01/10/2026
লগেন কাকাকে হঠাৎ বামাক্ষ্যাপা বললেন,
“লগেন কাকা, বিলিতি কারণ আর ফলের গন্ধ আমার নাকে লাগছে কেন?”
নগেন্দ্র পাণ্ডা ও অন্যান্য ভক্তরা অবাক হয়ে গেলেন। শ্মশানের চারদিকে তাঁরা খুঁজে দেখলেন, কিন্তু কোথাও কোনো কারণ বা ফলের চিহ্ন পেলেন না। বরং চারদিকে শুধু পচা অস্থি, কঙ্কাল আর গলিত শবদেহের দুর্গন্ধ।
সেই দুর্গন্ধে নাক চাপা দিয়ে তাঁরা বাবার কাছে ফিরে এসে বললেন,“কোথাও তো বাবা, আমরা কিছু দেখতে পেলাম না। শুধু পচা শবের দুর্গন্ধই পেলাম।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন,
“না রে লগেন! আমার নাকে তো ভুরভুর করে গন্ধ আসছে। যেখানে কঙ্কাল, অস্থি আর গলিত শব ছাড়া আর কিছুই নেই, সেখানে এমন সুগন্ধ কী করে আসতে পারে?”
বাবার কথা শুনে উপস্থিত ভক্তরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলেন। কেউই ঘটনার রহস্য বুঝতে পারলেন না।
এর কিছুক্ষণ পরেই মন্দিরের দিক থেকে হইচই শোনা গেল।
তেরোশো তেরো সালের কথা। দারভাঙার মহারাজা ধীরাজ রামেশ্বর সিং বাহাদুর বহু শিপাহী-সান্ত্রী সঙ্গে নিয়ে খ্যাপা বাবাকে দর্শন করতে এসেছেন।
জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক, তকমা লাগানো পাগড়ি আর সশস্ত্র পাহারাদারদের দেখে বাবা ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। পুলিশকে বাবা বরাবরই ভয় ও অবিশ্বাস করতেন।
তিনি লগেন কাকাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“লগেন কাকা, ওরা কারা?”
লগেন কাকা বললেন,
“বাবা, আপনার কোনো ভয় নেই। দারভাঙার মহারাজা এসেছেন আপনার সঙ্গে দেখা করতে। আর ওরা তাঁর সান্ত্রী-পাহারাদার।”
বাবা অবাক হয়ে বললেন,
“সে কী লগেন কাকা! আমি তো সামান্য ভিক্ষু। আমার কাছে আবার রাজা-রাজড়া কেন? তাহলে তো আমাকে পালাতে হয়!”
নগেন্দ্র পাণ্ডা ও ভুবতী নাথ পাণ্ডা বাবাকে অনেক বুঝিয়ে সাহস দিলেন। কিন্তু এত সান্ত্রী-পাহারাদার দেখে বাবা তখনও অস্বস্তিতে।
তাই নগেন্দ্রনাথ পাণ্ডা মহারাজের লোকদের বললেন,
“আপনারা মন্দিরে ফিরে যান। মহারাজ যেন সাধারণ পোশাকে একাই বাবার কাছে আসেন।”
বাবা তখন একেবারে সাধারণ মানুষের মতো বসে আছেন। মনে মনে শুধু সুযোগ খুঁজছেন—একবার পালাতে পারলেই হয়! সুযোগ পেলেই সটান কুণ্ডের গভীর জলে ডুবে আত্মগোপন করবেন।
কিন্তু ভুবতী পাণ্ডা ও অন্যান্য ভক্তরা এমনভাবে বাবাকে ঘিরে বসেছিলেন যে পালানোর কোনো সুযোগই তিনি পাচ্ছিলেন না।
কিছুক্ষণ পর মহারাজা সাধারণ পোশাকে এক হাতে বিলিতি কারণের বোতল এবং অন্য হাতে ফলপাকুড় নিয়ে বাবার কাছে এসে হাজির হলেন।
মহারাজকে দেখে বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
“ভুবু কাকা, এ আবার কে?”
ভুবতী পাণ্ডা বললেন,
“বাবা, ইনি খুব ভালো মানুষ। দারভাঙার মহারাজা। আপনার ভক্ত। আপনার জন্য কারণ আর ফল নিয়ে এসেছেন।”
মহারাজ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন,
“বাবা, আপনার কোনো ভয় নেই। আমি আপনার একজন সামান্য ভক্ত। আপনার জন্য কারণ আর ফল এনেছি। সেবা করুন বাবা।”
বাবা সরলভাবে বললেন,
“বেশ বাবা, রাজা ধীরাজ! বাবা, বেঁচে থাকো। তোমার দুটো ছেলে হোক।”
এই বলে বাবা তাঁকে আশীর্বাদ করলেন।
মহারাজ তখন বিনীতভাবে বললেন,
“বাবা, আমি অপুত্রক বলেই আপনার শরণাপন্ন হয়েছি। আশীর্বাদ করুন, যেন বংশরক্ষার জন্য পুত্রসন্তান লাভ করি।”
বাবা বললেন,
“নিশ্চয়ই হবে বাবা। তারা মা বললে একটাও নয়—দুটো হবে। নিশ্চয়ই হবে।”
এরপর নগেন্দ্রনাথ পাণ্ডা বাবার হাতে কারণের বোতল তুলে দিলেন। বাবা বললেন,
“লগেন কাকা, বোতলটা খুলুন তো। একবার ফট করে দিই। আমাদের রাজা বাহাদুর খুব ভালো লোক।”
বোতল খোলা হলো। বাবা একটু কারণ ঢেলে কালু কুকুরকে খেতে দিলেন।
কিন্তু কালু তা খাওয়ার পরিবর্তে ঘৃণায় মুখ বাঁকিয়ে নিল।
কালু কারণ না খাওয়ায় মুহূর্তের মধ্যে বাবার মেজাজ বদলে গেল। রুক্ষ স্বরে তিনি বললেন,
“যা কুকুরে খায় না, তাই হবে দেবভোগ্য!”
বাবার এই আকস্মিক উগ্র রূপ দেখে রাজা বাহাদুর কিছুটা দূরে সরে গিয়ে বিস্মিত চোখে তাঁকে লক্ষ্য করতে লাগলেন।
পাণ্ডা ও ভক্তরা তখন রাজা বাহাদুরকে মন্দিরে ফিরে যেতে অনুরোধ করলেন। তিনি মন্দিরে ফিরে গেলেন।
কথিত আছে, বাবার আশীর্বাদের কিছুদিন পরেই দারভাঙার মহারাজা যমজ পুত্রসন্তানের পিতা হন।
এরপর থেকে মহারাজা বামাক্ষ্যাপার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন। বাবার জন্য তিনি নিয়মিত মাসোহারা দেওয়ারও ব্যবস্থা করেছিলেন।
এইভাবেই তারাপীঠের মহাশ্মশানে সাধক বামাক্ষ্যাপার সঙ্গে দারভাঙার মহারাজার সেই স্মরণীয় সাক্ষাতের ঘটনা লোকমুখে আজও প্রচলিত।