31/07/2026
একদিন গ্রীষ্মের প্রখর মধ্যাহ্নে বামাখ্যাপা একাকী বসে তাঁর কুকুরদের নিয়ে খেলছিলেন। ছোট ছেলেরা যেমন কুকুর নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে আনন্দ করে, বামাখ্যাপাও ঠিক সেইভাবেই তাদের সঙ্গে মেতে উঠেছিলেন। যিনি তাঁর প্রকৃত স্বরূপ জানতেন না, তিনি এ দৃশ্য দেখে তাঁকে পাগল ছাড়া আর কিছুই মনে করতেন না।
দীর্ঘক্ষণ প্রখর রৌদ্রে খেলাধুলার পর বামাখ্যাপা একটি বৃক্ষতলায় বসে বিশ্রাম নিলেন। পশুগুলিও তাঁর চারপাশে এসে শুয়ে পড়ল। এমন সময় দূরদেশ থেকে এক অন্তরঙ্গ ভক্ত এসে তাঁর চরণধূলি গ্রহণ করলেন। ভক্তকে দেখেই বামাখ্যাপা স্নেহভরে বললেন,— “তুই এসেছিস? আমার জন্য কী এনেছিস?”
ভক্তরা যা-ই আনতেন, তিনি সানন্দে গ্রহণ করতেন এবং শিশুর মতো আনন্দ প্রকাশ করতেন।
আগন্তুক ভক্তটিকে দেখলে বৈষ্ণব বলেই মনে হতো। কিছুক্ষণ বসে থেকে তিনি বামাখ্যাপার সেবা করে বিনীতভাবে বললেন,— “বাবা, তান্ত্রিক সাধকদের মাহাত্ম্য কিছুই বুঝতে পারলাম না।”
বামাখ্যাপা কিছুক্ষণ শিশুর মতো অপলক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ হো-হো করে হেসে উঠে বললেন,— “কেন রে, তোর কী হয়েছে?”
ভক্ত বললেন,— “প্রভু, আমাদের বাড়ির কাছে একজন তান্ত্রিক সন্ন্যাসী এসেছেন। তাঁর কথাই বলছি।”
বামাখ্যাপা জিজ্ঞাসা করলেন,— “সংসারী না সন্ন্যাসী?”
ভক্ত উত্তর দিলেন,— “সন্ন্যাসী।”
বামাখ্যাপা বললেন,— “তবে তুই তাঁর বিষয় কী বুঝবি?”
ভক্ত বললেন,— “তাঁর কাজকর্ম দেখে বড়ই ঘৃণা হয়।”
বামাখ্যাপা আবার হো-হো করে হেসে বললেন,— “ওই তো দরকার! যাকে সকলে ঘৃণা করে, তাকে যে মা কোলে করে রাখেন—তা কি জানিস?”
ভক্ত বললেন,— “প্রভু, হাসবেন না। আমি আবার একজন গৃহীকেও ওই রকম দেখেছি। সে অনবরত মদ-মাংস খায়। কিন্তু শাস্ত্রে তো অন্যরকম বলা আছে; আপনিও তো তাই বলেছেন।”
বামাখ্যাপা বললেন,— “সে সংসারী। মায়ের নামে যে মদ খেয়ে ঢলাঢলি করে, তার নাম করতে নেই।”
ভক্ত বললেন,— “তাকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এসব শাস্ত্রেই আছে।”
বামাখ্যাপা বললেন,— “তার গোষ্ঠীর মাথা! শাস্ত্র কি আবার লোক হাসানোর উপদেশ দেয়? যারা কিছুই জানে না, তারাই তারামায়ের শাস্ত্রকে নষ্ট করে।”
ভক্ত বিনীতভাবে প্রশ্ন করলেন,— “তবে শাস্ত্রে কী আছে, বাবা?”
বামাখ্যাপা উত্তর দিলেন,— “আমি অত শাস্ত্র-টাস্ত্র জানি না বাপু। তারা-মাকে নিয়েই সব কারবার। তাঁকে জানলেই হলো।”
ভক্ত বললেন,— “অনেকে বলেন, কলিযুগে এই ধরনের উপাসনাই প্রয়োজন; নইলে সিদ্ধিলাভের উপায় নেই।”
বামাখ্যাপা বললেন,— “দেখো বাপু, ভক্তের সাধনা বড়ই গুপ্ত বিষয়। এটা লোক দেখানোর জিনিস নয়। তাই গুরু বলতেন—সাধনা অত্যন্ত গোপন বিষয়। তুমি যা-ই করো না কেন, সাধনা কখনো লোক দেখিয়ে করবে না। তাতে সাধনার উন্নতি হয় না। লোক দেখিয়ে শুধু পূজা-অর্চনা করা যায়; কিন্তু প্রকৃত সাধকের সাধনা হয় নিভৃতে, এমনভাবে যে কেউ তা জানতে না পারে। জানাজানি হলেই সব পণ্ড হয়ে যায়।”
এই কথা বলে বামাখ্যাপা আবার হো-হো করে হেসে উঠলেন এবং সেখান থেকে দ্রুত চলে গেলেন। তাঁর প্রিয় কুকুরগুলিও সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পিছু নিল।