B - RAM FILMS

B - RAM FILMS B - RAM FILMS is an Independent Film Production House, Where we showcase Shorts, Short Films, Music videos, Series etc.

26/02/2026

শেষ চিঠি - (উপন্যাসের অর্ধাংশ)
- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার

জীবনের পথে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সময় হঠাৎ থেমে যায়, অন্তত অনুভূতিতে। চারপাশে সবকিছু চলমান থাকে, অথচ অস্তিত্বের অন্তঃস্থলে জন্ম নেয় এক গভীর স্তব্ধতা। সেই স্তব্ধতা কোনো শব্দহীন শূন্যতা নয়, বরং তা এক অনির্বচনীয় ভার, যা ধীরে ধীরে সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত প্রত্যাশা এবং সমস্ত অর্থকে গ্রাস করতে থাকে। সেই মুহূর্তে জীবন আর সরলরেখায় প্রবাহিত হয় না, তা যেন এক অনন্ত প্রশ্নবোধকের সামনে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়ে।
মানুষ তখনও বেঁচে থাকে, কিন্তু তার ভেতরে কিছু একটির মৃত্যু ঘটে। সেই মৃত্যু দেহের নয়। সেই মৃত্যু বিশ্বাসের, আশ্রয়ের, এবং সবচেয়ে বড় কথা, সেই সহজ নির্ভরতাবোধের, যা একসময় জীবনের সমস্ত ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও তাকে বাঁচিয়ে রাখত।
অস্তিত্বের এই ভাঙন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘ নীরবতার ফল, দীর্ঘ অবহেলার ফল, দীর্ঘ অনুচ্চারিত বেদনাগুলোর অবধারিত পরিণতি। কারণ প্রতিটি নীরবতা একদিন শব্দ হয়ে ফিরে আসে না। কিছু নীরবতা চিরকাল নীরবই থেকে যায়, অথচ সেই নীরবতার ভার ক্রমশ অস্তিত্বের গভীরে শিকড় গেড়ে বসে।
মানুষ মূলত অর্থের সন্ধানী। সে ভালোবাসার মধ্যে অর্থ খোঁজে, সম্পর্কের মধ্যে আশ্রয় খোঁজে, এবং কারও উপস্থিতির মধ্যে নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি খোঁজে। কিন্তু যখন সেই অর্থ হারিয়ে যায়, যখন সেই আশ্রয় ভেঙে পড়ে, তখন অস্তিত্ব নিজেই নিজের কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠে। তখন জীবন আর কোনো প্রত্যাশার আলো বহন করে না। তা শুধু একটি দীর্ঘ, অনন্ত পথ হয়ে দাঁড়ায়, যার কোনো নিশ্চিত গন্তব্য নেই, কোনো নিশ্চিত প্রতীক্ষাও নেই।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো - এই ভাঙন দৃশ্যমান নয়। বাইরে থেকে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক থাকে। হাসি থাকে, কথা থাকে, দৈনন্দিনতার যান্ত্রিক গতি থাকে। অথচ অন্তরের গভীরে, এক অদৃশ্য বিনাশ ক্রমাগত নিজের কাজ সম্পন্ন করতে থাকে। সেই বিনাশ কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ নয়, তা এক ধীর, নিঃশব্দ ক্ষয়। যেখানে প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি বিশ্বাস একে একে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
মানুষ শান্তি চায়, এটাই তার সবচেয়ে মৌলিক আকাঙ্ক্ষা। কোনো প্রাপ্তির জন্য নয়, কোনো জয়ের জন্য নয়, শুধু একটি নির্ভরতার জন্য, একটি নিশ্চিন্ত অস্তিত্বের জন্য। কিন্তু যখন সেই নির্ভরতাই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, যখন সেই আশ্রয়ই ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়, তখন সমস্ত পৃথিবী হঠাৎ করেই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন আর কোনো অভিযোগ থাকে না, কোনো প্রত্যাশাও থাকে না, শুধু থাকে এক গভীর নীরব ক্লান্তি।
এই ক্লান্তি থেকে মুক্তির কোনো সুস্পষ্ট পথ নেই। কারণ এটি কোনো বাহ্যিক বন্ধন নয়, যা ছিন্ন করা যায়। এটি এক অন্তর্গত অবস্থা, যা ধীরে ধীরে অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তখন মানুষ আর মুক্তি খোঁজে না, সে শুধু দূরত্ব খোঁজে সমস্ত পরিচিত অর্থ, সমস্ত পরিচিত সম্পর্ক, এবং সমস্ত পরিচিত অনুভূতি থেকে এক অসীম দিগন্ত বিশিষ্ট দূরত্ব।
হয়তো সেই দূরত্বেই কিছুটা শান্তি নিহিত থাকে। হয়তো সেই দূরত্বেই সমস্ত প্রশ্নের অবসান ঘটে। উত্তরের মাধ্যমে নয়, বরং প্রশ্ন করার আকাঙ্ক্ষার সমাপ্তির মাধ্যমে। 😞😞
এই কারণেই কিছু গল্প কখনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কিছু অনুভূতি কখনও ভাষা খুঁজে পায় না।
কিছু চিঠি কখনও প্রেরিত হয় না।
তারা রয়ে যায় সময়ের অন্তরালে,
এক নিঃশব্দ সাক্ষ্য হয়ে,
এক ভগ্ন অথচ অমোচনীয় অস্তিত্বের চিহ্ন হয়ে। 😞😞

-রচিতঃ প্রীতম কর্মকার © ২০২৬

20/02/2026

মুখোশ: যার আড়ালে সব চরিত্রই কাল্পনিক
- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার

মুখোশ শুধু একখণ্ড বস্তু নয়, এটি এক গভীর প্রতীক। এটি এমন এক আচ্ছাদন, যা সত্য ও মিথ্যার মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে দেয়। মুখোশের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে এমন এক সত্তা, যাকে দেখে বাস্তব বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, অথচ তার অস্তিত্বের ভিত গড়ে ওঠে অভিনয়ের ওপর। ফলে একসময় সত্য আর প্রতারণার পার্থক্য অনির্ণেয় হয়ে ওঠে। যেন আলো আর ছায়া মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
মানুষ যখন মুখোশ পরতে শেখে, তখন সে কেবল নিজের পরিচয় আড়াল করে না, সে নিজের বিবেককেও স্তব্ধ করে দেয়। তখন সে নিজেকে অসহায় প্রমাণ করে, আর অন্যকে অপরাধীর আসনে বসিয়ে দেয়। এই আত্মপ্রতারণার মধ্য দিয়েই সে নিজের স্বার্থকে প্রতিষ্ঠিত করে। এই মানুষগুলোই সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর চরিত্র, কারণ তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে না কোনো দৃশ্যমান শক্তিকে, তারা ব্যবহার করে বিশ্বাসকে।
বিশ্বাস যা মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে নির্মল ভিত্তি, সেটিকেই তারা বিকৃত করে নিজেদের ঢাল বানায়। আর সাধারণ মানুষ, যারা এখনো সত্যকে হৃদয়ের আলোয় দেখতে চায়, তারা এই ছলনার সামনে অসহায় হয়ে পড়ে। কারণ প্রতারণা যখন সত্যের রূপ ধারণ করে, তখন তা আর প্রতারণা বলে মনে হয় না। তা হয়ে ওঠে এক নতুন বাস্তবতা।
এই মানুষগুলো প্রায়শই নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং অন্যের কৌশলে পরিচালিত হয়। তাদের বিবেক ধীরে ধীরে নিজের স্বাধীনতা হারায়। তখন তাদের কাছে ন্যায় বা অন্যায়ের কোনো স্বতন্ত্র অর্থ থাকে না। শুধু থাকে জয়ের এক অন্ধ আকাঙ্ক্ষা। সেই জয়ের পথে তারা যদি অন্যায়ের পর অন্যায়ও করে, তবুও তাদের মনে কোনো অনুশোচনা জন্মায় না। কারণ তারা বিশ্বাস করতে শেখে, জয়ই একমাত্র সত্য, আর পরাজয়ই একমাত্র অপরাধ।
কিন্তু সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকেন, যাদের দৃষ্টি অভিজ্ঞতার আলোয় দীপ্ত। তাদের কর্তব্য হয় এই অন্যায়ের গতিকে থামানো, সত্যকে তার যথার্থ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করা। অথচ অনেক সময় সেই মানুষরাই নিজের আবেগের কাছে পরাজিত হন। প্রিয়জনের প্রতি পক্ষপাত তাদের বিচারবোধকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তারা সত্য জেনেও নীরব থাকেন, আর সেই নীরবতাই অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ফলে অপরাধী জয়ী হয়, আর বিশ্বাস যা একসময় ছিল পবিত্র, তা চিরতরে ভেঙে পড়ে।
ঈশ্বর এই অন্যায়ের জন্য কোনো বিচার নির্ধারণ করে রেখেছেন কিনা, তা মানুষের অজানা। হয়তো এই পৃথিবীতে অন্যায়ই অনেক সময় বিজয়ের মুকুট পরে। কিন্তু সেই বিজয় কি চিরস্থায়ী? যখন মানুষ তার পার্থিব অস্তিত্ব অতিক্রম করে, তখন কি সে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে উত্তর দিতে পারে? নাকি তখনও সে নিজের মুখোশের আড়ালেই আশ্রয় খোঁজে?
আজকের সমাজে সত্যের মূল্য প্রায়ই দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভর করে। মানুষ যা দেখে, তাকেই সত্য বলে মেনে নেয়। অথচ দৃশ্যমানতা সবসময় সত্যের প্রতিফলন নয়। অনেক সময় সত্য লুকিয়ে থাকে অদৃশ্যের গভীরে। সেই অদৃশ্য সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য প্রয়োজন অন্তর্দৃষ্টি, প্রয়োজন নির্মোহ বিচারবোধ।
কিন্তু মানুষ প্রায়ই সেই অন্তর্দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে। তারা তাড়াহুড়ো করে বিচার করে, তাড়াহুড়ো করে রায় দেয়। সেই রায়ের ভারে কোনো এক নির্দোষ সত্তা ধীরে ধীরে তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। সে আর মানুষ থাকে না। সে হয়ে ওঠে এক নিঃশব্দ উপস্থিতি, যার কোনো মূল্য নেই, কোনো স্বীকৃতি নেই।
তার জীবন তখন এক শূন্যতার প্রতীকে পরিণত হয়। যেন এক অব্যক্ত আর্তনাদ, যা কেউ শুনতে পায় না।
হয়তো এই কারণেই প্রকৃত বিচার মানুষের হাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। কারণ মানুষের বিচার আবেগ দ্বারা প্রভাবিত, আর আবেগ প্রায়ই সত্যকে আড়াল করে দেয়। একমাত্র সেই সর্বজ্ঞ সত্তাই হয়তো সত্যকে তার পূর্ণতায় দেখতে পারেন, যিনি মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত মুখটিকে চিনতে সক্ষম।
মুখোশ তাই শুধু এক আচ্ছাদন নয়, এটি এক অস্তিত্বের বিভ্রম। এর আড়ালে লুকিয়ে থাকে এমন সব চরিত্র, যারা বাস্তব হয়েও বাস্তব নয়, যারা জীবিত হয়েও নিজের সত্যিকারের সত্তাকে হারিয়ে ফেলেছে।
আর সেই হারিয়ে যাওয়া সত্তার গল্প নীরবে, অদৃশ্য সময়ের অতলে বিলীন হয়ে যায়।
সম্ভবত সেই কারণেই ১৯৭৩ সালে ভারত সরকার জুরি প্রথা বিলুপ্ত করেছিল, যেন ন্যায়বিচার সত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সমাজ আজও অদৃশ্যভাবে সেই জুরি প্রথার অনুসরণ করে চলেছে। মানুষ আজও দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভর করে রায় দেয়, আর সেই রায়ের ভারে প্রকৃত মানুষটি ধীরে ধীরে পচে যায় অবহেলায়, অবিচারে, নীরব মৃত্যুর দিকে।
মুখোশ তখনও থাকে অটুট, অমলিন। আর তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চরিত্রগুলো চিরকালই কাল্পনিক থেকে যায়।

- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার © 2026

13/02/2026

“চতুর্দশীর ছায়ায় অবশিষ্ট আলোর আর্তনাদ”
- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার

তৃতীয় শতকের রোম ক্ষমতার নিষ্ঠুর অন্ধকারে নিমজ্জিত এক সাম্রাজ্য। সেই সময়ের এক যাজক, সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কিংবদন্তির আবরণে যাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয়, নাকি প্রেমিক-প্রেমিকাদের গোপনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করতেন, যেন যুদ্ধের উন্মত্ত রাষ্ট্রনীতি নবদম্পতির স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন না করে। কেউ বলেন, তিনি নিপীড়িত বিশ্বাসীদের মুক্তির পথ দেখাতেন। কেউ বলেন, তিনি প্রেমের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন ক্ষমতার বিরুদ্ধে। ইতিহাস তাঁর কাহিনি যতই ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন করুক, একটি বিষয় স্পষ্ট যে একজন মানুষের আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করে একটি দিনকে ‘প্রেমের দিন’ রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
কিন্তু প্রেম কি কোনো দিনমানের অধীন? হৃদয়ের যে অনির্বচনীয় স্পন্দন, তাকে কি ক্যালেন্ডারের একটি ঘরে আবদ্ধ করা যায়? যদি প্রেম সত্যই অস্তিত্বশীল হয়, তবে কি তার জন্য নির্দিষ্ট চতুর্দশী ফেব্রুয়ারির প্রয়োজন অনিবার্য? নাকি এই নির্দিষ্টতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের সময়ের এক নীরব স্বীকারোক্তি। প্রেম আজ আর অবাধ, স্বতঃস্ফূর্ত, আত্মনিবেদিত অনুভূতি নয় বরং তা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে জৈবিক চাহিদায়, সামাজিক প্রদর্শন এবং বিপণনের কৌশলে?

এই সময়ে দাঁড়িয়ে স্পর্শযোগ্য ও অস্পর্শযোগ্য উভয়ের অর্থই যেন আমূল রূপান্তরিত হয়েছে। প্রযুক্তি আমাদের সংযুক্ত করেছে, কিন্তু সেই সংযোগের ভিতরে প্রায়ই অনুপস্থিত অন্তরের সেতুবন্ধন। দৃশ্যমান উপহার, প্রকাশ্য ঘোষণা, ডিজিটাল অভিনন্দন সব মিলিয়ে প্রেম যেন হয়ে উঠেছে এক সুপরিকল্পিত প্রযোজনা।

আবেগের নামের আড়ালে বাজারের মুনাফা, আন্তরিকতার মুখোশের অন্তরালে হিসাব-নিকাশের অদৃশ্য খাতা। গোলাপের পাপড়ি শুকিয়ে যায়, কিন্তু বিপণনের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখীই থাকে। ফলত, যে মানুষগুলি নীরবে গভীরতম বেদনায় দগ্ধ হয়, তাদের আর্তনাদ পৌঁছায় না কোনো শ্রোতার কাছে। তাদের যন্ত্রণার কোনো ন্যায্য মূল্য নির্ধারিত হয় না। কারণ এই সমাজে অনুভূতিরও বাজারদর আছে। যে কষ্ট প্রকাশযোগ্য নয়, যে প্রেম প্রদর্শনযোগ্য নয়, তা যেন অস্তিত্বহীন। এই নির্মম বাস্তবতায় মানুষ কখনো কখনো পরমাণু বিস্ফোরণের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে ওঠে। নিজের স্বার্থরক্ষায় সে নীতির সীমানা অতিক্রম করতে দ্বিধা করে না। আর সেই অভিযাত্রায় সহায়তা করতে গৃহশত্রু বিভীষণরা সর্বদাই প্রস্তুত, বিশ্বাসঘাতকতা যেন সভ্যতার অন্তঃসলিল স্রোত।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়, যদি হৃদয়ের অন্তঃস্থলে নির্মল অনুভূতির একটি বিন্দুও অবশিষ্ট থাকে, তবে কি তার জন্য চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির প্রয়োজন হয়? না, প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় এক ক্ষুদ্র অথচ অমলিন মুহূর্তের, যেখানে দুটি আত্মা নিঃশব্দে একে অপরকে উপলব্ধি করে। সেই মুহূর্তে কোনো প্রদর্শন নেই, কোনো দর্শক নেই, কোনো বিপণন নেই, আছে কেবল আত্মার স্বীকৃতি। সেই এক বিন্দু স্বর্গীয় অনুভূতি যথেষ্ট জীবনসংগ্রামে অবিচল থাকার জন্য, প্রতিকূলতার ঝড়ে ভেসে না যাওয়ার জন্য, অন্ধকারের ভিতরে আলোর সম্ভাবনা দেখার জন্য।
কিন্তু যেখানে কেবল বুদ্ধির কূটচাল, কৌশলের নৈপুণ্য, ব্যক্তিস্বার্থের নিরন্তর অন্বেষণ সেখানে স্বর্গের স্বপ্ন দেখাও ভ্রান্তি। সেখানে অন্তর ধীরে ধীরে পরিণত হয় নরকে। আশ্চর্য এই যে, যে মানুষ অন্তরে পবিত্র, যে মানুষ সত্যকে ধারণ করে আঘাতের ভার প্রায়শই তাকেই বহন করতে হয়। কারণ স্বচ্ছতা এই যুগে দুর্বলতার প্রতীক, আর নির্মলতা একপ্রকার অবাঞ্ছিত সরলতা।

তবু এই আধুনিক, শিক্ষিত, তথাকথিত উন্নত সমাজকে বিদ্রূপমিশ্রিত প্রণাম না জানিয়ে উপায় নেই। তারা প্রেমকে পণ্যে রূপান্তরিত করেছে, আবেগকে করেছে অর্থনীতির উপাদান, হৃদয়ের স্পন্দনকে করেছে বিপণনের ভাষা। তাদের কৃতিত্ব অস্বীকার করা যায় না বরং ব্যবসার প্রসার ঘটেছে, বাজারের আয়তন বেড়েছে, লেনদেনের অঙ্ক বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রেমের নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এক সমৃদ্ধ শিল্প। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যায়, এই সমৃদ্ধির ভিতরে মানুষ কি নিজেকে খুঁজে পেয়েছে?
সম্ভবত না।
সে কেবল খুঁজেছে সাফল্যের শর্টকাট, স্বার্থসিদ্ধির উপায়, সামাজিক স্বীকৃতির অভিনয়। যদি মানুষ সত্যিই অন্য মানুষের জন্য এক বিন্দু নির্মল উপলব্ধি অর্জন করতে পারত তাহলে জলবিন্দুর মতো স্বচ্ছ, শিশিরের মতো পবিত্র হতো এবং এই পৃথিবী স্বর্গের চেয়েও অধিক সৌন্দর্যময় হয়ে উঠত। অথচ আমরা বেছে নিয়েছি অন্য পথ, নিজেকে প্রতিনিয়ত মিথ্যা বোঝানো, অন্যের দৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে দিতে নিজের অস্তিত্বকে ক্ষয় করা, নিজের অন্তর্জগৎকে নিঃশেষ করে বাহ্যজগতের প্রতিচ্ছবিকে আঁকড়ে ধরা। একসময় নিজের সত্তা, মর্যাদা, দায়িত্ব, কর্তব্য, আচরণ-বিচার সবকিছুকেই বিসর্জন দিয়ে আমরা প্রবেশ করি অন্ধ অনুসরণের অরণ্যে।

এই অভিনব ক্ষমতাকে তাই শতকোটি প্রণাম। যে ক্ষমতা মানুষকে নিজের মতো করে গড়ে নিয়ে তাকে ক্রমশ অন্ধকারের গভীরে নিমজ্জিত করতে পারে। যে ক্ষমতা মানুষকে বিশ্বাস করায় যে, সে মুক্ত, অথচ সে শৃঙ্খলিত। সে উন্নত, অথচ সে অন্তঃসারশূন্য।

অতএব, আমি অথবা আমার মতো মানুষরা, সম্ভবত এই উন্নত সভ্যতার আলোকমালার নীচে আর ফিরে আসতে চাই না। যেখানে অনুভূতি বিক্রয়যোগ্য, সম্পর্ক পরিমাপযোগ্য, আর আত্মা উপেক্ষিত। সেখানে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা ম্লান হয়ে যায়।

তাই নোটেগাছটি মুড়োল, আমার কথাটিও ফুরোল। কিন্তু প্রশ্নগুলি রয়ে গেল, চতুর্দশীর রাত পেরিয়ে পরবর্তী প্রভাতের প্রতীক্ষায়।

- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার © 2026

12/02/2026

"নামহীনদের গ্যালারি" - (উপন্যাসের অর্ধাংশ)
- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার

"সমাজের মানচিত্রে কিছু মানুষ চিরকাল অস্পষ্ট রেখা হয়ে থাকে", তাদের অস্তিত্ব আছে, কিন্তু গুরুত্ব নেই। তাদের নিঃশ্বাস আছে, কিন্তু স্বীকৃতি নেই। তাদের জীবন আছে, কিন্তু সমাজের চোখে তার কোনো মূল্য নেই।

এই পৃথিবীতে বারবার যাদের জীবনকে তুচ্ছ প্রমাণ করতে চাওয়া হয়েছে, এমন চারটি শ্রেণি হলো - কর্মহীন মানুষ, অবিবাহিত বা বিধবা-বিধুর মানুষ, সন্তানহীন মানুষ এবং অবসরপ্রাপ্ত মানুষ।

তাদের তুচ্ছ বলা হয় না কারণ তারা মানুষ নয়, তুচ্ছ বলা হয় কারণ তারা আর "কার্যকর পরিচয়" বহন করে না। তাদের শরীর আছে, আত্মা আছে, স্মৃতি আছে, অনুভব আছে কিন্তু সমাজের চোখে নেই তাদের ‘বর্তমান ভূমিকা’ নামের সনদপত্র।

সমাজ মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখে না, দেখে একটি চলমান পরিচয়পত্র হিসেবে। নাম নয়, মুখ নয়, হৃদয় নয়, দেখে শুধুই পরিচয়। পেশা কী ছিল, স্ট্যাটাস কী ছিল, সন্তান লাভের দ্বারা পিতৃত্ত্বের ও মাতৃত্ত্বের পরিচয়পত্র লাভ করেছিল কিনা, অতীতে কী অর্জন করেছিল ইত্যাদি সমূহ।

"সে এখন কে আছে", এই প্রশ্নটি সমাজের অভিধানে নেই।

আমরা মানুষটাকে দেখি না, দেখি তার অতীত জীবনবৃত্তান্ত। তার বর্তমান যন্ত্রণা আমাদের অদৃশ্য, কিন্তু তার অতীত সাফল্য আমাদের পূজার বস্তু।

আমরা ইতিহাসকে মন্দির বানাই, কিন্তু বর্তমান মানুষটাকে ভিক্ষার লাইনে দাঁড় করাই।

আমরা স্মৃতিকে সংরক্ষণ করি, কিন্তু মর্যাদাকে অবহেলা করি। আমরা অর্জনকে সম্মান করি, কিন্তু অস্তিত্বকে নয়।

এইখানেই সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ লুকিয়ে আছে। আমরা ভূমিকার প্রেমে পড়েছি, মানুষকে ভালোবাসতে ভুলে গেছি।

আমাদের শেখানো হয়েছে অতীত আঁকড়ে ধরতে, বর্তমানের পাশে দাঁড়াতে নয়। আমাদের শেখানো হয়েছে সাফল্যের পূজা করতে, সংগ্রামের সম্মান করতে নয়। আমাদের শেখানো হয়েছে উচ্চতাকে শ্রদ্ধা করতে, পতনকে লজ্জা ভাবতে। পিতামাতাকে ভগবানের পাশে স্থান দিতে, সন্তানহীনদের তুচ্ছ এবং অক্ষমতার প্রতীক ভাবতে।

এই শিক্ষার ফলেই কর্মহীন ও সন্তানহীন মানুষ হয়ে যায় সমাজের বোঝা, বিধবা-বিধুর হয়ে যায় সহানুভূতির বস্তু, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ হয়ে যায় ইতিহাসের আসবাবপত্র।

তারা জীবিত, তবু তাদের জীবনের কোনো সামাজিক মূল্য নেই।

"কারণ সমাজ মনে করে", ভূমিকা বদলালে মানুষের মূল্য বদলে যায়।

কিন্তু সত্যটা ঠিক উল্টো। ভূমিকা বদলালেই মানুষের মূল্য হারায় না, হারায় শুধু সমাজের বিবেক।

মানুষ ছোট হয় না ভূমিকা হারিয়ে যায়, সমাজ ছোট হয় মানুষকে অপ্রয়োজনীয় বানিয়ে।

"একদিন সমাজ বুঝবে", পরিচয় অস্থায়ী, ভূমিকা ক্ষণস্থায়ী, স্ট্যাটাস সাময়িক, কিন্তু মানুষ চিরন্তন।

"সেদিন হয়তো মানুষ আর জিজ্ঞেস করবে না", সে কী করে? সে কে ছিল? সে কী অর্জন করেছে?

সেদিন মানুষ জিজ্ঞেস করবে শুধু একটাই প্রশ্ন - "সে মানুষ তো?"

- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার © 2026

07/02/2026

নীরবতার ডানায় প্রেম - (উপন্যাসের অর্ধাংশ)
- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার

ভোর তখনো পুরোপুরি জন্মায়নি।
আকাশে কুয়াশার নরম চাদর, বাতাসে শিশিরের গন্ধ, চারপাশে এক অপার্থিব নীরবতা। জানালার কাঁচে হালকা শিশির জমে ছিল - যেন রাতের কান্না এখনো শুকায়নি।
ঘরের ভেতর নিঃশব্দে বসে ছিল সে - একজন মানুষ, না একজন ছায়া, তা বোঝা কঠিন। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা, অথচ সেই শূন্যতার মাঝেই জমে ছিল অসীম অনুভবের ভার।
ঠিক তখনই, জানালার ধারে এসে বসল একটি পাখি।
সাধারণ কোনো পাখি নয় - তার চোখে ছিল এক অচেনা গভীরতা,
তার উপস্থিতিতে ছিল এক অদ্ভুত ভারী নীরবতা।
মনে হলো, সে শুধু বসে নেই - সে অপেক্ষা করছে।
মানুষটি তাকিয়ে রইল পাখিটির দিকে।
দু’জনের মাঝে কোনো কথা নেই, তবু এক অদ্ভুত সংলাপ চলতে থাকল নীরবতার ভেতর।
হঠাৎ পাখিটি খুব ধীরে, খুব আস্তে বলল -
“সেদিন আমাদের দেখা হয়েছিল…”
মানুষটির বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে উঠল। স্মৃতির দরজাগুলো একে একে খুলে যেতে লাগল।
সেই দিনটি - একটা সাধারণ দিন ছিল না।
একটা হঠাৎ দেখা,
একটা হঠাৎ চোখে চোখ,
একটা হঠাৎ নীরবতা - আর সেই নীরবতার মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল এক অসম্ভব অনুভূতি।
ভালোবাসা - যার কোনো নাম ছিল না, কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না, কোনো অধিকার ছিল না।
শুধু ছিল - অপ্রতিরোধ্য টান, নীরব আকর্ষণ, অজানা ব্যথা।
পাখিটি আবার বলল—
“সেই দেখার পর থেকে আমি আর আমি থাকিনি।
আমার ভেতরে আগুন জ্বলতে শুরু করেছিল।
ভালোবাসার আগুন নয় শুধু - অপ্রাপ্তির আগুন, অক্ষমতার আগুন, ভয়ের আগুন।”

মানুষটি কিছু বলল না।
শুধু চুপচাপ শুনতে থাকল।

“হৃদয়টা পুড়তে পুড়তে একদিন গলে গেল,” পাখিটি বলল,
“আর সেই গলন থেকেই জন্ম নিল জল - চোখের জল নয়, আত্মার জল।”
একটা দীর্ঘ নীরবতা নামল।
তারপর পাখিটি বলল -
“আমি জানি না, কীভাবে বলব।
আমি জানি না, কাকে বলব।
আমি জানি না, কোন ভাষায় বলব।”
সে আকাশের দিকে তাকাল।
“আমি মুক্ত হলে উড়ে যাই,”
সে বলল,
“আমি উড়ি - কিন্তু কোথাও থাকি না।
আমি প্রতিদিন নিজের জন্য বাঁচি না।
আমি বাঁচি কারও স্মৃতির জন্য,
কারও অপেক্ষার জন্য,
কারও না-বলা ভালোবাসার জন্য।”
মানুষটির চোখ ভিজে উঠল।
পাখিটি ফিসফিস করে বলল - “কারও ডাক আমাকে ফিরিয়ে আনে,
কারও নীরবতা আমাকে আবার দূরে পাঠিয়ে দেয়।
আমি এক গন্তব্য থেকে আরেক গন্তব্যে যাই -
কিন্তু কোথাও পৌঁছাই না।”
একটা দীর্ঘশ্বাস।
তারপর সে বলল -
“আমি কোনো আকাশের নই,
কোনো ঘরের নই,
কোনো মানুষের নই।”
এক মুহূর্ত থেমে বলল -
“আমি শুধু ভালোবাসার।”
নীরবতা।
আর তখন মানুষটি বুঝে গেল -
এই পাখি পাখি নয়।
এটা এক অপূর্ণ প্রেম,
এক ভাঙা হৃদয়,
এক না-বলা গল্প,
এক নিঃসঙ্গ আত্মা।
এটা সেই মানুষটিরই আরেক রূপ।
এক অদ্ভুত প্রতিবিম্ব।
দু’জনেই চুপচাপ রইল।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ঘরের ভেতর।
পাখিটি ডানা মেলল।
উড়ে যাওয়ার আগে শুধু একটাই কথা বলল -
“কিছু প্রেম থাকে,
যেগুলো পাওয়ার জন্য নয় - বোঝার জন্য।”

আর সে উড়ে গেল।

ঘরে রইল শুধু নীরবতা,
একটা ভেজা জানালা,
একটা কাঁপতে থাকা হৃদয়,
আর একটা অসমাপ্ত উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় ।।

- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার © ২০২৬

01/02/2026
https://youtu.be/luyRkqqo1pw?si=8sKNXETk8EtnkzHd Watch this re-release Short Film "সমীকরণ The Equation" on YouTube chann...
24/12/2025

https://youtu.be/luyRkqqo1pw?si=8sKNXETk8EtnkzHd

Watch this re-release Short Film "সমীকরণ The Equation" on YouTube channel.
If you love this Film, please do subscrib, like, comments and share, also don't forget to click the "Bell 🔔" icon

“সমীকরণ The Equation” unfolds the poignant journey of Mallika, a free-spirited corporate professional and an independent mother, and her deeply sensitive tee...

Address

Kanchrapara
743145

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when B - RAM FILMS posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share