22/12/2025
আমাদের অজান্তেই ‘নিলাম’ হয়ে গেল দেশের ফুসফুস?
১০০ মিটারের এক অলীক ফিতে দিয়ে
যেভাবে শেষ করা হলো আরাবল্লীকে!
আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো।
আপনার বাড়ির ছাদটা যদি কেউ মাঝরাতে,
আপনার অজান্তেই খুলে নিয়ে যায়,
আপনি কি সঙ্গে সঙ্গে টের পাবেন?
সম্ভবত না।
কারণ তখন আপনি গভীর ঘুমে।
কিন্তু যেদিন ঘুম ভাঙবে,
সেদিন মাথার ওপরের রোদ
আপনাকে পুড়িয়ে দেওয়ার দায়
অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকবে না।
ঠিক এই ঘটনাটাই ঘটেছে আমাদের সঙ্গে।
খুব নিঃশব্দে।
আদালতের শান্ত, সংযত পরিসরে বসে,
আইনের ভাষায়,
কলমের একটিমাত্র আঁচড়ে
ভারতের প্রাচীনতম পাহারাদারের ভবিষ্যৎ
বদলে গেল।
কোন দামামা বাজেনি।
শুধু একটি সংজ্ঞার
পুনর্ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।
আর সেই সংজ্ঞার সঙ্গেই নির্ধারিত হয়ে গেল
দিল্লি, হরিয়ানা ও রাজস্থানের আগামী দিনের বাস্তবতা।
ভাবতে পারেন,
আমি কি বাড়াবাড়ি করছি?
আবেগে ভেসে যাচ্ছি?
একটু সময় দিন।
আরাবল্লীর বিস্তার,
তার ভৌগোলিক ভূমিকা
এবং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের
নির্মম হিসাবগুলো জানলে,
আপনার পায়ের তলার মাটি
নিঃশব্দে সরে যাবে।
এই গল্প আজকের নয়।
এর সূচনা আজ থেকে
প্রায় ৬৭০ মিলিয়ন বছর আগে,
যখন হিমালয়ের অস্তিত্বও তৈরি হয়নি,
পৃথিবী ছিল, তার একেবারে প্রারম্ভিক অধ্যায়ে।
ঠিক সেই সময়েই
ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্ত রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে
মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল
এক পাহাড়শ্রেণি,
যাকে আমরা আজ
আরাবল্লী নামে চিনি।
এ কোনো সাধারণ পাহাড় নয়।
গুজরাটের হিম্মতনগর থেকে শুরু করে
রাজস্থান, হরিয়ানা হয়ে
দিল্লির রাইসিনা হিলস পর্যন্ত,
প্রায় ৬৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ
এই পর্বতমালা
ভারতের ভূগোলের মেরুদণ্ডস্বরূপ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,
এই আরাবল্লী রাজস্থানকে প্রকৃত অর্থেই
দুই ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে।
একদিকে পশ্চিম রাজস্থান,
যেখানে বিস্তৃত মরুভূমি,
মারওয়ারের কঠোর রুক্ষতা।
অন্যদিকে পূর্ব রাজস্থান,
যেখানে জনবসতি, সবুজ আর উর্বর ভূমি।
এই পাহাড় মাঝখানে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে না থাকলে
পশ্চিমের মরুভূমি বহু আগেই পূর্ব দিক গ্রাস করত।
এই কারণেই আরাবল্লীকে বলা হয়
ভারতের ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’।
থর মরুভূমির ধুলোর ঝড়কে
বুক চিতিয়ে রুখে দেওয়ার
নীরব ক্ষমতা এই পাহাড়েরই।
দিল্লি ও এনসিআরের কোটি কোটি মানুষ
আজ যে বাতাস শ্বাস হিসেবে নিচ্ছেন,
মাটির নিচ থেকে যে জল এখনও উঠে আসছে,
তার পেছনে রয়েছে এই ৬৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ
পাহাড়শ্রেণির বনভূমি ও শিলাস্তরের নীরব অবদান।
আরাবল্লী না থাকলে দিল্লি বহু আগেই সাহারা সদৃশ হয়ে উঠত।
সব কিছু প্রকৃতির নিয়মেই চলছিল।
প্রকৃতি নীরবে তার কাজ করে যাচ্ছিল।
কিন্তু সমস্যার শুরু হলো অন্য জায়গায়।
এই পাহাড়ের অন্তরে লুকিয়ে আছে
বিপুল সম্পদ, পাথর, খনিজ
আর ভবিষ্যৎ নগরায়নের সম্ভাবনা।
সেখানেই অর্থনৈতিক স্বার্থের দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো।
এবার আসি সাম্প্রতিক ঘটনায়।
গত নভেম্বর মাসে,
২০২৫ সালে,
মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে
একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়।
এ কথা শুরুতেই বলা প্রয়োজন,
এই দেশের সংবিধান,
ও সর্বোচ্চ আদালতের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা অটুট।
কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তের
পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব
নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
এতদিন আরাবল্লীর প্রধান সুরক্ষা ছিল
ফরেস্ট কনজারভেশন অ্যাক্ট।
ধারণাটা ছিল স্পষ্ট, আরাবল্লী মানেই পাহাড়,
মানে বন, মানে সুরক্ষা।
কিন্তু নতুন ব্যাখ্যায় বলা হলো,
আরাবল্লী রেঞ্জের যেসব পাহাড় বা টিলার
উচ্চতা ১০০ মিটারের কম, সেগুলো আর
আইনগতভাবে ‘পাহাড়’ নয়।
একটু ভেবে দেখুন।
প্রকৃতি কি
মানুষের তৈরি ১০০ মিটারের মাপকাঠি মেনে নিজেকে গড়ে তুলেছিল?
৫০ মিটার উঁচু একটি টিলা কি জল ধরে রাখে না?
বালির গতিকে শাসন করে না?
কিন্তু আইনের চোখে যুক্তির জায়গা সীমিত।
১০০ মিটারের এক ইঞ্চি কম হলেই
পাহাড় হয়ে যায় ‘সমতল জমি’।
সরকারি সমীক্ষা বলছে,
আরাবল্লী পর্বতমালার
মাত্র ৯.২ শতাংশ অংশের উচ্চতা ১০০ মিটারের বেশি।
অর্থাৎ, প্রায় ৯১ শতাংশ পাহাড় এই ব্যাখ্যার বাইরে চলে গেল এক ধাক্কায়।
একটি ব্যাখ্যার মাধ্যমেই
আরাবল্লীর ৯১ শতাংশ এলাকাতার আইনি সুরক্ষা হারাল।
পাহাড় না থাকলে বন সংরক্ষণ আইনও কার্যকর থাকে না।
এর অর্থ, এই বিশাল অংশে
খনি, বি*স্ফো*র*ণ ও নির্মাণ
এখন আইনত সম্ভব।
তাহলে, এই জমি কার জন্য উন্মুক্ত হলো?
সেই প্রশ্নটাই সবচেয়ে অস্বস্তিকর।
নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষের জন্য নয়।
এখানেই উঠে আসে বৃহৎ কর্পোরেট স্বার্থ,
খনি শিল্প, সিমেন্ট শিল্প ও রিয়েল এস্টেটের প্রসঙ্গ।
রায়ে নাম না থাকলেও,
অর্থনৈতিক প্রবণতা স্পষ্ট।
আরাবল্লীর পাথর, নির্মাণ শিল্পের জন্য অমূল্য।
হাইওয়ে, বিমানবন্দর,
শহরের ভিত, সব কিছুর ভিত
গড়ে ওঠে এই পাথর গুঁড়িয়ে।
তার ধুলো ছড়িয়ে পড়ে বাতাসে, ঢুকে পড়ে মানুষের ফুসফুসে।
সাফারি পার্কের মতো প্রকল্পের আড়ালেবনভূমি হস্তান্তরের প্রশ্নও উঠছে।
রিসোর্ট, হোটেল, নগরায়নের সম্ভাবনা
পাহাড়ের বুকেচাপ সৃষ্টি করছে।
গ্রামের সাধারণ জমি ধীরে ধীরে
ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপ নিচ্ছে।
এর পরিণতি কোনো কল্পকাহিনি নয়।
এটা আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের বাস্তব।
৬৯২ কিলোমিটার দীর্ঘ যে প্রাকৃতিক প্রাচীর
মরুভূমিকে আটকে রেখেছিল,
তা ভেঙে গেলে বালির ঝড় আর থামবে না।
দিল্লির আকাশ নীল থাকবে না।
শ্বাস মানে হবে ধুলো।
পাহাড় কংক্রিটে ঢাকলে জল আর
মাটির নিচে নামবে না।
গুরুগ্রাম, জয়পুর, দিল্লি!
জলের সংকটে শুকিয়ে যাবে।
দামি ফ্ল্যাট থাকবে, কিন্তু
পানীয় জল থাকবে না।
আমরা উন্নয়ন চেয়েছিলাম, ঠিকই।
কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ বিসর্জন দিয়ে উন্নয়ন কার জন্য?
এই লেখা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়।
এই লেখা প্রকৃতির পক্ষে।
কারণ প্রকৃতি নীরব থাকে,
কিন্তু প্রতিশোধ নিতে ভোলে না।
যেদিন শেষ পাহাড়টি ভেঙে পড়বে,
সেদিন ১০০ মিটারের আইনি কাগজ দিয়ে
বালির ঝড় আটকানো যাবে না।
এই রায় কোনো পাহাড়ের শেষ নয়।
এ আমাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে
এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।
জেগে উঠুন।
সময়
এখনও ফুরোয়নি।
মানুষকে জানান। ছড়িয়ে দিন এই তথ্যটি।
কারণ পাহাড় হারালে।
আগামী প্রজন্ম জানবেও না।
তাদের শ্বাসরোধ করে মা*র*ল কে? 😭