05/10/2025
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা: উৎপত্তি ও ইতিহাস
শারদীয়া দুর্গোৎসবের পর আশ্বিন মাসের শেষে পূর্ণিমা তিথিতে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজার আরাধনা করা হয়। প্রায় প্রতি ঘরে ঘরেই দেবী লক্ষ্মীর পুজো হয়ে থাকে। লক্ষ্মী হলেন ধন সম্পত্তির দেবী। ধন সম্পদের আশায় ঘরে ঘরে কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা হয়ে থাকে। নারী পুরুষ উভয়েই এই পুজোয় অংশ গ্রহণ করেন।অনেকেই সারা বছর প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর পুজো করে থাকেন। এছাড়া শস্য সম্পদের দেবী বলে ভাদ্র সংক্রান্তি, পৌষ সংক্রান্তি ও চৈত্র সংক্রান্তিতে এবং আশ্বিন পূর্ণিমা ও দীপাবলীতে লক্ষ্মীর পুজো হয়। লক্ষণীয় বিষয় হল-খারিফ শস্য ও রবি শস্য ঠিক যে সময় হয় ঠিক সেই সময় মেতে ওঠে লক্ষ্মীর আরাধনায়।
তবে পুজোর উপাচারে পরিবর্তন হয় মাস ভেদে।বর্তমানে গৃহস্থের সুবিধের জন্যই হােক বা পুরােহিতের স্বল্পতার জন্য, লক্ষ্মী পুজো (বারােমেসে পুজো বাদে) হয় সকাল থেকেই। কিন্তু কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর প্রকৃষ্ট সময় প্রদোষকাল। অর্থাৎ সূর্যাস্ত থেকে দু ঘণ্টা পর্যন্ত যে সময়। যদিও প্রদোষ থেকে নিশীথ অবধি তিথি থাকলেও সেই প্রদোষেই পুজো বিহিত। কিন্তু আগেরদিন রাত্রি থেকে পরদিন প্রদোষ পর্যন্ত তিথি থাকলে পরদিন প্রদোষেই পুজো করা বিধেয়। আবার আগেরদিন রাতে তিথি থাকলেও যদি পরদিন প্রদোষে তিথি না থাকে তাহলে আগেরদিন প্রদোষেই পুজো করা কর্তব্য।
💥কোজাগরী শব্দের অর্থঃ
কোজাগরী' শব্দটির উৎপত্তি কো জাগতী’ অর্থাৎ কে জেগে আছ' কথাটি থেকে। বলা হয়, যার কিছু (সম্পত্তি) নেই সে পাওয়ার আশায় জাগে, আর ‘যার আছে (সম্পত্তি) যে না হারানাের আশায় জাগে। আর সারারাত জেগে লক্ষ্মীর আরাধনা করাই এই পুজোর বিশেষ আচার। কথিত আছে কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার দিন দেবী রাত্রে খোজ নেন। কে জেগে আছেন?
💥নানা ভাবে লক্ষ্মী দেবীর কল্পনাঃ
১) মূর্তি: মাটির দিয়ে তৈরী ছাচে বা কাঠামাে তৈরি করে তাতে দেবী মূর্তি তৈরি করে পূজা করা হয়।
২) কলার বেড়: কলার বাকলকে গােল করে নারকেলের নতুন কাঠি দিয়ে আটকানাে হয়। তাতে সিঁদুর দিয়ে বাঙালি স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা হয়। কলার বাকল দিয়ে তৈরী এই চোঙাকৃতি ভিতরে নিচুনি রাখা হয়। কাঠের আসনের উপরে লক্ষ্মীর পা অঙ্কিত আলপনার উপরে ৯টি চোঙা রাখা হয়। এই ৯টি বাকলের মধ্যে পঞ্চশস্য দেওয়া হয় সর্বশেষে শিস যুক্ত নারকেল রেখে লাল চেলি দিয়ে ঢেকে বউ সাজিয়ে লক্ষ্মী কল্পনা করা হয়।
৩) সপ্ততরী: নবপত্রিকা বা কলার পেটোর তৈরি নৌকা এই পূজার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই নৌকা এখনও বহু গৃহস্থেই তৈরি হয়ে থাকে। তবে বাজারেও এখন কিনতে পাওয়া যায় কলার পেটো। একে সপ্ততরী বলা হয়। এই তরীকে বাণিজ্যের নৌকা হিসাবে ধরা হয়। তাতে অনেকেই টাকা -পয়সা, চাল, ডাল, হরিতকি, কড়ি, হলুদ সাজিয়ে রাখেন।
৪) লক্ষ্মীর মুখ সমন্বিত পােড়া মাটির ঘট: লক্ষ্মীর মুখ সমন্বিত পােড়া মাটির ঘটে চাল বা কখনাে কখনাে জল ভরে সেটিকে লক্ষ্মী কল্পনা করে পূজা করা হয়।
৫) অনেক বাড়িতেই পূর্ববঙ্গীয় রীতি মেনে সরার পটচিত্রে পুজো করা হয়। এই সরাতে লক্ষ্মী, জয়া-বিজয়া সহ কয়েকটি বিশেষ পুতুলকে চিত্রায়িত করা হয়। দেবী লক্ষ্মী ধনসম্পদ, আধ্যাত্মিক সম্পদ, সৌভাগ্য ও সৌন্দর্যের দেবী। তিনি বিষ্ণুর পত্নী। তার অপর নাম মহালক্ষ্মী। জৈন ধর্মেও দেবী লক্ষ্মী পূজিত ও স্বীকৃত ছিলেন, কারণ প্রাচীন জৈন ধর্মেও দেবী লক্ষ্মী পূজিত ও স্বীকৃত ছিলেন, কারণ প্রাচীন জৈন স্মারকগুলিতেও লক্ষ্মীর ছবি দেখা যায়।লক্ষ্মী ছয়টি বিশেষ গুণের দেবী। পৌরাণিক মত অনুসারে তিনি বিষ্ণুর শক্তিরও উৎস। বিষ্ণু রাম ও কৃষ্ণ রূপে অবতার গ্রহণ করলে, লক্ষ্মী সীতা রূপে তাদের সঙ্গিনী হন। কৃষ্ণের দুই স্ত্রী রুক্মিনী ও সত্যভামাও লক্ষ্মীর অবতার রূপে কল্পিত হন।
➡️লক্ষ্মীর রূপভেদঃ
অষ্টলক্ষ্মী হলেন সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আটটি বিশেষ রূপ। তারা সম্পদের আট উৎস তথা লক্ষ্মীদেবীর শক্তির প্রতীক। অষ্টলক্ষ্মী লক্ষ্মীর অপ্রধান রূপভেদ। অষ্টলক্ষ্মী “সম্পদ” কথাটির অর্থ হল সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য, জ্ঞান, শক্তি, সন্তানাদি ও ক্ষমতা। মন্দিরে অষ্টলক্ষ্মীকে একযােগে পূজা করা হয়ে থাকে।
💥শ্রীঅষ্টলক্ষ্মীস্তোত্রম্
অনুযায়ী অষ্টলক্ষ্মী হলেন:
১) আদিলক্ষ্মী বা মহালক্ষ্মী: লক্ষ্মীর আদিরূপ এবং ঋষি ভৃগুর কন্যারূপে লক্ষ্মীর অবতার।
২) ধনলক্ষ্মী: লক্ষ্মীর অর্থ ও স্বর্ণদাত্রী রূপ।
৩) ধান্যলক্ষ্মী: কৃষিসম্পদদাত্রী লক্ষ্মী।
৪) গজলক্ষ্মী: গবাদি পশু ও হস্তীরূপ সম্পদদাত্রী লক্ষ্মী। স্বামী চিদানন্দের মতে গজলক্ষ্মী রাজক্ষমতা প্রদান করেন। পুরাণ অনুযায়ী, গজলক্ষ্মী দেবরাজ ইন্দ্রকে সমুদ্রগর্ভ থেকে তার হারানাে সম্পদ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বসুধা নারায়ণ “গজলক্ষ্মী” শব্দটির
ব্যাখ্যা করেছেন “গজ অর্থাৎ হাতিদের দ্বারা পূজিত লক্ষ্মী”।
৫) সন্তানলক্ষ্মী: সন্তানপ্ৰদাত্রী লক্ষ্মী।
৬) বীরলক্ষ্মী বা ধৈর্যলক্ষ্মী: যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্ব এবং জীবনের কঠিন সময়ে সাহস প্রদানকারী লক্ষ্মী।
৭) বিজয়লক্ষ্মী বা জয়লক্ষ্মী: বিজয় প্রদানকারিনী লক্ষ্মী, কেবলমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রেই নয় বরং কঠিন সময়ে বাধাবিপত্তি জয় করে সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রেও।
৮) বিদ্যালক্ষ্মী: কলা ও বিজ্ঞানের জ্ঞানপ্রদানকারিনী লক্ষ্মী।
💥কোনাে কোনাে অষ্টলক্ষ্মী তালিকায় লক্ষ্মীর অন্যান্য কয়েকটি রূপও অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকে:
১) ঐশ্বর্যলক্ষ্মী: ঐশ্বর্যপ্ৰদাত্রী লক্ষ্মী।
২) সৌভাগ্যা: সৌভাগ্য প্রদানকারিনী।
৩) রাজ্যলক্ষ্মী: “যিনি শাসককে আশীর্বাদ করেন।
৪) বরলক্ষ্মী: “যে দেবী সুন্দর বর প্রদান করেন।”
#মাতালক্ষী