26/02/2026
শেষ চিঠি - (উপন্যাসের অর্ধাংশ)
- রচিতঃ প্রীতম কর্মকার
জীবনের পথে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সময় হঠাৎ থেমে যায়, অন্তত অনুভূতিতে। চারপাশে সবকিছু চলমান থাকে, অথচ অস্তিত্বের অন্তঃস্থলে জন্ম নেয় এক গভীর স্তব্ধতা। সেই স্তব্ধতা কোনো শব্দহীন শূন্যতা নয়, বরং তা এক অনির্বচনীয় ভার, যা ধীরে ধীরে সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত প্রত্যাশা এবং সমস্ত অর্থকে গ্রাস করতে থাকে। সেই মুহূর্তে জীবন আর সরলরেখায় প্রবাহিত হয় না, তা যেন এক অনন্ত প্রশ্নবোধকের সামনে এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়ে।
মানুষ তখনও বেঁচে থাকে, কিন্তু তার ভেতরে কিছু একটির মৃত্যু ঘটে। সেই মৃত্যু দেহের নয়। সেই মৃত্যু বিশ্বাসের, আশ্রয়ের, এবং সবচেয়ে বড় কথা, সেই সহজ নির্ভরতাবোধের, যা একসময় জীবনের সমস্ত ক্লান্তি থাকা সত্ত্বেও তাকে বাঁচিয়ে রাখত।
অস্তিত্বের এই ভাঙন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি দীর্ঘ নীরবতার ফল, দীর্ঘ অবহেলার ফল, দীর্ঘ অনুচ্চারিত বেদনাগুলোর অবধারিত পরিণতি। কারণ প্রতিটি নীরবতা একদিন শব্দ হয়ে ফিরে আসে না। কিছু নীরবতা চিরকাল নীরবই থেকে যায়, অথচ সেই নীরবতার ভার ক্রমশ অস্তিত্বের গভীরে শিকড় গেড়ে বসে।
মানুষ মূলত অর্থের সন্ধানী। সে ভালোবাসার মধ্যে অর্থ খোঁজে, সম্পর্কের মধ্যে আশ্রয় খোঁজে, এবং কারও উপস্থিতির মধ্যে নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি খোঁজে। কিন্তু যখন সেই অর্থ হারিয়ে যায়, যখন সেই আশ্রয় ভেঙে পড়ে, তখন অস্তিত্ব নিজেই নিজের কাছে অপরিচিত হয়ে ওঠে। তখন জীবন আর কোনো প্রত্যাশার আলো বহন করে না। তা শুধু একটি দীর্ঘ, অনন্ত পথ হয়ে দাঁড়ায়, যার কোনো নিশ্চিত গন্তব্য নেই, কোনো নিশ্চিত প্রতীক্ষাও নেই।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো - এই ভাঙন দৃশ্যমান নয়। বাইরে থেকে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক থাকে। হাসি থাকে, কথা থাকে, দৈনন্দিনতার যান্ত্রিক গতি থাকে। অথচ অন্তরের গভীরে, এক অদৃশ্য বিনাশ ক্রমাগত নিজের কাজ সম্পন্ন করতে থাকে। সেই বিনাশ কোনো হঠাৎ বিস্ফোরণ নয়, তা এক ধীর, নিঃশব্দ ক্ষয়। যেখানে প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি বিশ্বাস একে একে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
মানুষ শান্তি চায়, এটাই তার সবচেয়ে মৌলিক আকাঙ্ক্ষা। কোনো প্রাপ্তির জন্য নয়, কোনো জয়ের জন্য নয়, শুধু একটি নির্ভরতার জন্য, একটি নিশ্চিন্ত অস্তিত্বের জন্য। কিন্তু যখন সেই নির্ভরতাই অনিশ্চিত হয়ে ওঠে, যখন সেই আশ্রয়ই ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়, তখন সমস্ত পৃথিবী হঠাৎ করেই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন আর কোনো অভিযোগ থাকে না, কোনো প্রত্যাশাও থাকে না, শুধু থাকে এক গভীর নীরব ক্লান্তি।
এই ক্লান্তি থেকে মুক্তির কোনো সুস্পষ্ট পথ নেই। কারণ এটি কোনো বাহ্যিক বন্ধন নয়, যা ছিন্ন করা যায়। এটি এক অন্তর্গত অবস্থা, যা ধীরে ধীরে অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। তখন মানুষ আর মুক্তি খোঁজে না, সে শুধু দূরত্ব খোঁজে সমস্ত পরিচিত অর্থ, সমস্ত পরিচিত সম্পর্ক, এবং সমস্ত পরিচিত অনুভূতি থেকে এক অসীম দিগন্ত বিশিষ্ট দূরত্ব।
হয়তো সেই দূরত্বেই কিছুটা শান্তি নিহিত থাকে। হয়তো সেই দূরত্বেই সমস্ত প্রশ্নের অবসান ঘটে। উত্তরের মাধ্যমে নয়, বরং প্রশ্ন করার আকাঙ্ক্ষার সমাপ্তির মাধ্যমে। 😞😞
এই কারণেই কিছু গল্প কখনও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
কিছু অনুভূতি কখনও ভাষা খুঁজে পায় না।
কিছু চিঠি কখনও প্রেরিত হয় না।
তারা রয়ে যায় সময়ের অন্তরালে,
এক নিঃশব্দ সাক্ষ্য হয়ে,
এক ভগ্ন অথচ অমোচনীয় অস্তিত্বের চিহ্ন হয়ে। 😞😞
-রচিতঃ প্রীতম কর্মকার © ২০২৬