27/01/2026
#একাদশী উপবাস কি? কিভাবে জগতে একাদশী উপবাসের প্রচলন হয়? একাদশীদেবীর আবির্ভাব কীভাবে হয়েছে?
একাদশী উপবাস: জ্যোতিষশাস্ত্র বা বৈদিক দিনপঞ্জি অনুযায়ী, মাসের শুক্ল এবং কৃষ্ণ এ দুটি পক্ষের একাদশ তিথিতে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের প্রীতি বিধানের জন্য ভক্ত যে উপবাস পালন করেন তাঁকে একাদশী উপবাস বলা হয়। অনেকের ধারনা উপবাস মানে শুধু অনাহারে থাকা। কিন্তু শাস্ত্রের দৃষ্টিতে উপবাসের অর্থ সেটি নয়।বরং উপ' শব্দে নিকটে এবং 'বাস' শব্দে অবস্থান করাকে নির্দেশ করে। সুতরাং উপবাস শব্দের অর্থ হল আমাদের ৫টি কর্মেন্দ্রিয়, ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং মনকে সর্বগুণের ঈশ্বর পরমাত্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শ্রীচরনারবিন্দে সম্পূর্ণরূপে নিবদ্ধ করে তাঁর নিকটে বাস করার যে প্রয়াস তাকে উপবাস বলা হয়। এ বিষয়ে স্কন্দপুরাণে (বিষ্ণুখণ্ড, মার্গশীর্ষমাসমাহাত্ম্য) বলা হয়েছে-
"উপবৃত্তন্তু পাপেভ্যো যজ্ঞ বাসো গুণৈঃ সহ।
উপবাসঃ স বিজ্ঞেয়ো ন শরীরস্য শোষণম্ ॥
পাপের প্রবৃত্তি হতে নিবৃত্তি এবং গুণ সকলের সাথে বসবাস, একেই উপবাস বলে; কিন্তু কেবল শরীর শোষণ উপবাস নয়।" অগ্নিপুরাণেও (১৫৭.৫-৬) একই কথা বলা হয়েছে।
একাদশী উপবাসের প্রচলনঃ পদ্মপুরাণের ক্রিয়াযোগসারের বর্ণনা অনুযায়ী—
"একসময় জৈমিনি ঋষি তাঁর গুরুদেব মহর্ষি ব্যাসদেবকে জিজ্ঞেস করলেন, হে গুরুদেব, সম্প্রতি অখিল পাপনাশক একাদশীর ফল সকল সযত্বে শুনতে ইচ্ছা করি। হে বিজ্ঞ, জগতে কি কারণে একাদশীর আবির্ভাব? ঐ একাদশীর বিধি কি? একাদশী পালন কখন কর্তব্য? তার কি ফল- এ সকল আমাকে বলুন। হে সদগুণ সাগর! একাদশীতে কোন্ দেব(ঈশ্বর) বিশেষ ভাবে পূজিত হন? যে ব্যক্তি একাদশী পালন করে না তার কি ক্ষতি হয়? এসমস্ত বিষয়ে আপনি দয়া করে বলুন।
মহর্ষি ব্যাসদেব তখন বলতে লাগলেন,হে বিপ্রসত্তম! নারায়ণ ভিন্ন অন্য কেউ সম্যকরূপে একাদশীর ফল বর্ণনা করতে সমর্থ নয়। তাই তোমার নিকট তা আমি সংক্ষেপে বলছি।সৃষ্টির প্রারম্ভে পরমেশ্বর ভগবান এ জড়সংসারে স্থাবর জঙ্গম সৃষ্টি করে সকলের শাসনের জন্য এক পাপপুরুষ নির্মাণ করলেন। সেই পাপপুরুষের অঙ্গগুলো বিভিন্ন পাপ দিয়েই নির্মিত হলো। একসময় পাপপুরুষের ভয়ঙ্কর প্রভাব দর্শন করে ভগবান শ্রীবিষ্ণু মর্ত্যের মানব জাতির দুঃখমোচন করার কথা চিন্তা করতে লাগলেন। একদিন গরুড়ের পিঠে চড়ে ভগবান যমরাজের আলয়ে আগমন করেন। ভগবানকে দর্শন করে যমরাজ উপযুক্ত স্বর্ণ সিংহাসন বসিয়ে পাদ্য, অর্ঘ্য ইত্যাদি দিয়ে যথাবিধি পূজা করলেন।যমরাজের সঙ্গে কথোপকথন কালে ভগবান শুনতে পেলেন দক্ষিণ দিক থেকে অসংখ্য জীবের আর্তক্রন্দন ধ্বনি। প্রশ্ন করলেন- এ আর্তক্রন্দন কেন? যমরাজ বললেন, হে প্রভু, মর্ত্যের পাপী মানুষেরা নিজ কর্মদোষে নরকযাতনা ভোগ করছে। সেই যাতনার আর্ত চিৎকার শোনা যাচ্ছে। যন্ত্রণাকাতর পাপাচারী জীবদের দর্শন করে করুণাময় ভগবান চিন্তা করলেন- "আমিই সমস্ত প্রজা সৃষ্টি করেছি, আমার সামনেই ওরা কর্মদোষে দুষ্ট হয়ে নরক যাতনা ভোগ করছে, এখন আমিই এদের সদ্গতির ব্যবস্থা করবো।" ভগবান শ্রীহরি সেই পাপাচারীদের সামনে একাদশী তিথি রূপে এক দেবীমূর্তিতে প্রকাশিত হলেন। সেই পাপীদের একাদশী ব্রত আচরণ করালেন। একাদশী ব্রতের ফলে তারা সর্বপাপ মুক্ত হয়ে বৈকুন্ঠ ধামে গমন করলেন।
একাদশী তিথিকে সমস্ত সৎকর্ম্মের মধ্যে উত্তম এবং জগৎপাবনী জেনে ভীত পাপপুরুষ বিষ্ণুর স্তব করার জন্য তার নিকটে উপস্থিত হলেন এবং কৃতাঞ্জলিপুটে বলতে লাগলেন,হে ভগবান, দয়া করে আপনি আমার দুঃখ দূর করুন। একাদশী তিথির ভয় থেকে আমাকে রক্ষা করুন। হে কৈটভনাশন, আমি একমাত্র একাদশীর ভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন করছি।মানুষ, পশুপাখি, কীট,পতঙ্গ, জল,স্থল, বন,প্রান্তর, পর্বত,সমুদ্র, বৃক্ষ, নদী, স্বর্গ,মর্ত্য, পাতাল সর্বত্রই আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছি, কিন্তু একাদশীর প্রভাবে কোথাও নির্ভয় স্থান পাচ্ছি না দেখে আজ আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। হে ভগবান, এখন দেখছি, আপনার সৃষ্ট অনন্ত কোটি ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে একাদশীই প্রাধান্য লাভ করেছে,সেজন্য আমি কোথাও আশ্রয় পেতে পারছি না। আপনি কৃপা করে আমাকে একটি নির্ভয় স্থান প্রদান করুন, যেহেতু তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছেন। ব্যাসদেব বললেন, এই বলে পাপপুরুষ ভূমিতে পতিত হয়ে গলদ অশ্রু নয়নে ক্রন্দন করতে লাগলেন।
পাপপুরুষের দর্শনে ভগবান্ প্রসন্ন হয়ে একাদশী ভীত পাপপুরুষকে বললেন, হে পাপপুরুষ! উঠে দাঁড়াও, আনন্দিত হও, একাদশী তিথিতে তোমার যেখানে স্থান, আমি তা তোমাকে এখন নির্দেশ করছি। যখন একাদশী তিথি এ ত্রিভুবনকে পবিত্র করতে আবির্ভূত হবে, তখন তুমি অন্ন (শস্য) মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করবে। তাহলে আমার মূর্তি একাদশী তোমাকে বধ করতে পারবে না। এই কথা বলে ভগবান্ অন্তর্হিত হলেন। পাপপুরুষও কৃতার্থ হয়ে যথাযথ স্থানে ফিরে গেলেন। এই কারণেই আত্মহিতকামী মানবগণ একাদশীতে অন্ন (শস্য) গ্রহণ করেন না। সংসারের যাবতীয় পাপ, নারায়ণ আজ্ঞায় একাদশী দিনে অন্নকে (শস্য) আশ্রয় করে অবস্থান করে। "
তবে, একাদশী ব্রত ঐদিন থেকে শুরু হলেও, একাদশীদেবীর আবির্ভাব হয়েছিল আরো অনেক আগে।
একাদশী দেবীর আবির্ভাব: সত্যযুগে 'মুর' নামে এক দানব ছিল। সে এতই দুরাচারী ছিল যে যুদ্ধে স্বর্গরাজ্য ইন্দ্রকে পরাজিত করে স্বর্গ থেকে বিতাড়িত করেছিল। দেবতারা মহাদেবের কাছে তাদের দুঃখের কথা বললে মহাদেব তাঁদের নিয়ে ক্ষীর সমুদ্রের তীরে বিষ্ণুর কাছে গেলেন। বিষ্ণু দেবতাদের কাছ থেকে জানলেন যে, প্রাচীনকালে ব্রহ্ম বংশে তালজঙ্গা নামে পরাক্রমশালী অসুর ছিল। তারই পুত্র মুর। সে স্বর্গ থেকে দেবতাদের বিতাড়িত করে তার স্বজাতি কাউকে রাজা, কাউকে অন্যান্য দিকপালরূপে প্রতিষ্ঠা করে এখন দেবলোক সম্পূর্ণ অধিকার করেছে। একথা শুনে ভগবান ক্রোধান্বিত হয়ে দেবতাদের সাথে চন্দ্রাবতী পুরীতে গেলেন। দেবতার ও অসুরদের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ হলো। কেবলমাত্র যুদ্ধক্ষেত্রে নারায়ণকে একা দেখে সে দানব গর্জন করতে থাকলো। মুর দানব একমাত্র জীবিত ছিল। দেবতাদের হিসাবে ১০০০ বছর যুদ্ধ করার পরও সে পরাজিত হল না। তখন বদ্রিকাশ্রমে ভগবান বিষ্ণু সিংহবতী নামক এক গুহায় শয়ন করলেন। সেখানে এক দানব বিষ্ণুকে নিদ্রিত দেখে মনে করলো বিষ্ণু ভয়ে শয়ন করে আছে। দানবের এই চিন্তার কারণে বিষ্ণুর দেহ থেকে এক কন্যা উৎপন্ন হলো। তার নাম উৎপন্না একাদশী। সে মুর দানবকে বধ করল। বিষ্ণু নিদ্রা থেকে উঠার পর দেখল এই কন্যা মুর দানবকে বধ করেছে।
বিষ্ণু এই একাদশীকে বর দিলেন এই ব্রত পালনকারীর সমস্ত ইচ্ছা পূর্ণ হবে। এই একাদশী ব্রত পালন করলে বিষ্ণুরই পূজা হবে। এই ব্রত পালনকারীর শত্রু বিনাশ, পরমগতি ও সর্বসিদ্ধি লাভ হবে। একাদশীর উৎপত্তি কোথা থেকে হলো তা শ্রবণ কীর্তন করলে শ্রীহরির আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
তো, যদিও আগে একাদশী ব্রত লোকে করত, তবে তা সেভাবে প্রচলিত ছিল না, কিন্তু ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং পাপী জীবদের উদ্ধার করার জন্য এই ব্রত এভাবে প্রচলন করেছেন।