13/03/2026
অ্যাকাডেমিক ব্যস্ততা, ফেলে আসা স্মৃতি আর ইতিহাসের খোঁজে: আইআইটি খড়গপুর ডায়েরি 🍁
বেনারসের গঙ্গার ঘাটের সেই আধ্যাত্মিক রেশ কাটতে না কাটতেই এবারের গন্তব্য ছিল খড়গপুর। এই শহরে আমি আগেও একবার এসেছি, তবে সেটা ছিল নিতান্তই কয়েক ঘণ্টার জন্য। খড়গপুরের বাতাসে আমার ভালোবাসার কিছু পুরোনো অনুভূতি আর ফেলে আসা স্মৃতি মিশে আছে। তাই এবার যখন IIT Kharagpur আয়োজিত আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে Mech2Med যোগ দেওয়ার সুযোগ এল, মনটা নাড়া দিয়েছিলো।
এবারের ট্রিপটা নিছক ঘোরাঘুরি নয়, মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের পিএইচডি-র গবেষণাপত্র এমন একটা আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রেজেন্ট করা। কনফারেন্সটি ছিল ২০ থেকে ২২শে ফেব্রুয়ারি। তাই আগের দিন, অর্থাৎ ১৯শে ফেব্রুয়ারি রাতেই হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে খড়গপুর পৌঁছে গিয়েছিলাম। তবে এবারের কনফারেন্সের সবচেয়ে স্পেশাল দিকটা হলো—আমি একা নই, আমাদের ল্যাবের সমস্ত মেম্বার এবং আমাদের সুপারভাইজারও এই কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন। আমরা সবাই মিলে উঠেছিলাম 'ইভেন্ট ভিউ' (Event View) হোটেলে। একসাথে থাকা, আর ল্যাবের সবার সাথে এমন একটা ট্রিপে অ্যাকাডেমিক আলোচনার পাশাপাশি হোটেলে আড্ডাও জমেছিল দারুণ। প্রথমটায় ভেতরে ভেতরে বেশ নার্ভাস লাগছিল। কিন্তু প্রেজেন্টেশনটা সাফল্যের সাথে মিটে যাওয়ার পর মনের ওপর থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেল! আর সেই ফুরফুরে মেজাজ, সাথে একটু পুরোনো স্মৃতির রেশ নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম দেশের প্রথম আইআইটি-র বিশাল ক্যাম্পাসটা এক্সপ্লোর করতে।
ক্যাম্পাস তো নয়, যেন আস্ত একটা শহর! এত বিশাল এলাকা পায়ে হেঁটে ঘোরা প্রায় অসম্ভব, তাই একটা টোটো ঠিক করে নিলাম। আর আমার মতো যার ফটোগ্রাফি আর ভিডিও তৈরির নেশা আছে, তার কাছে এই টোটো সফরটা ছিল একদম পারফেক্ট। চারপাশের পুরোনো স্থাপত্য আর সবুজের মেলা লেন্সবন্দি করতে করতে এগিয়ে চললাম ইতিহাসের খোঁজে।
টোটো করে প্রথমেই পৌঁছালাম ক্যাম্পাসের সবচেয়ে ঐতিহাসিক স্থান—হিজলি ডিটেনশন ক্যাম্প বা হিজলি জেলে। অনেকেই হয়তো জানেন না, ১৯৫১ সালে দেশের এই প্রথম আইআইটি-র পথচলা শুরু হয়েছিল এই জেলের ভবন থেকেই!ব্রিটিশ আমলে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি করে রাখার জন্য এই জেল তৈরি হয়েছিল। ১৯৩১ সালে এখানেই ঘটেছিল সেই মর্মান্তিক 'হিজলি ফায়ারিং', যেখানে ব্রিটিশ পুলিশের বিনা প্ররোচনায় চালানো গুলিতে শহীদ হন সন্তোষ মিত্র এবং তারকেশ্বর সেনগুপ্ত। সেই রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা ভবনটি আজ 'নেহেরু সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি মিউজিয়াম'। পুরোনো সেই সেলগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। একটা সময় যেখানে বন্দিদের আর্তনাদ আর শিকলের ঝনঝনানি শোনা যেত, আজ সেখানেই দেশের সেরা মেধারা তৈরি হচ্ছে—ইতিহাসের কী অদ্ভুত এক রূপান্তর! খড়গপুর মানেই তো রেলওয়ের এক বিশাল ইতিহাস। ক্যাম্পাসের ভেতরে ঘুরতে ঘুরতেই হেরিটেজ চত্বরে চোখে পড়ল পুরোনো দিনের একটি ন্যারো-গেজ ভিনটেজ ট্রেনের ইঞ্জিন। শুধু ট্রেনই নয়, সেখানে সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরোনো ভারতীয় ফাইটার এয়ারক্রাফটও! এগুলোর পাশাপাশি মিউজিয়াম এবং ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের আরও অনেক পুরোনো জিনিসপত্র আর স্থাপত্য, যা এক লহমায় অতীতের দিনগুলোতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই জায়গাটা ছবি তোলার জন্য দারুণ, তাই সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য বেশ কিছু সিনেম্যাটিক শট নিয়ে নিলাম।
হিজলি জেলের পাশাপাশি দেখলাম আইআইটি-র পুরোনো বিল্ডিংগুলো। এই স্থাপত্যগুলোর পরতে পরতে একটা আলাদা আভিজাত্য আর গাম্ভীর্য লুকিয়ে আছে। চওড়া করিডোর, বিশাল সব গাছপালা আর শান্ত পরিবেশ সত্যিই মুগ্ধ করার মতো। টোটোয় করে ক্যাম্পাসের এমাথা থেকে ওমাথা ঘুরতে ঘুরতে স্টুডেন্টদের কোলাহল, সাইকেল চালিয়ে ক্লাসে যাওয়ার ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে দারুণ একটা নস্টালজিক ভাইব পাচ্ছিলাম।
একদিকে কনফারেন্সে নিজের রিসার্চ ওয়ার্ক প্রেজেন্ট করার অ্যাকাডেমিক তৃপ্তি, IIT-Kharagpur-র মতো বিশাল মঞ্চে পুরস্কার নেওয়া, অন্যদিকে টোটোয় ঘুরে ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখার রোমাঞ্চ, আর মনের কোণে উঁকি দেওয়া কিছু পুরোনো ভালোবাসার স্মৃতি—সব মিলিয়ে খড়গপুরের এই সফরটা আমার ডায়েরিতে একটা বিশেষ জায়গা করে নিল। ২২ তারিখ সব কাজ মিটিয়ে ফেরার পথে বন্দে ভারত এক্সপ্রেসে চেপে যখন বাড়ির দিকে ফিরছিলাম, মনে হচ্ছিল অ্যাকাডেমিক কাজের পাশাপাশি মনটাকেও বেশ রিফ্রেশ করে নিলাম।
ফিরে আসবো আবার অন্য এক গল্প নিয়ে...
📷 কনফারেন্স আর এই ট্রিপের আরও কিছু মুহূর্তের ছবির লিংক নিচে দেওয়া থাকলো: https://www.facebook.com/share/p/1PKFYqsZbG/