06/09/2026
ভূগোলকে বই থেকে মঞ্চে—‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান–২০২৬’ তনুশ্রী ঘোষকে
২২ বছরের শিক্ষকতায় সৃজনশীল শিক্ষণ, নাট্যরূপে ভূগোল, সাহিত্যচর্চা ও ডিজিটাল শিক্ষণ-পদ্ধতির স্বীকৃতি
মালদহ: ভূগোলের কঠিন বিষয়কে শুধু বইয়ের পাতায় আটকে না রেখে গল্প, অভিনয়, মানচিত্র, স্থানীয় পরিবেশ ও ডিজিটাল উপস্থাপনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছে জীবন্ত করে তোলার দীর্ঘ প্রয়াস এবার পেল সরকারি স্বীকৃতি। শিক্ষাক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের পক্ষ থেকে ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান–২০২৬’-এর জন্য নির্বাচিত হয়েছেন মালদহের শিক্ষিকা তনুশ্রী ঘোষ। সরকারি পত্রে তাঁর এই সম্মানের কারণ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর বিশিষ্ট অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২০০৪ সালের ১২ জানুয়ারি ভূগোলের সহশিক্ষিকা হিসেবে শিক্ষকতা জীবনের সূচনা। দীর্ঘ ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত তনুশ্রী বর্তমানে মথুরাপুর বি.এস.এস. হাই স্কুল (উচ্চ মাধ্যমিক), মালদহ-এ ভূগোল ও শিক্ষাবিজ্ঞান পড়ান। ভূগোলে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড. ডিগ্রিধারী এই শিক্ষিকার কাছে শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের শেখার আনন্দের সঙ্গে যুক্ত করার এক নিরন্তর সৃজনশীল প্রয়াস।
পাঠ্যবই নয়, শিক্ষাই হোক জীবন্ত অভিজ্ঞতা
তনুশ্রী ঘোষের শিক্ষাদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ ভাবনা—শিক্ষা শুধু মুখস্থবিদ্যা নয়। শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে, পর্যবেক্ষণ করতে, বিশ্লেষণ করতে এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে পাঠ্যবিষয়কে মিলিয়ে দেখতে শেখানোই তাঁর লক্ষ্য।
শ্রেণিকক্ষে তিনি অনুসন্ধানভিত্তিক শিক্ষা, অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা, নির্মাণবাদী শিক্ষণ, গল্প বলা, নাট্যরূপ, মানচিত্রভিত্তিক শিক্ষা, সমস্যা-ভিত্তিক শিক্ষা এবং আনন্দময় শিক্ষণ-পদ্ধতির সমন্বিত প্রয়োগ করেন। ফলে একটি কঠিন ভৌগোলিক ধারণাও শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে ওঠে সহজ, আকর্ষণীয় এবং স্মরণীয়।
যখন ভূগোল উঠে আসে মঞ্চে
তাঁর সৃজনশীল উদ্যোগগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘মঞ্চে আমাদের পৃথিবী’ প্রকল্প। প্রায় সাত বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের বিভিন্ন পাঠ্যবিষয়কে নাট্যরূপ দেওয়ার কাজ করে চলেছেন তিনি।
এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা শুধু ভূগোলের তথ্য মুখস্থ করে না; বরং কখনও গ্রহ, কখনও নদী, কখনও মেঘ, কখনও আবার অন্য কোনও ভৌগোলিক উপাদানের চরিত্রে অভিনয় করে বিষয়টির সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে নেয়। ফলে শ্রেণিকক্ষের বিমূর্ত ধারণা মঞ্চে হয়ে ওঠে দৃশ্যমান ও জীবন্ত।
তনুশ্রীর মতে, যে বিষয়কে শিক্ষার্থী দেখে, অনুভব করে এবং নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, সেই বিষয় শেখা অনেক বেশি স্থায়ী হয়।
শিক্ষার্থীদের চারপাশের পরিবেশ তাঁর শিক্ষণ-পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্থানীয় নদী, মাটি, কৃষি, জনবসতি, ভূমির ব্যবহার, বাজার, পরিবহণ, জলবায়ু ও পরিবেশগত সমস্যাকে বৃহত্তর ভৌগোলিক ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে পাঠদান করার চেষ্টা করেন তিনি।
অর্থাৎ, ভূগোল তাঁর কাছে শুধু মানচিত্রের রেখা বা বইয়ের সংজ্ঞা নয়—শিক্ষার্থীর নিজের চারপাশের পৃথিবীই হয়ে ওঠে ভূগোলের পাঠশালা।
শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাতেও সক্রিয় তনুশ্রী ঘোষ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নিঃশব্দে অন্তরে একা—স্মৃতির ফসিল, শূন্যতার দলিল’, ‘অলক্ষ্যে একেলা’, ‘মঞ্চে আমাদের পৃথিবী’ এবং ‘আমাদের পৃথিবী’। এছাড়াও অষ্টম শ্রেণির ভূগোলের নাট্যরূপ নিয়েও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গ্রন্থ।
তাঁর সাহিত্যকর্মে মানুষের নীরবতা, স্মৃতি, একাকিত্ব ও মানবিক অনুভূতির পাশাপাশি নারীর জীবনসংগ্রাম এবং সামাজিক বাস্তবতার নানা দিকও উঠে এসেছে।
বর্তমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল শিক্ষণেও উদ্যোগী তনুশ্রী। ভূগোল ও শিক্ষাবিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের জন্য নিজস্ব তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দৃশ্যভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী এবং উপস্থাপনা তৈরি করেছেন তিনি।
চিত্র, নকশা, গ্রাফিক গল্প, রেখাচিত্র, মানচিত্র, তথ্যচিত্র, চলমান চিত্র এবং উপগ্রহচিত্রের সাহায্যে জটিল বিষয়কে সহজ ও দৃশ্যমান করে তোলাই তাঁর লক্ষ্য।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে তিনি শিক্ষককে প্রতিস্থাপনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। বরং তাঁর মতে, সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এই প্রযুক্তি শিক্ষককে আরও সৃজনশীল, শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক এবং কার্যকর শিক্ষণ-পদ্ধতি গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
তনুশ্রী ঘোষের কাছে শিক্ষার্থীর সাফল্য কেবল পরীক্ষার নম্বর দিয়ে বিচার করা যায় না। আত্মবিশ্বাস, সৃজনশীলতা, মূল্যবোধ, যোগাযোগক্ষমতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ফল।
বিদ্যালয়ছুট হওয়ার সম্ভাবনায় থাকা শিক্ষার্থী কিংবা পিছিয়ে পড়া পরিবারের অভিভাবকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও পরামর্শের মাধ্যমেও শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি।
নিজেকেও তিনি মনে করেন ‘আজীবন শিক্ষার্থী’। স্বীকৃত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডিজিটাল শিক্ষণ-পদ্ধতি, শিক্ষা, মনোবিজ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষণ কৌশল নিয়ে একাধিক প্রশিক্ষণ, কোর্স ও অনলাইন শিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। মালদহের একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি/বিলকে কেন্দ্র করে তাঁর পরিবেশবিষয়ক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক সেমিনারেও উপস্থাপিত ও প্রশংসিত হয়েছে।
‘বিদ্যাসাগর শিক্ষা সম্মান–২০২৬’ তনুশ্রী ঘোষের কাছে নিছক ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা, শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার প্রয়াস, সৃজনশীল শিক্ষণ, সাহিত্যচর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, গবেষণা ও সমাজসেবার পাশাপাশি বিদ্যালয়, সহকর্মী এবং শিক্ষার্থীদের সহযোগিতারও সম্মিলিত স্বীকৃতি এই সম্মান।
তাঁর কথায়, “আমার কাছে একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনও শংসাপত্র বা সম্মান নয়—একজন শিক্ষার্থীর চোখে শেখার আনন্দ দেখতে পাওয়া।”
সরকারি এই সম্মান পাওয়ার পরও থেমে থাকতে চান না তিনি। বরং আগামী দিনে শিক্ষাকে আরও সহজ, আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও সৃজনশীল করে তোলার লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে চান।
তাঁর এই সম্মান তাই কোনও যাত্রার সমাপ্তি নয়। বরং ২২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতার আলো এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও নতুন কিছু করার অঙ্গীকার নিয়ে শুরু হচ্ছে তাঁর শিক্ষণ-যাত্রার এক নতুন অধ্যায়।
ভূগোল যেখানে শুধু বইয়ের বিষয় নয়—মঞ্চে, জীবনে এবং বাস্তব পৃথিবীতেই তার পাঠ।