16/07/2026
বিগত কয়েক বৎসর যাবৎ দেখা যায় যে বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে পবিত্র রথযাত্রা , প্রভু জগন্নাথ কে নিয়ে শ্রীশ্রীঠাকুরের একটি বানী কে নিয়ে বিকৃত করে ভুল ব্যাখ্যা তৎসহ সম্পূর্ণ ভুল ধারণা পরিবেশন করা হয়। যা শ্রীশ্রীঠাকুরের ভাবধারার অপ প্রচার করা হয় থাকে।
সেই ধারণার পরিপূরক ব্যাখ্যা শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রপৌত্র
পূজনীয় শ্রী বৌধায়ন চক্রবর্ত্তী মহাশয় ব্যাখা করলেন যা আপনাদের সকলের সামনে উপস্থাপন করা হল।
"প্রভু জগন্নাথের সবচেয়ে বিখ্যাত উৎসবটি হল রথযাত্রা। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা শুরু হয়। শ্রীক্ষেত্র পুরীতে এই উৎসবের সময় জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার মূর্তি মূল মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বের করে এনে কাঠের তৈরি তিনটি বিরাট রথে করে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে গুণ্ডিচা মায়ের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। ভক্তরাই এই রথগুলি টেনে নিয়ে যান। পুরী ছাড়াও যেখানেই জগন্নাথ মন্দির আছে, সেখানেই এই বিশেষ দিনে এই ধরনের রথযাত্রা আয়োজিত হয়।
রথযাত্রা কেবল কাঠের রথ টানা নয়, এটি হলো নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার উৎসব। আমাদের শরীরটি হলো রথ। এতে পাঁচটি ইন্দ্রিয় হলো পাঁচটি ঘোড়া, আর বুদ্ধি হলো সারথি। যদি সদগুরু বা আদর্শের নির্দেশ মেনে আচরণশীল হয়ে মনকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবেই জীবন সঠিক গন্তব্যে পৌঁছায়। আমাদের যেকোনো ধর্মীয় উৎসবেই সেই চিরন্তন সুগভীর অন্তর্লীন বার্তা থাকে -- "অসতো মা সদ্গময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়। মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়।"
অনুষ্ঠানের মহড়ায় আমরা স্বভাবগত কারণে ভুলে যাই যেকোনো উৎসবের মূল উদ্দেশ্যটি। রথযাত্রাও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই যুগে যুগে পুরুষোত্তম যখন আসেন এবং ধর্মের, অনুষ্ঠানের মূল স্বরূপ দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে যান-- তখন আমরা উদ্দেশ্যটি বুঝতে পারি, এবং প্রকৃত লাভবান হতে পারি।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের দৃষ্টিতে যখন প্রভু জগন্নাথকে দেখি তখন জানতে পারি যে---" ...জগন্নাথের হাত নেই। জগন্নাথ জনে জনে হাত বিলিয়ে নিজে হাতহীন হয়ে বসে আছেন। আমাদের উপর তাঁর কোনো হাত নেই। কিন্তু যেই আমরা তাঁকে আমাদের হাত দুখানি দিয়ে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরবো, অমনি আমরা তাঁর হাতে চলে যাব। তখন তাঁর ইচ্ছায় আমরা চালিত করব নিজেদের। এমনি করেই আমরা সেই মঙ্গলের অধিকারী হবো যে মঙ্গল তিনি আমাদের দিতে চান। " তাঁকে আমাদের হাত দুখানি দিয়ে আঁকড়ে ধরাটাই তো হয়না বা কেউ বলেও দেয় না। পুরোহিত বা পান্ডারা ভরসা দেন শ্রীবিগ্রহ দর্শন বা পবিত্র রথের দড়ি ধরলেও নিশ্চিত মুক্তি, কর্মফলখণ্ডন। কিন্তু কোথায় আর মেলে মুক্তি ! কর্ম নিয়ন্ত্রণ না করে আজ অবধি কারুর কর্মফলখণ্ডন হয়েছে যে এক্ষেত্রে হবে ! সারাবছর যদি নিজের বৃত্তিপূজার উপাসক হয়েই থাকি, তাহলে একদিন প্রভু জগন্নাথ দর্শন ও তাঁর পবিত্র রথযাত্রা থেকে আমরা " রথ দেখা ও কলা বেচা (সমুদ্র দেখা, চান করা)" এবং পাঁপড়ভাজা এটুকু প্রাপ্তিরই যোগ্যতা লাভ করতে পারি। আমাদের এই মানসিকতা দেখে শ্রীশ্রীঠাকুর কালীষষ্ঠীমা কে উদ্দেশ্য করে আমাদের সকলের জন্যই তিনি এক সরস ও ইঙ্গিতপূর্ণ বাণী প্রদান করেন ---"জীবননাথকে হেলায় ফেলে/ জগন্নাথকে দেখতে গেলি,/ জীবননাথই যে জগন্নাথ/ অহংকারে না দেখতে পেলি।"
এই বাণীটির অর্থ কখনোই এমন নয় যে জগন্নাথ দর্শন বা তাঁর কোনো উৎসবে যোগদান বা পালন অর্থহীন। বরং তাঁকে আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরার অন্তর্নিহিত তত্ত্ব লুকিয়ে আছে বাণীটিতে। গুরুত্যাগের ঘৃণ্য কথা বা ঐতিহ্য-কূলাচার-রীতিনীতির অবজ্ঞা করার কথা কখনোই পুরুষোত্তমের আচরণের মধ্যে পড়ে না। শ্রীশ্রীঠাকুর বলেন -- "যে আচরণ বাক্য কর্ম/ বাঁচা-বাড়ার উৎস হয়,/ তাকেই জানিস ধর্ম বলে/ নইলে ধর্ম কিছুই নয়"। বাক্য কর্ম আচরণ এসবগুলির মাধ্যমে যখন কারুর স্ব-পারিপার্শিক বাঁচা-বাড়া অক্ষুণ্ন থাকে তখনই সে জীবননাথের প্রকৃত উপাসক। এই উপাসকই জগন্নাথকে পেলে নিজের দুহাত দিয়ে আঁকড়ে ধরতেই চায়, নিজেকে সঁপে দিতে চায়। " তুমি করে দাও চাই না আমি/ তোমায় ভালোবাসি বলে,/ হৃদয় উতল ভালোবাসা/ তোমার পায়ে পড়ুক ঢলে" --- এটাই তো তাঁর হাতে চলে যাওয়া, তাঁর ইচ্ছায় নিজেকে চালিত করা; তাঁকে নিজের বৃত্তির, অহং-এর খোরাক করতে না চেয়ে, বরং তাঁর তৃপ্তি স্বস্তি পোষণের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠা; জীবননাথকেই চিনতে পারা জগন্নাথ রূপে। অনুভবে আসে তখন --- " মন্নাথ শ্রী জগন্নাথ, মদগুরু শ্রী জগৎগুরু, মদাত্মা সর্বভূতাত্মা, তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ"। কিংবা " শ্রীনাথে জানকিনাথে অভেদ পরমাত্মনি..."। বেষ্টি থেকেই না সমষ্টি, এককোষী থেকেই না বহুকোষী। তাই বিশ্বাসের সিংহাসনে ভক্তিকে বসিয়ে হৃদয়ে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত করাই হলো জীবননাথের আরাধনা করা। তাতে জগন্নাথ এসেই পড়েন স্বমহিমায়।
জয় জগন্নাথ ।"
বন্দে পুরুষোত্তমম্ ।