26/02/2026
~~ 26 সে ফেব্রুয়ারী 2025 সকাল ~~
এক বছর হয়ে গেলো বাবুজি চলে গেছে ।। সময় কারুর জন্য থেমে থাকে না । সে চলতেই থাকে ।।আমাদের কেও তার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয় ।।
গোপালদা- নিয়োগীদা- নিয়োগী সাহেব - এই নামেই বাবুজি কে ডাকতো সবাই । আজ আমি ডাক্তার হবার পরে কিছু মানুষ আমাকে আমার নামেই চেনে , কিন্তু এখন ও কিছু মানুষ আমাকে গোপালদার ছেলে বলেই সম্বোধন করে ।। তখন বেশ গর্ব অনুভব হয় ।। বাবুজির নামে ছেলের পরিচিতি আমি বেশ উপভোগ করি ।। আমার বালি র চেম্বারের সামনে থেকে একদিন toto ই উঠেছিলাম , দুজন বয়স্ক মানুষ আগে থেকে ই বসেছিলেন , তারা আমাকে চেনেন না , একজন জিজ্ঞাসা করলেন " এখানে হোমিওপ্যাথি ডাক্তার বসে ?" আরেকজন উত্তর দিলেন " আরে আমাদের গোপালদার ছেলে ডাক্তারি পাশ করে এখানে চেম্বার করে "।। এটা শুনে সেদিন বেশ ভালো লেগেছিলো ।।
বাবুজির সামনে বা বাবুজির পিঠ পিছে দেখিনি বা শুনিনি বাবুজির নামে কেউ বদনাম করছে বা খারাপ কথা বলছে ।। এখন ও বালিবাজার বা হপ্তা বাজার গেলে আগেকার আলু র দোকান দার বা মাছের দোকান দার বাবুজির প্রসঙ্গ তোলে । আর একটাই কথা বলে " বড় ভালো মানুষ ছিলেন তোমার বাবা "
কখন যে " ভালো মানুষ " থেকে "ভালো মানুষ ছিলেন" হয়ে গেলো বুঝতেই পারলাম না ।। Past Tense | সেটাও দেখতে দেখতে 1 বছর হয়ে গেলো ।।
তবে সবাই ভালো বললেও আমার বাবুজির খুব খারাপ দোষ একটা ছিলো - আমার বাবুজি সত্যি ই খুব ভালো মানুষ ছিলো আর সবসময় অন্যের জন্য ভাবতো , নিজের জন্য কোনোদিন কিছু করতে আমি তো দেখিনি। অতিরিক্ত ভালোমানুষ - এই যুগে এটাই সব থেকে বড় দোষ ।। অনেক বছর আগেকার কথা তখন বাবুজি 9:26 এর ডানকুনি লোকাল ধরতো । 9:20 হয়ে গেছে তড়ি ঘড়ি করে বেরোচ্ছে - ঠিক সেই সময় এক অচেনা ভদ্রমহিলা এলেন তার মেয়ের documents attested করানোর জন্য ।। আমরা তো না বলে দিলাম । উনি অফিস যাচ্ছেন আপনি সন্ধ্যেবেলা আসুন ।। বাবুজি বললেন ওনাকে ডাকো , আমি সই করে দেব । আমরা বললাম - আরে তুমি ট্রেন পাবে না ।। বাবু সেই চিরাচরিত ডায়লগ দিলো " ও কিছু হবে না , তুই ডাক ওনাকে " | ওনাকে attested করে দিলেন।। সকালের অফিস time এ তাড়াহুড়ো র সময় কাউকে কোনোদিন আমি ফেরাতে দেখিনি । ভাত খেতে বসেও হাত ধুয়ে সই করে দিয়েছে ।। একদিন বলেছিল - " আমার একবার attested করানোর প্রয়োজন হয়েছিল , কিন্তু অনেক harrasment হতে হয়েছিল , তাই যেদিন নিজে attested করার ক্ষমতা পেলাম সেদিন ই ঠিক করে নিয়েছিলাম, আমার কাছে কেউ সই করাতে এলে তাকে কোনোদিন ও ফেরাবো না" ।।
বই পড়তে ভীষণ ভালোবাসতো বাবুজি ।। বড়দের বই হোক বা ছোটদের কমিক্স। কোনোটাই বাদ যেতো না ।। covid এর সময় আমি online এ ইন্দ্রজাল কমিক্স এর সেই পুরোনো বেতাল , অরণ্যদেব , Mandrake এর বেশ কিছু বই আনিয়েছিলাম । খুব খুশি হয়ে এক দিনেই সব বই গুলি গোগ্রাসে শেষ করে দিয়েছিল ।।
2012 সালে Heart attack হবার পর বছরে 1-2 বার নার্সিং হোমে ভর্তি হতে হত ।। icu থেকে General bed এ shift হতেই নির্দেশ চলে আসতো বই আনার জন্য ।। রোজ দুইবেলা visiting hours এ বই নিয়ে যেতে হত ।। covid এর সময় অপারেশন এর আগে টানা দুই মাস নার্সিং হোমে ভর্তি ছিল । সেই সময় দেখিনি বাবুজি কে অধৈর্য্য বা বিরক্ত হতে ।। রোজ বই নিয়ে যেতাম আমি আর দাদা।। visiting ডাক্তার বাবু রাও আমাদের বলতেন বাবা কে আর বই দিও না চোখে প্রেসার পড়বে , উনি সারাদিন বই পড়েন।।
2022 এর পর থেকে অবশ্য আর বই দিতে হয়নি ।। তখন বাবা শুধু bed ridden ই নয় , বাবার higher mental function ও কমে গেছিলো ।। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকতো ।। আর মাঝে মাঝে কিছু কথা বলতো যার কোনো অর্থই হয় না ।।
শেষের দিকে আমি কিছু জোর করে ভিডিও করতাম , কবিতা বলাতাম , জানিনা facebook এ সেগুলো আছে নাকি deleat হয়ে গেছে ।।
Bed ridden হবার পর কিছু শারীরিক অসুবিধা হলে বলার বা বোঝার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছিলো , তখন শুধু ছোটকা ছোটকা বলে আমার ডাকনাম ধরে ডাকতো ।।
ঐ সময় bed এই সব কিছু করাতে হত ।। মাঝে মাঝে ধৈর্য্য হারিয়ে রেগেও গেছি , এখন খারাপ লাগে সেই সব কথা মনে পড়লে ।।
বাবুজি আমাদের গায়ে কোনোদিন হাত তোলেনি । বাবুজি কে খুব কম রাগ তে দেখেছি ।। অসীম ধৈর্য্য ছিলো বাবুজির ।। খুব বড় মনের মানুষ ছিলো বাবুজি ।। নিজের টা কোনোদিন সে দেখেনি , সারা টা জীবন অন্যের জন্য করে গেছিলো ।।
আমাকে আর দাদা কে কোনোদিন কোনোকিছুর জন্য বারণ করেনি বাবুজি ।। আমরা যেটা চেয়েছি , সেটাই করতে দিয়েছে।। সেটা আমাদের ক্যারিয়ার হোক বা পড়াশোনা হোক বা অন্য কিছু ।। আমাকে নাকি অনেকটা বাবুজি র মতন দেখতে ।। আমি দাদা বাবুজি একসময় 3 জনেই long hair style করে রেখেছিলাম।। বাবুজির বড় চুল ছিলো 2020 পর্যন্ত ।। সিগারেট খেতো , রজনীগন্ধা খেতো - কিন্তু কোনো একবছর সিদ্ধান্ত নিলো আর খাবে না - ব্যাস আর ছোয়নি কোনোদিন ।। শুধু নস্য নিতো - ওটাই অবশ্য আসল রোগ এর কারণ ছিলো ।। Drink করতো খুব কালে ভদ্রে কিন্তু আনন্দ করতে খুব ভালোবাসতো ।। বিভিন্ন দামি দামি Drinks এর বোতল সাজিয়ে একটা showcase করার খুব শখ ছিলো - সেটা অবশ্য হয়ে ওঠেনি ।। তবে বোতল গুলো এখন ও আছে অগোছালো হয়ে ।।
নিজের কোনো শখ বা ইচ্ছে বা স্বপ্ন ছিলো কি না জানি না , কোনোদিন জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠেনি আর সেও বলেনি ।। তবে টিনটিন এর animation movie 3D তে দেখিয়েছিলাম imax/cinemax এ - খুব আনন্দ পেয়েছিল ।। রাজধানী বলে একটা restaurent এ নিরামিষ থালি পাওয়া যায় , সব বড় বড় celebrity রা ওখানে যায় - একবার নিয়ে গিয়েছিলাম - সেই বার ও খুব আনন্দ পেয়েছিল। জেমস বন্ড এর সিনেমা দেখতে খুব ই ভালোবাসতো ।। কোচবিহার আর বক্সিরহাট এ আমার বাবুজিকে সবাই এতো ভালোবাসতো - আমরা ইয়ার্কি মেরে বলতাম তুমি হলে ওখানকার মুকুট হীন সম্রাট ।
সব কিছুতে আমাদের সাথে থাকতো ।। কোনোদিন বাধা দেয়নি কোনো কাজ করার জন্য ।। আমরা কোনো সময় হেরে গিয়ে মন খারাপ করে বসে থাকলে বাবুজি বলতো " ও কিছু হয়নি , সব ঠিক হয়ে যাবে" ।। নিজের কষ্ট কোনোদিন ও মুখে আনতো না , আমাদের বুঝতেই দিত না ।। Heart attack যেদিন হয় তার 5-6 দিন আগে থেকেই বুকে ব্যাথা হচ্ছিলো - কিন্তু আমাদের বুঝতেই দেয়নি - সব কাজ করছিলো - হাসি মুখেই বলেছি - ও একটু আধটু ব্যাথা হচ্ছে ঠিক হয়ে যাবে ।।
বটগাছ ছিলো আমার কাছে ।। ডানা ভেঙে গেলেও জানতাম আমার মাথা র ওপর একটা বটগাছ আছে , ও আমার সব সমস্যার সমাধান করে দেবে।। তবে যাই হোক আজ আমি নিজে বটগাছ বা বৃক্ষ হয়েছি শুধুমাত্র বাবুজির শিক্ষায় আর আশীর্বাদে ।।
শিবভক্ত ছিলো তাই হয়তো শিবরাত্রি র দিনেই চলে গেলো ।। শেষ 3-4 বছর bed ridden থাকলেও আমার মা এর দেখাশোনায় আর ঠাকুরের আশীর্বাদে bed sore হয়ে কষ্ট পায়নি।। শিবভক্ত ছিলো বলেই হয়তো সব দুঃখ কষ্ট নিজের মধ্যে নেবার বা নিজের ভেতরে রাখবার ক্ষমতা ছিলো ।। ফেব্রুয়ারী মাস আমার দুই ভাইপো র জন্মমাস ।। আর বাবুজির মৃত্যুদিন আমার বড় ভাইপো র জন্মদিন ।।
।। ফেব্রুয়ারী মাস ।। - এই মাস টা আমার ঠিক suite করলো না।।
প্রথম জীবনে শ্রী শ্রী ঠাকুর বালক ব্রহ্মচারীর কাছে বাবুজি দীক্ষা নিয়েছিলেন আর ওনার সাথেই থাকতেন ।। পরবর্তীকালে আমি বাবুজির বিশেষ ধর্মীয় interest দেখিনি ।। কোচবিহার এ থাকালীন একবার সংকরাচার্য এসেছিলেন। ওনাকে প্রণাম করলে সবাই কে আশীর্বাদ স্বরূপ একটা ফুল দিছিলেন। বাবুজি আমার দিদা কে নিয়ে গেছিলেন , দিদা প্রণাম করলে ওনাকে ফুল দিয়েছিলেন , বাবুজি প্রণাম করার পর বাবুজির হাতে একটা রুদ্রাক্ষ দিয়েছিলেন।। সেটা সযত্নে কোথাও রাখা আছে বাড়িতে ।।
এখন বাবুজি কে miss করি বললে মিথ্যে বলা হবে ।। Miss করি না। বাবুজির কথা মাথা তেই থাকে তার স্মৃতি তার অভিজ্ঞতা মাথা তেই থাকে - তাই যাকে ভুলিনি তাকে আর miss করবো কিভাবে ।।..
Dr. Abhisek Neogy
Dr.Neogy's Clinic