14/08/2026
১৫ আগস্ট আসতে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
এবার আমরা পালন করব ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস।
কিন্তু এই স্বাধীনতার গল্প শুধু উৎসবের নয়, এর প্রতিটি পাতায় লেখা আছে ত্যাগ, রক্ত আর অগণিত মানুষের আত্মদানের ইতিহাস।
কিন্তু আজকের দিনটা শুধু পতাকা তোলার দিন নয়। শুধু মিষ্টি খাওয়ার দিন নয়। আজকের দিনটা একটু থেমে আমাদের নিজেদের একটা প্রশ্ন করার দিন।
আমরা যে স্বাধীন দেশে আজ দাঁড়িয়ে আছি, সেই স্বাধীনতা এল কীভাবে?
চলুন, আজ আমি আপনাদের একটা গল্প বলি।
গল্পটা আজকের নয়।
গল্পটা শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে।
একদিন ইংরেজরা এই দেশে এসেছিল ব্যবসা করতে। হাতে ছিল ব্যবসার পুঁজি, মুখে ছিল বাণিজ্যের কথা। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ব্যবসায়ীরাই দেশের ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে শুরু করল।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলায় ইংরেজদের ক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকে।
কিন্তু এই দেশের মানুষ চুপ করে বসে থাকেনি।
বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের বাড়তে থাকা আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতে হায়দার আলি এবং তাঁর ছেলে টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। টিপু সুলতান শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ দিয়েছিলেন।
অন্যদিকে বাংলার ফকির ও সন্ন্যাসী প্রতিরোধ, দক্ষিণ ভারতে পুলি থেভর, তামিলনাড়ুতে বীরপান্ডিয়া কাট্টাবোম্মানের মতো নেতাদের বিদ্রোহও ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভের পরিচয় দিয়েছিল।
অর্থাৎ স্বাধীনতার গল্প ১৮৫৭ সালে হঠাৎ শুরু হয়নি।
তার অনেক আগে থেকেই এই মাটির বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিরোধের আগুন জ্বলছিল।
তারপর এল ১৮৫৭ সাল।
ব্যারাকপুরে মঙ্গল পান্ডের বিদ্রোহের ঘটনা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। এরপর ১০ মে মীরাটে সিপাহিদের বিদ্রোহ বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লি, কানপুর, লখনউ, ঝাঁসি, বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ ইংরেজদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেল।
দিল্লিতে বৃদ্ধ বাহাদুর শাহ জাফরকে সামনে রেখে বিদ্রোহীরা স্বাধীনতার পতাকা তুলেছিল।
ঝাঁসিতে রানি লক্ষ্মীবাই হাতে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন।
লখনউয়ে বেগম হজরত মহল ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন।
বিহারে কুনওয়ার সিংয়ের মতো হিন্দু নেতা ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন।
আবার একই সময়ে মাওলভি আহমদুল্লাহ শাহ ফৈজাবাদি, হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কী, মাওলানা মুহাম্মদ কাসিম নানুতভি এবং মাওলানা রশিদ আহমদ গঙ্গোহির মতো মুসলিম নেতারাও ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
শামলি ও থানা ভবন অঞ্চলে আলেমদের নেতৃত্বে ইংরেজদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ হয়েছিল।
এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলা দরকার।
দেওবন্দের মাদ্রাসা থেকে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, এমনটা বলা ঐতিহাসিকভাবে ঠিক নয়। কারণ দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৭ সালে।
তবে ১৮৫৭ সালের সেই লড়াইয়ের সঙ্গে যুক্ত আলেমদের একটি ধারাই পরবর্তীকালে দেওবন্দের স্বাধীনতা-চেতনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করে। পরে দেওবন্দের বহু আলেম ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে জেল, নির্বাসন ও নানা নির্যাতন সহ্য করেন।
এভাবেই ভারতের স্বাধীনতার গল্পে আমরা দেখি এক আশ্চর্য ছবি।
একদিকে মঙ্গল পান্ডে, রানি লক্ষ্মীবাই, কুনওয়ার সিং।
অন্যদিকে বাহাদুর শাহ জাফর, বেগম হজরত মহল, মাওলভি আহমদুল্লাহ শাহ।
কিন্তু তাঁরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না।
তাঁদের শত্রু ছিল একই, তাঁদের স্বপ্ন ছিল একই।
দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করা।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
ইংরেজরা বিদ্রোহ দমন করল।
অনেক মানুষ মারা গেলেন।
অনেককে ফাঁসি দেওয়া হলো।
অনেককে কারাগারে পাঠানো হলো।
কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্নকে হত্যা করা গেল না।
তারপর শুরু হলো আরও দীর্ঘ লড়াই।
মাওলানা মাহমুদ হাসান, যাঁকে শায়খুল হিন্দ বলা হয়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধি, হুসাইন আহমদ মাদানি এবং আরও অনেকে।
আর সেই একই স্বাধীনতার পথে এগিয়ে আসেন মহাত্মা গান্ধী, সরদার প্যাটেল, জওহরলাল নেহরু, বাল গঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়ের মতো নেতারা।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদও স্বাধীনতার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন।
তারপর আসে এমন একটি বন্ধুত্বের গল্প, যা আজও আমাদের শেখায় স্বাধীনতার কোনো ধর্ম হয় না।
একজন ছিলেন রামপ্রসাদ বিসমিল।
আর তাঁর ঘনিষ্ঠ বিপ্লবী সহযোদ্ধা ছিলেন আশফাকউল্লাহ খান।
একজন হিন্দু।
একজন মুসলিম।
কিন্তু দেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁদের হৃদয়ের স্বপ্ন ছিল এক।
তাঁরা একই বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছেন, একই উদ্দেশ্যে লড়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত দুজনেই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।
এটাই ছিল ভারতের স্বাধীনতার আসল শক্তি।
হিন্দুর সাহস আর মুসলমানের সাহস আলাদা ছিল না।
মুসলমানের রক্ত আর হিন্দুর রক্তের রংও আলাদা ছিল না।
তারপর এল ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল।
জালিয়ানওয়ালাবাগ।
অমৃতসরের সেই বাগানে বৈশাখী উপলক্ষে বহু সাধারণ মানুষ জড়ো হয়েছিলেন।
কেউ হয়তো উৎসব দেখতে এসেছিলেন।
কেউ হয়তো রাজনৈতিক সভায় যোগ দিতে।
কেউ হয়তো শুধু কৌতূহলবশত সেখানে ছিলেন।
কিন্তু জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালানো হলো।
মানুষ পালাতে চাইছে।
কিন্তু বেরোনোর পথ সংকীর্ণ।
কেউ দেয়াল টপকানোর চেষ্টা করছে।
কেউ প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে।
কেউ গুলির হাত থেকে বাঁচতে কুয়োর মধ্যে ঝাঁপ দিচ্ছে।
একটা মুহূর্তে যে জায়গাটা মানুষের ভিড়ে ভরা ছিল, সেখানে নেমে এল মৃত্যু।
সেই দিন শুধু মানুষ মারা যায়নি।
ভারতীয়দের মনে ব্রিটিশ শাসনের প্রতি যে সামান্য বিশ্বাসটুকু বেঁচে ছিল, তারও অনেকটাই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
তারপর স্বাধীনতার আন্দোলন আরও তীব্র হলো।
গান্ধীজি অহিংস আন্দোলনের পথে মানুষকে সংগঠিত করলেন।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়লেন।
ভগৎ সিং, রাজগুরু, সুখদেব দেশের জন্য ফাঁসির মঞ্চে উঠলেন।
আশফাকউল্লাহ খানও হাসিমুখে মৃত্যুকে গ্রহণ করলেন।
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ কারাবরণ করলেন।
খান আবদুল গফফার খান সীমান্ত অঞ্চলের মানুষকে স্বাধীনতার আন্দোলনে যুক্ত করলেন।
মুহাম্মদ আলী জওহর, হাসরৎ মোহানি, বরকতউল্লাহ ভোপালিসহ আরও অসংখ্য মানুষ নিজেদের মতো করে স্বাধীনতার লড়াইয়ে অবদান রাখলেন।
কেউ জেলে গেলেন।
কেউ ফাঁসিতে ঝুললেন।
কেউ নির্বাসনে গেলেন।
কেউ নিজের ঘরবাড়ি হারালেন।
আর কেউ ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটুকুও রেখে যেতে পারলেন না।
কিন্তু তাঁদের সবার স্বপ্ন ছিল একটি।
একটা স্বাধীন দেশ।
অবশেষে এল ১৯৪৭ সাল।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর ইংরেজরা ভারত ছেড়ে চলে গেল।
১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হলো।
কিন্তু স্বাধীনতার সেই সকালও পুরোপুরি আনন্দের ছিল না।
দেশ ভাগ হয়ে গেল।
ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র তৈরি হলো।
আর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নিল স্বাধীন বাংলাদেশ।
কখনও কখনও মনে হয়, যেন একই পরিবারের তিন ভাইকে একই বাড়ি থেকে আলাদা করে তিনটি ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
একই মাটিতে জন্ম।
একই ইতিহাসের অনেকটা পথ একসঙ্গে চলা।
তারপর মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেল সীমান্ত।
দেশভাগের সময় মানুষ ঘর হারাল।
পরিবার হারাল।
আপনজন হারাল।
কেউ ট্রেনে উঠল নিজের বাড়ি ছেড়ে, কিন্তু আর কোনোদিন সেই বাড়িতে ফিরে যেতে পারল না।
স্বাধীনতার আনন্দের সঙ্গে মিশে গেল লাখ লাখ মানুষের কান্না।
তারপরও ১৯৪৭ আমাদের নতুন একটা সকাল দিল।
আজ আমরা সেই স্বাধীনতার ৭৯ বছর পার করে ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে এসে দাঁড়িয়েছি।
আজ আমাদের হাতে মোবাইল আছে।
ইন্টারনেট আছে।
স্কুল-কলেজ আছে।
নিজের মত প্রকাশ করার সুযোগ আছে।
আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি।
কিন্তু একটা প্রশ্ন আমাদের নিজেদের করতে হবে।
যাঁরা দেশের জন্য জেল খেটেছিলেন, তাঁরা কি চেয়েছিলেন আমরা শুধু স্বাধীনতার দিনে পতাকা তুলব আর পরের দিন সব ভুলে যাব?
যে তরুণটি দেশের জন্য ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি কি চেয়েছিলেন আমরা ধর্ম, ভাষা বা পরিচয়ের কারণে একে অপরকে ঘৃণা করি?
না।
স্বাধীনতা শুধু ইংরেজদের দেশ থেকে চলে যাওয়ার নাম নয়।
স্বাধীনতা মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।
স্বাধীনতা মানে নিজের অধিকার বোঝার সঙ্গে অন্যের অধিকারকেও সম্মান করা।
স্বাধীনতা মানে দেশকে ভালোবাসা, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
আজ আমরা যখন তেরঙ্গা পতাকার দিকে তাকাব, তখন শুধু তিনটি রং দেখব না।
দেখব সেই কৃষককে, যে কর দিয়েও ক্ষুধার্ত ছিল।
দেখব সেই তরুণকে, যে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও দেশের কথা ভেবেছিল।
দেখব সেই মাকে, যিনি তাঁর সন্তানকে দেশের জন্য হারিয়েছিলেন।
দেখব সেই উদ্বাস্তুকে, যিনি ঘর হারিয়েও নতুন করে জীবন শুরু করেছিলেন।
আর দেখব সেই অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত মানুষকে, যাদের নাম হয়তো আমাদের ইতিহাসের বইয়ে নেই, কিন্তু যাদের ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের স্বাধীনতা।
আর একটা কথা মনে রাখব।
স্বাধীনতা কোনো এক ধর্মের মানুষের দান নয়।
স্বাধীনতা কোনো এক নেতার দান নয়।
স্বাধীনতা এসেছে বহু মানুষের সম্মিলিত ত্যাগে।
হিন্দু-মুসলিম-শিখ-খ্রিস্টান, কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-যুবক, নারী-পুরুষ, পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য মানুষ মিলে এই স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছেন।
আজকের দিনে তাই আসুন আমরা শুধু বলি না, “ভারত মাতা কি জয়।”
বরং মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করি।
আমি আমার দেশকে ভালোবাসব।
আমি অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করব।
আমি ধর্ম বা পরিচয়ের কারণে কোনো মানুষকে ঘৃণা করব না।
আমি আমার দেশকে পরিষ্কার, সুন্দর ও শান্ত রাখার চেষ্টা করব।
আর যে মানুষগুলো নিজেদের জীবন দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ কখনও ভুলব না।
কারণ আমরা যে স্বাধীন বাতাসে আজ শ্বাস নিচ্ছি, তার প্রতিটি নিঃশ্বাসের পেছনে লুকিয়ে আছে বহু মানুষের ত্যাগের গল্প।
সেই গল্প আমাদের মনে রাখতে হবে।
আর মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা পাওয়া কঠিন ছিল।
কিন্তু স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।
আজ যদি আমরা সত্যিই তাঁদের সম্মান করতে চাই, তাহলে শুধু তাঁদের ছবি মালা দিয়ে সাজালেই হবে না।
তাঁদের স্বপ্নের দেশ গড়ার চেষ্টা করতে হবে।
যে দেশে মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে।
যে দেশে ধর্মের আগে মানুষকে দেখা হবে।
যে দেশে অন্যায়ের সামনে মাথা নত করা হবে না।
যে দেশে স্বাধীনতা শুধু পতাকায় থাকবে না, মানুষের জীবনেও থাকবে।
এই হোক আজকের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা।
এই স্বাধীনতা কারও একার নয়।
এই স্বাধীনতা আমাদের সবার।
✍️ The story of the world