25/06/2026
"হুগলি জেলার এক প্রাচীন জনপদ গুপ্তিপাড়া। গঙ্গার তীরবর্তী এই ঐতিহাসিক অঞ্চলের পরিচয় শুধু তার প্রাচীন মন্দির বা সংস্কৃতির জন্য নয়, বরং শতাব্দী প্রাচীন রথযাত্রার জন্যও।
আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছরেরও বেশি আগে গুপ্তিপাড়ায় শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের আরাধনাকে কেন্দ্র করে রথযাত্রার সূচনা হয়। কথিত আছে, ভক্তদের উদ্যোগেই এই উৎসব ধীরে ধীরে বড় আকার ধারণ করে। এরপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুপ্তিপাড়ার রথ বাংলার অন্যতম বিখ্যাত রথযাত্রায় পরিণত হয়।
গুপ্তিপাড়ার জগন্নাথ মন্দিরে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার পূজা হয়। রথযাত্রার দিন এই তিন বিগ্রহকে সুসজ্জিত কাঠের বিশাল রথে বসিয়ে মন্দির থেকে মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। হাজার হাজার ভক্ত রথের দড়ি টেনে এই যাত্রায় অংশ নেন।
তবে গুপ্তিপাড়ার রথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বিশেষ ঐতিহ্য, যার নাম 'ভাণ্ডার লুট'। উল্টো রথের আগের দিন জগন্নাথদেবের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ প্রসাদ নিবেদন করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে ভক্তরা সেই প্রসাদ সংগ্রহের জন্য একত্রিত হন। এই অনুষ্ঠান বহু বছর ধরে গুপ্তিপাড়ার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে রয়েছে এবং দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এই দৃশ্য দেখার জন্য ভিড় করেন।
রথযাত্রাকে ঘিরে বসে বিশাল মেলা। একসময় এই মেলায় আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের মানুষ কেনাকাটা করতে আসতেন। এখনও সেই ঐতিহ্য বজায় রয়েছে। খেলনা, মাটির জিনিস, মিষ্টি, নাগরদোলা এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
গুপ্তিপাড়ার রথ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং মানুষের আবেগের প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই উৎসব মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, মিলন এবং ঐতিহ্যের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে।
আজও যখন রথের বিশাল চাকা ঘুরতে শুরু করে, তখন শুধু একটি রথ এগিয়ে যায় না— এগিয়ে যায় শত শত বছরের ইতিহাস, বিশ্বাস এবং বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
আর সেই কারণেই, গুপ্তিপাড়ার রথ শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়, এটি বাংলার ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়।"