24/05/2026
বেশ কয়েকমাস আগে বলেছিলাম আমার ওয়াইফের একটা ঘটনা আপনাদের সাথে শেয়ার করব। যে কীভাবে ভুল চিকিৎসা ওর একটা চোখ কেড়ে নিয়েছে।
তো দিনটা ছিল ৫ই জুন সকালবেলা। ঘুম থেকে উঠেই মুন লক্ষ্য করে ওর ডান চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে আছে। আমাকে দু একবার বলে। আমি বলি চোখে জলের ঝাঁপটা দাও। হয়ত ঘুমের জন্য, বা চোখে নোংরা আছে এই জন্য ঝাপসা দেখছ।
কিন্তু এই দিন যত সময় এগোয় ওর চোখের ঝাপসা ভাবটা আরও বাড়তে থাকে। সন্ধ্যা আসতে আসতে ওর চোখে কিছুটা অংশ বেশ ব্লার হয়ে যায়। আমার এবার চিন্তা হয়। আমি কাছেই একটা ডাক্তারের কাছে যাই, মুলত যারা বিভিন্ন চশমার দোকানে চেম্বার করেন। হাতের কাছে এরাই এভালেবল থাকেন। তো এই ডাক্তার দেখে বললেন, ওর চোখে হয়ত রেটিনায় ফ্লুইড জমতে পারে, আপনি কাল একবার কোন ভালো হস্পিটালে নিয়ে যান। এটা মেডিসিন দিলে ঠিক হয়ে যাবে।
পরের দিন মানে ৬ই জুন। আমরা যাই মধ্যমগ্রামের সেন্টার ফর সাইটে (সমস্ত প্রেসক্রিপশন অ্যাটাচ করা আছে)। এখানে গিয়ে অ্যাপয়ন্টমেন্ট নেই ডাক্তার সুকন্যা মন্ডলের, দেখলাম FRCS ডিগ্রী আছে। এবং ১০ বছরের অভিজ্ঞতা। তাহলে ভালো ডাক্তারই হবেন।
ডাক্তার প্রথমে বেশ কয়েকটা টেস্ট করলেন। তারপর বলেন, অপারেশন করতে হবে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম যে ঠিক কী হয়েছে ?
বললেন, মুনের চোখের ভিতরে যে রেটিনা আছে সেটা ফ্লুইড জমে ডিটাচ হয়ে গেছে। এটা খুবই সিরিয়াস একটা প্রবলেম, যদি ইমিডিয়েটলি অপারেশন করা না হয় তাহলে হয়ত ভবিশ্যতে ডান চোখ পুরোপুরি ব্লাইন্ড হয়ে যাবে।
আমরা শুনে শকড হয়ে যাই। জিজ্ঞাসা করলাম এটা কীভাবে হয় ?
উনি বললেন – এক্সাক্ট রিজন তো জানা নেই।
- কীভাবে অপারেশন হবে ?
- চোখের ভেতরে একধরনের গ্যাস দেওয়া হবে, যেটা রেটিনার ওই পর্দা ঠেলে রাখবে ধিরে ধিরে ওটা ঠিক হয়ে যাবে।
- অপারেশন করলে পুরোপুরি ভিসন ব্যাক করবে তো ?
- হ্যা, তবে এটা আবার ফিরতে পারে। এই অপারেশনের কোন গ্যারান্টি নেই। এটা হয়ত ১-২ বছর পর আবার ফ্লুইড জমতে পারে। তবে ভয়ের কারন নেই, এটা এত তাড়াতাড়ি হয় না।
- খরচ কত হবে ?
- ৫০ এর মত।
এই পর্যন্ত কথা বলে আমাদের পাঠানো হয় ওই সেন্টার ফর সাইটের কনসাল্টেশন রুমে, ওয়াহিদা রহমানের কাছে, সাথে আরকটি মহিলা ছিল, তার নামটা মনে নেই, কাগজে কোথাও মেনশনও নেই।
এই দুটি মহিলা মিলে আমাদের ভয় দেখায়। বলে দরকার হয় কালই অপারেশন করান। নইলে এক চোখ অন্ধ হয়ে যাবে। এতে মুন ওখানে বসেই কেঁদে ফেলে। আমিও রীতিমত ভয় পাই। আর ওরা বলে দেখুন, চোখ কিন্তু ধীরে ধীরে আরও কালো হয়ে যাচ্ছে। মুন বলে হ্যা, সেটাই হচ্ছে। ওরা বলে যে যদি খুব দেরি করো অপারেশন করতে তাহলে হয়ত আর আগের মত ভিসন ফিরবে না চোখে।
সাথে আমাদের আরও একটা মিথ্যা কথা বলা হয় – যে যেদিন অপারেশন হবে সেদিনই নাকি কয়েক ঘন্টার মধ্যে দেখতে পারব।
তো যাই হোক, এখানে কথা বলে আমরা দুজনেই রীতিমত ঘাবড়ে যাই। চোখের বিষয়। অন্য কোন কিছু হলে না হয় একটু সময় দেওয়া যায়, বা অন্য কোন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া যায়। এখানে দেখলাম যেহেতু FRCS ডাক্তার, ১০ বছরের এক্সপেরিয়েন্স, নিশ্চয়ই ভালো হবেন।
বললাম ঠিকাছে তাহলে কালই অপারেশন করানো হবে, ডাক্তারের সাথে কথা বললাম, যদি কিছু ডিসকাউন্ট করেন, কারন একরাতের মধ্যে এত গুলো টাকা জোগাড় করাও একটু চাপ। তো উনি ৪-৫ হাজার টাকা কমান।
শুরু থেকে ডাক্তারের ব্যবহার খুবই ভালো ছিল। আর এটায় আমরা আরও বেশি ভরসা পাই যে চোখ ঠিক হয়ে যাবে।
পরের দিন যথারীতি মধ্যমগ্রাম পউছাই। ওরা ওখান থেকে আমাদের নিয়ে যায়, এক্সাইড মোরে থাকা সেন্টার ফর সাইটে। অপারেশন হয়, প্রায় ২-৩ ঘন্টা। চোখে না জানি কত ইঞ্জেকশন, আর কাটা ছেড়া হয়েছে। মুন পরে বলছিল কতটা কষ্ট লাগে, খোলা চোখে, সব বোঝা যাচ্ছিল। সেই ব্যাথা, সেই কষ্ট।
কিন্তু আমাদের মনে বিশ্বাস ছিল এই টুকু ব্যাথা সহ্য করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
ডাক্তার বললেন অপারেশন সাকসেসফুল। কিন্তু ওকে আগামী ১৫ দিন মাথা নীচে করে রাখতে হবে। নইলে ওর চোখে যে গ্যাস আছে, সেটা রেটিনাকে ভালো ভাবে সাপোর্ট দেবে না
এরপর থেকে শুরু হয় অহস্য ১৫টা দিন, মুন সারাদিন মাথা নীচু করে থাকত। জুন মাসের গরমে ও এক মুহূর্তের জন্য চিত হয়ে শুতেও পারত না।
৭দিন পর একবার চেকাপে গেলাম, ম্যাডাম বলল, সব কিছু একদম পারফেক্ট। খুব ভালো রিকভারি হচ্ছে।
আবার গেলাম ১৫ দিন পর, তখন দেখি ম্যাডামের মুখ কেমন পালটে গেছে, বলেন ওর ওই চোখে নাকি আবার ফ্লুইড এসেছে। আমরা শকড ! এত খরচ করে অপারেশন করা হল, আবার সেই এক প্রবলেম। এই সময় উনি আবার লেজার দিয়ে কিছু করেন। (আমি সব প্রেসক্রিপশন দিয়ে দিলাম পোস্টে) বলে এবার ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কথা ছিল ১৫ দিনের মধ্যে মুনের ভিসন আবার আগের মত হয়ে যাবে। সেটা তো হয়নি, বরং আরও ব্লার হয়ে যায়। ঝাপসা।
আমার এবার এই ডাক্তারের উপর সন্দেহ হয়। এরপর আমরা যাই, বিরাটির একজন ডাক্তারের কাছে (সুব্রত মন্ডল) তিনি চেক করে বললেন। মুনের এই চোখ আর ঠিক হবে না। কারন ওর চোখের নার্ভে কিছু স্কার এসেছে। যেগুলো আর ঠিক হবে না। কারন নার্ভ রিকভার হয় না। সাথে বললেন, ওর চোখে জাস্ট একটা ইনফ্লেমশন হয়েছিল, যেটা ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যেত (অপারেশনের পর ডাক্তার সুকন্যা মন্ডল একটা ওষুধ দিয়েছিলেন) এর জন্য অপারেশন করার কোন প্রয়োজন ছিল না।
এরপর আর কি ! একটা চোখ সারা জীবনের জন্য ড্যামেজ।
যখন সুকন্যা মন্ডলকে বললাম, এটা আপনি কি করলেন, স্বাভাবিক ভাবেই সব কিছু ডিনাই করলেন।
শঙ্কর নেত্রালয় গেলাম, হায়দ্রাবাদ গেলাম – সব জায়গায় একটা জিনিস বুঝিয়ে দিল যে অপারেশনের কারনেই এই ক্ষতিটা হয়েছে। আর এটা কখনই ঠিক হবে না।
একটা মেয়ে, ২২ বছর বয়স, সবে বিয়ে হয়েছে। জীবনে স্বপ্ন একজন মেকাপ আর্টিস্ট হবে। বা কোন চাকরি করবে। সে আর কোনদিন দু চোখ দিয়ে কিছু দেখতে পারবে না। ভাবুন ওর মানসিক অবস্থা তখন কেমন ছিল।
কথা বলত না শুধু চোখ দিয়ে জল পরত। এখনও ও এক টানা কোন কাজ করতে পারে না। চোখে ব্যাথা হয় এখনও।
এই হল আমাদের পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। আমাদের দোষ ছিল একটাই – একজন FRCS ১০ বছর এক্সপেরিয়েন্সড ডাক্তারকে বিশ্বাস করা। আর ওই কন্সাল্ট্যান্টদের কথায় ভয় পাওয়া। যাদের কাছে আমি আপনি, মানুষ না। আমরা হলাম খদ্দের। যাদের ঘাড় মটকে ইন্সেন্টিভ পাওয়া যায়।
ছবি ১- যেদিন অপারেশনে যাচ্ছিলাম
ছবি ২ - অপারেশনের দিন
ছবি ৩ - ৭দিন পরে যখন চেকাপে যাই
ছবি ৪ - চোখের উপরে কি অত্যাচার হয়েছে দেখতে পাবেন
ছবি ৫ - প্রথম যেদিন প্রেসক্রাইব করে যে অপারেশন করতে হবে।
ছবি ৬-৯ - সেদিন যা যা টেস্ট হয়েছিল
ছবি ১০ - অপারেশনের আগের পেপার
বাকি ছবি গুলো পর পর আছে, একদম শেষে আছে এলভি প্রসাদের প্রেসক্রিপশন। ওটা ডাউনলোড হয়নি। ওদের সার্ভারে কিছু প্রবলেম আছে।