05/08/2026
"যে ছেলেকে মানুষ করতে সব বিক্রি করেছিলেন, সেই ছেলেই বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে গেল। কিন্তু একদিন..."
বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বসে ছিলেন সত্তরোর্ধ্ব অমলবাবু। হাতে একটি পুরনো অ্যালবাম। প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি গেটের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হয়তো আজ ছেলে আসবে— এই আশাতেই।
ছয় মাস আগে ছেলে রাহুল বলেছিল,
"বাবা, এখানে আপনার ভালো যত্ন হবে। আমি কাজের চাপে সময় পাই না।"
অমলবাবু শুধু মৃদু হেসেছিলেন। তিনি জানতেন, ছেলে মিথ্যা বলছে। তবু কোনো অভিযোগ করেননি।
বৃদ্ধাশ্রমের সবাই জানত, অমলবাবু প্রতিদিন বিকেলে গেটের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কেউ এলে তাঁর চোখে এক ঝলক আশা জেগে ওঠে, তারপর আবার নিভে যায়।
একদিন বিকেলে একটি দামি গাড়ি এসে থামল। সবাই ভাবল, নিশ্চয়ই কোনো বৃদ্ধকে দেখতে এসেছে।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন একজন সুদর্শন যুবক। পরনে দামি স্যুট। হাতে ফুলের তোড়া।
তিনি ধীরে ধীরে অমলবাবুর সামনে এসে দাঁড়ালেন।
"স্যার... আমাকে চিনতে পারছেন?"
অমলবাবু ভালো করে তাকিয়ে বললেন,
"না বাবা, মনে করতে পারছি না।"
যুবকটি হেসে বলল,
"আমি শুভ। অনেক বছর আগে আপনি আমাকে বিনা টাকায় পড়াতেন। আমার বাবা ছিলেন রিকশাচালক। বই কেনার টাকাও ছিল না। আপনি নিজের টাকা দিয়ে বই কিনে দিয়েছিলেন।"
অমলবাবুর চোখ ভিজে উঠল।
শুভ আবার বলল,
"আজ আমি একজন বড় ইঞ্জিনিয়ার। যদি সেদিন আপনি পাশে না দাঁড়াতেন, তাহলে আজ আমি এখানে পৌঁছাতে পারতাম না।"
বৃদ্ধাশ্রমের সবাই নীরবে শুনছিল।
শুভ চারদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল,
"আপনি এখানে কেন?"
অমলবাবু একটু হেসে বললেন,
"ছেলের ব্যস্ত জীবন। তাই এখানে রেখে গেছে।"
শুভর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে বলল,
"স্যার, যিনি শত মানুষের জীবন গড়েছেন, তিনি বৃদ্ধাশ্রমে থাকবেন— এটা আমি হতে দেব না।"
ঠিক তখনই বৃদ্ধাশ্রমের গেট দিয়ে আরেকজন ঢুকল।
সে আর কেউ নয়, অমলবাবুর ছেলে রাহুল।
আজ অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ায় সে দেখতে এসেছে।
কিন্তু সামনে যা দেখল, তাতে সে স্তব্ধ।
একজন সফল মানুষ তার বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে।
রাহুল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
"আপনি কে?"
শুভ শান্ত গলায় বলল,
"আমি সেই ছাত্র, যাকে আপনার বাবা নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছিলেন। আজ আমি যা হয়েছি, সব তাঁর জন্য।"
রাহুলের মাথা নিচু হয়ে গেল।
সে বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কান্নাভেজা গলায় বলল,
"বাবা... আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি তোমার ভালোবাসার মূল্য বুঝতে পারিনি।"
অমলবাবু ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
"ভুল সবাই করে বাবা। কিন্তু ভুল বুঝতে পারাই মানুষের সবচেয়ে বড় গুণ।"
সেদিন রাহুল বাবাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল।
বৃদ্ধাশ্রমের গেট পেরিয়ে যাওয়ার সময় অমলবাবু একবার পেছনে তাকালেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন,
"সন্তানকে শুধু বড় করলেই হয় না, তাকে মানুষের মতো মানুষও করতে হয়।"
নীতিশিক্ষা:
যে বাবা-মা আমাদের জীবনের ভিত্তি গড়ে দেন, তাঁদের শেষ বয়সে কখনো একা ফেলে রাখা উচিত নয়। তাঁদের ভালোবাসা ও সম্মানই সন্তানের সবচেয়ে বড় পরিচয়।