06/10/2026
৪৫৯-তম বর্ষে আন্দুল দত্তচৌধুরী পরিবারের শারদীয়া দুর্গাপুজো
তথ্য ও চিত্র - ধ্রুব চৌধুরী: হাওড়া জেলার অন্যতম প্রাচীন পারিবারিক দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে আন্দুলের দত্তচৌধুরী পরিবারের শারদীয়া দুর্গাপুজো। কয়েক শতাব্দীর ইতিহাস ও পারিবারিক ঐতিহ্য বহন করে আজও প্রাচীন রীতিনীতি মেনে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে এই পুজো।
আনুমানিক ১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সুলতান সিকান্দার শাহের আমলে তেকড়ি দত্ত তৎকালীন মুজঃফরপুর পরগনার ‘চৌধুরী’ পদ লাভ করেন। এর পর তিনি তাঁদের পৈতৃক বালিগ্রামের বাসভবন (ভরদ্বাজ গোত্রীয় 'কুলশ্রেষ্ঠ'বালির দত্ত) ত্যাগ করে সরস্বতী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত আন্দুলে এসে সমাজ সংস্কার করে প্রাসাদবাড়ি, দেবোত্তর, ইত্যাদি স্থাপন করেন। সেই সময় থেকেই আন্দুলে দত্তচৌধুরী বংশের ইতিহাসের সূচনা। তেকড়ি দত্তের ষষ্ঠ পুরুষ ছিলেন চৌধুরী রামশরণ দত্ত (১৫৪৮–১৬০৬ খ্রিস্টাব্দ)। বাংলার ইতিহাসে তখন এক অস্থির সময়। পাঠান শাসনপর্বে সরস্বতী নদীপথে পর্তুগিজ ও মগ দস্যুদের হানায় প্রজাকুল বারবার বিপর্যস্ত হয়ে উঠত। পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসারে, এমনই এক সংকটময় সময়ে কুলগুরুর পরামর্শে চৌধুরী রামশরণ অশ্বমেধ যজ্ঞের সমতুল্য ধর্মীয় মাহাত্ম্যসম্পন্ন মহাপূজা হিসেবে দুর্গাপুজোর প্রবর্তন করেন। ১৫৬৮ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় দত্তচৌধুরী পরিবারের এই শারদীয়া মহাপূজা। তার পর কেটে গিয়েছে সাড়ে চার শতাব্দীরও বেশি সময়। বংশপরম্পরায় সেই পুজো আজও অব্যাহত। ২০২৬ সালে ঐতিহ্যবাহী এই দুর্গাপুজো ৪৫৯তম বর্ষে পদার্পণ করেছে। সময়ের পরিবর্তন ঘটলেও পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বহু প্রাচীন পারিবারিক আচার ও রীতিনীতি আজও যথাসম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে।
এই প্রাচীন পুজোকে ঘিরে প্রতি বছরই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যেও বিশেষ উৎসাহ দেখা যায়। শারদোৎসব উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকেও শুভেচ্ছাবার্তা এসে পৌঁছয় দত্তচৌধুরী বাড়িতে।
এই পরিবারের আরাধ্যা মহিষমর্দিনী দুর্গা এখানে ‘রাজরাজেশ্বরী’ নামে পূজিতা। প্রতিমা ও চালচিত্রেও রয়েছে এই পুজোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। দেবীর চালি নির্মিত হয় সাবেকি ‘টানাচৌরি’ রীতিতে। লক্ষ্মীর চালিতে আঁকা থাকে জগদ্ধাত্রীর প্রতিকৃতি এবং তার উপরে বসানো হয় দেবী জয়ার ছোট মূর্তি। সরস্বতীর চালিতে আঁকা হয় দক্ষিণাকালীর রূপ, উপরে অধিষ্ঠিতা থাকেন দেবী বিজয়া। আর দুর্গার মূল চালিতে থাকে অনন্ত বিষ্ণুর চিত্র; সর্বোচ্চে বসানো হয় ধ্যানমগ্ন শিবের মূর্তি।
দত্তচৌধুরী বাড়ির দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি শুরু হয় মূল পুজোর ১২ দিন আগেই। কৃষ্ণানবমীতে কল্পারম্ভের সঙ্গে দুর্গাদালানের নির্দিষ্ট ‘বোধনঘরে’ শুরু হয়ে যায় বোধনের আচার। ষষ্ঠীর বিকেলে বাড়িতে এসে উপস্থিত হন পরিবারের রাজপুরোহিত ও তন্ত্রধারক। এই পরিবারের পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য নবমীর আচার। এ দিন অনুষ্ঠিত হয় কুমারীপুজো, বলি এবং ধুনো পোড়ানো। এক সময়ে নবমীতে ছাগবলি দেওয়ার প্রথা থাকলেও বর্তমানে তা সম্পূর্ণ বন্ধ। তার পরিবর্তে প্রাচীন রীতির স্মারক হিসেবে অনুষ্ঠিত হয় আখবলি, চালকুমড়ো বলি এবং প্রতীকী ‘শত্রুবলি’। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী—তিন দিনই রাজরাজেশ্বরীর উদ্দেশে নিবেদন করা হয় অন্নভোগ।
বিজয়া দশমীর বিকেলে শুরু হয় বিদায়ের পর্ব। দেবীকে তাঁর বেদি থেকে নামিয়ে উত্তরমুখী করে রাখা হয়। প্রথমে দত্তচৌধুরী পরিবারের বৌরাণীরা দেবীকে বরণ করেন। তাঁদের বরণের পর এগিয়ে আসেন পাড়ার বিবাহিত মহিলারা। বরণপর্ব শেষ হলে শোভাযাত্রা সহকারে রাজরাজেশ্বরীকে নিয়ে যাওয়া হয় আন্দুলের দুলেপাড়ায়। সেখানে আরও এক দফা বরণের পর শুরু হয় নিরঞ্জনের শেষ যাত্রা। এক সময়ে দত্তচৌধুরী পরিবারের নিজস্ব ‘ব্যাচামণি ঘাট’-এ সরস্বতী নদীর জলে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হত। কিন্তু কালের প্রবাহে সরস্বতী নদীর জলধারা ক্ষীণ হয়ে পড়ায় সেই প্রথায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে দুর্গাদালানের সামনেই পরিবারের দেবোত্তর পুকুরে রাজরাজেশ্বরীর প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়।
এই ভাবেই কৃষ্ণানবমীর কল্পারম্ভ থেকে বিজয়া দশমীর নিরঞ্জন—দীর্ঘ আচারপরম্পরার মধ্য দিয়ে আজও বেঁচে রয়েছে আন্দুলের দত্তচৌধুরী পরিবারের কয়েক শতাব্দীপ্রাচীন শারদোৎসব। সময়ের সঙ্গে কিছু রীতির পরিবর্তন ঘটলেও রাজরাজেশ্বরীকে কেন্দ্র করে পরিবারের উত্তরাধিকার, স্থানীয় জনজীবন এবং আন্দুলের স্মৃতি আজও একই সূত্রে বাঁধা।