল কালারটা একটু দেরিতে আসছে। এখনও পিক হয়নি। তবে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে রংটা দারুণ হবে।’

আমেরিকায় অক্টোবরে গাছের পাতাগুলো সবুজ থেকে লাল, কমলা আর সোনালি রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। এই কয়েক সপ্তাহের অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে পরিবার-পরিজন মিলে কাছাকাছি পাহাড়, জঙ্গল বা লেকের ধারে বেড়াতে যাওয়াকে এখানে "ফল ট্রিপ" বলা হয়।

সমীরের কথায় ঝিলিকের চোখ সঙ্গে সঙ্গে চকচক করে উঠল। ‘তা হলে একটা ফল ট্রিপ করলে কেমন হয়?’

ব্যস, কথাটা পড়তেই সবাই যেন অপেক্ষা করছিল। কেউ বলল শেনানডোয়া, কেউ হার্পার্স ফেরি, কেউ আবার পেনসিলভেনিয়ার কথা তুলল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই নানা জায়গার নাম মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠতে লাগল। শেষ পর্যন্ত সবার মন গিয়ে থামল ডিপ ক্রিক লেকে। পাহাড়, জঙ্গল, জল আর শরতের রং—সব এক জায়গায়।
তারপর শুরু হল বাড়ি খোঁজা। কেউ ফোনে, কেউ ল্যাপটপে। আধঘণ্টার মধ্যেই আমরা যেন গুপ্তধন পেয়ে গেলাম—লেকের একেবারে ধারে বিশাল একটি ভ্যাকেশন হাউস। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, বাড়ির পিছনে কাঠের ডেক, সেখান থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে জলের কাছে। চারটি বড় বেডরুম, বিশাল বেসমেন্ট, বাচ্চাদের খেলার জায়গা—সব মিলিয়ে যেন আমাদের জন্যই বানানো। আর দেরি করিনি। তখনই বুক করে ফেললাম অক্টোবরের শেষ সপ্তাহান্তের জন্য। শুক্রবার সন্ধ্যায় রওনা, রবিবার রাতে ফেরা—দু’দিন শুধু বন্ধু, প্রকৃতি আর আনন্দ।

তখনও আমরা কেউ জানতাম না, সেই বাড়িটিই আমাদের জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত রাতের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

• • •

পরের দু’সপ্তাহ যেন চোখের পলকে কেটে গেল। কে কী খাবার আনবে, কোথায় ঘুরতে যাওয়া হবে, বাচ্চাদের জন্য কী নিতে হবে—হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পরিকল্পনার শেষ ছিল না। অবশেষে এল সেই শুক্রবার। আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটু আগেই ফিরলাম। বিকেল পাঁচটার মধ্যে জামাকাপড়, খাবারের বাক্স, বাচ্চাদের খেলনা আর নানারকম প্রয়োজনীয় জিনিসে গাড়ির ট্রাঙ্ক ভর্তি।

আদি আর অভির উত্তেজনা সামলানো দায়। গাড়িতে ওঠার আগেই অন্তত দশবার জিজ্ঞেস করেছে, ‘আকাশরা পৌঁছে গেছে?’ ‘অহনা কি আমাদের ঘরে থাকবে?’ ‘ইয়টে উঠব তো?’ ওদের কাছে ডিপ ক্রিকের সৌন্দর্যের চেয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দু’টো রাত কাটানোই ছিল বড় অ্যাডভেঞ্চার।

প্রত্যেক পরিবার এমনভাবে রান্না করে খাবার নিয়ে যাচ্ছিল, যাতে সেখানে গিয়ে বেশি সময় রান্নাঘরে কাটাতে না হয়। আমাদের লক্ষ্য ছিল পরিষ্কার—কম রান্না, বেশি ঘোরাঘুরি, আর যতটা সম্ভব একসঙ্গে সময় কাটানো।
সূর্য নামতে শুরু করার সময় আমরা কলাম্বিয়া ছাড়লাম। সামনে প্রায় আড়াই ঘণ্টার পথ। সন্ধে গাঢ় হতে হতে হাইওয়ের দু’পাশ অন্ধকার হয়ে এল। মাঝপথে দু’-একবার খাবার আর কফির জন্য থামায় পৌঁছতে একটু দেরি হল। রাত আটটার কিছু পরে যখন আমাদের গাড়ির হেডলাইট অন্ধকার চিরে বাড়িটার সামনে এসে পড়ল, তখন অন্য তিনটি গাড়ি ইতিমধ্যেই ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে। বাড়ির ভিতর থেকে হাসির শব্দ বাইরে পর্যন্ত ভেসে আসছিল।

দরজা খুলতেই সবাই হইহই করে আমাদের স্বাগত জানাল। ছ’টি বাচ্চা একে অপরকে খুঁজে পেল যেন বহুদিন পরে দেখা হয়েছে—চিৎকার, লাফালাফি, জড়িয়ে ধরা; মুহূর্তে বাড়িটা জীবন্ত হয়ে উঠল।

বাড়িটা ছবির থেকেও বেশি সুন্দর। মেন লেভেলে বিশাল লিভিং এরিয়া, আর তার সঙ্গে খোলা রান্নাঘর—যেখানে রান্না করতে করতেও সবাই মিলে গল্প করা যায়। উপরে চারটি বড় বেডরুম, প্রত্যেকটির সঙ্গে আলাদা বাথরুম। চারটি পরিবারের জন্য একেবারে নিখুঁত ব্যবস্থা।

তবে বাড়ির আসল আকর্ষণ ছিল বেসমেন্ট। টেবিল টেনিস, পুল টেবিল, নানা ইনডোর গেম, আর একপাশে বাচ্চাদের আলাদা খেলার জায়গা। বেসমেন্টের শেষ প্রান্তে ছিল মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বড় স্লাইডিং কাচের দরজা। তার ওপারেই প্রশস্ত কাঠের ডেক। ডেকের সিঁড়ি নেমে গেছে সরাসরি ডিপ ক্রিক লেকের দিকে।

বাইরে তখন রাত। তবু বাড়ির আলোয় লেকের কালো জল চিকচিক করছিল। দূরের গাছগুলোর লাল, কমলা আর সোনালি পাতা অন্ধকারের মধ্যেও যেন জ্বলছিল। দৃশ্যটা এত সুন্দর ছিল যে চোখ সরাতে ইচ্ছে করছিল না। অথচ, সেই কাচের দরজার দিকে তাকিয়ে কেন জানি না, আমার মনে হয়েছিল—ওপাশের অন্ধকারটা একটু বেশিই ঘন।

রাত সাড়ে ন’টার দিকে সবাই বড় ডাইনিং টেবিল ঘিরে বসে পড়লাম। ভাত, মাছের কালিয়া আর বাঙালি কায়দায় রান্না করা খাসির মাংস—শীতল পাহাড়ি রাতে খাবারটা যেন আরও সুস্বাদু লাগছিল। খাওয়ার পর বাচ্চাদের আর বেশি সময় জেগে থাকার শক্তি রইল না। একে একে সবাই বিছানায় ঢলে পড়ল।

আমরা বড়রা আরও কিছুক্ষণ গল্প করলাম, পরের দিনের পরিকল্পনা ঠিক করলাম। হাসির শব্দে বাড়ি ভরে ছিল। রাত প্রায় বারোটার সময় ক্লান্তি আমাদেরও ঘরে পাঠিয়ে দিল। প্রথম রাতটা শান্তিতেই কেটে গেল।

• • •

পরের সকালটা ছিল একেবারে ছবির মতো। জানলার বাইরে ঝকঝকে আকাশ, বাতাসে কনকনে ঠান্ডার ছোঁয়া, আর রান্নাঘর জুড়ে ফুলকো লুচি ও আলুভাজার গন্ধ। পেট ভরে প্রাতরাশ করে সকাল দশটার মধ্যে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। প্রথম গন্তব্য—সোয়ালো ফলস স্টেট পার্ক।

পাহাড় আর জঙ্গলের কোলে সেই পার্ক যেন অন্য এক জগৎ। ইউগিওগেনি নদী পাথুরে গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে, কখনও শান্ত, কখনও সাদা ফেনায় উন্মত্ত। মাডি ক্রিক ফলসের কাছে পৌঁছতেই দূর থেকে গর্জন শুনতে পেলাম। বিশাল জলরাশি পাথরের গায়ে আছড়ে পড়ছে—শব্দে মনে হচ্ছিল পাহাড়ের বুক কেঁপে উঠছে।
চারদিকে উঁচু হেমলক গাছ। ওদের কালচে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে শরতের লাল-কমলা রং আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। বনপথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, গাছগুলো যেন বহু পুরনো কোনও রহস্য নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলছে। বাচ্চারা সামনে ছুটছে, আমরা বারবার থেমে ছবি তুলছি। সেই সৌন্দর্য ভাষায় বোঝানো কঠিন।
দুপুর দেড়টা নাগাদ আমরা একটি স্থানীয় রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। এতক্ষণ হাঁটার পর সবাই ভীষণ ক্ষুধার্ত। টেবিল ভরে গেল বাফেলো চিকেন, লেমন পেপার চিকেন, মাশরুম মেডলি আর পেস্টো-প্রোশুটোতে। বাচ্চাদের সামনে চিকেন নাগেটস, হট ডগ আর ম্যাক অ্যান্ড চিজ পড়তেই ওদের আর কথা নেই—শুধু খাওয়া।

বিকেলের পরিকল্পনাটা ছিল আরও রোমাঞ্চকর। আমরা তিন ঘণ্টার জন্য পনেরো জনের একটি ইয়ট ভাড়া করেছিলাম। ইয়টটি যখন ধীরে ধীরে লেকের শান্ত জলের উপর দিয়ে এগোতে শুরু করল, মনে হল পৃথিবী যেন একটু থেমে গেছে। দু’পাশের পাহাড় আর গাছের আগুনরঙা ছায়া জলের আয়নায় কাঁপছিল।

ছ’টি বাচ্চা ইয়টটাকে নিজেদের খেলাঘর বানিয়ে ফেলল। কেউ খেলনা গাড়ি নিয়ে ছুটছে, কেউ ডেকের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দৌড়চ্ছে, কেউ হাওয়ার দিকে মুখ তুলে চেঁচাচ্ছে। আমরা আটজন বড়রা ঠান্ডা বাতাস গায়ে মেখে গল্প, হাসি আর সেই দৃশ্যের মধ্যে ডুবে ছিলাম। চারপাশে এত আলো, এত রং, এত আনন্দ—সেই মুহূর্তে কে ভাবতে পেরেছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই একই লেক আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অন্য এক অর্থ নিয়ে ফিরে আসবে?

সন্ধে ছ’টা নাগাদ বাড়িতে ফিরলাম। সারাদিনের ঘোরাঘুরিতে ক্লান্ত, কিন্তু মন ভরা। হালকা স্ন্যাকস খেয়ে বাচ্চারা আবার বেসমেন্টে নেমে গেল। ওদের শক্তি যেন শেষই হয় না। আমরা লিভিং রুমে বসে সারাদিনের ছবি আর ভিডিও একে অপরকে দেখাচ্ছিলাম। বাইরে ধীরে ধীরে রাত নামছিল। জানলার ওপারে শরতের শেষ আলো মুছে গিয়ে লেকটা আবার কালো হয়ে উঠছিল।

বেসমেন্ট থেকে ভেসে আসা বাচ্চাদের হাসি তখন আমাদের সন্ধের আরামদায়ক পটভূমির মতো। তাই প্রায় আধঘণ্টা পরে যখন আদি আর আকাশ দৌড়ে লিভিং রুমে এসে দাঁড়াল, প্রথম কয়েক সেকেন্ড আমরা বুঝতেই পারিনি কী হয়েছে।

দু’জনের মুখ ফ্যাকাশে। চোখ দুটো ভয়ে বড় বড়। আকাশ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘ডেভিড বাইরে চলে গেছে!’
আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম, ‘ডেভিড? ডেভিড কে?’
আকাশ কাঁপা গলায় বলল, ‘ওই লাল বলটা নিয়ে... স্লাইডিং ডোরের মধ্যে দিয়ে চলে গেল!’

কথাটা শুনেই আমার পিঠ বেয়ে ঠান্ডা একটা স্রোত নেমে গেল। আমরা কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই অর্ণব উঠে প্রায় ছুটে বেসমেন্টের দিকে নামল। বাকিরাও তার পিছনে। সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ নামার সঙ্গে সঙ্গে বুকের ভিতর অস্বস্তিটা যেন বাড়ছিল।

নিচে পৌঁছে দেখি, অভি, অহনা, অনিক আর ঈশানী কাচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। কেউ কথা বলছে না। চারটি ছোট মুখে অদ্ভুত এক স্তব্ধতা।

আমি এগিয়ে গিয়ে দরজাটা পরীক্ষা করলাম। দরজা বন্ধ। শুধু বন্ধ নয়—ভিতর থেকে লক করা। কাচ অক্ষত। কোথাও ফাঁক নেই, কোনও ভাঙা অংশ নেই। এমনকি দরজার সামনে রাখা ছোট ম্যাটটাও নড়েনি।
অর্পিতা আকাশের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। খুব নরম গলায় বলল, ‘কী হয়েছে, বাবা? ডেভিড কে?’

ছ’জনের মধ্যে আকাশই সবচেয়ে বড়। সে একবার আদির দিকে তাকাল। আদি দ্রুত মাথা নাড়ল, যেন তাকে বলতে সাহস দিচ্ছে। তারপর ভাঙা ভাঙা বাক্যে যা বলল, আমরা প্রথমে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

ওরা যখন খেলছিল, তখন হঠাৎ আরও একটি ছেলে সেখানে এসে দাঁড়ায়। কেউ তাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেনি। কেউ দরজা খুলতে শোনেনি। ছেলেটি নিজেই বলেছিল, তার নাম ডেভিড। তার হাতে ছিল একটি উজ্জ্বল লাল বল।

ডেভিড নাকি খুব স্বাভাবিকভাবেই ওদের খেলায় যোগ দিয়েছিল। বলটা কখনও আকাশকে, কখনও আদিকে, কখনও অন্যদের ছুড়ে দিচ্ছিল। সবাই মিলে হাসতে হাসতে বল কিক করছিল, ধরছিল, আবার ছুড়ছিল। যেন সে ওদের বহুদিনের চেনা বন্ধু।

একসময় ডেভিড বলটাকে জোরে কিক করে স্লাইডিং কাচের দরজার দিকে পাঠায়। বলটা কাচে লেগে ফিরে আসার কথা। কিন্তু তা হয়নি। ছ’টি শিশুর চোখের সামনে লাল বলটা কোনও বাধাই নেই এমনভাবে কাচের মধ্যে দিয়ে চলে যায়।

তারপর ডেভিড এক মুহূর্তও থামেনি। বলের পিছনে দৌড়ে সে-ও সোজা বন্ধ কাচের দরজার মধ্যে দিয়ে চলে যায়—আর ওপাশের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

আকাশ আর আদি নাকি সঙ্গে সঙ্গে তার পিছনে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু দরজার হাতল টানতেই বোঝে, দরজাটা লক করা। তখনই ভয় পেয়ে ওরা আমাদের ডাকতে দৌড়ে আসে।

আকাশের প্রতিটি কথা আমার যুক্তিবোধকে ধাক্কা দিচ্ছিল। মন বলছিল, বাচ্চারা নিশ্চয়ই কোনও খেলা বানিয়েছে, অথবা আলো-ছায়ায় ভুল দেখেছে। কিন্তু ওদের চোখে যে আতঙ্ক ছিল, সেটা অভিনয় নয়। আদি বারবার একই কথা বলছে। বাকি চারজনও চুপচাপ মাথা নাড়ছে।
আমরা এখনও ঠিক করতেই পারিনি—ওদের কথা মানবে, না বোঝাবে যে এমন কিছু হওয়া সম্ভব নয়—ঠিক তখনই অসম্ভবটা আমাদের নিজেদের চোখের সামনে ঘটল।

সিঁড়ির উপর থেকে হঠাৎ দ্রুত পায়ের শব্দ নেমে আসতে লাগল। ধাপ... ধাপ... ধাপ... যেন কেউ প্রাণপণে ছুটে আসছে। সেই সঙ্গে এক মহিলার গলা—আতঙ্কে ভাঙা, অসহায়, মরিয়া।
‘ডেভিড! ডেভিড!’
আমরা একসঙ্গে ঘুরে তাকালাম।
একজন অচেনা মহিলা সিঁড়ি বেয়ে ঝড়ের বেগে নিচে নেমে এলেন। চুল এলোমেলো, চোখে উন্মত্ত আতঙ্ক। তিনি আমাদের কারও দিকে তাকালেন না, এক মুহূর্ত থামলেন না। যেন এই ঘরে আমরা কেউ নেই। যেন তাঁর সামনে শুধু একটাই লক্ষ্য—কাচের দরজার ওপারে হারিয়ে যাওয়া কাউকে খুঁজে পাওয়া।
তিনি আবার চিৎকার করলেন, ‘ডেভিড!’
তারপর সোজা বন্ধ স্লাইডিং দরজার দিকে ছুটে গেলেন।
আমরা প্রত্যেকে স্পষ্ট দেখেছি—দরজাটা তখনও বন্ধ, তখনও লক করা। তবু মহিলা গতি কমালেন না। তাঁর শরীর কাচে ধাক্কা খেল না। কাচ ভাঙল না। তিনি কেবল কাচের মধ্যে দিয়ে চলে গেলেন—যেন দরজাটা ছিল কুয়াশার তৈরি। আর পরের মুহূর্তেই লেকের দিকের ঘন অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।

ঘরের মধ্যে একসঙ্গে কয়েকটি চাপা আর্তনাদ উঠল। ঝিলিক আমার হাত এমন জোরে চেপে ধরল যে নখের চাপ অনুভব করলাম। কেউ পিছিয়ে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল, কেউ বাচ্চাদের টেনে বুকে জড়িয়ে নিল। আমার নিজের হাতও কাঁপছিল। মুখ শুকিয়ে কাঠ।

কয়েক মুহূর্ত কারও মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না। শুধু আমাদের দ্রুত, অগভীর শ্বাসের শব্দ আর বাইরে বাতাসে শুকনো পাতার খসখসানি।
ঝিলিক প্রায় ফিসফিস করে বলল, ‘এইমাত্র... কী হল?’
আমি উত্তর দিতে গিয়েও থেমে গেলাম। ‘আমি... আমি জানি না। আমাদের কাউকে ফোন করতে হবে।’
সমীর কাঁপা হাতে ফোন বের করে রেন্টাল এজেন্সির নম্বরে কল করল। যতটা সম্ভব শান্ত আর যুক্তিসঙ্গতভাবে পুরো ঘটনাটা বোঝানোর চেষ্টা করল। ওপাশের মহিলা প্রথমে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘আমি বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে আপনাদের জানাচ্ছি।’
পরের পনেরো মিনিট যেন পনেরো ঘণ্টা। আমরা কেউ আর বেসমেন্টে থাকতে চাইনি। বাচ্চাদের নিয়ে সবাই উপরে উঠে এলাম। কেউ একা কোনও ঘরে গেল না। লিভিং রুমের সব আলো জ্বালিয়ে আমরা একসঙ্গে বসে রইলাম।

পনেরো মিনিট পরে সমীরের ফোন বেজে উঠতেই সবাই চমকে উঠল। এজেন্সির অপারেটর জানালেন, তিনি বাড়ির মালিককে সঙ্গে নিয়ে আসছেন। আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন।

অপেক্ষার সেই আধঘণ্টা আমার জীবনের দীর্ঘতম সময়গুলোর একটি। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে বাড়ি হাসি, গান আর আনন্দে ভরা ছিল, এখন সেটাই যেন অচেনা। কাঠের মেঝের সামান্য কড়কড় শব্দে আমরা তাকিয়ে উঠছি। বাইরে ডালে বাতাস লাগার শব্দেও মনে হচ্ছে কেউ বাড়ির চারপাশে হাঁটছে।

ইয়টের হাসি, লেকের রং, দিনের ছবি—সব যেন বহু পুরনো কোনও স্মৃতি। আমরা এক উৎসবমুখর ছুটি কাটাতে এসেছিলাম। অথচ রাত নামতেই যেন বাড়িটির অন্য একটি দরজা খুলে গেছে—যে দরজা দিয়ে যুক্তি প্রবেশ করতে পারে না।

• • •

প্রায় আধঘণ্টা পরে দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল। সমীর দরজা খুলতেই এক মহিলা আর এক মধ্যবয়স্ক পুরুষকে দেখা গেল। মহিলার নাম শেলি—রেন্টাল এজেন্সির অপারেটর। পুরুষটির নাম রোনাল্ড—এই বাড়ির মালিক।

পরিচয়পর্ব শেষ করে সবাই লিভিং রুমে বসলাম। আমরা একে একে সব বললাম। ডেভিড নামের অচেনা ছেলেটি, তার লাল বল, বন্ধ কাচের দরজার ভিতর দিয়ে চলে যাওয়া, তারপর সেই অজানা মহিলার আর্তনাদ করে ছুটে এসে একইভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া—একটি কথাও বাদ দিলাম না।

রোনাল্ড প্রথমে নিঃশব্দে শুনছিলেন। তাঁর মুখে কোনও ভাব ছিল না। কিন্তু আমাদের বর্ণনা যত এগোল, তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের কোণে জল জমতে শুরু করল। শেষ পর্যন্ত তিনি মুখ ঘুরিয়ে হাতের পিঠ দিয়ে চোখ মুছলেন। সেই প্রতিক্রিয়া আমরা কেউই আশা করিনি।

কিছুক্ষণ পরে তিনি ভারী গলায় বললেন, ‘আমি তোমাদের একটা জিনিস দেখাতে চাই।’ তিনি ফোন বের করে আকাশ আর আদিকে কাছে ডাকলেন। গ্যালারিতে কিছু ছবি স্ক্রল করে একটি ছবিতে থামলেন। তারপর ফোনের পর্দা ওদের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। দু’জনের প্রতিক্রিয়া ছিল তৎক্ষণাৎ। আকাশ প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘এই তো! এটাই ডেভিড!’ আদি উত্তেজিত হয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, ‘হ্যাঁ! ও-ই আমাদের সঙ্গে বল খেলছিল!’

ওদের কণ্ঠে ছিল পরিচিত কাউকে আবার দেখে ফেলার নিষ্পাপ আনন্দ। কিন্তু ঘরের বড়দের শরীরের মধ্যে দিয়ে একই সঙ্গে যেন বরফের স্রোত বয়ে গেল।

ঝিলিক নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা নিশ্চিত?’
আকাশ আর আদি একসঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ!’

রোনাল্ড ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আরেকটি ছবি খুললেন। ছবিতে এক মহিলা—মুখে নরম হাসি, চোখে মায়া।
আমাদের বুকের ভিতরটা একসঙ্গে ধক করে উঠল। তাঁকে চিনতে আমাদের এক মুহূর্তও লাগেনি। ঘণ্টাখানেক আগে সেই মুখই আমরা বেসমেন্টে দেখেছি—শুধু ছবির শান্ত চোখের জায়গায় তখন ছিল উন্মত্ত আতঙ্ক।

রোনাল্ডের গলা কেঁপে উঠল। ‘ওর নাম ডেবি। আমার স্ত্রী।’
ঘরের নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে এল। আমরা কেউ নড়লাম না। রোনাল্ড গভীর শ্বাস নিলেন, যেন বহুদিন বন্ধ থাকা একটি দরজা খুলতে নিজেকে প্রস্তুত করছেন। তারপর তিনি তাঁর গল্প বলতে শুরু করলেন।

‘২০১৮ সালে ডেবি আর আমি এই বাড়িটা কিনেছিলাম। মূলত ভ্যাকেশন রেন্টাল হিসেবে ব্যবহার করব ভেবেছিলাম। তবে নিজেরাও মাঝে মাঝে এসে থাকব—বিশেষ করে শরতে। আমাদের ছেলে ডেভিডের তখন পাঁচ বছর বয়স। ভীষণ প্রাণবন্ত ছেলে। এই বাড়িটা প্রথম দেখাতেই ওর খুব ভালো লেগেছিল।’

রোনাল্ড একটু থামলেন। তাঁর চোখ ফোনের পর্দায় স্থির। ‘ডেভিডের সবচেয়ে প্রিয় খেলনা ছিল একটা লাল বল। ও প্রায় সব জায়গায় বলটা সঙ্গে নিয়ে যেত।’
শেলি নিঃশব্দে তাঁর কাঁধে হাত রাখলেন। রোনাল্ড আবার বলতে শুরু করলেন।

‘সেই বছরও শরতের রং দেরিতে এসেছিল। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহান্ত—ঠিক এই সময়। ডেবি আর ডেভিড কয়েক সপ্তাহের জন্য এখানে ছিল। আমাকে ব্যবসার কাজে বাইরে থাকতে হয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যায় ডেবি রান্নাঘরে রাতের খাবার তৈরি করছিল, আর ডেভিড বেসমেন্টে খেলছিল।’ পরের কথাগুলো বলতে যেন তাঁর কষ্ট হচ্ছিল।

‘রান্না করতে করতে ডেবি হঠাৎ জানলা দিয়ে বাইরে তাকায়। রান্নাঘরের জানলা থেকে বাড়ির পিছনের ডেক আর লেকের ধারের অনেকটা দেখা যায়। সে দেখে—ডেভিড লেকের খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে তার লাল বল।’

রোনাল্ডের গলা ভেঙে গেল। ‘ডেবি বুঝতে পারেনি, ও কীভাবে বেসমেন্টের দরজা খুলল। সে সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে ডেভিডের নাম ধরে ডাকে, তারপর দৌড়ে বেসমেন্টে নেমে যায়। স্লাইডিং দরজা পেরিয়ে ডেকের সিঁড়ি দিয়ে লেকের দিকে ছুটে যায়।’

আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিলাম। রোনাল্ড যেন আমাদের সামনে বসে নেই—ছ’বছর আগের সেই সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে গেছেন।
‘ডেবি যখন জলের কাছে পৌঁছয়, তখন ডেভিড কোথাও নেই। শুধু লাল বলটা জলের উপর ভাসছে।’

কথাটা বলেই তিনি চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর মুখে এমন যন্ত্রণা ফুটে উঠল যে আমাদের কারও তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল।
‘ডেবি সঙ্গে সঙ্গে নাইন-ওয়ান-ওয়ানে ফোন করে, আমাকেও জানায়। ও সাঁতার জানত। সাহায্য আসার অপেক্ষা না করে জলে ঝাঁপ দেয়। বারবার ডুব দিয়ে ডেভিডকে খুঁজতে থাকে... যতক্ষণ না পুলিশ আর উদ্ধারকারী দল পৌঁছয়।’

রোনাল্ডের চোখ থেকে এবার আর জল থামল না। ‘দু’ঘণ্টা পরে তারা ডেভিডকে খুঁজে পায়। কিন্তু ততক্ষণে... অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
ঘরে তখন শুধু তাঁর অসমান শ্বাসের শব্দ। বাচ্চারাও অস্বাভাবিকভাবে চুপ। যেন ওরাও বুঝতে পারছে, গল্পটা শুধু ভয়ের নয়—অসহ্য দুঃখের।
রোনাল্ড বললেন, ‘ডেবি নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারেনি। বারবার বলত, সে যদি একটু আগে জানলার দিকে তাকাত... যদি ডেভিডকে বেসমেন্টে একা না রাখত... যদি আরও দ্রুত ছুটতে পারত...’
তিনি মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, ‘ওর মন আর শরীর দুটোই ভেঙে পড়েছিল। চার মাস পরে আমি ডেবিকেও হারালাম।’

রোনাল্ডের গল্প আমাদের উপর যেন বিশাল ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল। দিনের আলোয় যে লেক আমাদের কাছে এত সুন্দর, এত শান্ত মনে হয়েছিল, তার গভীরে এমন একটি স্মৃতি লুকিয়ে আছে—ভাবতেই শরীর শিউরে উঠল।

শেলি নরম গলায় বললেন, ‘রোনাল্ড বাড়িটা এখনও রেখে দিয়েছে, কারণ ডেবি আর ডেভিডের সঙ্গে তার সবচেয়ে বেশি স্মৃতি এই বাড়িতেই। অন্য মানুষ এখানে এসে আনন্দ পায়—এই ভেবেই সে বাড়িটা ভাড়া দেয়।’
রোনাল্ড চোখ মুছে আমাদের দিকে তাকালেন। ‘আমি কখনও ভাবিনি...’ তিনি থামলেন। গলা আর বেরোতে চাইছে না। ‘আমি কখনও ভাবিনি, ওরা এখনও এখানে থাকতে পারে। কিন্তু তোমরা যা দেখেছ, তা যদি সত্যি হয়...’
তিনি ধীরে ধীরে বেসমেন্টের সিঁড়ির দিকে তাকালেন।
‘তা হলে হয়তো... ওরা এখনও যায়নি।’

কেউ কোনও উত্তর দিল না। ভয়ের জায়গায় তখন অন্য এক অনুভূতি এসে বসেছে—গভীর শোক, মায়া, আর এমন এক রহস্য যার কোনও সহজ ব্যাখ্যা নেই। বাড়িটি আর শুধু জঙ্গলের ধারে দাঁড়ানো সুন্দর ভ্যাকেশন হাউস নয়। যেন তার প্রতিটি দেওয়ালে জমে আছে এক শিশুর অসমাপ্ত খেলা, এক মায়ের শেষ ডাক, আর এক মানুষের এমন শোক—যাকে সময়ও মুছে দিতে পারেনি।

• • •

সেই রাতের ভার আমাদের প্রত্যেকের উপর নেমে এসেছিল। কেউ আর সেখানে দ্বিতীয় রাত কাটাতে পারল না। আমরা চার পরিবার একটু দূরে সরে নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কথা বললাম। সিদ্ধান্ত নিতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ভয় যতটা, তার চেয়েও বেশি ছিল অসহায় বিষণ্ণতা। সেই বাড়ির মধ্যে থেকে আনন্দ করা আর সম্ভব ছিল না।

আমরা রোনাল্ড আর শেলিকে জানালাম। শেলি দুঃখিত মুখে বললেন, ‘আমরা সত্যিই খুব দুঃখিত। চাইলে আজ রাতের জন্য আপনাদের অন্য একটি জায়গার ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’

কিন্তু আমরা না বললাম। অন্য কোনও বাড়িতে গেলেও এই রাতটা আমাদের ছেড়ে যেত না। আমরা শুধু বাড়ি ফিরতে চেয়েছিলাম। পরিচিত আলো, পরিচিত ঘর, নিজের বিছানা—সেই মুহূর্তে সেগুলোই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে হচ্ছিল।

পরের দু’ঘণ্টা আমরা প্রায় নিঃশব্দে জিনিসপত্র গুছোলাম। যে বাড়িতে আগের দিন ঢোকার সময় চিৎকার আর হাসিতে কান পাতা দায় ছিল, সেখান থেকে বেরোনোর সময় শুধু ব্যাগের চেন বন্ধ হওয়ার শব্দ, পায়ের আওয়াজ, আর মাঝেমধ্যে বাচ্চাদের চাপা প্রশ্ন শোনা যাচ্ছিল।
সবকিছু গাড়িতে তোলার পরে বাইরে এসে দেখি, রোনাল্ড এখনও পার্কিংয়ের ধারে একা দাঁড়িয়ে। বাড়ির ম্লান আলো পিছন থেকে পড়ে তাঁকে আরও নিঃসঙ্গ দেখাচ্ছিল। আমি ধীরে ধীরে তাঁর কাছে গেলাম। অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলাম—দুঃখিত, শক্ত থাকুন, আপনার কোনও দোষ ছিল না—কিন্তু কোনও কথাই যথেষ্ট মনে হল না।
আমি শুধু তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম।

রোনাল্ডও কিছু বললেন না। কয়েক মুহূর্ত আমরা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছু শোক আছে, যার সামনে ভাষা পরাজিত হয়।
আমি সরে এসে বললাম, ‘নিজের খেয়াল রাখবেন।’ কথাটা নিজের কাছেই ফাঁপা শোনাল।

গাড়ি চলতে শুরু করার পরে রিয়ারভিউ মিররে শেষবার বাড়িটার দিকে তাকালাম। দেখলাম, রোনাল্ড ধীরে ধীরে আবার বাড়ির দিকে হাঁটছেন। মাথা সামান্য নত, কাঁধে এমন এক ভার—যা ছ’বছরেও হালকা হয়নি।
আমরা কাছের একটি রেস্তোরাঁয় থেমে রাতের খাবার প্যাক করলাম। পার্কিং লটে দাঁড়িয়ে একে অপরকে ‘গুড নাইট’ আর ‘সেফ ড্রাইভ’ বললাম। সাধারণত এমন সময় আরও কিছুক্ষণ গল্প, হাসি, পরের ট্রিপের পরিকল্পনা চলত। সেদিন কেউ কথা বাড়াল না।

রাত তখন এগারোটা পেরিয়ে গেছে। গাড়িতে খাবার খেয়ে আদি আর অভি পিছনের সিটে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওদের মুখ শান্ত, যেন কয়েক ঘণ্টা আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার কোনও ছায়াই সেখানে নেই।

কলাম্বিয়ার দিকে ফেরার পথটা দীর্ঘ আর অস্বাভাবিকভাবে নীরব ছিল। ঝিলিক জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল। মাঝেমধ্যে রাস্তার আলো এসে তার মুখে পড়ছে, আবার সরে যাচ্ছে। আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম, কিন্তু মনের মধ্যে বারবার একই দৃশ্য ঘুরছিল—লাল বল, বন্ধ কাচের দরজা, অচেনা ছেলেটি, আর সেই মহিলার মরিয়া ডাক।

আমাদের বাচ্চাদের হাসির শব্দ কি ডেভিডকে ডেকে তুলেছিল? এত বছর পরে অন্য কয়েকটি শিশুকে খেলতে দেখে কি সে আবার নিজের অসমাপ্ত খেলায় ফিরে এসেছিল? সে কি জানেই না যে তার জীবনের সময় থেমে গেছে? সে কি এখনও বন্ধু খুঁজে বেড়ায়—কারও সঙ্গে লাল বলটা ভাগ করে নেওয়ার জন্য?

নাকি ডেবির আত্মা এখনও সেই বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়ায়? একই সন্ধ্যা, একই আতঙ্ক, একই দৌড়—বারবার পুনরাবৃত্তি করে? প্রতিবারই কি সে ভাবে, এবার হয়তো ছেলেকে সময়মতো ধরে ফেলবে? এবার হয়তো লেকের জলে লাল বলটা একা ভাসবে না?

একজন মায়ের ভালোবাসা কি মৃত্যুর পরেও থামে না? তাঁর সেই ছুটে যাওয়া কি শুধু স্মৃতির পুনরাবৃত্তি, নাকি এক অনন্ত প্রতিশ্রুতি—‘আমি খুঁজব, যতক্ষণ না তোমাকে পাই’?

আরও অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন মাথায় ঘুরছিল। বাড়িটা কি তাদের ধরে রেখেছে, না লেক? শরতের ওই শেষ সপ্তাহান্তে কি অতীত আর বর্তমানের মাঝের পর্দা পাতলা হয়ে যায়? আমাদের আগে আর কেউ কি ডেভিডকে দেখেছে? আর কোনও শিশু কি লাল বল নিয়ে তার সঙ্গে খেলেছে? কোনও অতিথি কি রাতের অন্ধকারে ‘ডেভিড’ বলে এক মহিলার আর্তনাদ শুনে পরদিন চুপচাপ চলে গেছে—নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে না পেরে?
আর আমরা কেন? এত পরিবার, এত অতিথির মধ্যে সেদিন আমাদেরই কেন সেই দৃশ্য দেখতে হল? কেবলই কি কাকতালীয়? নাকি কোনও অদৃশ্য হাত আমাদের সেখানে নিয়ে গিয়েছিল—রোনাল্ডকে জানাতে যে তাঁর প্রিয়জনেরা সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়নি?

হয়তো ডেভিড শুধু খেলতে চেয়েছিল। হয়তো ডেবি এখনও তাকে বাঁচাতে চাইছিল। অথবা হয়তো মা আর ছেলে দু’জনেই এমন এক মুহূর্তে আটকে আছে, যেখান থেকে সময় এগোয় না—লাল বলটি চিরকাল কাচের দরজার দিকে গড়িয়ে যায়, একটি শিশু তার পিছনে ছুটে যায়, আর এক মা চিরকাল তার নাম ধরে ডাকে।

এই প্রশ্নগুলো মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল। কোনওটিরই উত্তর নেই। মনে হচ্ছিল, ডিপ ক্রিকের সেই বাড়ি আমাদের ভিতরে কয়েকটি প্রশ্ন রেখে দিয়েছে—যাতে আমরা চলে এলেও তার গল্প আমাদের সঙ্গে বেঁচে থাকে।
প্রায় দু’ঘণ্টা পরে আমরা কলাম্বিয়ায় পৌঁছলাম। রাতের রাস্তা ফাঁকা। আমাদের গাড়ির হেডলাইট গ্যারেজের দরজায় লম্বা ছায়া ফেলল। ঝিলিক পিছনে ঘুমন্ত ছেলেদের দিকে তাকাল।

আমি আস্তে করে বললাম, ‘আমরা বাড়ি এসে গেছি।’
কথাটা ঝিলিককে যতটা বললাম, সম্ভবত নিজেকেও ততটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম।

ইঞ্জিন বন্ধ করে গাড়ি থেকে নামলাম। চারপাশ নিস্তব্ধ। নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েও মনে হচ্ছিল, আমাদের একটা অংশ যেন এখনও ডিপ ক্রিকের সেই লেকের ধারে আটকে আছে—কাচের দরজার সামনে, যেখানে যুক্তি থেমে গিয়েছিল।

ঘটনাটার মানে কী? রোনাল্ড কি কোনওদিন সেই বাড়িতে শান্তি খুঁজে পাবেন? নাকি বাড়িটি চিরকাল দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকবে—ভালোবাসা আর এমন এক হারানোর নীরব সাক্ষী হয়ে, যা মৃত্যুকেও অতিক্রম করে?

আমি আকাশের দিকে তাকালাম। শীতল তারার আলো অন্ধকার ভেদ করে নেমে আসছিল। মনে হল, হয়তো ওই অসীম আকাশের কোথাও উত্তর লুকিয়ে আছে। কিন্তু আকাশ নীরবই রইল। রাতও।

17/07/2026

Basu Continuum Presents Midnight Notes: The Worcester Townhouse Mystery.

Three WPI PhD students in a Worcester townhouse find Midnight Notes correcting their PhD-level work—only when each is alone.

15/07/2026

Basu Continuum presents The Phantom Feast.

A family road trip through rural Bengal.
A storm that swallows the night.
A restaurant glowing in the darkness — waiting.
What began as a simple stop for dinner becomes a chilling encounter with something that should not exist… something that watches, remembers, and hungers for the living.
Step inside Bengali Masala only if you’re ready to discover what the storm was trying to warn them about.
A haunted night. And a place you’ll never look at the same way again.

14/07/2026

Basu Continuum presents a thrilling supernatural audio story: Dust on our feet.
In the summer of 2004, three cousins visited their ancestral village of Rol, where an old, ruined mansion still stood under the weight of forgotten stories. One full-moon night, curiosity drew them closer to that silence. What followed stayed with them forever.

Basu Continuum presents a thrilling supernatural audio story: Dust on our feet. In the summer of 2004, three cousins vis...
14/07/2026

Basu Continuum presents a thrilling supernatural audio story: Dust on our feet.
In the summer of 2004, three cousins visited their ancestral village of Rol, where an old, ruined mansion still stood under the weight of forgotten stories. One full-moon night, curiosity drew them closer to that silence. What followed stayed with them forever.

Basu Continuum presents a thrilling supernatural audio story: Dust ...

পায়ে লেগে থাকা ধুলোরাজরতন বসুআমি বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি, শব্দের একটা উৎস থাকতেই হয়।কাঁপতে থাকা তার। বাতাসের স্তম্ভ। আ...
14/07/2026

পায়ে লেগে থাকা ধুলো
রাজরতন বসু

আমি বরাবর বিশ্বাস করে এসেছি, শব্দের একটা উৎস থাকতেই হয়।
কাঁপতে থাকা তার। বাতাসের স্তম্ভ। আঘাত লাগা পর্দা। গলা। বাঁশি। শরীর।
পদার্থবিদ্যা আমাদের তাই শেখায়। শব্দ এক ধরনের তরঙ্গ। আর তরঙ্গ নিজে নিজে জন্মায় না। তাকে সৃষ্টি হতে হয়, কোনও মাধ্যমের ভেতর দিয়ে চলতে হয়, দূরত্ব মানতে হয়, প্রতিফলন মানতে হয়, বিশোষণ, ব্যতিচার, অনুরণন—সব কিছুর নিয়ম মেনে চলতে হয়।
শব্দ হঠাৎ শূন্য থেকে ভেসে আসে না।
কিন্তু ২০০৪ সালের এক গ্রীষ্মরাতে, বাঁকুড়া জেলার রোল নামে এক গ্রামে, আমি এমন এক সুর শুনেছিলাম যার কোনও জীবিত উৎস ছিল না।
আর সবচেয়ে ভয়ের কথা এই নয় যে আমি সেই সুর শুনেছিলাম।
সবচেয়ে ভয়ের কথা—বুবাই আর তাতোনও শুনেছিল।
এত বছর পরেও আমি তার কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারি না।
শুধু ঘটনাটা যেমন ঘটেছিল, তেমনই বলতে পারি।

২০০৪ সালে আমি খড়্গপুরে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স করছিলাম। আমার মামাতো ভাই বুবাই তখন বর্ধমানে ফিজিক্সে বি.এসসি. করছে, আর আর-এক মামাতো ভাই তাতোন কলকাতায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। আমরা তখন তরুণ, কৌতূহলী, একটু বেশি আত্মবিশ্বাসী, আর বিজ্ঞানের ছাত্র বলে ভয়কে নিয়ে হাসাহাসি করার মতো যথেষ্ট বোকা।
সেই গরমের ছুটিতে আমরা সবাই গিয়েছিলাম রোলে, পারিবারিক জমায়েতে।
রোল আমার মামারবাড়ি—আমার মায়ের পৈতৃক গ্রাম। বাংলার বাইরের কাউকে এই কথাটা বোঝানো কঠিন। মামারবাড়ি মানে শুধু মায়ের দাদার বাড়ি নয়। মামারবাড়ি একটা আলাদা ভূগোল। সেখানে নিয়ম একটু নরম হয়, খাবারের স্বাদ একটু বেশি ভালো লাগে, মামাতো ভাইবোনেরা গোপন অভিযানের সঙ্গী হয়ে ওঠে, আর প্রত্যেকটা উঠোনে ছেলেবেলার কোনও অর্ধেক-ভোলা গল্প লেগে থাকে।
আমি গিয়েছিলাম মা আর দিদির সঙ্গে। সেই বছর জমায়েতটা একটু বড়ই হয়েছিল। প্রায় দশজন মামাতো ভাইবোন, সঙ্গে তাদের বাবা-মা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাড়ি জেগে থাকত—প্রেশার কুকারের সিটি, মামিমাদের এ ঘর থেকে ও ঘরে ডাকাডাকি, ছোটরা খালি পায়ে ছুটোছুটি করছে, মামারা জমি আর রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছেন, কেউ চা চাইছে, কেউ গামছা খুঁজে পাচ্ছে না।

আর মামাদের এই নতুন বাড়িগুলোর একটু দূরে, পুকুর আর সরু গ্রাম্য রাস্তা পেরিয়ে, দাঁড়িয়ে ছিল পুরনো মিত্রবাড়ি।
সবাই তাকে বলত—পুরনো বাড়ি।
অনেক প্রজন্ম আগে, আমার মায়ের দিকের পরিবার রোলের মিত্র জমিদার পরিবার নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু ২০০৪ সালে সেই জমিদারবাড়ি আর বাড়ি ছিল না। ভগ্নাবশেষে পরিণত হয়েছিল। সেখানে আর কেউ থাকত না। আমার মামারা তাঁদের পরিবার নিয়ে কাছাকাছি নতুন বাড়িতে উঠে এসেছিলেন। পুরনো বাড়িটা পড়ে ছিল—আধভাঙা, আধঢাকা, গাছপালার আড়ালে এমনভাবে লুকোনো যেন গ্রামটা তাকে ঘিরে বড় হয়েছে, কিন্তু তাকে পুরো ছুঁতে সাহস করেনি।
আমি এর আগেও অনেক ভগ্নপ্রাসাদ দেখেছি। বাংলায় তার অভাব নেই—ভাঙা খিলান, শ্যাওলা ধরা দেওয়াল, মৃত উঠোন, আর হারিয়ে যাওয়া ঐশ্বর্যের ভারী নীরবতা। কিন্তু মিত্রবাড়িটা আলাদা ছিল।
সামনের ফটকটা তখনও দাঁড়িয়ে ছিল, যদিও ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ফাটল। খিলানের এক পাশ ভেতরের দিকে বসে গেছে। দেওয়ালের গায়ে লতা উঠে গেছে। উঠোনের ওপর ঝুঁকে আছে ভাঙা বারান্দা, কাঠের রেলিং পচে গিয়ে কাত হয়ে আছে। কোথাও কোথাও পলেস্তারা খসে পড়ে পুরনো ইট বেরিয়ে এসেছে—চামড়ার নিচে হাড় যেমন দেখা যায়। জানলাগুলো কালো, ফাঁকা, গভীর।
দিনের বেলায় বাড়িটাকে পরিত্যক্ত মনে হত।
সন্ধেবেলায় মনে হত, সে তাকিয়ে আছে।
রাতে ওদিক দিয়ে কেউ যেত না।
বড়রা অবশ্য খুব বাস্তব কারণ দিতেন। ছাদ ভেঙে পড়তে পারে। সাপ থাকতে পারে। মেঝে বসে গেছে। কাঁটাঝোপ আছে। পোকামাকড় আছে। এরকম বিপজ্জনক পুরনো জায়গায় যাওয়ার দরকার কী?
কেউ কোনওদিন বলেননি, “ওখানে কিছু আছে।”
কিন্তু বড়রা অনেক সময় যা বলেন না, সেটাই সবচেয়ে জোরে শোনা যায়।

________________________________________

একদিন বিকেলের দিকে তাতোন, বুবাই আর আমি হাঁটতে হাঁটতে পুরনো বাড়ির দিকে চলে গেলাম।
আমাদের কোনও গুরুতর পরিকল্পনা ছিল না। বাড়ির ভেতরের হইচই থেকে একটু পালাচ্ছিলাম মাত্র। সূর্য নেমে এসেছে। বাঁকুড়ার লাল মাটি তখন গভীর সোনালি-লাল। কয়েকটা গরু বাড়ি ফিরছে। দূরের রান্নাঘর থেকে ধোঁয়া উঠছে। কোথাও একজন মহিলা সন্ধের আগে একটা বাচ্চাকে ঘরে ডাকছেন।
আমরা পুরনো ফটকের সামনে দাঁড়ালাম।
বুবাই চাপা গলায় বলল, “ভাবতে পারো? এক সময়ে লোকজন সত্যিই এখানে থাকত।”
তাতোন মাথা উঁচু করে ভাঙা বারান্দাটার দিকে তাকাল। “ওটা এখনও পড়ে যায়নি, এটাই মিরাকল।”
আমি বললাম, “তুই গিয়ে নিচে দাঁড়া। তোর ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞানটা পরীক্ষা করা যাক।”
ও হেসে বলল, “ইঞ্জিনিয়াররা স্ট্রাকচার ডিজাইন করে। নিজেদের স্যাম্পল বানায় না।”
আমরা হাসলাম, কিন্তু খুব আস্তে। ওই বাড়ির কাছে জোরে হাসতেও কেমন অস্বস্তি হচ্ছিল।
আমরা ভেতরে ঢুকিনি। শুধু বাইরের সীমানা ধরে হাঁটছিলাম, লম্বা ঘাস আর শুকনো পাতার ভেতর দিয়ে। দেওয়ালের ফাটল দিয়ে ভেতরের উঠোন, পুরনো ঠাকুরদালান, ভাঙা ঘর, আর অন্ধকারে ঢুকে যাওয়া একটা করিডরের খানিকটা দেখা যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই আমার মনে পড়ল বড়মামার নতুন বাড়ির বসার ঘরে ঝোলানো পুরনো ছবিটার কথা।
ছোটবেলা থেকে বহুবার দেখেছি—একজন গম্ভীর, মর্যাদাবান মানুষ, খোদাই করা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন, এক কাঁধে সিল্কের চাদর, মোটা গোঁফের নিচে কঠিন চোখ। বিবর্ণ ফ্রেমের নিচে লেখা ছিল: রাজা বাহাদুর শশিভূষণ মিত্র।
ছোটবেলায় পূর্বপুরুষদের ছবি নিয়ে আমাদের তেমন আগ্রহ ছিল না। কিন্তু বড়রা তাঁর কথা বলতেন এক ধরনের সংযত শ্রদ্ধার সঙ্গে। রোলের মিত্র জমিদারদের মধ্যে তিনি নাকি ছিলেন খুব বিশিষ্ট—রুচিশীল, নিয়মানুবর্তী, আর শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী।
পুরনো বাড়ির ভাঙা দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ সেই ছবিটার ওজন যেন অনুভব করলাম।
বাড়িটা আর শুধু পরিত্যক্ত মনে হল না। মনে হল, কারও উপস্থিতি এখনও সেখানে রয়ে গেছে।

________________________________________

তারপরই আমরা বাচ্চাদের হাসির শব্দ শুনলাম।
ভাঙা বাড়ির পাশের বটগাছটার নিচে কয়েকজন গ্রামের বাচ্চা খেলছিল। খালি পা, ধুলো মাখা, আর একেবারে নির্ভীক। তাদের মধ্যে আট-নয় বছরের একটা ছেলে হাতে লম্বা কালো একটা জিনিস ধরে ছিল।
প্রথমে ভেবেছিলাম লাঠি।
তারপর সে জিনিসটা ঠোঁটে তুলল।
বাঁশি।
কিন্তু সাধারণ বাঁশি নয়।
আমার দেখা বাঁশির চেয়ে সেটা লম্বা, আর অনেক বেশি গাঢ় রঙের। প্রায় কালচে-বাদামি। কোথাও মসৃণ, কোথাও রুক্ষ—যেন বহু বছর ধরে বহু হাত তাকে ছুঁয়েছে। দু’প্রান্তে সরু ধাতব রিং বাঁধানো, বয়সের দাগে সবুজাভ। মুখ লাগানোর ছিদ্রের কাছে ছোট্ট একটা চিহ্ন খোদাই করা।
আমি একটু এগিয়ে গেলাম।
চিহ্নটা দেখতে শঙ্খের মতো, একটা বৃত্তের ভেতর।
তাতোন ও লক্ষ্য করেছিল। সে জিজ্ঞেস করল, “এটা কোথায় পেলি?”
ছেলেটা বাঁশিটার দিকে তাকাল, তারপর আমাদের দিকে। একটু হাসল।
“ও বাড়ি থেকে।”
সে মিত্রবাড়ির দিকে আঙুল তুলল।
বুবাইয়ের হাসি একটু মিলিয়ে গেল। “ভেতর থেকে?”
ছেলেটা মাথা নাড়ল।
আরেকটা মেয়ে, চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, চুল এলোমেলো, বলল, “অনেক পুরনো জিনিস আছে ওখানে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা ভেতরে গিয়েছিলে?”
ছেলেটা কাঁধ ঝাঁকাল। যেন একটা ভাঙা জমিদারবাড়িতে ঢোকা আর আমগাছে ওঠা একই ব্যাপার।
তাতোন হাত বাড়িয়ে বলল, “দেখি।”
ছেলেটা একটু ইতস্তত করল, তারপর বাঁশিটা তার হাতে দিল।
তাতোন মন দিয়ে বাঁশিটা উলটে পালটে দেখল। বুবাই আর আমিও ঝুঁকে পড়লাম।
তাতোন বলল, “এটা কিন্তু নর্মাল বাঁশি নয়। ধাতুর রিংগুলো দেখ। আর এই চিহ্নটা।”
মেয়েটা খুব আস্তে বলল, “সন্ধের পরে এটা বাজাতে নেই।”
বুবাই জিজ্ঞেস করল, “কেন?”
বাচ্চারা উত্তর দিল না।
ছেলেটা বাঁশিটা ফেরত নিয়ে ঠোঁটে তুলল। একবার ফুঁ দিল।
একটা দুর্বল, ভাঙা শব্দ বেরোল। সুর নয়। যেন কোনও নিঃশ্বাস একটা পুরনো তানকে মনে করার চেষ্টা করছে।
মেয়েটা হেসে বলল, “সবাই বাজাতে পারে না।”
ওর গলার স্বরটা আমার ভালো লাগল না।
বুবাই আবার পুরনো বাড়ির দিকে তাকাল। “জানো,” সে ধীরে বলল, “আমাদের পরিবারে সংগীত নিয়ে কিছু একটা শুনেছি।”
তাতোন ওর দিকে তাকাল। “আমিও। পুরনো মিত্রদের নাকি শাস্ত্রীয় সংগীতের খুব শখ ছিল।”
আমার মনেও যেন একটা অস্পষ্ট স্মৃতি নড়ে উঠল। কোনও সম্পূর্ণ গল্প নয়। মায়ের মুখে ছোটবেলায় শোনা কয়েকটা টুকরো কথা—রাতভর গান, দূরদূরান্ত থেকে ওস্তাদদের আসা, মিত্রবাড়ির কোনও পুরনো হলঘর।
আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমিও কিছু একটা শুনেছি। হয়তো এখানে গানবাজনার আসর বসত।”
হঠাৎ বাঁশি-ধরা ছেলেটা আমাদের দিকে খুব অদ্ভুত গম্ভীর চোখে তাকাল।
তারপর বলল, “রাতে এখানে গান হয়।”
বুবাই অস্বস্তির হাসি হেসে বলল, “গান হয়?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল। “মাঝে মাঝে। বারোটার পরে।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী ধরনের গান?”
ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “বাঁশি। তানপুরা। তবলা। পুরনো গান।”
কয়েক মুহূর্ত আমরা চুপ করে রইলাম।

আমাদের পেছনে মিত্রবাড়ির ভাঙা জানলাগুলো অন্ধকার হয়ে এসেছে। বাইরের আলো পুরো ফুরোনোর আগেই বাড়ির ভেতরে যেন সন্ধে নেমে গেছে।
তারপর তাতোন একটু বেশিই জোরে হেসে উঠল।
“রাতে শব্দ অদ্ভুতভাবে ট্রাভেল করে,” সে বলল। “টেম্পারেচার গ্রেডিয়েন্ট, ওয়াল থেকে রিফ্লেকশন, ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ কমে যায়—কেউ গ্রামের কোথাও গান বাজাচ্ছে, আর এরা ভাবছে ভাঙা বাড়ি থেকে আসছে।”
মেয়েটার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“আমরা মিথ্যে বলছি না।”
তারপর গ্রাম্য রাস্তা থেকে কেউ বাচ্চাদের ডাকল। ছেলেটা বাঁশিটা বগলে গুঁজে দৌড়ে গেল। বাকিরাও গেল। তাদের হাসির শব্দ সন্ধের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
আমরা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
বুবাই বলল, “মেয়েটাকে লক্ষ্য করেছো?”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী?”
“চোখের পলক খুব কম ফেলছিল।”
তাতোন মাথা নাড়ল। “অসাধারণ। এখন আমরা ব্লিঙ্কিং ফ্রিকোয়েন্সি নিয়েও ভয় পাব।”

________________________________________

সেই রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আমরা তিনজন একই ঘরে শুলাম।
ঘরটা বড়, মোটা দেওয়াল, ধীরগতির সিলিং ফ্যান, আর কাঠের জানলা দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকছে। মেঝেতে তিনটে বিছানা পাতা। বাইরে পারিবারিক জমায়েত ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসছে। ছোট কাজিনদের বকুনি দিয়ে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। বড়দের কথাবার্তা এক এক করে মিলিয়ে যাচ্ছে। উঠোনে কোথাও একটা কুকুর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দরজার কাছে মশার কয়েল পুড়ছে।
কিন্তু আমাদের কারও ঘুম এল না।
তাতোন চিৎ হয়ে শুয়ে, দু’হাত মাথার পেছনে রেখে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ছিল।
সে বলল, “তাহলে ভদ্রলোকের মতো তদন্ত করা যাক। হাইপোথিসিস এক—গ্রামের বাচ্চারা একটা পুরনো বাঁশি পেয়েছে, আর সেটাকে ঘিরে ভূতের গল্প বানিয়েছে।”
বুবাই পাশ ফিরে বলল, “হাইপোথিসিস দুই—ওরা সত্যি কথা বলছে।”
তাতোন বলল, “সত্যি মানে কী? মরা ওস্তাদরা রাত বারোটার পরে পারফর্ম করেন?”
বুবাই বলল, “মরা না-ও হতে পারে। হয়তো কেউ সত্যিই ওখানে বাজায়।”
আমি বললাম, “রাত বারোটায়? ওই ভাঙা বাড়ির ভেতর?”
তাতোন কাঁধ ঝাঁকাল। “রাতে শব্দ অদ্ভুত চলে। রিফ্লেকশন, খোলা মাঠ, চারপাশে শব্দ কম। দূরের বাঁশি বাড়ির ভেতর থেকে আসছে বলে মনে হতে পারে।”
আমি বললাম, “আর বাঁশিটা?”
“পুরনো জিনিস,” তাতোন বলল। “জমিদার আমলের কিছু হবে।”
“আর শঙ্খের চিহ্নটা?”
“ফ্যামিলি মার্ক, কারিগরের মার্ক, অলংকার—যে-কোনও কিছু হতে পারে।”
বুবাই খানিক চুপ করে থেকে আমার দিকে ফিরল। “রাজুদা, তুমিও তো শুনেছো, মিত্রদের পূর্বপুরুষদের সংগীতের শখ ছিল?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ। কিছু একটা শুনেছি। পুরনো বাড়িতে ওস্তাদরা আসতেন—এরকম।”
বুবাই বলল, “আমার বাবাও বলেছিল। ক্লাসিক্যাল মিউজিকের আসর বসত। হয়তো উৎসবের সময়।”
তাতোন ঘুমঘুম হেসে বলল, “তা হলে কেস সলভড। সত্যি ইতিহাস থেকে গ্রাম্য গুজব। গ্রাম্য গুজব থেকে ভূতের গল্প। ফাইল ক্লোজড।”
কিন্তু ফাইল ক্লোজড হল না।
একই জিনিসগুলো মাথায় ঘুরে ফিরে আসছিল—কালো বাঁশি, শঙ্খচিহ্ন, মেয়েটার সতর্কবাণী, আর বাচ্চাদের কথা—রাত বারোটার পরে পুরনো বাড়ির ভেতর থেকে তানপুরা, তবলা আর বাঁশি শোনা যায়।
ধীরে ধীরে আমাদের চারপাশের বাড়িটা গভীর গ্রাম্য নীরবতায় ডুবে গেল।
এক এক করে আমরা কথা বলা বন্ধ করলাম।
কখন যে বুবাই, তাতোন আর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম, বুঝতেই পারিনি।
________________________________________

তারপর কেউ আমার কাঁধ নাড়ল।
“রাজুদা। ওই রাজুদা। ওঠ।”
আমি চোখ খুললাম।
ঘরটা রূপোর আলোয় ভেসে যাচ্ছে।
কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারলাম না কোথায় আছি। মাথার ওপর ফ্যান ধীরে ঘুরছে। জানলায় চাঁদের আলো। তাতোন আমার পাশে বসে আছে—পুরো জেগে।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “কী?”
সে ঠোঁটে আঙুল রাখল।
“পূর্ণিমা।”
“তো?”
“বাইরে আলো। প্রায় সন্ধেবেলার মতো। টর্চও লাগবে না।”
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
“না।”
ওপাশ থেকে বুবাই গোঙাল। “কী হচ্ছে?”
তাতোন ওকেও নাড়ল। “ওঠ। পুরনো বাড়ি যাচ্ছি।”
বুবাই সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। “তুমি পাগল?”
তাতোন ফিসফিস করে বলল, “শোন। আজ পারফেক্ট রাত। পূর্ণিমা, সবাই ঘুমিয়ে, আর বাচ্চারা বলেছিল গান বারোটার পরে শোনা যায়। এখন সাড়ে বারোটা।”
আমি জানলার দিকে তাকালাম।
চাঁদের আলোটা অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। মেঝের ওপর ফ্যাকাসে আয়তক্ষেত্র এঁকে রেখেছে। বাইরে গ্রাম নিঃশব্দ।
আমি বললাম, “ওখানে যাওয়ার কথা তো আমরা বলিনি।”
তাতোন বলল, “শুধু ফটক পর্যন্ত যাব।”
বুবাই বিড়বিড় করল, “ভূতের গল্পে সব বোকাই এই কথাটা বলে।”
তাতোন হাসল। “ভালো। তা হলে সাহিত্যিক ঐতিহ্য মেনে চলছি।”
আমরা ইতস্তত করলাম।
এই ইতস্তত করাটা জরুরি।
আমরা কোনও বীরপুরুষ ছিলাম না। অন্ধকারে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়া নির্বোধও ছিলাম না। জানতাম এটা খারাপ আইডিয়া। জানতাম আমাদের মা-বাবারা জানতে পারলে রক্ষে নেই। জানতাম ভূত না থাকলেও ওই বাড়িটা বিপজ্জনক। তবু কৌতূহল মাঝে মাঝে যুক্তির মুখোশ পরে আসে।
আমরা নিজেদের বললাম—আমরা তদন্ত করতে যাচ্ছি।
আমরা নিজেদের বললাম—তিনজন বিজ্ঞানপড়ুয়া ছেলেকে গ্রাম্য লোককথা ভয় দেখাতে পারে না।
শেষে আমি বললাম, “শুধু ফটক পর্যন্ত।”
বুবাই বলল, “ভেতরে ঢোকা যাবে না।”
তাতোন খুব তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে।”
আমরা একটা টর্চ নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম।
বাড়ি ঘুমিয়ে। মশারির নিচে মানুষজন ফ্যাকাসে তাঁবুর মতো ঢাকা। অন্য ঘর থেকে কারও নাক ডাকার শব্দ আসছে। আমরা খালি পায়ে উঠোন পেরোলাম, তারপর পাশের দরজার কাছে রাখা চটি পরে নিলাম। একটা কুকুর মাথা তুলে আমাদের বেরোতে দেখল, কিন্তু ডাকল না।

________________________________________

বাইরে রোল অন্য জগৎ হয়ে গেছে।
গ্রামের পথ পূর্ণিমার আলোয় ঝলমল করছে। পুকুরগুলো কালো আয়না। কলাগাছের পাতা স্থির। কয়েকটা তালগাছ আকাশের সামনে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে। বাতাসে ভেজা মাটি আর রাতের ফুলের গন্ধ।
আমরা কথা না বলে হাঁটছিলাম।
পুরনো বাড়ি দেখা যেতেই পেটের ভেতরটা যেন শক্ত হয়ে গেল।
পূর্ণিমার আলোয় বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে—ভাঙা অংশগুলো ফ্যাকাসে, আর ফাঁকা অংশগুলো কালো। ফটকটা দিনের চেয়ে উঁচু লাগছে। দেওয়ালের ফাটলগুলো শিরার মতো। ওপরের বারান্দা থেকে উঠোনের ওপর লম্বা ছায়া পড়েছে।
আমরা ফটকের সামনে থামলাম।
বুবাই ফিসফিস করল, “হয়ে গেছে। এলাম। দেখলাম। এবার চলো।”
ঠিক তখনই আমরা শুনলাম।
একটা মাত্র সুর।
নিচু।
স্থির।
এত মৃদু যে প্রথমে মনে হল মাথার ভেতরেই বাজছে।
সা।
সুরটা বাতাসে ধরে রইল।
তারপর আরেকটা সুর এসে জুড়ল।
পা।
সা। পা। সা।
তানপুরা।
আমরা তিনজন জমে গেলাম।
শব্দটা বাড়ির ভেতর থেকে আসছে।
তাতোন ফিসফিস করে বলল, “কেউ আছে।”
বুবাই বলল, “এই সময়?”
“হয়তো রেডিও।”
ভয়ে আমার প্রায় হাসি পেয়ে গেল। “ভাঙা জমিদারবাড়ির ভেতর রেডিওতে তানপুরা বাজছে?”
সুরটা চলতেই থাকল।
তারপর বাঁশি শুরু হল।
প্রথম ফ্রেজটা ধীরে উঠল, রাতের বাতাসে বেঁকে গেল, আর এসে যেন আমার বুকের ভেতরে বসে পড়ল।
শব্দটা জোরে নয়। পারফরম্যান্সের মতোও নয়। যেন কেউ চাঁদের জন্য বাজাচ্ছে, দেওয়ালের জন্য বাজাচ্ছে, কিংবা এমন কারও জন্য যে এখনও আসেনি।
সুরগুলো দীর্ঘ, নিয়ন্ত্রিত, অসহ্য সুন্দর।
বুবাই ফিসফিস করল, “এটা লোকসঙ্গীত নয়।”
তাতোন কিছু বলল না।

আর তারপর, নিজেদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি ভেঙে, আমরা ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
উঠোন ভর্তি বুনো ঘাস। ভাঙা ইটের ওপর চাঁদের আলো। পুরনো ঠাকুরদালানের কাছে একটা ফাটা স্তম্ভ কাত হয়ে আছে। ওপরে কোথাও বাদুড় নড়েচড়ে উঠল। বাঁশির সুরটা যেন ভেতরের দিক থেকে আসছে।
আমরা আস্তে আস্তে উঠোন পেরোলাম।
হাওয়া ঠান্ডা হয়ে উঠল।
প্রথমে সেটা হাতের ওপর টের পেলাম। রোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে। তারপর ঘাড়ের পেছনে। বাইরে গ্রীষ্মরাতটা গরম ছিল, কিন্তু পুরনো বাড়ির ভেতরে বাতাস যেন বহু বছর ধরে আটকে থাকা ঠান্ডা।
গন্ধটাও বদলে গেল।
প্রথমে ধুলো।
তারপর স্যাঁতসেঁতে ইট।
তারপর ধূপ।
তাজা ধূপ।
বুবাই থেমে গেল। “গন্ধ পাচ্ছো?”
আমি উত্তর দেওয়ার আগেই আর-একটা গন্ধ এল।
চন্দন।
তারপর ফুল।
জুঁই।
গাঁদা।
তাতোন টর্চ জ্বালাল। আলোটা একবার, দু’বার কেঁপে উঠে স্থির হল।
সে স্বভাবতই বলল, “ব্যাটারির সমস্যা।”
কিন্তু আমরা জানতাম, সে নিজেই কথাটা বিশ্বাস করছে না।
আমরা খিলানওয়ালা একটা করিডরে ঢুকলাম। আমাদের চটি শুকনো পাতা আর ভাঙা পলেস্তারার ওপর ঘষটাতে লাগল। কোথাও জল পড়ছে টুপটাপ। তানপুরার সুর গভীর হল। তারপর খুব আস্তে তবলা যোগ দিল।
ধা… ধিন… ধিন… ধা…
ছন্দটা ধীর, ধৈর্যশীল, অপেক্ষমাণ।
করিডরের শেষে আলো দেখা গেল।
সাদা টর্চের আলো নয়।
উষ্ণ হলুদ আলো।
প্রদীপের আলো।
আমরা এক পা এক পা করে এগোলাম।
করিডরটা খুলে গেল একটা বড় হলঘরে।
আর সেখানে পৃথিবী ভেঙে গেল।
হলঘরটা আর ভাঙা নয়।
দেওয়ালের ধারে ধারে পিতলের প্রদীপ জ্বলছে। মেঝেতে মোটা গালিচা পাতা। সারি সারি পুরুষ বসে আছেন—ধুতি, চাদর, পাগড়ি। খোদাই করা কাঠের পর্দার আড়াল থেকে মহিলারা দেখছেন। স্তম্ভের কাছে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন ভৃত্য। বাতাসে ধূপের ধোঁয়া আর তানপুরার নরম ঝংকার।
মাঝখানে বসে আছেন একজন গম্ভীর বৃদ্ধ জমিদার, সিল্কের চাদর কাঁধে।
তাঁর মুখে অহংকার নয়। রুচি। গভীর মনোযোগ। যেন যা শুনছেন, তা তিনি শুধু কান দিয়ে নয়, সমস্ত সত্তা দিয়ে গ্রহণ করছেন।
আমি স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
আমি মুখটা চিনতাম।
বড়মামার বসার ঘরের ফ্রেমবন্দি ছবিতে এই মুখই দেখেছি।
তীক্ষ্ণ চোখ।
মোটা গোঁফ।
সিল্কের চাদর।
বিবর্ণ ফ্রেমের নিচের নামটা যেন অন্য শতাব্দী থেকে ফিরে এল—
রাজা বাহাদুর শশিভূষণ মিত্র।

হলের দূর প্রান্তে উঁচু মঞ্চে তিনজন শিল্পী বসে আছেন।
একজন তানপুরা হাতে।
একজন তবলায়।
আর একজন বাঁশিবাদক।
বাঁশিবাদকের হাতে কালো বাঁশি, দু’প্রান্তে ধাতুর রিং।
মুখের ছিদ্রের কাছে সেই একই শঙ্খচিহ্ন।
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
আমি ফিসফিস করে বললাম, “এটা সম্ভব নয়।”
আমরা একে অপরের হাত শক্ত করে চেপে ধরলাম।
তাতোন বলল, “কোনও নাটক। কেউ স্টেজ করেছে।”
কিন্তু হলঘরের কেউ আমাদের উপস্থিতি টের পাচ্ছে বলে মনে হল না।
শিল্পীদের পাশে বসে আছে একটা ছোট মেয়ে।
লাল পাড় সাদা শাড়ি। মাঝখানে সিঁথি করে আঁচড়ানো চুল। কাঁধে ছোট্ট শাল। ডান পায়ে একটা রুপোর নূপুর।
মেয়েটার মুখ ফ্যাকাসে। অসুস্থ দেখাচ্ছে।
তবু তার চোখ বাঁশিবাদকের ওপর স্থির—নির্ভেজাল বিশ্বাসে ভরা।
সুর চলতে লাগল।
রাগটা গভীর, রাত্রিকালীন, ধ্যানমগ্ন। বুবাই আমার কানের কাছে মুখ এনে বলল, “মালকোষ।”
বাঁশিবাদকের চোখ বোজা। তাঁর আঙুলগুলো অবিশ্বাস্য কোমলতায় ছিদ্রের ওপর নড়ছে। আলাদা আলাদা সুর নয়—একটানা নিঃশ্বাসের মতো বয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ ফ্রেজ উঠছে, নামছে, যেন ধীর ঢেউ। তবলাবাদক মন দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। তানপুরার সুর ঘরটাকে বেঁধে রেখেছে।

________________________________________

তারপর কিছু একটা বদলে গেল।
সুর গুলো দীর্ঘ হতে শুরু করল।
প্রথমে তা ছিল অপরূপ।
তারপর অস্বস্তিকর।
বাঁশিবাদক একটা সুর এত দীর্ঘ ধরে রাখলেন যে আমি নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠলাম। তাঁর হয়ে আমি যেন শ্বাস নিচ্ছি। তাঁর হয়ে ছাড়ছি। অপেক্ষা করছি কখন তিনি শ্বাস নেবেন।
তিনি নিলেন না।
তবলাবাদকের হাত ধীরে এল।
তানপুরাবাদক চোখ খুললেন।
শ্রোতাদের মধ্যে কেউ সামনের দিকে ঝুঁকল।
ছোট মেয়েটা তার শাল আঁকড়ে ধরল।
বাঁশিবাদকের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, কিন্তু সেখানে যন্ত্রণার ছাপ নেই। আছে আত্মসমর্পণ। মনে হচ্ছিল তিনি এমন কোথাও চলে গেছেন যেখানে আমরা কেউ পৌঁছতে পারি না।
সুরটা কেঁপে উঠল।
তবু তিনি ধরে রাখলেন।
রাজা বাহাদুর শশিভূষণ মিত্র হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন।
খুব আস্তে বললেন, “বাস।”
কিন্তু বাঁশিবাদক শুনলেন না।
অথবা শুনেও হয়তো তিনি আনুগত্যের সীমা পার হয়ে গিয়েছিলেন।
সুরটা সরু হয়ে এল।
তাঁর হাতে বাঁশিটা কাঁপল।
তারপর তাঁর নিঃশ্বাস আটকে গেল।
ভয়াবহ ছোট্ট একটা শব্দ।
নাটকীয় নয়।
জোরে নয়।
শুধু শরীরের ভেতরের একটা ক্ষুদ্র ভাঙন।
বাঁশিটা তাঁর আঙুল থেকে পিছলে পড়ল।
এক সেকেন্ড তিনি বসেই রইলেন—স্থির, সামান্য মাথা নত, যেন অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সুরের শেষ অংশটা এখনও শুনছেন।
তারপর ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঝুঁকে মঞ্চ থেকে পড়ে গেলেন।
বাঁশিটা তার প্রাণহীন আঙুল থেকে খসে মেঝেতে পড়তেই একটা ফাঁপা শব্দ হল; আর সেই মুহূর্তে বাঁশির একটি ধাতব রিং আলগা হয়ে হলঘর পেরিয়ে গড়াতে গড়াতে এসে থামল ঠিক আমাদের পায়ের সামনে।
এমন সময়, হলঘরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ল।
রাজা বাহাদুর শশিভূষণ মিত্রই প্রথম ছুটলেন।
লোকজন বাঁশিবাদককে সাবধানে তুলে গদির ওপর শুইয়ে দিল। কেউ জল চাইছে। কেউ বৈদ্য ডাকতে বলছে। কেউ উঠোনের দিকে দৌড়ে গেল। তবলাবাদক কাঁদছেন। তানপুরাবাদক বারবার বলছেন, “শ্বাস নিন, শ্বাস নিন, দয়া করে শ্বাস নিন।”
ছোট মেয়েটা স্থির দাঁড়িয়ে ছিল।
তারপর সে চিৎকার করে উঠল।
“বাবা!”
শব্দটা হলঘর চিরে গেল।
মহিলারা ছুটে এলেন। একজন তাকে কোলে তুললেন। আরেকজন তার কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠলেন, “জ্বরে পুড়ছে!” মেয়েটা দুর্বল শরীরে ছটফট করছে, বাবার কাছে যেতে চাইছে।
জমিদার বাঁশিবাদকের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছেন। তাঁর সিল্কের চাদর এক কাঁধ থেকে নেমে গেছে। তিনি শিল্পীর হাত ঘষছেন, তারপর মুখের কাছে কান নিয়ে যাচ্ছেন।
“সবাইকে ডাকো,” তিনি আদেশ দিলেন। “বৈদ্য আনো। ঘোড়া পাঠাও। গরম তেল আনো। জল আনো।”
ওই ঘরে কোনও নিষ্ঠুরতা ছিল না।
ছিল শুধু আতঙ্ক।
ছিল অসহায়তা।
ছিল মৃত্যু থামিয়ে দেওয়ার জন্য ভালোবাসা, মর্যাদা, প্রার্থনা আর মানুষের হাতের ব্যর্থ চেষ্টা।
ছোট মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, “বাবা, গানটা শেষ করো। বাবা, ওঠো। সবাই অপেক্ষা করছে।”
কথাগুলো বারবার ফিরে আসছিল।
বাবা, গানটা শেষ করো।
বাবা, ওঠো।
সবাই অপেক্ষা করছে।
হলঘর কেঁপে উঠল।
এক মুহূর্তের জন্য প্রদীপগুলো অদৃশ্য হয়ে গেল। গালিচার জায়গায় বুনো ঘাস। পালিশ করা মেঝে ফেটে গেল। ছাদ খুলে চাঁদের আলো ঢুকে পড়ল।
তারপর আবার পুরনো হল ফিরে এল।
অতীত আর বর্তমান যেন একে অন্যের ভেতরে ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে।
আমরা একে অন্যের হাত চেপে ধরলাম। “আমাদের বেরোতে হবে।”
কিন্তু কেউ উত্তর দেওয়ার আগেই ছোট মেয়েটার গলা আবার উঠল—এবার আরও কাছে, আরও তীক্ষ্ণ, সবকিছু ভেদ করে।
“বাবা… গানটা শেষ করো… বাবা… গানটা শেষ করো…”
কথাগুলো প্রতিধ্বনি হচ্ছিল না।
বাড়ছিল।
একবার।
দু’বার।
আবার।
তারপর অসংখ্যবার।
যেন মিত্রবাড়ির প্রতিটি ফাটল, প্রতিটি ভাঙা খিলান, প্রতিটি অন্ধকার ঘর সেই একই কান্নাভেজা অনুরোধ ফিরিয়ে দিচ্ছে।
আমরা একে অপরের হাত শক্ত করে চেপে ধরলাম।
হঠাৎ সব আলো নিভে গেল।
আর মুহূর্তের মধ্যে—
মিত্রবাড়ি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে গেল।
ধীরে নয়।
এক মুহূর্তে।
যেন কেউ গোটা অতীতটাকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল।
প্রদীপ নেই।
হলঘর ছায়ায় ভেঙে পড়েছে।
তানপুরার সুর বিকৃত হয়ে নিচু, দমবন্ধ করা গুঞ্জনে পরিণত হয়েছে।
আমার চোখ ঝাপসা।
দেওয়াল গলছে।
মেঝে কাত হচ্ছে।
আমি আর বুঝতে পারছি না কোথায় দাঁড়িয়ে আছি।
মেয়েটার গলা বারবার ফিরে আসছে—এখন আমার মাথার ভেতরে।
“বাবা… গানটা শেষ করো… বাবা… গানটা শেষ করো…”
সেটা আর অনুরোধ নয়।
সেটা ভাঙন।
প্রত্যেকবার আরও ধারালো।
প্রত্যেকটা শব্দ আমার কানের ভেতর ছিঁড়ে ঢুকছে।
আমি কান চেপে ধরতে চাইলাম।
হাতের অনুভূতি নেই।
আমি চিৎকার করতে চাইলাম।
শব্দ বেরোল না।
অন্ধকার চাপ দিচ্ছে।
গলা এমন উচ্চতায় উঠল যে মনে হল মাথার খুলি ফেটে যাবে—
আর তারপর—

________________________________________

আমি ছিটকে বেরিয়ে এলাম।
আস্তে নয়।
ধীরে নয়।
হঠাৎ।
যেন কেউ আমাকে টেনে নিজের শরীরে ফিরিয়ে দিল।
আমি হাঁফ ছেড়ে উঠলাম।
হাওয়া ফুসফুসে ধাক্কা মেরে ঢুকে গেল।
চোখ খুলে গেল।
মাথার ওপরে সিলিং ফ্যান ঘুরছে।
ঘর চাঁদের আলোয় ভাসছে।
হৃৎপিণ্ড এমন জোরে ধকধক করছে যে ব্যথা হচ্ছিল।
এক মুহূর্ত বুঝতে পারছিলাম না আমি কোথায়।
তারপর বুবাই আমার পাশে বসে উঠল, শ্বাসরুদ্ধ গলায়।
ঠিক একই মুহূর্তে তাতোনও লাফিয়ে উঠল, যেন তাকে বিদ্যুৎ ছুঁয়েছে।
আমরা তিনজন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
চোখ বড় বড়।
শ্বাস কাঁপছে।
ভয়ে জমে গেছি।
কেউ কথা বলল না।
কারণ বলার দরকার ছিল না।
আমরা সবাই শুনেছি।
আমরা সবাই অনুভব করেছি।
যেন আমাদের সবাইকে একই মুহূর্তে টেনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
ঘরটা একেবারে আগের মতোই।
দরজা বন্ধ।
টর্চ তাতোনের বালিশের পাশে।
চটিগুলো দেওয়ালের কাছে।
দরজার কাছে মশার কয়েল অর্ধেক পুড়ে গেছে।
আমরা কোথাও যাইনি।

আমরা স্বপ্ন দেখেছি।

এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা।
বাচ্চাদের গল্পের প্রভাব। একই পরিবেশ। এক ধরনের মানসিক মিল। তিনটে মন একই ভয় থেকে একই ছবি বানিয়েছে। অদ্ভুত, কিন্তু হয়তো অসম্ভব নয়।
তারপর বুবাই নিজের বিছানার চাদর সরাল।
ওর পা লাল ধুলোয় ঢাকা।
ঘরের ধুলো নয়।
গ্রামের ধুলো।
পায়জামার নিচের অংশে শুকনো ঘাস লেগে আছে।
আমি ধীরে নিজের পায়ের দিকে তাকালাম।
ধুলো।
আঁচড়।
গোড়ালির কাছে ছোট্ট কাঁটা।
তাতোন কাঁপতে কাঁপতে উঠে চাঁদের আলোয় দাঁড়াল।
ওর পায়েও ধুলো।
আর তার ডান হাত থেকে তীব্র চন্দনের গন্ধ আসছে।
আমরা কেউ একটা শব্দও করলাম না।
তারপর জিনিসটা দেখলাম।
আমাদের বিছানাগুলোর মাঝখানে মেঝের ওপর পড়ে আছে একটা সরু কালচে ধাতব রিং।
পুরনো।
জং ধরা।
ধারে সবুজ দাগ।
মিত্রবাড়ির সেই বাঁশির ধাতব রিংটার মতো—যেটা হঠাৎ খুলে গিয়ে নিস্তব্ধ হলঘর পেরিয়ে গড়াতে গড়াতে এসে থেমেছিল আমাদের পায়ের ঠিক সামনে।

রাতটা আর কাটল না। রাতটা যেন শুধু আমাদের চারপাশে বসে রইল।
আমরা আর ঘুমোলাম না। ওই ঘরেই বসে রইলাম ভোর পর্যন্ত। প্রথম পাখির ডাক, উঠোনে প্রথম পায়ের শব্দ, টিউবওয়েল থেকে প্রথম জলের ছিটে, সকালের প্রথম সাধারণ মানবিক শব্দ—সব শুনলাম।
সাধারণ শব্দকে এত মূল্যবান আগে কখনও লাগেনি।

________________________________________

সকালের খাওয়া শেষ করে আমরা বড়দের সব বললাম না। শুধু মূল কথাগুলো বললাম—পুরনো বাড়ি থেকে সুর শোনা, অদ্ভুত স্বপ্ন, বাঁশিবাদক, ছোট মেয়ে, পায়ে ধুলো, আর ধাতব রিং। কিন্তু ছোট ছোট খুঁটিনাটি বলিনি। বাঁশির গায়ের শঙ্খচিহ্নের কথা বলিনি। মেয়েটার এক পায়ে নূপুর ছিল—সেটা বলিনি। বাঁশিবাদক দীর্ঘ সুরের মাঝখানে কীভাবে শ্বাস হারিয়ে ফেললেন—সেটাও বলিনি।
প্রথমে সবাই প্রত্যাশামতোই প্রতিক্রিয়া দিলেন।
মায়েরা বকতে শুরু করলেন—গ্রামের ছেলেপুলেদের গল্প শুনে মাথা খারাপ করেছি। দিদি এসে আমাদের রক্ষা করল, না হলে বকুনি আরও বাড়ত। একজন মামিমা বললেন, পূর্ণিমার রাতে ঘুম অদ্ভুত হয়। আরেকজন বললেন, রাতে বেশি খাওয়ার ফল। কেউ বললেন, হয়তো ঘুমের ঘোরে বাইরে বেরিয়েছিলাম। কেউ আবার বললেন, “এই বয়সে এরকম হয়।”
কিন্তু বড়মামা হাসলেন না।
তিনি চুপচাপ শুনলেন।
বাঁশির কথা বলতেই তাঁর মুখ বদলে গেল।
ধাতব রিংটা দেখাতেই তিনি একেবারে স্থির হয়ে গেলেন।
তারপর তিনি উঠে দরজাটা বন্ধ করলেন।
ঘর নিঃশব্দ।
তিনি আমাদের তিনজনের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, “রাতে পুরনো বাড়ির কাছে যাওয়া তোমাদের উচিত হয়নি।”
বুবাই আস্তে বলল, “আমরা গিয়েছিলাম কি না, সেটাই তো জানি না।”

বড়মামা আমাদের ধুলো-মাখা পায়ের দিকে তাকালেন।
আমরা ধীরে ধীরে পা সরিয়ে নিলাম।

তারপর বলতে শুরু করলেন।
“আগেকার দিনে মিত্রবাড়ি সংগীতের জন্য বিখ্যাত ছিল।”
তাঁর গলা ধীর, মাপা। যেন বহুদিন বন্ধ থাকা একটা দরজা তিনি খুলছেন।
“শুধু দেখানোর জন্য নয়। মিত্র পূর্বপুরুষরা সত্যিই সংগীত ভালোবাসতেন। উৎসব, পূর্ণিমা, বিশেষ আসর—বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, কখনও কলকাতা থেকেও ওস্তাদরা আসতেন। পুরনো বাড়ির হলঘর ভোর পর্যন্ত আলোয় ভরে থাকত। তানপুরা, তবলা, সরোদ, সেতার, বাঁশি—বাড়িটা যেন সংগীতের মধ্যে বাঁচত।”
তাতোন, বুবাই আর আমি একে অন্যের দিকে তাকালাম।
এই গল্পের কিছু টুকরো আমরা অস্পষ্টভাবে আগে শুনেছিলাম।
বড়মামা বলে গেলেন।
“একজন বাঁশিবাদক ছিলেন। আমাদের বড়রা তাঁর কথা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে বলতেন। তাঁর আসল নাম এখন আর নিশ্চিত করে কেউ জানে না। কেউ বলত হরিমোহন, কেউ বলত হরি বাঁশি। খুব ধনী মানুষ ছিলেন না, বড় দরবারি ওস্তাদও নন। কিন্তু লোকের মুখে শোনা যেত—তিনি বাজালে প্রদীপের শিখাও নাকি স্থির হয়ে শুনত।”
আমার শরীর দিয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
“তাঁর একটা ছোট মেয়ে ছিল,” বড়মামা বললেন। “মেয়েটির মা আগেই মারা গিয়েছিলেন। সে বাবার সঙ্গে সর্বত্র যেত। আসরে বাবার পাশে বসে থাকত, তাঁর চাদরের প্রান্ত ধরে। সেই রাতে মেয়েটার জ্বর ছিল। মিত্রবাড়ির মহিলারা তাকে বিশ্রাম দিতে চেয়েছিলেন। জল দিয়েছিলেন, কপালে কাপড় দিয়েছিলেন, বাঁশিবাদককে বলেছিলেন বেশি রাত পর্যন্ত না বাজাতে। কিন্তু মেয়েটা বাবার পাশে বসে থাকতে কাঁদছিল। বাঁশিবাদক হেসে বলেছিলেন, ‘থাকতে দিন। আমি বাজালেই ও ঘুমোয়।’”
ঘরে কেউ নড়ল না।
বড়মামা বললেন, “সেটাও ছিল পূর্ণিমার রাত।”
সকালের আলো যেন তাঁর কথায় অন্ধকার হয়ে উঠল।
“রাজা বাহাদুর শশিভূষণ মিত্র নিজে সেই রাতে হলে ছিলেন। শিল্পীদের তিনি গভীর সম্মান করতেন। সেই আসর তিনি ঐশ্বর্য দেখানোর জন্য করেননি—সংগীতের প্রতি নিবেদন হিসেবে করেছিলেন। বাঁশিবাদক গভীর রাতের রাগ ধরেছিলেন। কেউ কেউ বলে সেটা মালকোষ ছিল।”

মালকোষ রাগের নাম শুনতেই আমরা একে অপরের দিকে তাকালাম।

বড়োমামা বলতে থাকলেন, “রাত যত গভীর হল, তিনি তত তন্ময় হয়ে গেলেন। সুরগুলো দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হল। তিনি একটা সুর এতক্ষণ ধরে রাখলেন যে লোকজন ভয় পেয়ে গেল। কেউ তাঁকে থামতে বলল। জমিদার নিজে উঠে বললেন, ‘বাস।’ কিন্তু বাঁশিবাদক তখন সুরের মধ্যে হারিয়ে গেছেন। তাঁর শ্বাস আটকে গেল। হৃদস্পন্দন থেমে গেল। বসা অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে পড়ে গেলেন।”
বড়মামা থামলেন।
“মিত্র পরিবার যা পারা যায় সব করেছিল। এটা মনে রেখো। কেউ তাঁকে আঘাত করেনি। কেউ তাঁকে জোর করেনি। তাঁরা তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। রাজা বাহাদুর শশিভূষণ মিত্র নিজে ছুটে গিয়েছিলেন। জল আনা হয়েছিল। বৈদ্য ডাকানো হয়েছিল। ডাক্তার আনতে লোক পাঠানো হয়েছিল। মহিলারা প্রার্থনা করেছিলেন, শিশুটির দেখা

Address

Arambagh

Telephone

03211 255 317

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Basu Continuum posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share