12/01/2026
মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ছিঁড়ে যখন অবিনাশবাবুর শেষ নিঃশ্বাসটা বেরিয়ে গেল, ঘরজুড়ে তখন এক অদ্ভুত শূন্যতা। দেওয়াল ঘড়ির কাঁটাটা যেন মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। পরক্ষণেই তিনি দেখলেন, তিনি নিজের অসাড় শরীরের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছেন। ভারী অদ্ভুত সেই অনুভূতি— কোনো যন্ত্রণা নেই, নেই দীর্ঘদিনের শ্বাসকষ্টের ছটফটানি; শুধু এক আশ্চর্য গুরুত্বহীন হালকা বোধ।
নিচে তখন শোকের চেয়েও ব্যস্ততার আর্তনাদ বেশি। বড় ছেলে আলমারির চাবির গোছা খুঁজছে, মেজ ছেলে ফোনে ব্যস্ত দাহকার্যের খরচের হিসেব নিয়ে। অবিনাশবাবু তাদের ডাকলেন, চিৎকার করে বলতে চাইলেন— "চাবিটা তো বালিশের নিচে!" কিন্তু কেউ শুনল না। তিনি বুঝতে পারলেন, শব্দের জগত থেকে তিনি চিরতরে বিচ্যুত। আজীবন যে শরীরটাকে তেল-জল দিয়ে আগলে রাখলেন, সেই 'আমি' আজ এক নিথর বস্তু মাত্র।
অবিনাশবাবু দেখলেন, তার সারাজীবনের সঞ্চয় আর অহংকারগুলো এখন কেবলই ভাগাভাগির অপেক্ষায়। মানুষ মরে গেলে তার দেহটা যেমন পর হয়ে যায়, তার দাবিগুলোও তেমন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এক পশলা শীতল বাতাসের মতো তিনি জানালার বাইরে অসীম আকাশের নীলে ভাসতে শুরু করলেন। নিজের শরীরের দিকে শেষবার তাকিয়ে তার মনে হলো— খাঁচাটা পড়ে রইল মাটির পৃথিবীতে, আর 'পাখি'টা বুঝে নিল যে মুক্তির স্বাদ আসলে কোনো মালিকানায় নেই, আছে কেবল নিঃস্ব হয়ে বিলীন হয়ে যাওয়ায়। এক পরম শান্তিময় আলোর ভুবনে তিনি মিশে গেলেন, যেখানে কোনো 'আমার' নেই, আছে শুধু 'আমি'হীন এক অনন্ত তৃপ্তি।