30/07/2026
বইয়ের সঙ্গে যেভাবে আমার সখ্য তৈরি হলো
বইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কের শুরুটা আমার কাছে কেমন জানি অদ্ভুত আর হাস্যকর মনে হয়। যে ছেলে ঠিকমতো বাংলাই পড়তে পারত না, সেই ছেলেই কিনা একের পর এক বই সংগ্রহ করত! অনেকেই হয়তো অবাক হবেন কিন্তু এটাই সত্য।
আমি তখন হিফজ বিভাগের ছাত্র। হিফজ প্রায় শেষের দিকে। বই পড়তে পারতাম না, পড়ার সময়ও পেতাম না। তবুও সুযোগ পেলেই বই কিনে রাখতাম। মনে মনে ভাবতাম, একদিন নিশ্চয়ই পড়তে পারব। টুকটাক বাংলা পড়তে পারতাম উচ্চারণ করে করে, তা-ও খুব ধীরে ধীরে।
কঠিন শব্দে আটকে যেতাম। স্রেফ চার মাস নুরানি পড়ার সুযোগ হয়েছিল, তাই ভাষার ভিত্তিটাও খুব শক্ত ছিল না। রাস্তাঘাটের সাইনবোর্ড, দোকানের নাম, গাড়ির গায়ে লেখা—যা চোখে পড়ত, সব উচ্চারণ করার চেষ্টা করতাম।
কোনো শব্দ না পারলে পরে খুঁজে খুঁজে শিখতাম। এভাবেই আস্তে আস্তে অক্ষর আর শব্দের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল। আর সেই বন্ধুত্ব একদিন আমাকে বইয়ের দুনিয়ায় নিয়ে আসল।
'২০২১ সাল' আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় বছরগুলোর একটি। সেদিন প্রথম পড়েছিলাম 'আঁধার রাতের বন্দিনী' নামক উপন্যাসটি। এটি অন্য দশটা উপন্যাসের মতো ছিল না, আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক আলো ছিল। একটি বই যে একজন মানুষের চিন্তা, অনুভূতি আর জীবনবোধ বদলে দিতে পারে—তা আমি এটি পড়ে নিজেই উপলব্ধি করেছি।
এরপর যেন বইয়ের নেশায় পেয়ে বসল। একের পর এক ইসলামি উপন্যাস পড়তে লাগলাম। হাতে টাকা না থাকলে ধার করে হলেও বই কিনতাম। অবশ্য এখনও কিনি। নতুন কোনো বইয়ের খোঁজ পেলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আনন্দ কাজ করত। 'বইটা যে করেই হোক কেনা লাগবে।'
হিফজ শেষে যে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলাম, সেটি আমার সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামত হয়ে আসে। সেখানে প্রতিদিন বই পড়ার নির্দিষ্ট সময় ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত পাঠাগার খোলা থাকত। দিনের পর দিন সেই লাইব্রেরির তাকের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমি বই পড়েছি, নতুন বইগুলো খুঁজেছি।
সেখানেই আমার হৃদয়ে সাহিত্যপ্রেমের বীজ অঙ্কুরিত হয়। শুরুটা উপন্যাস পড়তে পড়তে শুরু হলেও ইতিহাসের প্রতিও গভীর ভালোবাসা জন্ম নেয়।কিন্তু জীবনের সব গল্প একরকম থাকে না। আমাদের ইচ্ছে মতো আমরা জীবনের গল্প সাজাতে পারি না।
একসময় পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার পর হঠাৎ করেই বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেললাম। যেন পথ হারানো এক মুসাফিরের মতো আমিও আমার পাঠকসত্তাকে হারিয়ে ফেলি। অনলাইনের মায়াজাল, চাকরির ব্যস্ততা আর জীবনের পরিবর্তিত বাস্তবতা আমাকে বই থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল।
এতকিছুর মাঝেও একটি জিনিস কখনো আমার থেকে হারিয়ে যায়নি। তা হল, বই সংগ্রহের ভালোবাসা। বই পড়ি বা না পড়ি, ভালো লাগলেই সংগ্রহ করতাম। কারণ বই আমার কাছে কখনো শুধু কাগজের মলাট ছিল না; ছিল স্বপ্নের আরেকটি নাম।
এই ভালোবাসার প্রমাণ হয়তো আমার ছোট ছোট ত্যাগগুলো।
এক ঈদে নতুন জামা কেনার জন্য টাকা জমিয়েছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় কয়েকটি বই চোখে পড়তেই আর নিজেকে সামলাতে পারিনি। নতুন জামার স্বপ্ন ছেড়ে বইগুলো কিনে নিয়েছিলাম। ঈদের দিন নতুন পোশাক ছিল না, কিন্তু বুকভরা তৃপ্তি ছিল।
আরেকদিন মাদ্রাসা ছুটির আগে হাতে ছিল মাত্র পাঁচশ টাকা। তিনশ টাকা দিয়ে একটি বই কিনলাম। বাকি দুইশ টাকা ছিল বাড়ি ফেরার গাড়ি ভাড়া। কিন্তু আরেকটি বই দেখে মন আটকে গেল। শেষ পর্যন্ত সেই ভাড়ার টাকাও বই কিনে ফেললাম। পরে বুঝলাম, শহরে গিয়ে ফোন করার ভাড়াটুকুও আর হাতে নেই।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে, চারদিকে অনিশ্চয়তা। সেদিন সত্যিই মনে হয়েছিল, বই কিনে জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছি। তবুও আল্লাহর ওপর ভরসা রেখেছিলাম। তাঁর অশেষ রহমতে একজন পরিচিত বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তাঁর সাহায্যে শহরে পৌঁছালাম, বাড়িতে ফোন করলাম, টাকা এলো, আর আমি নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারলাম।
আজও সেই দিনের কথা মনে হলে বুক কেঁপে ওঠে। তখন উপলব্ধি করেছিলাম—বইয়ের প্রতি ভালোবাসা কখনো কখনো মানুষকে পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করায়, আর আল্লাহ চাইলে সেই পরীক্ষার পথও সহজ করে দেন।
এরপর একদিন অনলাইনে পরিচয় হলো এক বইপ্রেমী বড় ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁর পুরো টাইমলাইনজুড়ে ছিল শুধু বইয়ের কথা, বইয়ের ছবি, বইয়ের ভালোবাসা। তাঁর উৎসাহ, তাঁর কথাগুলো যেন আমার ভেতরে হারিয়ে যাওয়া পাঠকসত্তাকে আবার জাগিয়ে তুলল।
আবার বই হাতে নিতে শুরু করলাম, শুরু করলাম ভাইয়ের পরামর্শে বই নিয়ে লেখালিখিও'। আল্লাহ তা'আলা পাহাড়ি ভাইকে সুস্থতার সাথে নেক হায়াত দান করুন!
এখনও নিজেকে বড় পাঠক মনে করি না। বই নিয়ে সুন্দর করে লিখতেও পারি না। কিন্তু আমি শিখছি, প্রতিদিন একটু একটু করে শিখছি। কারণ বই আমাকে শিখিয়েছে—শেখার কোনো শেষ নেই।
আজ আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার গড়ে তোলা। ছোট্ট হলেও সেটি হবে আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। আমি বই সংগ্রহ করব, তাক ভরে তুলব একেকটি ভালো বই দিয়ে। সেখানে মানুষ বিনা মূল্যে বই পড়বে।
কোনো বইপ্রেমী বইয়ের অভাবে ফিরে যাবে না। আমি চাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমার সেই পাঠাগারে এসে বই হাতে নিক, জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হোক, বইকে ভালোবাসুক। হয়তো আমি একদিন থাকব না, কিন্তু যদি আমার সংগ্রহ করা বইগুলো একজন মানুষের জীবনও বদলে দিতে পারে, তাহলেই আমার বইপ্রেম সার্থক হবে।
বই আমাকে শুধু একজন পাঠক বানায়নি; বই আমাকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আর আমার সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্ন—একটি ছোট্ট পাঠাগার, যেখানে বই হবে সবার, জ্ঞান হবে সবার, আর ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়বে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
#সিজদাহ্_বই_সখ্যতা_প্রতিযোগিতা
সিজদাহ পাবলিকেশন
✍️ইবনে খালদুন