10/03/2026
কথায় বলে, "একটি ছবি হাজার শব্দের কথা বলে।" কিন্তু সেই ছবি যদি প্রেক্ষাপটহীন বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা সত্য বলার চেয়ে মিথ্যা ছড়াতেই বেশি সাহায্য করে। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সফর এবং তাঁকে কেন্দ্র করে রাজ্যে যে রাজনৈতিক বাদানুবাদ শুরু হয়েছে, তা এই সত্যকেই ফের সামনে নিয়ে এল।
রাষ্ট্রপতি যখন কোনো রাজ্যে সফরে যান, তখন দেশের 'প্রথম নাগরিক' হিসেবে তাঁকে স্বাগত জানানো সেই রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সাংবিধানিক কর্তব্য ও শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে। উত্তরবঙ্গ সফরে রাষ্ট্রপতির অভ্যর্থনায় রাজ্যের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি নিয়ে যখন সমালোচনার ঝড় উঠেছে, ঠিক তখনই একটি পাল্টা ছবি সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের পক্ষ থেকে একটি ছবি তুলে ধরা হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, ভারতরত্ন লালকৃষ্ণ আদবানি এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বসে আছেন, অথচ রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। দাবি করা হচ্ছে, এটি রাষ্ট্রপতির প্রতি অবমাননা। কিন্তু প্রকৃত সত্যটি অনুসন্ধান করলে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র।
ছবিটি ২০২৪ সালের ৩১ মার্চের। সেদিন বর্ষীয়ান জননেতা লালকৃষ্ণ আদবানিকে তাঁর বাসভবনে গিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান 'ভারতরত্ন' প্রদান করেছিলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু।
প্রটোকল অনুযায়ী, যখন রাষ্ট্রপতি কাউকে পুরস্কৃত করেন, তখন রাষ্ট্রপতি দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদান করেন এবং প্রাপক দাঁড়িয়ে তা গ্রহণ করেন। উপস্থিত অতিথিরা নিজ আসনে বসে অনুষ্ঠানটি প্রত্যক্ষ করেন।
লালকৃষ্ণ আদবানি সেই সময় শারীরিক অসুস্থতার কারণে দাঁড়িয়ে সম্মান গ্রহণ করতে অসমর্থ ছিলেন। তাই রাষ্ট্রপতি বিশেষ সৌজন্য দেখিয়ে তাঁকে বসে থাকা অবস্থাতেই ভারতরত্ন প্রদান করেন। রাষ্ট্রপতি নিজে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদান করছিলেন বলেই প্রধানমন্ত্রী সহ অন্যান্য অতিথিরা প্রটোকল মেনেই নিজ আসনে বসে ছিলেন।
একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের খণ্ডিত চিত্র ব্যবহার করে জনমানসে ভুল বার্তা দেওয়া কেবল রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাই নয়, বরং দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকেও কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা। উত্তরবঙ্গের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির স্বাগত প্রটোকল কেন লঙ্ঘিত হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে অন্য একটি ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া প্রশাসনিক গুরুত্বকে লঘু করে দেয়।
গণতন্ত্রে সমালোচনা কাম্য, কিন্তু সেই সমালোচনা যখন তথ্যের বিকৃতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। রাষ্ট্রপতির সম্মান এবং প্রটোকল কোনো দলীয় বিষয় নয়, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদার প্রতীক। তাই সত্যকে আড়াল না করে গঠনমূলক আলোচনা এবং শিষ্টাচার বজায় রাখাই কাম্য।