12/09/2026
ঘুম ভাঙতেই ভবতারণ মুখুটি প্রমাদ গুনলেন, কালো মেঘে সেজে উঠেছে আকাশ। বেলাও পড়ে আসছে। কী করবেন এখন? তিনি এমন মরণঘুম ঘুমোলেন যে বুঝতেই পারলেন না!
তিনি রাতকানা মানুষ, দিনের আলো মরে গেলেই দিশেহারা হয়ে পড়েন। ভেবেছিলেন বেলাবেলি ঢুকে যাবেন যজমানের বাড়ি।
কিন্তু পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে গাছতলায় শুয়ে এমন মরণঘুম ঘুমালেন। মায়ের নাম স্মরণ করতে করতে লাঠি ঠুকে ঠুকে পা বাড়ালেন। ভবতারণ দু’বার হোঁচট খেতে খেতে ও বাঁচলেন। তারই মধ্যে বৃষ্টি এলো — গোদের উপরে বিষ ফোঁড়া...
একটা মস্ত গর্তে পা পড়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিলেন প্রায়। দু’টি নরম হাত এসে তাকে ধরল। কোনওমতে সামলে নিয়ে দেখেন একটি বাচ্চা মেয়ে। মেয়েটার হাতে একটা আলো... তার সামনে এসে বললে, " ঠাকুর মশাই আমি পুঁটি। দাদু আমারে পাইঠেছেন আপনাকে নিয়ে যেতে... "
ভবতারণ বুঝল তার যজমান হরিরাম চাটুজ্যের নাতিন... হরিরাম জানে ভবতারণ কখনো কথার বরখেলাপ করে না। এখনও আসেনি মানে নিশ্চয়ই রাস্তায় আটকে পড়েছে। তাই নাতিনকে পাঠিয়ে দিয়েছে।
নিশ্চিন্ত মনে অবতারণ পথ চলেন। আর সামনে সামনে তাকে আলো দেখিয়ে নিয়ে চলে সেই পুঁটি। মনে মনে ভাবেন ভবতারণ , সত্যিই হ্যারিকেনখানা বেশ জব্বর। না হলে অমাবস্যার এমন ঘোর কালিলেপা রাত সামান্য হ্যারিকেনের আলোয় এমন ভাবে আলোকিত হয়! বিদেশি যন্ত্র হবে... আজ দক্ষিণ একটু বেশি চাইতে হবে।
সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যজমান বাড়ি এসে ঢুকলেন। ঢাকের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে পূজায় বসলেন তিনি। সাড়ম্বরে পূজা সমাপন করে, ভোর রাত্রে সামান্য ফলাহার করতে বসলেন ভবতারণ... কিন্তু তার মন পড়ে আছে সেই ছোট্ট পুঁটির দিকে। মেয়েটার সাথে ভাল করে আলাপ করতে হবে। ভারি মিষ্টি মেয়ে।
হরিরামকে ডেকে বললেন, "বাবা হরে তোমার নাতিনটাকে ডেকে দাও দিন দেখি। জেগে আছে না ঘুমিয়ে পড়েছে... লক্ষ্মীমান্ত মেয়ে ওর মাথায় দুটো জপ করে দিই।"
হরিরাম আকাশ থেকে পড়ে, নাতিন তার কই? তার তো মোটে দুটো ছেলে। ছোট ছেলেটার এখনো বিয়ে হয়নি। বড় ছেলেটার বিয়ে ঠাকুর মশাই কদিন আগেই দিয়ে গেলেন...
ফলাহারের বাটি ফেলে ছুটে এলেন ভবতারণ, মায়ের মূর্তির সামনে উপুড় হয়ে বসলেন। হ্যাজাকের আলো বাড়িয়ে দিলেন তিনি, অবিকল পুঁটির মুখ। পার্থক্য এই যে, সেখানে পুঁটি মিটিমিটি হাসছিল আর এখানে বের করে ভ্যাঙাচ্ছে— যেন বলছে কেমন দিলুম? দরদর করে তার চোখ থেকে জলের ধারা নামলো। যা বোঝার তিনি বুঝে গিয়েছেন...
তাঁর পূজার ব্যবস্থা তিনি করিয়ে নেন। প্রয়োজনে কানাকেও এক রাতের জন্য চক্ষুস্মান করে দিতে পারেন তিনি। তিনি যে তারা...
নিবেদনে তমোঘ্ন নস্কর