KAMOL KATHA

KAMOL KATHA Informative , interview with notable personality and awareness informetion, historical values,

23/06/2026

২৩ শে জুন কালা দিবস পালন করে,কালো ব্যাচ পরুন

বটু কৃষ্ণ হালদার

দেশভাগের অগ্নিগর্ভ দিনগুলো: যেখানে রক্ত গঙ্গা বইল

ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র এবং মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র কুফল হিসেবে ১৯৪৬ সাল থেকে সমগ্র বাংলায় দাঙ্গার আগুন জ্বলছিল। নোয়াখালী থেকে শুরু করে কলকাতার রাস্তাঘাট সর্বত্রই তখন কেবল আর্তনাদ।

লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দু নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। যখন কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত, তখন সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন। দেশভাগ যখন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন বাংলার হিন্দুদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। জিন্নাহ এবং সোহরাওয়ার্দীর স্বপ্ন ছিল সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করা।

ঠিক সেই সময় ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী অনুভব করেন যে যদি দেশভাগ হয়, তবে বাঙালির জন্য একটি আলাদা ভূখণ্ড থাকতে হবে যেখানে তারা সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে।

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী: বাঙালির অস্তিত্বের রক্ষাকবচ

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ছিলেন এক অদম্য যোদ্ধা। যখন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হতে চলেছে, তখন তিনি বিধানসভায় এবং গণপরিষদের বিতর্কে বজ্রনির্ঘোষ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল অকাট্য ... যদি ভারতবর্ষ ভাগ হয় তবে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে।

তিনি বলেছিলেন:

"আমি কোনোদিন দেশভাগ চাইনি। কিন্তু যদি দেশভাগ হয়ই, তবে বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি আলাদা ভূখণ্ড থাকতে হবে যেখানে তারা সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে।"

শ্যামাপ্রসাদ বাবুর এই বজ্রনির্ঘোষ বক্তৃতা এবং জনমত গঠন জিন্নাহ এবং সোহরাওয়ার্দীর নীল নকশা নস্যাৎ করে দেয়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে পাকিস্তান যদি সৃষ্টি হয়, তবে তা হবে অখণ্ড ভারতের একটি অংশ কেটে, কিন্তু বাংলার হিন্দু প্রধান এলাকাগুলো কোনোভাবেই সেই রাষ্ট্রের অংশ হবে না। তাঁর এই অটল অবস্থানের কারণেই আজ আমরা পশ্চিমবঙ্গ নামক এই রাজ্যটি পেয়েছি।

দেশভাগের সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সাহসিকতা এবং দূরদর্শিতা আমাদের শিখিয়েছে যে অস্তিত্বের সংকটের মুখে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়। তিনি কেবল একজন নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

এক ভারত, এক পরিচয়: ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর অখণ্ড ভারতের লড়াই

স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছর ভারতের অভ্যন্তরীণ সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। তৎকালীন সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার কারণে ভারতীয় নাগরিকদের সেখানে প্রবেশ করতে পারমিট বা অনুমতির প্রয়োজন হতো। এই ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন ডঃ মুখার্জী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ভারতের প্রতিটি অংশ সমান এবং সেখানে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়।

এক দেশে দুই বিধান চলবে না

১৯৫৩ সালের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন ভারতের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। ডঃ মুখার্জীর সেই কালজয়ী স্লোগান আজও আমাদের কানে অনুরণিত হয়। তিনি বলেছিলেন যে এক দেশে দুই প্রধান, দুই বিধান আর দুই নিশান চলবে না। তিনি চেয়েছিলেন কাশ্মীরকে পূর্ণভাবে ভারতের মূল প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করতে। তাঁর যুক্তি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। যদি কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়, তবে কেন সেখানে প্রবেশের জন্য আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হবে।

এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর, যিনি কাশ্মীরে যাননি।অন্যদিকে এমন বাঙালিকেও খুঁজে বের করা খুব দুষ্কর, যিনি জানেন কেন আজ কাশ্মীরে ভারতবাসী হিসেবে তাঁকে পাসপোর্ট, ভিসা বা নিদেনপক্ষে পারমিট নিয়ে যেতে হয় না।৮ই এপ্রিল ১৯৫০ - নেহরু লিয়াকৎ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। সেদিনই ঐ চুক্তি র প্রতিবাদে ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯শে এপ্রিল ১৯৫০ শ্যামাপ্রসাদ পার্লামেন্টে তাঁর পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে যে বিবৃতি দেন তার প্রতিটি ছন্দে ফুটে উঠেছিল তাঁর সাবলীল ব্যক্তিত্ব, তীব্র দেশপ্রেম, অজেয় ইচ্ছাশক্তি আর দুর্জয় সাহস। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন -

" কোন ব্যক্তিগত কারণ আমাকে পদত্যাগ করতে প্রণোদিত করেনি। আমি আশা করি, যাদের সাথে আমার মত বিরোধ হয়েছে, তাঁরাও আমার এই conviction কে সমর্থন করবেন। আমার পদত্যাগের কারণ সম্পূর্ণ মৌলিক এবং আমি মনে করি, যে সরকারের নীতি আমি অনুমোদন করি না সেই সরকারের একজন সদস্য হয়ে থাকা অনুচিত এবং অসম্মানজনক।

"আমি মনে করি এই নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি মূল সমস্যার বিন্দুমাত্র সমাধান করবে না। ওই দেশ থেকে সমস্ত হিন্দু শিখকে তাড়িয়ে দিয়ে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, একই ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে ইসলামিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা পাকিস্তানের জাতীয় নীতি। এই নীতির ফলে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছে"NASTY BRUTISH AND SHORT"। আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা থেকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। যদি কেউ পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাস স্মরণ করেন তবে বুঝতে পারবেন যে, সেখানে হিন্দুদের পক্ষে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সমস্যাটা সাম্প্রদায়িক নয়, প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক। এই চুক্তি দুঃখজনকভাবে ইসলামিক রাষ্ট্রের অর্থ কি হতে পারে তা এড়িয়ে গেছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই চুক্তির এক জায়গায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, the principles of democracy. freedom. equality. tolerance and special justice as enunciated by Islam shall be fully observed। তিনি বলেছেন, ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং আচার-আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা এবং তা প্রতিকারের উপায় বিশেষভাবে নির্দিষ্ট।

"আমি গুরুত্ব সহকারে এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই, এই ধরনের সমাজে কোন হিন্দু তাঁর সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে পারেন কিনা?"

নেহরু কে তিনি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে বলেন- "যারা এই চুক্তিকে সমর্থন করছেন তাঁদের কাছে আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ মিনতি, আপনারা পূর্ব পাকিস্তানে যান; একলা নয়, স্ত্রী, ভগ্নি ও কন্যাদের নিয়ে ওখানে সাহসের সাথে হতভাগ্য হিন্দু সংখ্যালঘুদের সাথে বসবাস করুন। তবে তো হবে এই চুক্তির প্রতি আপনাদের বিশ্বাসের সত্তিকারের পরীক্ষা"। (I would only respectfully urge those who believe in the agreement to discharge their responsibility by going to East Bengal - not alone, but accompanied by their wives, sisters and daughters and bravely share the burden of joint living with the unfortunate Hindu minorities of East Bengal)।"

ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পদত্যাগ করলেন। আলোড়ন সৃষ্টি হল রাজনৈতিক মহলে। তবে কি শ্যামাপ্রসাদ রাজনীতি ছেড়ে দিলেন। কারণ তিনি তাঁর ভাষণে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে আত্মনিয়োগের কথা বারবার বলেছিলেন।

অনেকেই প্রশ্ন করলেন, তবে কি জহরলাল নেহরুর একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নেওয়া হবে?

কিন্তু অচিরেই ভুল ভাঙ্গে সবার। শ্যামাপ্রসাদ এর নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক দল জন্ম নেয় - জনসংঘ।

নতুন দলের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্যামাপ্রসাদ জানালেন," কংগ্রেসের শাসনের মধ্যে যে একনায়তান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে তার অন্যতম কারণ দেশে কোনো সুসংগঠিত বিরোধীদল নেই (one of the chief reasons for the manifestation of dictatorship of Congress rule is the absence of well organised opposition parties)।"

স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন পার্টি কে ভালোভাবে নিলেন না নেহরু। হুংকার ছাড়লেন," I will crush Janasangha"

উত্তর দিলেন শ্যামাপ্রসাদ - "I say, I will crush this crushing mentality:

জনসংঘের বিরুদ্ধে রুটিনমাফিক অভিযোগ আনলেন নেহরু, "সাম্প্রদায়িক"। বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন শ্যামাপ্রসাদ,' "স্বাধীনতার আগে মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার বেদীতে বারবার ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কে বলি দিয়ে এবং দেশভাগের পরেও পাকিস্তানের খেয়াল এর কাছে যিনি আত্মসমর্পণ করেন, সেই নেহরুর অন্যকে সাম্প্রদায়িক অভিযুক্ত করা মানায় না। এখন একমাত্র নেহরু এবং তার সাকরেদরা ছাড়া দেশে আর কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই। আগামী নির্বাচনে মুসলমান ভোট পাওয়ার আশায় তাঁরাই এই নীতি নিয়েছেন। দেশের অন্যান্য সমস্যা থেকে দেশের মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলেছেন। (The cry of communalism raised by Pandit Nehru is to sidetrack the real issues now before the country)"।

নেহরুর কাশ্মীরে নীতির তীব্র সমালোচনা করেন শ্যামাপ্রসাদ। পার্লামেন্টে শ্যামাপ্রসাদের ভাষনের মাঝখানে চিৎকার করে ওঠেন অসহিষ্ণু নেহরু - "I know more about Kashmir then Mukharji"

জবাব দেন শ্যামাপ্রসাদ - "এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা যে প্রধানমন্ত্রী জগতের সবকিছুই সকলের থেকে বেশি জানেন এবং বোঝেন আর তাই তিনি করো পরামর্শ নেন না। তাহলে আমি জানতে চাই, কাশ্মীরীরা প্রথমে ভারতীয় পরে কাশ্মীরী না প্রথমে কাশ্মীরী পরে ভারতীয়। এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং আমাদের অবশ্যই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। (Are Kashmiris Indians first and Kashmiris next or they are Kashmiris first and Indians next or they are Kashmiris first, second and third and not Indians at all)।"

১৯৪৭ সালের ২৬ শে অক্টোবর জম্মু-কাশ্মীর ভারতের যোগদান করে। এই যোগদান ছিল সম্পূর্ণ শর্তহীন। কিন্তু আগ বাড়িয়ে হঠাৎ নেহরু কাশ্মীরের জন্য কিছু সুযোগ সুবিধা ঘোষণা করেন। প্রস্তাব দেওয়া হয়, কাশ্মীরের জন্য আলাদা আইন, আলাদা পতাকা এবং আলাদা প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। এই প্রস্তাবকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়ার জন্য সংবিধানে ৩৭০ ধারা বলে একটি বিশেষ ধরাও সংযুক্ত করা হয়।

নেহরুর এই অবিমৃষ্যকারিতায় ক্ষুব্দ শ্যামাপ্রসাদ নেহরু সম্পর্কে মূল্যায়ন করেন -"When I scan the whole course of Indian history, I do not find a single man who has done more harm to this country than Pandit Nehru"

শ্যামাপ্রসাদ নেহরুর এই কাশ্মীর নীতির তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাঁর সিংহ গর্জন 'এক প্রধান' 'এক নিশান' 'এক বিধান' সমগ্র দেশে ধ্বনিত হতে থাকে। ওই সময় কাশ্মীর যেতে পারমিট লাগত। অর্থাৎ সরকারি অনুমতি নিয়ে তবেই কাশ্মীর যাওয়া যেত। শ্যামাপ্রসাদ নিজে এই প্রথা ভেঙে কাশ্মীর যাওয়ার সংকল্প নেন। এই প্রসঙ্গে নেহরু কে লেখা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি এখানে উল্লেখের দাবি রাখে।

" আমি আপনাকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিতে চাই যে, আপনার ক্রোধ এবং আক্রোশের সম্মুখীন হতে আমরা প্রস্তুত। গতকাল পাঞ্জাবে নিবর্তনমূলক আটক আইন আমাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার করে আপনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে কি হতে চলেছে। আমাদের দেশের গণতন্ত্রের এক অদ্ভুত প্রতিফলন আপনার কাছে দেখা গেল, যেখানে আইনসিদ্ধ রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করতে নিবর্তনমূলক আটক আইন প্রয়োগ করা হল।

" আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন যে আপনার মত কাশ্মীর সমস্যা আন্তর্জাতিককরন ব্যাপারটা আমি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। তবে এই দাবি কোন একজনও করবে না যে, আপনার কাশ্মীর নীতি পরিচালনা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের সম্মান একটুও বাড়িয়েছে বা বিপুল আন্তর্জাতিক সমর্থন আমরা পেয়েছি।"সর্বশেষে একজন দেশপ্রেমিকের তাঁরই বিরোধীকে আহ্বান -

"আমাদের মধ্যে নীতিগত বিরোধ থাকলও আমরা একই মায়ের দুই সন্তান। আসুন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমরা সমস্ত রকম মর্যাদার লড়াই থামিয়ে এই সমস্যার একটা সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করি।"

কিন্তু নেহরু শুনলেন না। তাঁর কাছে দেশের থেকেও তাঁর ব্যক্তিগত ইগো এবং মুসলমান তাস খেলা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ।২৫ শে এপ্রিল, ১৯৫৩, কলকাতা থেকে দিল্লিতে উড়ে গিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। যাবেন কাশ্মীর। নেহরু-আব্দুল্লাহ র গড়ে তোলা বিজাতীয় নীতি ভেঙ্গে ফেলবেন তিনি। ভেঙেছিলেনও। কিন্তু দেখে যেতে পারেননি। আজ ২৩শে জুন ২০২০। জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার অস্তিত্বও আর নেই। ১৯৫৩ সালের এই ২৩ শে জুন দিনটিতেই হত্যা করা হয়েছিল ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে।পন্ডিচেরি থেকে শ্রীমা ও দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন "unfortunately he was killed"।

শ্যামাপ্রসাদের এই অকাল প্রয়াণে শ্রদ্ধায়, দুঃখে, মর্মবেদনায় নির্বাক হয়ে গিয়েছিল আপামর জনসাধারণ।এক জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদ মাধ্যমে(২৪.০৬.১৯৫৩)য় লেখা হয়েছিল-" অপরাহ্ন তিনটার মধ্যে নরনারী ও শিশুর এক বিরাট জনতা দমদম বিমান ঘাঁটিতে উপস্থিত হয়

" কলিকাতা হইতে দমদম বিমান ঘাটি পর্যন্ত নয়মাইল দীর্ঘ পথের উভয় পাশে গ্রিয়েরসন মুখে গৃহের সম্মুখে অলিন্দে এবং পারশে আগ্রহাকুল জনতা সমবেত হয় এবং দমদমের দিক হইতে আগত প্রত্যেকের নিকট ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের বিমান কখন আসিবে প্রশ্ন করিতে থাকে।তিনটা হইতে ছয়টা, ছয়টা হইতে সাড়ে সাতটা, সাড়ে সাতটা হইতে নয়টা - বিমান আসিবার সময় কেবলই পিছাইয়া যাইতে লাগিল। তথাপি এই বিরাট জনসমুদ্র প্রতীক্ষারত হইতে চ্যুত হইল না।অবশেষে দেহ দমদমে পৌঁছাইল।

"রাত্রি নয়টা বাজিবার পাঁচ মিনিট পূর্বে ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের শবদেহ বহন করিয়া একখানি আই.এন.এ. বিমান দমদম বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করে।বেলা তিনটা হইতে এই বিপুল জনতা অশেষ ধৈর্য সহকারে প্রতীক্ষা করিতেছিল। জনতার ভিড় এত বেশি হইয়া ছিল যে বিমান অবতরণ ক্ষেত্রের প্রবেশ পথে পুলিশকে এক কঠিন বেষ্টনী রচনা করিয়া শৃঙ্খলা রক্ষা করিতে হয়

"রাত্রি প্রায় নয়টার সময় দমদম বিমান ঘাঁটি হইতে শোভাযাত্রা ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের শবানুগমন করিয়া কলিকাতা অভিমুখে অগ্রসর হইতে থাকে। শোভাযাত্রাটি যতই কলিকাতার নিকটবর্তী হইতে থাকে, ততই লোকে লোকে ভরিয়া যাইতে থাকে। পথের দুই ধারে অগণিত লোক - পুরুষ, নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা আকুল নয়নে ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের শবদেহর দিকে চাহিয়া থাকে। বাড়ির বারান্দা, গাছের উপর, ছাদে সর্বত্র লক্ষ লক্ষ লোক ডক্টর মুখোপাধ্যায় কে শেষবারের মতো দর্শন করিবার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করিয়া থাকে। শ্যামবাজার মোড়ে লক্ষাধিক নর-নারী গভীর রাত্রি পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া থাকে"সজল চোখে চপলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রশ্ন করেন - "কেমন করিয়া জনসাধারণের চিত্তে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ এমন দৃঢ়ভাবে আসন প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন?"

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হত্যার পরেই মাত্র ১ পয়সা ট্রাম ভাড়া বাড়ানো কে শিখণ্ডী বানিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল কমিউনিস্টরা। ওখানেও উদ্দেশ্য সেই একটাই ছিল - শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হত্যাতে মানুষের মনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল সেটাকে ট্রাম বাস পুড়িয়ে অন্য পথে ড্রেন আউট করে দেওয়া। তৎকালীন কংগ্রেস সরকারকে বাঁচিয়ে দেওয়া।

বটু কৃষ্ণ হালদার,কলকাতা-১০৪,ফোন_৯৮৩০৪২০৯০৪২৩ শে জুন কালা দিবস পালন করে,কালো ব্যাচ পরুন

বটু কৃষ্ণ হালদার

দেশভাগের অগ্নিগর্ভ দিনগুলো: যেখানে রক্ত গঙ্গা বইল

ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্র এবং মুসলিম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র কুফল হিসেবে ১৯৪৬ সাল থেকে সমগ্র বাংলায় দাঙ্গার আগুন জ্বলছিল। নোয়াখালী থেকে শুরু করে কলকাতার রাস্তাঘাট সর্বত্রই তখন কেবল আর্তনাদ।

লক্ষ লক্ষ বাঙালি হিন্দু নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। যখন কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত, তখন সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন। দেশভাগ যখন অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন বাংলার হিন্দুদের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। জিন্নাহ এবং সোহরাওয়ার্দীর স্বপ্ন ছিল সমগ্র বাংলাকে পাকিস্তানের অংশ করা।

ঠিক সেই সময় ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী অনুভব করেন যে যদি দেশভাগ হয়, তবে বাঙালির জন্য একটি আলাদা ভূখণ্ড থাকতে হবে যেখানে তারা সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে।

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী: বাঙালির অস্তিত্বের রক্ষাকবচ

ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ছিলেন এক অদম্য যোদ্ধা। যখন অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হতে চলেছে, তখন তিনি বিধানসভায় এবং গণপরিষদের বিতর্কে বজ্রনির্ঘোষ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল অকাট্য ... যদি ভারতবর্ষ ভাগ হয় তবে বাংলাকেও ভাগ করতে হবে।

তিনি বলেছিলেন:

"আমি কোনোদিন দেশভাগ চাইনি। কিন্তু যদি দেশভাগ হয়ই, তবে বাঙালি হিন্দুদের জন্য একটি আলাদা ভূখণ্ড থাকতে হবে যেখানে তারা সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে।"

শ্যামাপ্রসাদ বাবুর এই বজ্রনির্ঘোষ বক্তৃতা এবং জনমত গঠন জিন্নাহ এবং সোহরাওয়ার্দীর নীল নকশা নস্যাৎ করে দেয়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে পাকিস্তান যদি সৃষ্টি হয়, তবে তা হবে অখণ্ড ভারতের একটি অংশ কেটে, কিন্তু বাংলার হিন্দু প্রধান এলাকাগুলো কোনোভাবেই সেই রাষ্ট্রের অংশ হবে না। তাঁর এই অটল অবস্থানের কারণেই আজ আমরা পশ্চিমবঙ্গ নামক এই রাজ্যটি পেয়েছি।

দেশভাগের সেই অগ্নিগর্ভ দিনগুলোতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সাহসিকতা এবং দূরদর্শিতা আমাদের শিখিয়েছে যে অস্তিত্বের সংকটের মুখে কীভাবে রুখে দাঁড়াতে হয়। তিনি কেবল একজন নেতা ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক।

এক ভারত, এক পরিচয়: ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর অখণ্ড ভারতের লড়াই

স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছর ভারতের অভ্যন্তরীণ সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে ছিল অত্যন্ত সংকটজনক। তৎকালীন সময়ে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার কারণে ভারতীয় নাগরিকদের সেখানে প্রবেশ করতে পারমিট বা অনুমতির প্রয়োজন হতো। এই ব্যবস্থার ঘোর বিরোধী ছিলেন ডঃ মুখার্জী। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ভারতের প্রতিটি অংশ সমান এবং সেখানে কোনো বিভেদ থাকা উচিত নয়।

এক দেশে দুই বিধান চলবে না

১৯৫৩ সালের সেই ঐতিহাসিক আন্দোলন ভারতের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছিল। ডঃ মুখার্জীর সেই কালজয়ী স্লোগান আজও আমাদের কানে অনুরণিত হয়। তিনি বলেছিলেন যে এক দেশে দুই প্রধান, দুই বিধান আর দুই নিশান চলবে না। তিনি চেয়েছিলেন কাশ্মীরকে পূর্ণভাবে ভারতের মূল প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে যুক্ত করতে। তাঁর যুক্তি ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। যদি কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়, তবে কেন সেখানে প্রবেশের জন্য আলাদা অনুমতির প্রয়োজন হবে।

এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর, যিনি কাশ্মীরে যাননি।অন্যদিকে এমন বাঙালিকেও খুঁজে বের করা খুব দুষ্কর, যিনি জানেন কেন আজ কাশ্মীরে ভারতবাসী হিসেবে তাঁকে পাসপোর্ট, ভিসা বা নিদেনপক্ষে পারমিট নিয়ে যেতে হয় না।৮ই এপ্রিল ১৯৫০ - নেহরু লিয়াকৎ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। সেদিনই ঐ চুক্তি র প্রতিবাদে ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯শে এপ্রিল ১৯৫০ শ্যামাপ্রসাদ পার্লামেন্টে তাঁর পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে যে বিবৃতি দেন তার প্রতিটি ছন্দে ফুটে উঠেছিল তাঁর সাবলীল ব্যক্তিত্ব, তীব্র দেশপ্রেম, অজেয় ইচ্ছাশক্তি আর দুর্জয় সাহস। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন -

" কোন ব্যক্তিগত কারণ আমাকে পদত্যাগ করতে প্রণোদিত করেনি। আমি আশা করি, যাদের সাথে আমার মত বিরোধ হয়েছে, তাঁরাও আমার এই conviction কে সমর্থন করবেন। আমার পদত্যাগের কারণ সম্পূর্ণ মৌলিক এবং আমি মনে করি, যে সরকারের নীতি আমি অনুমোদন করি না সেই সরকারের একজন সদস্য হয়ে থাকা অনুচিত এবং অসম্মানজনক।

"আমি মনে করি এই নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি মূল সমস্যার বিন্দুমাত্র সমাধান করবে না। ওই দেশ থেকে সমস্ত হিন্দু শিখকে তাড়িয়ে দিয়ে এবং তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, একই ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে ইসলামিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা পাকিস্তানের জাতীয় নীতি। এই নীতির ফলে পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের জীবন হয়ে দাঁড়িয়েছে"NASTY BRUTISH AND SHORT"। আমাদের ইতিহাসের শিক্ষা থেকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়। যদি কেউ পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাস স্মরণ করেন তবে বুঝতে পারবেন যে, সেখানে হিন্দুদের পক্ষে সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। সমস্যাটা সাম্প্রদায়িক নয়, প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক। এই চুক্তি দুঃখজনকভাবে ইসলামিক রাষ্ট্রের অর্থ কি হতে পারে তা এড়িয়ে গেছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই চুক্তির এক জায়গায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, the principles of democracy. freedom. equality. tolerance and special justice as enunciated by Islam shall be fully observed। তিনি বলেছেন, ইসলাম শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং আচার-আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলামে দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা এবং তা প্রতিকারের উপায় বিশেষভাবে নির্দিষ্ট।

"আমি গুরুত্ব সহকারে এই প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই, এই ধরনের সমাজে কোন হিন্দু তাঁর সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে নিরাপদ বোধ করতে পারেন কিনা?"

নেহরু কে তিনি সরাসরি আহ্বান জানিয়ে বলেন- "যারা এই চুক্তিকে সমর্থন করছেন তাঁদের কাছে আমার শ্রদ্ধাপূর্ণ মিনতি, আপনারা পূর্ব পাকিস্তানে যান; একলা নয়, স্ত্রী, ভগ্নি ও কন্যাদের নিয়ে ওখানে সাহসের সাথে হতভাগ্য হিন্দু সংখ্যালঘুদের সাথে বসবাস করুন। তবে তো হবে এই চুক্তির প্রতি আপনাদের বিশ্বাসের সত্তিকারের পরীক্ষা"। (I would only respectfully urge those who believe in the agreement to discharge their responsibility by going to East Bengal - not alone, but accompanied by their wives, sisters and daughters and bravely share the burden of joint living with the unfortunate Hindu minorities of East Bengal)।"

ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পদত্যাগ করলেন। আলোড়ন সৃষ্টি হল রাজনৈতিক মহলে। তবে কি শ্যামাপ্রসাদ রাজনীতি ছেড়ে দিলেন। কারণ তিনি তাঁর ভাষণে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে আত্মনিয়োগের কথা বারবার বলেছিলেন।

অনেকেই প্রশ্ন করলেন, তবে কি জহরলাল নেহরুর একচ্ছত্র আধিপত্য মেনে নেওয়া হবে?

কিন্তু অচিরেই ভুল ভাঙ্গে সবার। শ্যামাপ্রসাদ এর নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক দল জন্ম নেয় - জনসংঘ।

নতুন দলের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্যামাপ্রসাদ জানালেন," কংগ্রেসের শাসনের মধ্যে যে একনায়তান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে তার অন্যতম কারণ দেশে কোনো সুসংগঠিত বিরোধীদল নেই (one of the chief reasons for the manifestation of dictatorship of Congress rule is the absence of well organised opposition parties)।"

স্বাভাবিকভাবেই এই নতুন পার্টি কে ভালোভাবে নিলেন না নেহরু। হুংকার ছাড়লেন," I will crush Janasangha"

উত্তর দিলেন শ্যামাপ্রসাদ - "I say, I will crush this crushing mentality:

জনসংঘের বিরুদ্ধে রুটিনমাফিক অভিযোগ আনলেন নেহরু, "সাম্প্রদায়িক"। বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন শ্যামাপ্রসাদ,' "স্বাধীনতার আগে মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার বেদীতে বারবার ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কে বলি দিয়ে এবং দেশভাগের পরেও পাকিস্তানের খেয়াল এর কাছে যিনি আত্মসমর্পণ করেন, সেই নেহরুর অন্যকে সাম্প্রদায়িক অভিযুক্ত করা মানায় না। এখন একমাত্র নেহরু এবং তার সাকরেদরা ছাড়া দেশে আর কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই। আগামী নির্বাচনে মুসলমান ভোট পাওয়ার আশায় তাঁরাই এই নীতি নিয়েছেন। দেশের অন্যান্য সমস্যা থেকে দেশের মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই সাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তুলেছেন। (The cry of communalism raised by Pandit Nehru is to sidetrack the real issues now before the country)"।

নেহরুর কাশ্মীরে নীতির তীব্র সমালোচনা করেন শ্যামাপ্রসাদ। পার্লামেন্টে শ্যামাপ্রসাদের ভাষনের মাঝখানে চিৎকার করে ওঠেন অসহিষ্ণু নেহরু - "I know more about Kashmir then Mukharji"

জবাব দেন শ্যামাপ্রসাদ - "এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা যে প্রধানমন্ত্রী জগতের সবকিছুই সকলের থেকে বেশি জানেন এবং বোঝেন আর তাই তিনি করো পরামর্শ নেন না। তাহলে আমি জানতে চাই, কাশ্মীরীরা প্রথমে ভারতীয় পরে কাশ্মীরী না প্রথমে কাশ্মীরী পরে ভারতীয়। এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এবং আমাদের অবশ্যই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। (Are Kashmiris Indians first and Kashmiris next or they are Kashmiris first and Indians next or they are Kashmiris first, second and third and not Indians at all)।"

১৯৪৭ সালের ২৬ শে অক্টোবর জম্মু-কাশ্মীর ভারতের যোগদান করে। এই যোগদান ছিল সম্পূর্ণ শর্তহীন। কিন্তু আগ বাড়িয়ে হঠাৎ নেহরু কাশ্মীরের জন্য কিছু সুযোগ সুবিধা ঘোষণা করেন। প্রস্তাব দেওয়া হয়, কাশ্মীরের জন্য আলাদা আইন, আলাদা পতাকা এবং আলাদা প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। এই প্রস্তাবকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়ার জন্য সংবিধানে ৩৭০ ধারা বলে একটি বিশেষ ধরাও সংযুক্ত করা হয়।

নেহরুর এই অবিমৃষ্যকারিতায় ক্ষুব্দ শ্যামাপ্রসাদ নেহরু সম্পর্কে মূল্যায়ন করেন -"When I scan the whole course of Indian history, I do not find a single man who has done more harm to this country than Pandit Nehru"

শ্যামাপ্রসাদ নেহরুর এই কাশ্মীর নীতির তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাঁর সিংহ গর্জন 'এক প্রধান' 'এক নিশান' 'এক বিধান' সমগ্র দেশে ধ্বনিত হতে থাকে। ওই সময় কাশ্মীর যেতে পারমিট লাগত। অর্থাৎ সরকারি অনুমতি নিয়ে তবেই কাশ্মীর যাওয়া যেত। শ্যামাপ্রসাদ নিজে এই প্রথা ভেঙে কাশ্মীর যাওয়ার সংকল্প নেন। এই প্রসঙ্গে নেহরু কে লেখা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি এখানে উল্লেখের দাবি রাখে।

" আমি আপনাকে পরিষ্কার করে জানিয়ে দিতে চাই যে, আপনার ক্রোধ এবং আক্রোশের সম্মুখীন হতে আমরা প্রস্তুত। গতকাল পাঞ্জাবে নিবর্তনমূলক আটক আইন আমাদের কর্মীদের গ্রেপ্তার করে আপনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে কি হতে চলেছে। আমাদের দেশের গণতন্ত্রের এক অদ্ভুত প্রতিফলন আপনার কাছে দেখা গেল, যেখানে আইনসিদ্ধ রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করতে নিবর্তনমূলক আটক আইন প্রয়োগ করা হল।

" আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন যে আপনার মত কাশ্মীর সমস্যা আন্তর্জাতিককরন ব্যাপারটা আমি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। তবে এই দাবি কোন একজনও করবে না যে, আপনার কাশ্মীর নীতি পরিচালনা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের সম্মান একটুও বাড়িয়েছে বা বিপুল আন্তর্জাতিক সমর্থন আমরা পেয়েছি।"সর্বশেষে একজন দেশপ্রেমিকের তাঁরই বিরোধীকে আহ্বান -

"আমাদের মধ্যে নীতিগত বিরোধ থাকলও আমরা একই মায়ের দুই সন্তান। আসুন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমরা সমস্ত রকম মর্যাদার লড়াই থামিয়ে এই সমস্যার একটা সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করি।"

কিন্তু নেহরু শুনলেন না। তাঁর কাছে দেশের থেকেও তাঁর ব্যক্তিগত ইগো এবং মুসলমান তাস খেলা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ।২৫ শে এপ্রিল, ১৯৫৩, কলকাতা থেকে দিল্লিতে উড়ে গিয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। যাবেন কাশ্মীর। নেহরু-আব্দুল্লাহ র গড়ে তোলা বিজাতীয় নীতি ভেঙ্গে ফেলবেন তিনি। ভেঙেছিলেনও। কিন্তু দেখে যেতে পারেননি। আজ ২৩শে জুন ২০২০। জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারার অস্তিত্বও আর নেই। ১৯৫৩ সালের এই ২৩ শে জুন দিনটিতেই হত্যা করা হয়েছিল ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে।পন্ডিচেরি থেকে শ্রীমা ও দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন "unfortunately he was killed"।

শ্যামাপ্রসাদের এই অকাল প্রয়াণে শ্রদ্ধায়, দুঃখে, মর্মবেদনায় নির্বাক হয়ে গিয়েছিল আপামর জনসাধারণ।এক জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদ মাধ্যমে(২৪.০৬.১৯৫৩)য় লেখা হয়েছিল-" অপরাহ্ন তিনটার মধ্যে নরনারী ও শিশুর এক বিরাট জনতা দমদম বিমান ঘাঁটিতে উপস্থিত হয়

" কলিকাতা হইতে দমদম বিমান ঘাটি পর্যন্ত নয়মাইল দীর্ঘ পথের উভয় পাশে গ্রিয়েরসন মুখে গৃহের সম্মুখে অলিন্দে এবং পারশে আগ্রহাকুল জনতা সমবেত হয় এবং দমদমের দিক হইতে আগত প্রত্যেকের নিকট ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের বিমান কখন আসিবে প্রশ্ন করিতে থাকে।তিনটা হইতে ছয়টা, ছয়টা হইতে সাড়ে সাতটা, সাড়ে সাতটা হইতে নয়টা - বিমান আসিবার সময় কেবলই পিছাইয়া যাইতে লাগিল। তথাপি এই বিরাট জনসমুদ্র প্রতীক্ষারত হইতে চ্যুত হইল না।অবশেষে দেহ দমদমে পৌঁছাইল।

"রাত্রি নয়টা বাজিবার পাঁচ মিনিট পূর্বে ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের শবদেহ বহন করিয়া একখানি আই.এন.এ. বিমান দমদম বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করে।বেলা তিনটা হইতে এই বিপুল জনতা অশেষ ধৈর্য সহকারে প্রতীক্ষা করিতেছিল। জনতার ভিড় এত বেশি হইয়া ছিল যে বিমান অবতরণ ক্ষেত্রের প্রবেশ পথে পুলিশকে এক কঠিন বেষ্টনী রচনা করিয়া শৃঙ্খলা রক্ষা করিতে হয়

"রাত্রি প্রায় নয়টার সময় দমদম বিমান ঘাঁটি হইতে শোভাযাত্রা ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের শবানুগমন করিয়া কলিকাতা অভিমুখে অগ্রসর হইতে থাকে। শোভাযাত্রাটি যতই কলিকাতার নিকটবর্তী হইতে থাকে, ততই লোকে লোকে ভরিয়া যাইতে থাকে। পথের দুই ধারে অগণিত লোক - পুরুষ, নারী, আবালবৃদ্ধবনিতা আকুল নয়নে ডক্টর মুখোপাধ্যায়ের শবদেহর দিকে চাহিয়া থাকে। বাড়ির বারান্দা, গাছের উপর, ছাদে সর্বত্র লক্ষ লক্ষ লোক ডক্টর মুখোপাধ্যায় কে শেষবারের মতো দর্শন করিবার জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করিয়া থাকে। শ্যামবাজার মোড়ে লক্ষাধিক নর-নারী গভীর রাত্রি পর্যন্ত অপেক্ষা করিয়া থাকে"সজল চোখে চপলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রশ্ন করেন - "কেমন করিয়া জনসাধারণের চিত্তে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ এমন দৃঢ়ভাবে আসন প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন?"

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হত্যার পরেই মাত্র ১ পয়সা ট্রাম ভাড়া বাড়ানো কে শিখণ্ডী বানিয়ে তাণ্ডব চালিয়েছিল কমিউনিস্টরা। ওখানেও উদ্দেশ্য সেই একটাই ছিল - শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হত্যাতে মানুষের মনে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল সেটাকে ট্রাম বাস পুড়িয়ে অন্য পথে ড্রেন আউট করে দেওয়া। তৎকালীন কংগ্রেস সরকারকে বাঁচিয়ে দেওয়া।

বটু কৃষ্ণ হালদার,কলকাতা-১০৪,ফোন_৯৮৩০৪২০৯০৪

20/06/2026
20/06/2026

“সঙ্ঘ কাউকে আদেশ দেয় না”— এই কথার মধ্যে সঙ্ঘজীবনের এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে।

সঙ্ঘে কোনো স্বয়ংসেবককে চাপ সৃষ্টি করে বা আদেশ জারি করে কাজ করানো হয় না। এখানে মানুষকে গড়ে তোলা হয় আত্মীয়তা, ধ্যান ও সংস্কারের মাধ্যমে। শাখায় এসে একজন স্বয়ংসেবক ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন যে এই সমাজ, এই দেশ, এই সংস্কৃতি তাঁর নিজের। তখন কাজ আর কর্তব্য হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে হৃদয়ের আহ্বান।

মা কি কখনও সন্তানকে আদেশ দিয়ে সেবা করায়? পরিবারে কি শুধুই নির্দেশে সম্পর্ক টিকে থাকে? না, সেখানে থাকে ভালোবাসা, আত্মীয়তা ও দায়িত্ববোধ। সংঘের সম্পর্কও ঠিক তেমনই। তাই সংঘ আদেশ দেয় না, বরং এমন সংস্কার দেয় যে স্বয়ংসেবক নিজেই সমাজ ও জাতির জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দিতে প্রস্তুত হন।

সঙ্ঘের ইতিহাসে অসংখ্য স্বয়ংসেবক কারাগারে গেছেন, বিপদের মুখোমুখি হয়েছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের কাউকে কোনো আদেশপত্র দেওয়া হয়নি। তাঁরা এগিয়ে এসেছেন নিজের অন্তরের তাগিদে, মাতৃভূমির প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে।

এই কারণেই সঙ্ঘে বলা হয়—
“আদেশে নয়, আত্মপ্রেরণায়; বাধ্যতায় নয়, ভক্তিতে; নিয়ন্ত্রণে নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণে— স্বয়ংসেবক গড়ে ওঠে।”

সঙ্ঘের প্রকৃত শক্তি কোনো দপ্তর, কোনো পদ বা কোনো নির্দেশে নয়; সংঘের শক্তি নিহিত রয়েছে সেই স্বয়ংসেবকের হৃদয়ে, যিনি নীরবে অনুভব করেন—
“এই দেশ আমার, এই সমাজ আমার, এর সুখ-দুঃখের দায়িত্বও আমার।”

“संघ किसी को आदेश नहीं देता” — इस वाक्य में संघ जीवन का एक गहरा सत्य छिपा हुआ है।

संघ में किसी स्वयंसेवक से दबाव बनाकर या आदेश देकर कार्य नहीं कराया जाता। यहाँ व्यक्ति का निर्माण आत्मीयता, चिंतन और संस्कारों के माध्यम से किया जाता है। शाखा में आने वाला स्वयंसेवक धीरे-धीरे अनुभव करता है कि यह समाज, यह देश और यह संस्कृति उसकी अपनी है। तब कार्य केवल कर्तव्य नहीं रह जाता, बल्कि हृदय की पुकार बन जाता है।

क्या माँ कभी अपने पुत्र से आदेश देकर सेवा करवाती है? क्या परिवार में केवल निर्देशों के आधार पर संबंध बने रहते हैं? नहीं, वहाँ प्रेम, आत्मीयता और उत्तरदायित्व की भावना होती है। संघ का संबंध भी ठीक वैसा ही है। इसलिए संघ आदेश नहीं देता, बल्कि ऐसे संस्कार देता है कि स्वयंसेवक स्वयं ही समाज और राष्ट्र के लिए सर्वस्व अर्पित करने को तत्पर हो जाता है।

संघ के इतिहास में असंख्य स्वयंसेवक कारागार गए, संकटों का सामना किया और अपना जीवन समर्पित किया। उन्हें किसी प्रकार का आदेश-पत्र नहीं दिया गया था। वे अपने अंतःकरण की प्रेरणा से, मातृभूमि के प्रति अगाध प्रेम से आगे आए थे।

इसीलिए संघ में कहा जाता है—

“आदेश से नहीं, आत्मप्रेरणा से;
बाध्यता से नहीं, भक्ति से;
नियंत्रण से नहीं, आत्मनियंत्रण से— स्वयंसेवक का निर्माण होता है।”

संघ की वास्तविक शक्ति किसी कार्यालय, किसी पद या किसी निर्देश में नहीं है; संघ की शक्ति उस स्वयंसेवक के हृदय में निहित है, जो निःशब्द भाव से अनुभव करता है—

“यह देश मेरा है, यह समाज मेरा है, और इसके सुख-दुःख की जिम्मेदारी भी मेरी है।”

13/06/2026

#শোক_সংবাদ

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের বরিষ্ঠ প্রচারক তথা কোচবিহার বিভাগ কার্যালয় প্রমুখ শ্রী বাদল রায় আজ সকালে কোচবিহার এম.জে.এন. হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।‌

ঈশ্বরের কাছে ওঁনার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি।

ওঁ শান্তি

08/06/2026

যে ধ্বনি বিপ্লবীদের হৃদয় ঝড় তুলেছিল:_

বন্দেমাতরম

বটু কৃষ্ণ হালদার

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক ও মনীষী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম (২৬.৬.১৮৩৮) নৈহাটীর কাঠালপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট,

"বন্দে মাতরম্‌—গান নহে, মন্ত্র।"শ্রীহট্টের বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামীনীরদ কুমার গুপ্ত লিখছেন—"স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যখনই দুর্বলতা অনুভব করেছি,তখনই ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্র উচ্চারণ করায় দেহে ও মনে নূতন বলের সঞ্চার হয়েছে। বিপদের সম্মুখীন হলে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি করার সঙ্গে সঙ্গে সাহস এসেছে এবং বিপদকে বিপদ বলে গণ্য করি নাই। পুলিশ বা মিলিটারী জোর করে সভা অথবা শোভাযাত্রা ভেঙ্গে দিতে এসেছে, আমরা ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি করেছি। এই দিক থেকে বিচার করলে ‘বন্দেমাতরম্’ ছিল আমাদের War-cry বা যুদ্ধধ্বনি। জেলেও যখনই রাজবন্দীরা অত্যাচারিত হয়েছে, তখনই উচ্চৈঃস্বরে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি করেছেন। এককথায় ‘বন্দে মাতরম্ ছিল আমাদের কাছে কতকটা ইষ্ট মন্ত্রেরই মতো।"

১৮৯৬ সালে বিডন স্কোয়ারে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পাঁচ বছর বাদে ১৯০১ সালের কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেন দক্ষিণাচরণ সেন। ১৯০৫ সালে কংগ্রেসের বারাণসী অধিবেশনে গানটি পরিবেশন করেছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী।

স্বয়ং ঋষি অরবিন্দ ঘোষ "বন্দেমাতরম" কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি এই গানটিকে "বঙ্গদেশের জাতীয় সংগীত" হিসেবে অভিহিত করেন এবং এর মাধ্যমে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনে এর ব্যবহারকে জনপ্রিয়।

কিন্তু এহেন গীত গাইতে, বিপ্লবের এমন অগ্নীমন্ত্র উচ্চারণের ক্ষেত্রেও অনেকের সমস্যা ছিলো। অনেকের রীতিমত আপত্তিও ছিলো। এই সময়ে দাঁড়িয়ে যাদেরকে অনেকে প্রাতস্মরণীয় বলে মনে করেন, তাঁদের কেউ কেউও সেই তালিকায় ছিলেন।

যে শব্দবন্ধ সমগ্র জাতিকে বিপ্লবের বীজমন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল, যে সংগীতের সুরমূর্ছনা সমগ্র জাতির নিদ্রাভঙ্গ করে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ রাজশক্তির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়েছিল সেইবন্দেমাতরম এর স্রষ্ঠা কি সাম্প্রদায়িক...?

"ঊনবিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইংরেজ প্রভু ভক্ত, দালাল, শ্রেষ্ঠ হিন্দু জাতীয়তাবাদী এবং শ্রেষ্ঠ কট্টর মুসলিম বিদ্বেষী গদ্য লেখক। এই চরম সাম্প্রদায়িক লেখক তার সাহিত্যকর্মে অত্যন্ত কুৎসিত ও অশালীন ভাষায় নিরবচ্ছিন্নভাবে মুসলমান শাসক এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচার করেছেন।"

সাহিত্য সম্রাট বলে আমরা যাকে সম্মান করি সেই বন্দেমাতরম মন্ত্রের স্রষ্ঠা সম্বন্ধে এমন অনবদ্য সব বিশেষণ পাবেন আপনি গুগল সার্চ করলে। বোঝাই যায় ওপার বাংলার কোন স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবীর প্রতিভা এখানে বিকশিত হয়েছে। জীবনের শেষ উপন্যাস ‘সীতারাম’-এ লেখক মুসলমান ফকির চাঁদশাহের মুখ দিয়ে সীতারামের উদ্দেশ্যে যে কথাগুলি বলেছিলেন, তা সম্ভবত পড়েননি মিঞাজান...।

ফকির বলিল, বাবা! শুনিতে পাই, তুমি হিন্দুরাজ্য স্থাপন করিতে আসিয়াছ, কিন্তু অত দেশাচারের বশীভূত হইলে, তোমার হিন্দুরাজ্য সংস্থাপন করা হইবে না। তুমি যদি হিন্দু মুসলমান সমান না দেখ, তবে এই হিন্দু মুসলমানের দেশে তুমি রাজ্য রক্ষা করিতে পারিবে না। তোমার রাজ্যও ধর্মরাজ্য না হইয়া পাপের রাজ্য হইবে।’

যদি পড়তেন, তাহলে কোন যুক্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র মুসলমান-বিরোধী ছিলেন? ‘বন্দেমাতরম’-এর স্রষ্টাকে কোন ঐতিহাসিক ভিত্তিতে ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যায় কলঙ্কিত করে রাখছেন ?

বঙ্কিমচন্দ্র, আনন্দমঠ এবং বন্দেমাতরম, যে তিনটি শব্দ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সমার্থক, সেগুলি নিয়ে কোনও আলোচনা শুরু হলেই তথাকথিত প্রগতিশীল এবং ‘সেকুলার’-দের কেমন একটা অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়। একদল এটা বলতে নেমে পড়েন, ‘বন্দেমাতরম’-এ যেহেতু দেশকে ‘মা’ হিসাবে বন্দনা করা হয়েছে, এই গান মুসলমানরা জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকার না-ও করতে পারেন। কারণ দেশকে ‘মা’ হিসাবে বন্দনা করাটা নাকি ‘ইসলাম-বিরোধী’!

ভারতের তিরিশ চল্লিশ কোটি মুসলমানের জন্য যদি ‘দেশমাতৃকা’র বন্দনা ‘ধর্মবিরোধী’ হয় এবং ‘বন্দেমাতরম’ গাওয়াটা ‘ইসলাম বিরোধী’ হয়, তা হলে বাংলাদেশের ১৪ কোটি মুসলমান কোন যুক্তিতে ‘আমার সোনার বাংলা’ আবেগবিহ্বল চিত্তে গাইতে পারে? জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহণ করতে পারে? রবীন্দ্রনাথের সেই গানেও তো দেশকে ‘মা’ রূপেই কল্পনা করা হয়েছে! শুধু একবার মনে করুন সেই লাইনগুলি, যেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে, আসি নয়নজলে ভাসি’.....। রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নিয়ে কারও প্রশ্ন তোলার সাহস হয় না। আর বঙ্কিমচন্দ্র হলেই ‘সাম্প্রদায়িক’?

আনন্দমঠের সন্ন্যাসীরা মুসলমান রাজশক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হলে আমরা বলি বঙ্কিম মুসলমান বিদ্বেষী ছিলেন। তাহলে বঙ্কিম যখন উপন্যাসের শেষে মহাপুরুষের মুখ দিয়ে হিন্দু ধর্মের সুতীব্র সমালোচনা করে হিন্দু সন্তানদলের হাত থেকে রাজ্যশাসনের অধিকার কেড়ে নেন তখন আমরা তাঁকে হিন্দুবিদ্বেষী বলি না কেন? হিন্দুধর্মের ত্রুটি-বিচ্যুতি-দুর্বলতার সমালোচনা করলে যদি হিন্দু-বিদ্বেষী না হয় তবে অত্যাচারী মুসলমান রাজশাসনের বিরুদ্ধাচরণ করলেই বা সাম্প্রদায়িক আখ্যায় কলঙ্কিত হতে হবে কেন ?

যে ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় ১২৮৭ সনের চৈত্রে ‘আনন্দমঠ’ ছাপা শুরু হয়, সেই একই পত্রিকায় তার তিন মাস আগে, অর্থাৎ পৌষ সংখ্যায় ‘বাঙ্গালীর উৎপত্তি’ শীষর্ক প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, ‘লোকসংখ্যা গণনায় স্থির হইয়াছে যে যাহাদিগকে বাঙ্গালী বলা যায়, যাহারা বাঙ্গালাদেশে বাস করে, বাঙ্গালাভাষায় কথা কয়, তাহাদিগের মধ্যে অর্ধেক মুসলমান’। মনে রাখবেন, এর আগে এই একই পত্রিকায় ‘বঙ্গদর্শন’-এ ১২৭৯ সনে চারটে সংখ্যা জুড়ে ছাপা হয়েছিল তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘বঙ্গদেশের কৃষক’। এবং সেই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র একই সঙ্গে হাসিম শেখ এবং রামা কৈবর্ত্ত, অর্থাৎ বাংলার মুসলমান এবং হিন্দু প্রজা, কি দুর্দশার জীবন যাপন করছে, তার সুনিপুণ ছবি আঁকেন।

বাংলার কৃষকের জীবন যাপনের এই ছবি ক্যানভাসে আঁকার সময় তিনি হিন্দু এবং মুসলমানের মধ্যে কোনও ভেদাভেদ তো করেনইনি, বরং বারেবারে ‘ছয় কোটি সুখী প্রজা’ দেখার কথা বলেছেন। তাঁর নিজের কথায়, ‘দুই চারিজন অতি ধনবান ব্যক্তির পরিবর্তে’ ‘ছয় কোটি সুখী প্রজা’ দেশের মঙ্গল এবং শ্রীবৃদ্ধিকে সূচিত করবে। এবং ‘বন্দেমাতরম’-এর স্রষ্টা স্পষ্ট করে বারবার বলেছেন, এই ছয় কোটি প্রজার মধ্যে তিন কোটি হাসিম শেখ আর তিন কোটি রামা কৈবর্ত্ত। এর পরেও বলবেন উনি মুসলিম বিদ্বেষী......?

বর্তমানকালের একজন বিশিষ্ট সাহিত্যিক বঙ্কিমসাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বঙ্কিমসাহিত্যের প্রয়োজন নেই বলে দাবি করেছেন। আজকের বাঙালি বুদ্ধিজীবিদের কয়েকজনের মধ্যে বঙ্কিমবিদ্বেষ দেখা যায়, তার যথার্থ উত্তর রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধে আছে" মনে আছে, বঙ্গদর্শনে যখন তিনি সমালোচকপদে আসীন ছিলেন তখন তাহার ক্ষুদ্র শত্রুর সংখ্যা অল্প ছিল না। শত শত অযোগ্য লোক তাহাকে ঈর্ষা করিত এবং তাঁহার শ্রেষ্ঠত্ব অপ্রমাণ করিবার চেষ্টা করিতে ছাড়িত না।"

শারদ সংকলন (১৪১১) 'পত্রী'তে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যের মূল্যায়ন এবং প্রাসঙ্গিতার বিষয়ে গবেষণাধর্মী লেখাগুলি আলোচিত হয়েছিল। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ গুণীজনের প্রতিটি প্রবন্ধই সুচিন্তিত রচনা। শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক রবীন্দ্র কুমার দাশগুপ্ত, অধ্যাপক পবিত্র সরকার প্রমুখ বিদ্বজ্জনের চিঠিতে প্রবন্ধগুলির বিষয়ে সপ্রশংস উল্লেখ করেছেন। সারস্বত পাঠকসমাজেও সমাদৃত হয়েছে সংখ্যাটি, সে কারণে সংকলনটি "প্রসঙ্গ: বঙ্কিমচন্দ্র" নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হল।

বন্দেমাতরম্ গানের রচয়িতা, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম পুরোধা। তাঁর 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অসামান্য ঘটনা। মনীষা ও জ্ঞানের এমন সৃষ্টি বাংলা সাহিত্য পত্রিকার ইতিহাসে বিরল। বঙ্কিমচন্দ্রের যুগান্তকারী উপন্যাসের মধ্যে 'বিষবৃক্ষ', 'কপালকুণ্ডলা' ও 'আনন্দমঠ' অন্যতম। 'বিষবৃক্ষ' তাঁর অসামান্য শিল্পকীর্তি। 'কপালকুণ্ডলা'র সমতুল্য উপন্যাস এখনও রচিত হয় নি। 'কমলাকান্তের দপ্তর' গ্রন্থটি সমাজ সমালোচনায় বঙ্কিম-প্রতিভার উজ্জ্বল দিকও উন্মোচিত করে। সমালোচনা সাহিত্যেও পথিকৃত বঙ্কিম। 'বিবিধ প্রবন্ধ' তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমের আবির্ভাব ও তাঁর প্রভাব প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, "বঙ্কিম বঙ্গসাহিত্যের প্রভাতের সূর্যোদয় বিকাশ করিলেন, আমাদের হৃল্পদ্ম প্রথম উন্মোচিত হইল।... বঙ্গভাষা সহসা বাল্যকাল হইতে যৌবনে উপনীত হইল।" তিনি যে রুচি, চিন্তা ও মনীষার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আজকের বাংলা সাহিত্যে বিরল।

বটু কৃষ্ণ হালদার,কলকাতা_১০৪,ফোন_৯৮৩০৪২ ০৯০৪

Address

CN Roy Road
Kolkata
700039

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when KAMOL KATHA posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share