30/05/2026
৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা, ২০২৬-এ দ্য কাফে টেবল থেকে প্রকাশিত, লেখক ইমন অর্ণব-এর গল্প সংকলন 'অদ্ভুত বিষণণ যখেরা' পড়ে শ্রী জয়দীপ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মতামত জানিয়েছেন।
প্রকাশনার পক্ষ থেকে জয়দীপবাবুকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।
পোস্টের সঙ্গের ছবিটিও ওঁর ফেসবুকের টাইমলাইন থেকে সংগৃহীত।
"♣ মানবমনের অন্ধকার গলির এক সাহসী দলিল:
ইমন অর্ণবের 'অদ্ভুত বিষণ্ণ যখেরা'। ♣
বইয়ের নাম: অদ্ভুত বিষণ্ণ যখেরা
লেখক: ইমন অর্ণব
প্রকাশনী: দ্য কাফে টেবিল
প্রচ্ছদ: দিবাকর চন্দ
মূল্য : ২৭৫ টাকা।
সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক গল্পের ধারাটি আর কোণঠাসা যে নেই, তার প্রমাণ ইমন অর্ণবের 'অদ্ভুত বিষণ্ণ যখেরা' বইটি।।
লেখক কেবল প্রথাগত গল্পের কাঠামোকেই ভাঙেননি, বরং অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন মানুষের দমিয়ে রাখা মনস্তত্ত্ব, নৈতিক পতন এবং সামাজিক নগ্নতার এক অনবদ্য আখ্যান।।
বইটি মূলত একটি উপন্যাসিকা এবং ছয়টি ভিন্ন স্বাদের ছোটগল্পের সংকলন। প্রতিটি লেখাতেই মানবমনের অন্ধকার দিক— লোভ, কাম, হিংস্রতা, অপরাধবোধ এবং মোহের এক নিখুঁত সার্জারি করা হয়েছে।।
এই বইয়ের মূল শক্তি লুকিয়ে আছে এর ছোটগল্পগুলোতে। লেখকের নিজস্ব এক গল্প বলার ভঙ্গি রয়েছে, যেখানে অনেক সময় কেন্দ্রীয় চরিত্র শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থেকেও পুরো গল্প জুড়ে প্রবলভাবে উপস্থিত।।
সামাজিক অবক্ষয়ের আয়না:
♠'আলিওশাকে মেসেজ পাঠান' গল্পটি সমাজের অন্ধকার এবং সকরুণ ট্র্যাজেডির এক নিপুণ দলিল। রিন্টি নামের যে চরিত্রকে ঘিরে গল্প আবর্তিত, তার অনুপস্থিতি এবং চন্দ্রনাথের স্ত্রীর একটি নির্দিষ্ট সংলাপ পাঠককে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।।
♠'ভালো থাকবেন শৈলজা' গল্পে শাশুড়ি বা মেয়েলি দেওরের মতো পার্শ্বচরিত্রগুলো তাদের নিষ্ঠুরতা ও অসহায়তা নিয়ে প্রধান চরিত্রের মতোই শক্তিশালী ও দাগ কেটে রাখার মতো হয়ে উঠেছে।।
♠ছকভাঙা থ্রিলার: 'মৃত্যুর অলীক ঘ্রাণ' চিরাচরিত ডার্ক থ্রিলার নয়; এটি ভিক্টিমের বয়ানে লেখা এক সিরিয়াল কিলারের গল্প। প্রথাগত সমাপ্তির বদলে লেখক এখানে এক অপ্রাপ্তির রেশ রেখে যান, যা পাঠককে যথেষ্ট ভাবনায় ফেলে দেয়।।
♠এই সংকলনের একটি শক্তিশালী গল্প নিঃসন্দেহে
'ফিরে যায় বসন্তবেলা'। আপাত নিরীহ প্রেমের মোড়কে শুরু হওয়া এই গল্প আচমকাই যে ভয়ংকর বাঁক নেয়, তা নারীত্বের চরম অবমাননা এবং মানবিক অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্নের সামনে পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয়। উনি এখানে কোনো সমাধান দেননি, শুধু আমাদের সকলকে চোখে আঙুল দিয়ে বাস্তবটা দেখিয়েছেন।
♣ স্মৃতির গোলকধাঁধা এবং জাদুবাস্তবতা।
বইয়ের শেষ অংশটি হলো নাম-উপন্যাসিকা
'অদ্ভুত বিষণ্ণ যখেরা'।
নাম-উপন্যাসিকাটির পাঠ-অভিজ্ঞতা এক কথায় বলতে গেলে— চরম অস্বস্তিকর এবং একই সঙ্গে ঘোরলাগা। প্রথাগত উপন্যাসের চেনা ছক, চলন বা প্যাটার্নের সাথে এর কোনো মিল না পাওয়াই সম্ভবত এই অস্বস্তির মূল কারণ।
পুরো আখ্যানটি মূলত মাণ্ডবী নামক এক চরিত্রের আত্মকথন। তবে একে নিছক 'আত্মকথন' বললে এর গভীরতা বোঝানো যায় না। বরং এটি হলো মাণ্ডবীর মুহূর্তযাপন। তার ভাবনাগুলো কোনো নির্দিষ্ট সরলরেখায় হাঁটে না। একটি ভাবনার রেশ কাটতে না কাটতেই অবচেতনভাবে অন্য এক ভাবনায় তার অবতরণ ঘটে। ৯০-এর দশকের নস্টালজিয়া (পেনফ্রেন্ডশিপ, সাইবার ক্যাফে) থেকে শুরু করে সম্পর্ক, শরীর, যৌনতার নগ্ন ও সরাসরি উপস্থাপন এই উপন্যাসিকাকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। এর পাশাপাশি লেখকের জাদুবাস্তবতার ব্যবহার— যেমন দীর্ঘশ্বাসের তীব্রতায় রঙ্গন গাছের শিকড় উপড়ে যাওয়া বা শরীর থেকে লবঙ্গ ফুলের গন্ধ বের হওয়া।।
উপন্যাসিকাটির বেশিরভাগ চরিত্রের নির্দিষ্ট কোনো নাম নেই; তারা কেবল 'মা', 'বড়দা', বা 'মেজদা' পরিচয়েই আখ্যানে উপস্থিত।
পুরো উপন্যাসটি, এমনকি 'যখ' নামক মূল কনসেপ্টটিকেও লেখক যেভাবে অপূর্ব সব রূপকের মোড়কে উপস্থাপন করেছেন, তা সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো।
আর উপন্যাসের সমাপ্তি? সেটি আবারও সেই অস্বস্তির জগতেই আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এক অদ্ভুত, না-মেলা সমীকরণ ও মানসিক শূন্যতার সামনে দাঁড় করিয়ে উপন্যাসিকাটি শেষ হয়। এই অস্বস্তিটুকু আসলে উপন্যাসেরই জয়, কারণ বইয়ের পাতা বন্ধ করার পরও এর রেশ মন থেকে সহজে মুছে যাওয়ার নয়।"