10/08/2026
তিরঙ্গা যাত্রা কি সত্যিই নতুন কোনও ঐতিহ্য? উত্তরটা খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় প্রায় ১২০ বছর আগে। আজকের জাতীয় পতাকার ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার নাম। ১৯০৬ সালে এই শহরেই স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় একটি জাতীয় পতাকা প্রকাশ্যে উত্তোলন করা হয়েছিল। তারপর ভিকাজি কামা, পিংগালি ভেঙ্কাইয়া, মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে ১৯৩১ সালের কংগ্রেসের তিরঙ্গা—একাধিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে আজকের জাতীয় পতাকা।
১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই গণপরিষদ বর্তমান তিরঙ্গাকে গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পরে পতাকা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীক। আর ২০২২ সালে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচির মাধ্যমে পতাকা আবার পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। সেখান থেকেই নতুন মাত্রা পায় তিরঙ্গা যাত্রা। আজকের কলকাতার রাজপথের এই যাত্রার পিছনে তাই রয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিস্তৃত এক দীর্ঘ ইতিহাস।
----
আজ যে তিরঙ্গাকে আমরা ভারতের জাতীয় পতাকা হিসেবে চিনি, তার ইতিহাস আসলে স্বাধীনতার বহু বছর আগে শুরু হয়েছিল। বর্তমান পতাকার রূপ একদিনে তৈরি হয়নি। প্রায় চার দশক ধরে একাধিক নকশা, রং, প্রতীক এবং রাজনৈতিক ভাবনার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে আজকের জাতীয় পতাকা। আর এই ইতিহাসের একেবারে প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার নাম। ১৯০৬ সালের ৭ অগস্ট কলকাতার পার্সি বাগান স্কোয়ারে, বর্তমানে যেটি গ্রিন পার্ক নামে পরিচিত, একটি জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছিল। সেই পতাকা আজকের তিরঙ্গা ছিল না। তাতে ছিল লাল, হলুদ এবং সবুজ রঙের তিনটি অনুভূমিক অংশ। মাঝের হলুদ অংশে লেখা ছিল ‘বন্দে মাতরম্’। অন্য অংশে ছিল পদ্ম, সূর্য এবং অর্ধচন্দ্রের প্রতীক। স্বদেশি আন্দোলনের উত্তাল সময়ে এই পতাকা উত্তোলনের ঘটনা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এর ঠিক এক বছর পর, ১৯০৭ সালে, ভারতের স্বাধীনতার দাবি দেশের সীমানা পেরিয়ে ইউরোপেও পৌঁছে যায়। বিপ্লবী ভিকাজি কামা এবং তাঁর সহযোগীরা জার্মানির স্টুটগার্টে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে ভারতের স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেন। বিদেশের মাটিতে ভারতীয় স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে পতাকা তুলে ধরার এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। তখনও ভারতের কোনও সরকারি জাতীয় পতাকা ছিল না। বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী নিজেদের ভাবনা অনুযায়ী পতাকা ব্যবহার করছিল। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—পতাকা ধীরে ধীরে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ভারতের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠছে।
১৯১৭ সালে অ্যানি বেসান্ত এবং বাল গঙ্গাধর তিলকের নেতৃত্বে হোম রুল আন্দোলনের সময়ও একটি আলাদা পতাকা ব্যবহৃত হয়। সেই পতাকায় ছিল লাল ও সবুজ রঙের একাধিক অনুভূমিক দাগ, সপ্তর্ষিমণ্ডলের আদলে সাতটি তারা, এক কোণে ইউনিয়ন জ্যাক এবং অন্য অংশে চাঁদ ও তারার প্রতীক। এই একের পর এক পরিবর্তন থেকেই বোঝা যায়, স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতারা এমন একটি পতাকার সন্ধান করছিলেন, যা একই সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং মানুষের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
এই সন্ধানের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত হয়ে যান পিংগালি ভেঙ্কাইয়া। ১৯১৬ সালে তিনি ভারতের জন্য একটি জাতীয় পতাকার সম্ভাব্য নকশা নিয়ে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে দীর্ঘ গবেষণার পর তিনি ভারতের জন্য উপযুক্ত একটি পতাকার ধারণা তুলে ধরেছিলেন। তাঁর এই কাজ পরবর্তীকালে জাতীয় পতাকার নকশা তৈরির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ভেঙ্কাইয়ার নাম তাই ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
১৯২১ সালে বিজয়ওয়াড়ায় কংগ্রেসের অধিবেশনের সময় ভেঙ্কাইয়া মহাত্মা গান্ধীর সামনে একটি পতাকার নকশা উপস্থাপন করেন। প্রাথমিক নকশায় ছিল লাল ও সবুজ রং। পরে গান্ধীর পরামর্শে সাদা রং এবং চরকার প্রতীক যুক্ত হয়। চরকা তখন শুধুমাত্র একটি নকশা ছিল না। স্বদেশি, দেশীয় উৎপাদন, আত্মনির্ভরতা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের যোগকে প্রকাশ করত চরকা। ফলে পতাকা ক্রমশ রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রামের সঙ্গেও যুক্ত হতে শুরু করে।
১৯২০ এবং ১৯৩০-এর দশকে জাতীয় পতাকা আরও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সভা, মিছিল, প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন জনসমাবেশে পতাকা হাতে মানুষের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ সরকারের চোখে পতাকা ছিল রাজনৈতিক প্রতিরোধের দৃশ্যমান চিহ্ন, আর আন্দোলনকারীদের কাছে সেটি ছিল স্বাধীন ভারতের স্বপ্নের প্রতীক। এই সময় থেকেই পতাকা হাতে মিছিলের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা দিবসের শোভাযাত্রা এবং জাতীয় পতাকা-কেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মসূচির ভিত সেখানেই তৈরি হয়।
১৯৩১ সালে জাতীয় পতাকার ইতিহাসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। কংগ্রেস একটি নতুন তিরঙ্গা গ্রহণ করে। উপর থেকে গেরুয়া, সাদা এবং সবুজ—এই তিনটি রঙের অনুভূমিক বিন্যাসের মাঝখানে রাখা হয় চরকা। এই পতাকার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছিল যে রংগুলিকে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসেবে দেখা উচিত নয়। পতাকাটিকে একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এই ১৯৩১ সালের পতাকাই পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরি হয়ে ওঠে।
এরপর আসে ১৯৪৭ সাল। স্বাধীনতার সময় যত এগিয়ে আসছিল, ততই প্রয়োজন হয়ে পড়ছিল এমন একটি পতাকার, যা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নয়, বরং নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতীক হতে পারে। ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই গণপরিষদের বৈঠকে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জওহরলাল নেহরু ভারতের জাতীয় পতাকার প্রস্তাব পেশ করেন। গেরুয়া, সাদা এবং গাঢ় সবুজ—তিনটি সমান অনুভূমিক অংশের মাঝখানে নীল রঙের অশোকচক্র রাখার প্রস্তাব গৃহীত হয়। পতাকার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত নির্ধারণ করা হয় ৩:২।
এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। ১৯৩১ সালের পতাকার মাঝখানে থাকা চরকার জায়গা নেয় অশোকচক্র। সারনাথের অশোকস্তম্ভের ধর্মচক্র থেকে নেওয়া এই প্রতীকে ছিল ২৪টি কাঁটা। চরকা স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বদেশি এবং আত্মনির্ভরতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলেও অশোকচক্র স্বাধীন রাষ্ট্রের আরও বিস্তৃত ঐতিহাসিক ও নৈতিক পরিচয়কে তুলে ধরার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে স্বাধীন ভারতের পতাকা একই সঙ্গে অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখল এবং নতুন রাষ্ট্রের পরিচয়ও প্রকাশ করল।
এরপর আসে ১৯৪৭ সালের ১৫ অগস্ট। ভারত স্বাধীন হল। যে পতাকা কয়েক দশক ধরে স্বাধীনতা আন্দোলনের মিছিল, সভা এবং প্রতিবাদের মধ্যে মানুষের হাতে ঘুরেছে, সেই পতাকাই এবার স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকা হিসেবে নতুন মর্যাদা পেল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক থেকে তিরঙ্গা পরিণত হল একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারি পরিচয়ে।
স্বাধীনতার আগে পতাকা হাতে মিছিল ছিল মূলত স্বাধীনতার দাবি, রাজনৈতিক প্রতিবাদ এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অংশ। স্বাধীনতার পরে সেই একই পতাকা ধীরে ধীরে নতুন অর্থ পেতে শুরু করল। স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান, স্কুলের কর্মসূচি, সরকারি আয়োজন, সামাজিক সংগঠনের শোভাযাত্রা এবং সাধারণ মানুষের উদযাপনে তিরঙ্গা জায়গা করে নিল। অর্থাৎ স্বাধীনতার সঙ্গে তিরঙ্গার সম্পর্ক শেষ হয়নি; বরং তার ভূমিকা বদলে গিয়ে আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এই দীর্ঘ ইতিহাসের পরবর্তী বড় অধ্যায় শুরু হয় ২০২২ সালে। ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে শুরু হয় ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচি। উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় পতাকাকে শুধু সরকারি ভবন বা আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া। সেই কর্মসূচির সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় তিরঙ্গা যাত্রা, তিরঙ্গা বাইক র্যালি, পদযাত্রা এবং নানা ধরনের জনসম্পৃক্ত অনুষ্ঠানও যুক্ত হয়। ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যে পতাকা মানুষের হাতে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে উঠেছিল, বহু দশক পরে সেটিই আবার ব্যাপক জনঅংশগ্রহণের কেন্দ্র হয়ে সামনে আসে।
এই জায়গা থেকেই আজকের তিরঙ্গা যাত্রার ইতিহাসকে বোঝা যায়। এর কোনও একক প্রতিষ্ঠাবর্ষ বা একক প্রতিষ্ঠাতা নেই। তিরঙ্গা হাতে মিছিলের শিকড় স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে, আর ‘তিরঙ্গা যাত্রা’ নামে সংগঠিত আধুনিক কর্মসূচি সাম্প্রতিক দশকে বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। ১৯০৬ সালের কলকাতার সেই প্রথম দিকের জাতীয় পতাকা থেকে ১৯৪৭ সালের স্বাধীন ভারতের তিরঙ্গা, আর সেখান থেকে ২০২২ সালের ‘হর ঘর তিরঙ্গা’—এই দীর্ঘ পথ পেরিয়েই আজকের তিরঙ্গা যাত্রার সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।
স্বাধীনতার পরে তিরঙ্গা আর শুধু রাষ্ট্রের প্রতীক হয়ে থাকেনি। ধীরে ধীরে এটি সাধারণ মানুষের স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন, বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক সংগঠনের কর্মসূচি এবং বিভিন্ন শোভাযাত্রারও অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তবে স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পতাকা হাতে মিছিলের যে রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল, স্বাধীনতার পরে তার চরিত্র বদলে যায়। তখন আর ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য পতাকা হাতে রাস্তায় নামতে হয়নি; স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের জাতীয় পরিচয় উদ্যাপন করাই হয়ে ওঠে মূল বিষয়। বিভিন্ন শহর ও রাজ্যে স্বাধীনতা দিবসের আগে বা ১৫ অগস্টকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে পতাকা মিছিল, পদযাত্রা এবং বাইক র্যালি চলতে থাকে। অর্থাৎ তিরঙ্গা যাত্রার কোনও একক সূচনাবিন্দু তৈরি হয়নি, বরং স্বাধীনতার পর কয়েক দশক ধরে নানা ধরনের স্থানীয় কর্মসূচির মধ্যে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
এই জায়গায় ২০২২ সাল একটি বিশেষ মোড় তৈরি করে। ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’-এর অধীনে শুরু হয় ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই উদ্যোগের আহ্বান জানান। লক্ষ্য ছিল ২০২২ সালের ১৩ অগস্ট থেকে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত দেশের সাধারণ মানুষকে নিজেদের বাড়িতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনে উৎসাহিত করা। এর পিছনে শুধু স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের ভাবনা ছিল না; জাতীয় পতাকার সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্দেশ্যও ছিল। এতদিন তিরঙ্গার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেকটাই সরকারি ভবন, বিদ্যালয়, সেনা প্রতিষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ সেই পতাকাকে ঘরের দরজায়, বারান্দায় এবং ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।
এই কর্মসূচির পরিসরও ছিল বিশাল। ২০২২ সালে সরকারের পরিকল্পনা ছিল প্রায় ২০ কোটি বাড়িতে জাতীয় পতাকা পৌঁছে দেওয়ার। মানুষকে বাড়িতে পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি জাতীয় পতাকার সঙ্গে ছবি তুলে নির্দিষ্ট পোর্টালে জমা দেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছিল। ১৫ অগস্ট ২০২২-এর মধ্যে ওই পোর্টালে ৫ কোটিরও বেশি ‘তিরঙ্গা সেলফি’ জমা পড়ে। সংখ্যাটি শুধু একটি সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক প্রচারের সাফল্য বোঝায় না; জাতীয় পতাকাকে কেন্দ্র করে কত বড় পরিসরে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল, তারও একটি ধারণা দেয়।
কিন্তু ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ শুধু বাড়িতে পতাকা তোলার কর্মসূচি হয়ে থাকেনি। খুব দ্রুত এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন ধরনের জনসমাগম এবং শোভাযাত্রা। ২০২২ সালের ৩ অগস্ট দিল্লিতে সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি বিশেষ ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ বাইক র্যালি আয়োজন করা হয়। লালকেল্লা থেকে শুরু হওয়া সেই র্যালি ইন্ডিয়া গেটের দিকে যায়। উপরাষ্ট্রপতি এম ভেঙ্কাইয়া নাইডু এর সূচনা করেন এবং একাধিক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সাংসদ তাতে অংশ নেন। জাতীয় পতাকা হাতে মোটরবাইকে এই ধরনের সংগঠিত র্যালি পরবর্তী সময়ে ‘তিরঙ্গা যাত্রা’কে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।
এরপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্বাধীনতা দিবসকে কেন্দ্র করে তিরঙ্গা যাত্রা, বাইক র্যালি, সাইকেল র্যালি এবং পদযাত্রা দেখা যেতে থাকে। কোথাও স্থানীয় প্রশাসন, কোথাও রাজনৈতিক সংগঠন, কোথাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আবার কোথাও সামাজিক সংগঠন এই ধরনের কর্মসূচি আয়োজন করে। ফলে ‘তিরঙ্গা যাত্রা’ কোনও একটি সংগঠন বা দলের একচেটিয়া কর্মসূচি নয়। একই নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন সংগঠন নিজেদের মতো করে জাতীয় পতাকা নিয়ে যাত্রা আয়োজন করেছে। এই কারণেই তিরঙ্গা যাত্রার ইতিহাস লিখতে গিয়ে ২০২২ সালকে এর জন্মবছর বলা ঠিক নয়। বরং ২০২২ সালকে বলা যায় এমন একটি সময়, যখন পতাকা-কেন্দ্রিক জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি নতুন করে সর্বভারতীয় মাত্রা পায় এবং ‘হর ঘর তিরঙ্গা’র সঙ্গে তিরঙ্গা যাত্রা একটি পরিচিত জনউদযাপনের রূপ পেতে শুরু করে।
পশ্চিমবঙ্গেও এই পরিবর্তনের আলাদা ইতিহাস রয়েছে। ২০২২ সালেই কলকাতায় ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরকারি দফতরের উদ্যোগে তিরঙ্গা প্রদর্শন করে র্যালি হয়েছিল। ১৩ অগস্ট কলকাতায় কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের অধীন বিভিন্ন দফতরের কর্মীদের অংশগ্রহণে একটি তিরঙ্গা র্যালির আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ ২০২২ সালেই কলকাতার রাজপথে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’র সঙ্গে সরাসরি যুক্ত পতাকা-কেন্দ্রিক জনকর্মসূচির উপস্থিতি দেখা যায়।
একই সময়ে তিরঙ্গা যাত্রা রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গেও যুক্ত হতে শুরু করে। ২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উদ্যোগে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ উপলক্ষে একাধিক কর্মসূচি এবং তিরঙ্গা যাত্রা হয়েছিল। একটি র্যালিকে ঘিরে পুলিশের অনুমতি সংক্রান্ত বিতর্কও তৈরি হয়েছিল। এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে—জাতীয় পতাকা ও স্বাধীনতা দিবসের কর্মসূচি একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদযাপনের অংশ, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলিও নিজেদের জনসংযোগ এবং রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিরঙ্গা যাত্রাকে ব্যবহার করতে পারে। ফলে একই নামের কর্মসূচির উদ্দেশ্য, আয়োজক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট জায়গাভেদে আলাদা হতে পারে।
২০২৬ সালে এই ইতিহাস আরও একটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। পশ্চিমবঙ্গে এ বছর প্রথমবার রাজ্য সরকারের উদ্যোগে রাজ্যজুড়ে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে। ৯ অগস্ট থেকে ১৭ অগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, কলকাতা পুরসভা, পুরসভা, পঞ্চায়েত এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে এই কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে। তিরঙ্গা র্যালির পাশাপাশি প্রভাতফেরি, সাইকেল ও ই-বাইক মিছিল, জাতীয় পতাকার ইতিহাস নিয়ে প্রদর্শনী, কুইজ, ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি ভবন, ঐতিহাসিক স্থাপনা, বাস টার্মিনাস এবং বাজার এলাকাতেও তিরঙ্গা-ভিত্তিক আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই বছর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে পতাকা বিতরণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য। রাজ্য সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৭০ লক্ষ জাতীয় পতাকা মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। কলকাতায় ১০ অগস্ট বিকেল ৩টেয় একটি বড় তিরঙ্গা র্যালির আয়োজন করা হয়েছে। কলকাতার নেতাজি মূর্তি থেকে শুরু হওয়ার কথা এই যাত্রার। বিপুল মানুষের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা থাকায় শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পার্কিংয়ের উপর বিধিনিষেধও জারি করা হয়েছে। অর্থাৎ এই কর্মসূচি এখন শুধু একটি প্রতীকী পদযাত্রা নয়; এর জন্য আলাদা প্রশাসনিক প্রস্তুতি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হচ্ছে।
তবে ২০২৬ সালের কলকাতার তিরঙ্গা যাত্রার ইতিহাসকে শুধু এই একটি দিনের কর্মসূচি দিয়ে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কারণ কলকাতার সঙ্গে জাতীয় পতাকার সম্পর্ক শুরু হয়েছিল প্রায় ১২০ বছর আগেই। ১৯০৬ সালে এই শহরেই স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি পতাকা প্রকাশ্যে উত্তোলন করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের তিরঙ্গা সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের নতুন অধ্যায় শুরু করে। তার বহু দশক পরে ২০২২ সালে ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ পতাকাকে আবার সাধারণ মানুষের ঘরের সঙ্গে যুক্ত করে। আর ২০২৬ সালে সেই পতাকা কলকাতার রাজপথে কয়েক হাজার মানুষের অংশগ্রহণে একটি সংগঠিত জনযাত্রার রূপ নিয়েছে।
এই দীর্ঘ পথের দিকে তাকালে ‘তিরঙ্গা যাত্রা’কে কোনও একটি নির্দিষ্ট দিনের কর্মসূচি হিসেবে দেখার বদলে একটি পরিবর্তনশীল ঐতিহাসিক ধারার অংশ হিসেবে দেখা যায়। স্বাধীনতার আগে পতাকা ছিল আন্দোলনের দৃশ্যমান প্রতীক। স্বাধীনতার পরে সেটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের প্রতীক এবং জাতীয় দিবসের উদযাপনের কেন্দ্র। ২০২২ সালের ‘হর ঘর তিরঙ্গা’ সেটিকে আরও ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ে যায়, আর তার সঙ্গে যুক্ত তিরঙ্গা যাত্রা পতাকাকে আবার রাস্তায়, মানুষের সমাবেশে এবং জনজীবনের দৃশ্যপটে ফিরিয়ে আনে। ২০২৬ সালের কলকাতার আয়োজন সেই ধারারই সাম্প্রতিকতম বড় প্রকাশ।