09/06/2026
লোকটাকে দেখে ঠিক ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলেন অনিমেষবাবু। এই মুহূর্তে তিনি শুয়ে আছেন দক্ষিণ কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে— মাথায় হনুমান-টুপির মতো করে ব্যান্ডেজ বাঁধা। ডাক্তারবাবু আগেভাগেই বলে দিয়েছিলেন যে এই সার্জারি সফল হওয়ার সম্ভাবনা ন্যূনতম। কিন্তু তা সত্ত্বেও এযাত্রায় প্রাণটা বেঁচে গেছে বুঝতে পেরে তিনি এখন যত না আনন্দিত, তার চেয়েও বেশি অবাক হয়েছেন এমন একটা জায়গায় ডাক্তার, নার্স, নিজের স্ত্রী-কন্যা আর শ্যালকের পাশে, মুখে পাগলাটে হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই লোকটাকে দেখে। এমনিতে বছর পাঁচেক আগে রাস্তায় দেখা কোনো পাগলকে কারোর মনে থাকার কথা নয়, কিন্তু এই লোকটাকে অবিনাশবাবুর মনে আছে একটা বিশেষ কারণে— লোকটার গায়ের রং কুচকুচে কালো। এমন কালো মানুষ তিনি আর কখনও দেখেননি। সেইবার অফিস যাওয়ার পথে তাঁর শীততাপনিয়ন্ত্রিত ক্যাবটা যখন চিংড়িঘাটার সিগন্যালে দাঁড়িয়েছিল, তখন কোথা থেকে যেন উদয় হয়ে জানালার কাঁচে টোকা দিয়েছিল এই লোকটা। অসম্ভব কালো গায়ের রং, জটপাকানো চুল-দাড়ি, পরনে শুধু একটা ময়লা ছেঁড়া লুঙ্গি। প্রথমটায় ভেবেছিলেন বুঝি ভিখারি, তাই চালককে কাঁচ নামানোর নির্দেশ দিয়ে মানিব্যাগের দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন। তবে কাঁচ নেমে যেতেই সে হঠাৎ করে বলে উঠেছিল, "আরে সাব! আপকে সাথ তো মেরা খুন কা রিশতা হ্যায়!"
একথা শুনে অনিমেষবাবুকে ভড়কে যেতে দেখে চালক হেসে বলেছিল, "এলাকায় নতুন আমদানি হয়েছে স্যার, গত তিন-চারদিন ধরেই দেখছি এখানে।" এরপর সিগন্যাল সবুজ হয়ে যেতেই তিরবেগে গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছিল সে।
ডাক্তাবাবুর কথায় তিনি আবার বর্তমানে ফিরে এলেন, "মিট হিম মিঃ সান্যাল, ইউ হ্যাভ হ্যাড আ ম্যাসিভ ব্লাড লস ডিউরিং দ্য সার্জারি। আর আপনি তো জানেনই, আপনার ব্লাড গ্রুপ কতটা রেয়ার। ওই গ্রুপের তিন ইউনিট ব্লাড জোগাড় করা খুবই আর্জেন্ট হয়ে পড়েছিল। আপনার ফ্যামিলি বা আমরা, কারোর পক্ষ থেকেই সেটা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই ভদ্রলোক যদি স্বেচ্ছায় ব্লাড ডোনেট করতে রাজি না হতেন, তাহলে হয়তো আপনাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না।"
অবিনাশবাবুর মাথা কাজ করছিল না; তিনি শুধু শুনলেন লোকটা তার সেই পাগলাটে হাসিটা ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখেই বলছে, "আপকো বোলা থা না সাব, আপকে সাথ মেরা খুন কা রিশতা হ্যায়!"