16/05/2026
সেদিন ১৮৭২ সালের ৫ই জুন। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথি। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে সেদিন এক বিশেষ উৎসবের আমেজ—ফলহারিণী কালীপুজো। মা ভবতারিণীর মন্দিরে ভক্তদের ভিড়, আলোর রোশনাই, আর মন্ত্রোচ্চারণে চারপাশ মুখরিত। কিন্তু এই কোলাহল থেকে একটু দূরে, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নিজের ঘরটিতে বিরাজ করছিল এক গভীর, শান্ত এবং রহস্যময় নিস্তব্ধতা।
রাত তখন প্রায় ৯টা। বাইরের উৎসবের দিকে ঠাকুরের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। ঘরের ভেতরে তিনি এক বিশেষ পুজোর আয়োজন করে বসে আছেন। তবে সেখানে কোনো মাটির বা পাথরের প্রতিমা নেই। চন্দন, ফুল, বেলপাতা, ধূপ-দীপ আর নৈবেদ্য সাজিয়ে তিনি যেন এক বিশেষ দেবীর অপেক্ষায়।
এমন সময় ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করলেন মা সারদা। তাঁর বয়স তখন অল্প, কিন্তু চোখেমুখে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা ও প্রশান্তি। ঠাকুর পরম স্নেহে তাঁকে নির্দেশ দিলেন ঘরের নির্দিষ্ট একটি পিঁড়িতে বসতে। আলপনা দেওয়া সেই আসনটি আসলে কোনো সাধারণ আসন নয়, সেটি পাতা হয়েছিল স্বয়ং দেবীর জন্য!
মা সারদা শান্তভাবে সেই আসনে বসলেন। ঠাকুর তাঁকে সাধারণ মানবী বা নিজের স্ত্রী হিসেবে নয়, বরং সাক্ষাৎ জগন্মাতা 'ষোড়শী' বা ত্রিপুরাসুন্দরী রূপে আবাহন করলেন। মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে তাঁকে শুদ্ধ করলেন। এরপর পরম ভক্তিভরে শুরু হলো সেই ঐশ্বরিক আরাধনা। ফুল, চন্দন আর ধূপের সুবাসে ছোট ঘরটি ভরে উঠল। ঠাকুর নিজের হাতে মিষ্টি তুলে দিলেন মা সারদার মুখে, ঠিক যেমন করে মন্দিরে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়।
পুজোর মন্ত্র পড়তে পড়তে শ্রীরামকৃষ্ণ ধীরে ধীরে বাহ্যিক জ্ঞান হারাতে লাগলেন। তাঁর চোখ স্থির, শরীর স্পন্দনহীন—তিনি গভীর সমাধিতে মগ্ন হয়ে গেলেন। এদিকে দেবীর আসনে বসা মা সারদাও যেন এক অন্য জগতে প্রবেশ করলেন। ঠাকুরের পূজার আকর্ষণে তিনিও বাহ্যজ্ঞান হারিয়ে এক গভীর আধ্যাত্মিক স্তরে চলে গেলেন। স্থির হয়ে বসে রইলেন তিনি। ঘরের ভেতরে তখন যেন দুই ভিন্ন শরীর, কিন্তু আত্মা এক হয়ে মিলেমিশে গেছে মহাশূন্যে। দীর্ঘক্ষণ সেই নিস্তব্ধ ঘরের ভেতর এক অপার্থিব পরিবেশ বজায় রইল।
রাত আরও গভীর হলো। ধীরে ধীরে ঠাকুরের সমাধি ভাঙল। তিনি আবার এই জগতের চেতনায় ফিরে এলেন। তখন তিনি তাঁর নিজের জপের মালাটি হাতে নিলেন। এতকাল ধরে তিনি যা কিছু কঠোর সাধনা করেছেন, ঈশ্বর লাভের যে পুণ্য অর্জন করেছেন, তা সবটুকু, সেই মালার সাথে তিনি মা সারদার ওই পদ্মচরণে অঞ্জলি দিয়ে সমর্পণ করলেন।