11/10/2026
Writing
🔴 বিশেষ প্রতিবেদন | PB NEWS
বাচ্চাদের অতিরিক্ত রাগ ও জেদ কেন? কীভাবে কাউন্সেলিং করবেন অভিভাবকরা?
👨👩👧 বকাঝকা নয়, মারধর নয়—সন্তানের মনের কথা বুঝুন, ভালোবাসা ও ধৈর্যের মাধ্যমে বদলান তার আচরণ!
বর্তমানে অনেক অভিভাবকেরই একটি সাধারণ অভিযোগ—বাচ্চা খুব রাগ করে, সামান্য কথা বললেই চিৎকার করে, নিজের ইচ্ছা পূরণ না হলে কান্নাকাটি শুরু করে, জেদ ধরে বসে থাকে কিংবা বাবা-মায়ের কথা শুনতে চায় না। কখনও খেলনা না পেলে, কখনও মোবাইল ফোন কেড়ে নিলে, আবার কখনও পড়তে বসতে বললেই শুরু হয় রাগারাগি।
অনেক সময় অভিভাবকরা এই আচরণকে শুধুমাত্র অবাধ্যতা বলে মনে করেন। কেউ বকাঝকা করেন, কেউ শাস্তি দেন, আবার কেউ সন্তানের কান্না থামাতে তার সব দাবি মেনে নেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই পদ্ধতিগুলি কি সত্যিই শিশুর রাগ ও জেদ কমাতে সাহায্য করে?
মনে রাখতে হবে, ছোটদের রাগ ও জেদ সব সময় খারাপ আচরণের লক্ষণ নয়। অনেক সময় শিশু নিজের মনের কথা ঠিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। ক্লান্তি, ক্ষুধা, ঘুমের অভাব, হতাশা, মনোযোগের চাহিদা, পারিবারিক অশান্তি কিংবা অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের মতো বিভিন্ন কারণে তার আচরণে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
তাই শিশুকে শুধুমাত্র শাসন করার পরিবর্তে তার আচরণের কারণ বোঝার চেষ্টা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
🧠 ১. প্রথমে বুঝুন, বাচ্চা কেন এত রাগ করছে
শিশুর রাগের পিছনে কী কারণ রয়েছে, তা খুঁজে বের করুন। সে কি কোনও কথা বুঝতে পারছে না? পড়াশোনার চাপ অনুভব করছে? বন্ধুদের সঙ্গে সমস্যা হচ্ছে? নাকি নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়ছে?
শিশু কখন, কোন পরিস্থিতিতে এবং কী কারণে রাগ করছে, তা লক্ষ্য করুন। এতে তার আচরণের ধরন বুঝতে সুবিধা হবে।
❤️ ২. রাগের সময় ধৈর্য ধরুন, পাল্টা রাগ করবেন না
বাচ্চা চিৎকার করলে বাবা-মাও যদি চিৎকার করেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। শিশুর রাগের মুহূর্তে শান্ত থাকার চেষ্টা করুন। নিরাপদ পরিবেশে তাকে কিছুটা সময় দিন এবং শান্ত হলে কথা বলুন।
তাকে বোঝান, রাগ হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু রাগের কারণে কাউকে মারধর করা, জিনিসপত্র ভাঙা বা আঘাত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
🗣️ ৩. শিশুর মনের কথা মন দিয়ে শুনুন
শিশু যখন কোনও বিষয় নিয়ে অভিযোগ করে, তখন সঙ্গে সঙ্গে তাকে থামিয়ে দেবেন না। তার কথা মন দিয়ে শুনুন। সে কী অনুভব করছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন।
আপনি বলতে পারেন, “আমি বুঝতে পারছি, তুমি এখন খুব রেগে গেছ। তুমি আমাকে শান্তভাবে বলো, কী হয়েছে?”
এতে শিশু ধীরে ধীরে নিজের আবেগ প্রকাশ করতে শিখবে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে তার বিশ্বাসের সম্পর্ক আরও মজবুত হবে।
🚫 ৪. অতিরিক্ত বকাঝকা ও মারধর থেকে বিরত থাকুন
শিশুকে ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে চুপ করানো সম্ভব হলেও, এতে তার সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। অতিরিক্ত শাস্তি শিশুর মধ্যে ভয়, ক্ষোভ ও অনিরাপত্তা বাড়াতে পারে।
তাই ভুল করলে কেন সেটি ভুল, তা সহজ ভাষায় বোঝান। শিশুর ব্যক্তিত্বকে আঘাত না করে তার নির্দিষ্ট আচরণ নিয়ে কথা বলুন।
উদাহরণস্বরূপ, “তুমি খুব খারাপ” না বলে বলুন, “খেলনাটা ছুড়ে মারা ঠিক হয়নি। আমরা অন্যভাবে সমস্যার সমাধান করতে পারি।”
📱 ৫. মোবাইল ও টিভি ব্যবহারে নিয়ম তৈরি করুন
দীর্ঘ সময় মোবাইল, টিভি বা ভিডিও গেমে ডুবে থাকলে শিশুর ঘুম, পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং পারিবারিক যোগাযোগ ব্যাহত হতে পারে। তাই বয়স অনুযায়ী স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করুন।
হঠাৎ করে মোবাইল কেড়ে না নিয়ে আগে থেকেই সময়সীমা জানিয়ে দিন। মোবাইলের পরিবর্তে গল্পের বই, আঁকাআঁকি, খেলাধুলা, ধাঁধা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করুন।
🌟 ৬. ভালো আচরণের প্রশংসা করুন
শিশু যখন রাগ না করে নিজের কথা বোঝায়, অপেক্ষা করতে শেখে কিংবা কোনও সমস্যা শান্তভাবে সমাধান করে, তখন তার প্রশংসা করুন।
যেমন বলতে পারেন, “আজ তুমি খুব সুন্দরভাবে নিজের কথাটা বলেছ। তোমার এই আচরণটা আমার ভালো লেগেছে।”
এতে শিশু বুঝতে পারবে কোন আচরণটি ভালো এবং ভবিষ্যতে সেই আচরণ অনুসরণ করতে উৎসাহিত হবে।
📚 ৭. পড়াশোনার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেবেন না
অনেক সময় পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষার ভয় কিংবা বারবার তুলনা করার কারণে শিশুর মধ্যে বিরক্তি ও রাগ তৈরি হতে পারে।
অন্য শিশুর সঙ্গে তুলনা না করে তার নিজের অগ্রগতিকে গুরুত্ব দিন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, বিশ্রাম, ঘুম এবং পছন্দের কাজের জন্যও সময় রাখুন।
🕰️ ৮. প্রতিদিনের রুটিন তৈরি করুন
শিশুর ঘুম, খাওয়া, পড়াশোনা, খেলাধুলা ও বিশ্রামের জন্য নিয়মিত সময়সূচি রাখুন। প্রতিদিনের রুটিন মোটামুটি একই রকম থাকলে অনেক শিশুই বেশি নিরাপদ বোধ করে।
তবে রুটিন যেন অতিরিক্ত কঠোর না হয়। শিশুর বয়স, প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী সময়সূচি তৈরি করুন।
🤝 ৯. জেদ করলেই সব দাবি পূরণ করবেন না
শিশু কান্নাকাটি বা জেদ করলেই যদি প্রতিবার তার দাবি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে সে শিখতে পারে যে জেদ করলেই নিজের ইচ্ছা পূরণ হয়।
তাই ভালোবাসার সঙ্গে সীমারেখা নির্ধারণ করুন। কোন বিষয়টি সম্ভব এবং কোনটি সম্ভব নয়, তা পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিন। একই নিয়ম বাবা-মা দু’জনের পক্ষ থেকেই বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
শিশুর অনুভূতিকে গুরুত্ব দিন, কিন্তু সব দাবি মেনে নেওয়াকেই ভালোবাসা বলে মনে করবেন না।
👨⚕️ ১০. কখন শিশু মনোবিদ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেবেন?
যদি শিশুর রাগ ও জেদ খুব ঘন ঘন হয়, দীর্ঘ সময় ধরে চলে, বাড়ি ও স্কুলে তার দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, অন্যকে আঘাত করার প্রবণতা দেখা যায় কিংবা ঘুম, পড়াশোনা ও সামাজিক সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে শিশু বিশেষজ্ঞ বা যোগ্য শিশু মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
শিশুর বয়স, বিকাশ, পারিবারিক পরিবেশ এবং আচরণের ধরন বুঝে বিশেষজ্ঞ প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবেন। কাউন্সেলিং মানেই শিশুর কোনও রোগ রয়েছে, এমন নয়। অনেক সময় অভিভাবকদেরও শেখানো হয় কীভাবে শিশুর আবেগ সামলাতে এবং ইতিবাচক আচরণ গড়ে তুলতে সাহায্য করা যায়।
💖 অভিভাবকদের জন্য বিশেষ বার্তা
একটি শিশু জন্ম থেকেই সব আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে না। ধীরে ধীরে সে বাবা-মা, পরিবার, স্কুল এবং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আবেগ সামলানোর কৌশল শেখে।
তাই সন্তানের রাগ দেখলেই তাকে খারাপ শিশু ভাববেন না। তার আচরণের পিছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। তাকে সময় দিন, নিরাপদ পরিবেশ দিন, ভালোবাসুন এবং প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
মনে রাখবেন, শিশুকে শুধু ভালো নম্বর পেতে শেখানোই অভিভাবকের দায়িত্ব নয়; তাকে নিজের অনুভূতি বুঝতে, অন্যকে সম্মান করতে, হতাশা সামলাতে এবং সুস্থভাবে বড় হতে সাহায্য করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
📢 আপনার সন্তান কি খুব রাগ করে বা সামান্য বিষয় নিয়ে জেদ ধরে? আপনি কীভাবে তাকে সামলান? আপনার অভিজ্ঞতা কমেন্টে জানান। অন্য অভিভাবকদের সচেতন করতে পোস্টটি শেয়ার করুন।
PB NEWS | শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে সচেতন হোন।
কপিটি সংক্ষিপ্ত ও সহজ করুন
ফটো কার্ডের জন্য মূল পয়েন্ট দিন
আরও সহানুভূতিশীল ভাষা ব্যবহার করুন