05/04/2024
গল্প:- বিদেশ বিভূঁই
বিয়ের ছ'মাস এর মধ্যেই যেতে হবে সুদূর বিদেশে। তা আবার কোথায় এক্কেবারে এক লাফে আমেরিকা। কারণ হাজব্যান্ড বহুবছর আগে থেকেই ওখানে কর্মরত। তাই যথারীতি বিয়ের পর আমারও গন্তব্যস্হল হতে চলেছে আমেরিকা। মা বাবা কে ফেলে রেখেই পাড়ি দিতে হবে আটলান্টিক মহা সাগরের উদ্দেশ্যে। না না আমি হেঁটে যাবো না।
যাই হোক একদিকে মা বাবার কাছ থেকে এতো দূরে চলে যেতে হবে সেটা নিয়ে মোনের ওজন এক্কেবারে এক মণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ওপর আাবার একা একা এতোখানি জার্নি। মানে সব কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে ততক্ষণে আমার হৃৎপিন্ডের ভেতর আটলান্টিক মহাসাগরের ন্যায় উথাল পাথাল শুরু হয়ে গেছে। এখানে জানিয়ে রাখি আমার কত্তামশাই ইন্ডিয়া এসেছিল শুধুমাত্র বিয়ে টুকুর উদ্দেশ্যে। মানে ওই আরকি আমার সিঁথিতে সিঁদুর টা দিয়েই তড়িঘড়ি তাকে ফিরতে হয়েছিল আমেরিকা। কারণ খুব বেশীদিনের জন্য ছুটি বরাদ্দ ছিলো না। তবে হ্যাঁ ও কিন্তু আমাকে পই পই করে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে আমার একার জার্নিতে আমাকে কিভাবে কি কি করতে হবে। রাত সাড়ে দশটা নাগাদ ছিলো আমার ফ্লাইট। আমার শ্বশুর মশাই দায়িত্ব নিয়ে আমায় ছাড়তে এসেছিলেন দমদম এয়ারপোর্টে। তারপর এয়ারপোর্টের সমস্ত ফর্মালিটিস কমপ্লিট করে ডুকে পড়লাম এয়ারপোর্টের একদম ভেতরে। আরও কিছুখনের অপেক্ষা তারপরেই উড়োজাহাজের দরজা খুলবে। তারপর গোটা দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, মানে কিছুখনের জন্য। তাই ভাবলাম চটপট সব ফোন কল গুলো সেরে ফেলি। তালিকার শুরুতেই মা বাবা, শ্বাশুড়ি মা। মোটামুটি সবাইকে জানিয়ে দিলাম হাম সাহি সালামাত পৌঁছ গায়ে এয়ারপোর্ট তাক। তারপর উড়ন্ত জাহাজ আমাকে সোজা ডাল ভাত আলু সেদ্ধ থেকে এনে ফেললো আল- হাবিবি- র রাজ্যে। মাত্র পাঁচ ঘন্টা তেই অনেকখানি পাল্টে গেলো দুনিয়া টা। এতো কিছু পাল্টি খাওয়ার মাঝে তো আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে এক ঝাঁক মুখ আমার অবস্থান বোঝার অপেক্ষায় অপেক্ষারত। টুক করে মুঠোফোনে হাত ছোঁয়াতেই দেখলাম,,, এ তো মহা বিপদ! নেটওয়ার্ক তো পাবো না সেটা জানাই ছিল এখন তো দেখছি দোহা গভর্মেন্ট আমায় তাদের ওয়াই ফাই টুকু থেকেও বঞ্চিত করছে। এ কেমন অবিচার বলুন তো? খোঁজ খোঁজ রবে আমার চোখ্যুযুগল ততক্ষণে চোষে ফেললো আশপাশটা। ওইতো একজন ভারতীয় এগিয়ে আসছে এই দিকেই। কোন উপায় না পেয়ে ওনার কাছে গিয়ে সারেন্ডার করলাম বল্লাম যে কোনোরকম ভাবে আপনার মোবাইল টা একটু পাওয়া যাবে? আমার এই হতভাগা অ্যান্ড্রয়েড কিছুতেই ওয়াই ফাই কে ধরতে ছুঁতে পারছে না। তারপরে কোনোরকমে বরকে জানালাম যে আমি এখনও অক্ষত।।
এরপর গিয়ে বসলাম দ্বিতীয় ফ্লাইটে। এবার তো আসল মজা। টানা ষোলো ঘন্টার জার্নি। আমি আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিলাম। সুযোগ যখন পেয়েছি মন ভরে ঘুমিয়ে নেবো।। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। ফ্লাইট উড়তে শুরু করলো আর আমিও নাক ডাকতে শুরু করলাম। না চাইতেই মুখের কাছে খাবার চলে আসছে। খাওয়া আর ঘুম। ঘুম আর খাওয়া। ঠিক যেনো আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ এর জিন এর মতো কারবার। বিশ্বাস করুন সেদিন ঘুমোতে ঘুমোতে আমি হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম। বাবাগো মনে হচ্ছিল কেউ আমায় বাঁচা। এটা তো ঘুম নয় এ এক বিশাল বড়ো সাজা।।
যাই হোক হাঁপাতে হাঁপাতে পৌঁছে গেলাম আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে।। তখনও আসল গন্তব্যে কিন্তু পৌঁছোয়নি। এবার তৃতীয় ফ্লাইট ছাড়বে ডালাস থেকে। আরও দের, দু- ঘন্টা ওড়ার পর মাটিতে পা রাখলাম। হ্যাঁ সত্যি বলছি এতোক্ষণ বিশাল উড়ছিলাম,, মানে যাকে বলে মাটিতে একেবারে পা-ই ঠেকছিলো না।।
আল্টিমেটলি পৌঁছোলাম ফাইনাল ডেসটিনেশন -এ। রাত তখন সাড়ে এগারোটা। কত্তামশাই তার এক বন্ধুকে সঙ্গে করে রিসিভ করতে এলো আমায়। সে তো আমায় দেখেই অবাক। ভাবছে এতো এতক্ষণে নেতিয়ে পড়ার কথা,, কিন্তু এখনো তো জিওল মাছের মতো বেশ তিরিং বিরিং করছে।
এবার আসি আসল কথায়,, বিয়ের ছ' মাস পর বরের সাথে দেখা তাও আবার এতো ঝক্কি পোয়ানোর পর,,,তাই সেই ব্যাপারটা নিয়ে মনের মধ্যে যথেষ্ট আনন্দ থাকলেও, একটা বিশেষ জিনিস আমার চোখে পড়লো। এখানে পা রাখতেই আমার মন এবং মগজ একসাথে বলে উঠলো এটাই বুঝি আমেরিকা? এইরকম জনমানবশূন্য একটা জায়গার নাম আামেরিকা? গাড়িতে লাগেজ তুলে প্রায় দশ পনেরো মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম অ্যাপার্টমেন্টে। এসে চটপট ফ্রেশ হয়ে ডিনার টা সেরে ফেললাম ভাত, ডাল, মাছের ঝাল সাথে ছিলো আরও অনেক কিছু । সবই কত্তা মশাইয়ের কৃপা।।
🖊️ দ্বিজা