07/06/2026
ভূমিকা
অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য
কোনো স্বতন্ত্র ব্যক্তিবিশেষের সৃষ্টি নিয়ে নয়, সামগ্রিকভাবে বাংলা উপন্যাস বা বাংলা উপন্যাসের নানা ধারা বৈশিষ্ট্য রূপ ও রীতিপদ্ধতি নিয়ে এযাবৎ যাঁরা বিচার-বিশ্লেষণ আলোচনা করে এসেছেন- শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে তপোধীর ভট্টাচার্য; সেই মননশীল বিশিষ্ট সমালোচকবর্গের নামের তালিকায় অবশ্যই সংযোজিত করে নিতে পারি এক নতুন উপন্যাসসমালোচকের নাম- ডক্টর কমলিকা রায় দত্ত।
পাঠক উপন্যাস পড়েন আনন্দের জন্য, রসোপভোগ করবার জন্য। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে বুদ্ধদেব বসু বা শরৎচন্দ্র থেকে সমরেশ বসু- উনিশ শতক থেকে একাল পর্যন্ত সকলেই তাঁদের নিজেদের মতন করে উপন্যাস সৃষ্টি করে এসেছেন।
রবীন্দ্রনাথও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির ছাদে বসে বঙ্গদর্শনের সদ্য-প্রকাশিত বিষবৃক্ষ বা বঙ্কিমের অন্যান্য উপন্যাস বৌঠানকে পড়ে-পড়ে শুনিয়েছেন। এ তো স্কুলের পাঠ্যবই নয়- এ আনন্দের পড়া, অনুভব আস্বাদনের শ্রবণ। আবার আমরাও এই কালে আধুনিক পত্রপত্রিকার পাতায় বা বইতে বুদ্ধদেব বসু সন্তোষকুমার ঘোষ অথবা সমরেশ বসু পড়েছি। এইসব মানুষকে আমরা কাছ থেকে দেখেছি। এঁরা আমাদের কালের লেখক গল্পকার ঔপন্যাসিক। এঁরা বিখ্যাত সাহিত্যিক। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় তো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের মাস্টারমশাই ছিলেন।
একটি উপন্যাস আমি আমার বাড়ির ছাদে মাদুর পেতে বসে বা শুয়ে পড়ছি। ভালো লাগছে বলেই তো পড়ছি।
পড়ছি। খুশিতে পড়ছি, আনন্দে পড়ছি, কখনো বা চোখের জল মুছতে-মুছতে পড়ছি। পড়তে-পড়তে এক সময় উপন্যাসের শেষ পাতাতে এসে পৌঁছচ্ছি। পড়া শেষ হচ্ছে।
পাঠক বই কিনছে, পড়ছে, উপন্যাসের একটি-একটি নতুন এডিশন ছাপা হচ্ছে। আরও
পাঠক পড়ছে।
আমরা পড়ছি; তবুও আমরা জানি মানি- এই পড়াই আমাদের সম্পূর্ণ পড়া নয়। একটা উপন্যাস তো শুধু একটা গল্পকাহিনি মাত্র নয়- তার মধ্যে রয়েছে জগতের কথা জীবনের কথা অন্তর্জীবনের কথা মনস্তত্ত্বের কথা সময়ের কথা রাজনীতির কথা ইতিহাসের কথা। তাই কখনো কখনো কোনো কোনো উপন্যাসকে মহাকাব্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে, এপিক উপন্যাস বলে চিহ্নিত করা হয়।
তাই একটা উপন্যাস বাড়ির বারান্দায় দ্বিপ্রাহরিক আহারের পরে আরাম কেদারায় বসেও পড়া যায়, আবার সেই উপন্যাসটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে একটা সেমিস্টারে ছ'মাস পড়িয়ে একজন কৃতী শিক্ষক তা শেষ করেন। সেই উপন্যাস থেকে প্রতি বছর নতুন নতুন প্রশ্ন আসে, ছাত্রটিকেও উপন্যাসটির জন্য যথেষ্ট পড়াশুনা চিন্তা-ভাবনা করতে হয়, টেস্টটা বারবার পড়তে হয়, পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে হয়।
সবসময় কি উপন্যাসের শিক্ষকরূপে প্রমথনাথ বিশী, বুদ্ধদেব বসু বা নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে পাওয়া যাবে?
বাংলা উপন্যাসে চেতনাপ্রবাহ রীতি
উপন্যাসকে ভালো করে বোঝার আগ্রহ শুধু কি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের? তা অবশ্যই নয়। ছাত্রসমাজের বাইরেও বৃহৎ পাঠকসমাজ রয়েছেন, যাঁরা উপন্যাসের রহস্যের গভীরে ডুব দিয়ে সব কিছু জানতে চান, বুঝে নিতে চান। তাঁদের জন্যই 'বঙ্গ সাহিত্যে উপন্যাসের ধারা', 'বাংলা উপন্যাসের ইতিহাস', 'বাংলা উপন্যাসে কালান্তর', 'কালের প্রতিমা', 'উপন্যাসের ভিন্ন পাঠ' প্রভৃতি বিখ্যাত গ্রন্থগুলি রচিত।
ডক্টর কমলিকা রায় দত্ত বাংলা মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের বিবর্তন তথা চেতনাপ্রবাহ রীতির উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ দীর্ঘ আলোচনা করেছেন তাঁর এই সুরচিত সুবিন্যস্ত গ্রন্থখানিতে। উপন্যাসের খুব জটিল ও কঠিন একটি দিক তাঁর গবেষণাকর্মের বিষয় রূপে নির্বাচিত- যে নিবন্ধ রচনা করে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি-এইচ.ডি. ডিগ্রি প্রাপ্তির গৌরবসম্মান লাভ করেছেন। এখন তিনি তাঁর আলোচনা ও ব্যাখ্যান আরও পরিমার্জিত ও সমৃদ্ধ করে এই গ্রন্থ প্রকাশ করলেন।
বাংলা উপন্যাস সমালোচনার ক্ষেত্রে চেতনাপ্রবাহ রীতি নিয়ে আলোচনা ও চর্চা এযাবৎ খুব কমই হয়েছে। যে ক্ষীণ পথে খুব কম পথিকের পদচারণা ঘটেছে সেই পথের প্রায় নিঃসঙ্গ যাত্রী হয়ে কমলিকা তাকে একটি প্রশস্ত সুরম্য সরণীতে পরিণত করে তুলেছেন বলা যেতে পারে।
তাঁর তীক্ষ্ণ যুক্তিগ্রাহ্য মননশীল আলোচনার অন্তর্গত প্রধান ঔপন্যাসিকরা হলেন ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, সতীনাথ ভাদুড়ী, বুদ্ধদেব বসু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সন্তোষকুমার ঘোষ, চিত্তরঞ্জন ঘোষ, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী ও দেবেশ রায়। মূলত চল্লিশ পঞ্চাশ ষাট ও সত্তরের দশকের চেতনাপ্রবাহ রীতির উপন্যাসই তাঁর আলোচনার ভুবন। তাছাড়া বাংলাদেশে চেতনাপ্রবাহ রীতি নিয়ে যাঁরা উপন্যাস লিখেছেন তাঁদের লেখালেখি নিয়েও একটি তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন বা সমীক্ষা রচনা করেছেন লেখিকা। বাংলাদেশের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে সময়ের সীমানার দিকে তাকিয়ে তিনি কেবল সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর লেখা চেতনাপ্রবাহ রীতির তিনটি উপন্যাসের পর্যালোচনা করেছেন। কমলিকা তাঁর লেখায় শুধু যে একজন কৃতী সাহিত্য সমালোচকের পরিচয় দিয়েছেন তাই নয়; বস্তুতপক্ষে তাঁর লেখা থেকে পাওয়া গেয়েছে যথার্থ এক জীবনরস রসিককে।
সব মিলিয়ে বলতে পারি, বাংলা ভাষায় চেতনাপ্রবাহ রীতি নিয়ে এটি একটি অতি মূল্যবান সুলিখিত গভীর বিশ্লেষণাত্মক উপভোগ্য আলোচনা গ্রন্থ। এই ধরনের উন্নতমানের গবেষণাগ্রন্থ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিভাগের পক্ষে যথেষ্ট গৌরবের কারণ বলে বিবেচিত হবে। উপন্যাসের পাঠকসমাজও এমন গ্রন্থ পাঠ করে আনন্দিত হবেন উপকৃত হবেন, নিঃসংশয়ে তা বলতে পারি। ছাত্র-শিক্ষকের পক্ষেও এ-বই বিশ্বস্ত সহায়ক বন্ধু।
আবারও বলব বাংলা উপন্যাস সমালোচনার ইতিহাসে কমলিকা রায় দত্তর এই বইএক সুনিশ্চিত সমৃদ্ধ সংযোজন।
অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য