31/01/2026
গত পোস্টে আমরা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে মানেভঞ্জন, তুমলিং, সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যান পেরিয়ে সান্দাকফু পৌঁছেছিলাম —সিঙ্গালিলা রিজ ধরে এই ট্রেক শুধু হাঁটা নয়, পাহাড়ের সঙ্গে এটা একটা নির্লিপ্ত আলাপচারিতা, যেখানে কুয়াশার ফাঁক দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা, দূরে ঝলমল এভারেস্ট—আর প্রতিটা বাঁকে প্রকৃতি আর মানুষের মিলেমিশে থাকা গল্প। সান্দাকফু পৌঁছে বিকেলে অবশ্যই সক্ষ্মী হন এক অবিস্মরণীয় সূর্যাস্তের যা আপনার স্মৃতির locker-এ সারাজীবন জায়গা করে নেবে এটা আমার বিশ্বাস।
দিন ৫: সান্দাকফু – ফালুট (২১ কিমি, ১২ ঘন্টা)
পরদিন সকালে সান্দাকফুতে হিমালয়ের বিশাল পর্বতশ্রেণীর উপর এক চমৎকার সূর্যোদয় দেখে । ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়তে পারেন ফালুটের উদ্দেশ্যে।
ফালুট ট্রেক : ফালুট সান্দাকফু থেকে আরও ২১ কিলোমিটার দূরে এবং এটি ১১৮১১ ফুট উচ্চতায় সিঙ্গালিলা রেঞ্জের অন্যতম সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।
ফালুট শব্দটি লেপচা শব্দ "ফাক-লুক" থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ অনুর্বর শৃঙ্গ।
সান্দাকফু থেকে ফালুট ট্রেক : সান্দাকফু থেকে ফালুটের ট্রেকটি সম্ভবত পুরো পথের মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয়। পথটি বেশ দীর্ঘ এবং আগে পুরো পথে মাত্র একটি বসতি ছিল কিন্তু এখন এই রাস্তার মাজে আপনি আল ও থাকুম ভ্যালি পাবেন যেখানে কিছু হোম স্টেস গড়ে উঠেছে যেখানে আপনি রাত্রিযাপন করতে পারবেন। সান্দাকফু থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে সাবারগ্রাম বা সাবারকুম গ্রামটি অবস্থিত, যা ফালুটে পৌঁছানোর আগে শেষ বসতি। তাই ফালুটের পথে খাবার ও জল সাথে নিয়ে যাওয়াই ভালো।
সান্দাকফু থেকে ফালুটের ট্রেকিং পথটি তুলনামূলকভাবে সহজ এবং পুরোটাই পাহাড়ের টপ ধরে ফলে আপনি পুরো রাস্তা তেই হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বত শৃঙ্গ গুলোকে সাথে নিয়েই চলবেন এই পথ দিয়ে হাঁটার সময় আপনি আপনার ডানদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিবার এবং বামদিকে এভারেস্ট পরিবারকে দেখতে পাবেন।। রাস্তায় আপনি রডোডেনড্রন বন, পাইন বন, বিশাল তৃণভূমি এবং পটভূমিতে চমৎকার বরফে ঢাকা পর্বতমালা ভেদ করে চড়াই ও উতরাই উভয় পথই রয়েছে।
ফালুটে পৌঁছাতে প্রায় ১০-১২ ঘন্টা সময় লাগে এবং অভিজ্ঞ ট্রেকাররা এটি একদিনে করতে পারেন। কখনও কখনও, ট্রেকাররা সাবারগ্রামে থামতে পছন্দ করেন, তবে এখানে থাকার ব্যবস্থা সীমিত।
ফালুট মূলত একটি মালভূমির মতো, যেখানে একটিমাত্র জিটিএ ট্রেকার্স হাট রয়েছে। এখানকার থাকার ব্যবস্থা বেশ সাধারণ। কিন্তু একবার চারদিকে তাকালে আপনি চারপাশের সৌন্দর্য দেখতে পাবেন। কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতমালাকে মনে হবে যেন হাতের নাগালেই। এটি সরলরেখায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে এবং এটিকে বিশাল ও অসাধারণ দেখায়। সিঙ্গালিলা রেঞ্জ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার এত কাছ থেকে দৃশ্য আর কোথাও পাওয়া যায় না।
দুপুরের দিকে ফালুটে বেশ বাতাস বয়। বাতাস বেশ জোরালো থাকে, বিশেষ করে রাতে এবং রাতে ঘরের ভেতরে থাকাই ভালো। ফালুট থেকে সূর্যোদয়ও অসাধারণ।
ষষ্ঠ দিন: ফালুট – গোর্খে
পরের দিন, এক মনোমুগ্ধকর সূর্যোদয় দেখার পর, হিমালয়ের বরফ আবৃত শৃঙ্গগুলিকে বিদায় জানিয়ে তৈরী হয়ে যান আমাদের পরের গন্তব্য গোর্খে। পথটি পাইন, কনিফার এবং বাঁশের ঝাড়ের সুন্দর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেছে। গোর্খে ফালুট থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। এটি পাইন গাছে ঘেরা একটি সুন্দর ছোট গ্রাম। গ্রামের মাঝখান দিয়ে গোর্খে খোলা নদী বয়ে গেছে। এই গ্রামে প্রায় ৩০টি পরিবার বাস করে। গোর্খেতে রাত কাটানোর জন্য একটি জিটিএ ট্রেকার্স হাট এবং কয়েকটি হোমস্টের ব্যবস্থা আছে।
সপ্তম দিন: গোর্খে - শ্রীখোলা
গোর্খে থেকে রামমাম হয়ে গন্তব্য শ্রীখোলা দূরত্ব ৮কিলোমিটার । এটি ট্রেক এর লাস্ট স্টপ এখন থেকে আপনি শিলিগুড়ির শেয়ার জীপ্ ও প্রাইভেট গাড়ি পেয়ে যাবেন। যদি দীর্ঘ পথ পাড়িদেবার কারণ-এ আপনি ক্লান্ত বোধ করেন তাহলে রেস্ট এবং থাকার জন্য আপনি রামমাম ও শ্রীখোলায় অনেক হোমস্টে পেয়ে যাবেন।
এই পথটি ছাড়া সান্দাকফু থেকে শ্রীখোলা আসার আরো কয়েকটি পথ আছে
পথ ১: সান্দাকফু থেকে শ্রীখোলা হয়ে গুরদুম
এটি সবচেয়ে সাধারণ এবং সবচেয়ে ছোট পথ। সান্দাকফু থেকে গুরদুম মাত্র ১০ কিলোমিটার এবং এটি প্রায় ৩.৫ – ৪ ঘণ্টার মধ্যে হেঁটে যাওয়া যায়। আপনি যদি রাতে সেখানে থাকতে চান তবে গুরদুমে একটি ব্যক্তিগত থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।
গুরদুম থেকে শ্রীখোলা আরও ১.৫ ঘণ্টার হাঁটা পথ। এই পথটি জঙ্গল এবং রডোডেনড্রন বনের মধ্যে দিয়ে গেছে। বসন্তকালে (এপ্রিল ও মে), বন রডোডেনড্রন ফুলে ভরে ওঠে। আপনি ভাগ্যবান হলে, একটি রেড পান্ডা বা হিমালয়ান ভাল্লুকের দেখা পেতে পারেন।
শ্রীখোলা নামটি একই নামের নদীর নামে রাখা হয়েছে। শ্রীখোলায় থাকার জন্য অনেক বিকল্প রয়েছে। সাধারণত, ট্রেকাররা শ্রীখোলায় রাতে থাকেন এবং পরের দিন রিম্বিক, মানেভঞ্জন এবং ঘুম হয়ে দার্জিলিং যাওয়ার জন্য একটি শেয়ার্ড জিপে ওঠেন। শ্রীখোলা থেকে আপনি আরও ৭ কিলোমিটার পাহাড়ি পথে হেঁটে রিম্বিক যেতে পারেন। সেখানে রাত কাটিয়ে পরের দিন জিপে করে শিলিগুড়ি যেতে পারেন।
রুট ২: মোল্লের হয়ে সান্দাকফু থেকে শ্রীখোলা (১৬ কিমি)
এই পথে আপনাকে সাবারগ্রাম পর্যন্ত ট্রেকিং করতে হবে। এখানে রাস্তাটি দুটি ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। আপনাকে ডানদিকের রাস্তাটি ধরে মোল্লে, তারপর রাম্মাম এবং সবশেষে শ্রীখোলা পৌঁছাতে হবে।
**একটি বিষয়ে আপনাদের অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে শ্রীখোলা থেকে শিলিগুড়ির যাবার গাড়ি আপনি দুপুর এর পর পাবেন না। তাই গাড়ির সময় মাথায় রেখে আপনারা পরের দিনের প্ল্যান করবেন।
Best time to Visit :
বসন্ত (মার্চ - মে): প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য আদর্শ সময়, কারণ এই সময়ে আবহাওয়া মনোরম থাকে এবং পাহাড়ের ঢাল রঙিন ফুলে (রডোডেনড্রন, অর্কিড) ভরে থাকে।
শরৎ (সেপ্টেম্বর - নভেম্বর): পরিষ্কার আকাশ এবং নির্মল বাতাসের কারণে এই সময়টি মনোরম পর্বত দৃশ্যের জন্য সেরা বলে বিবেচিত হয়।
শীতকাল (ডিসেম্বর - ফেব্রুয়ারি): শান্ত পথ এবং তুষারপাতের সাথে এক জাদুকরী অভিজ্ঞতা, তবে খুব ঠান্ডা তাপমাত্রা এবং বিশেষ করে জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারিতে ভারী তুষারপাতের সম্ভাবনা থাকে।
বর্ষাকাল (জুন - আগস্ট): এই সময়ে দৃশ্যমানতা কম থাকে এবং ভারী বৃষ্টির কারণে পথচলা কঠিন ও কম উপভোগ্য হয়, তাই এই সময়টি ভ্রমণের জন্য সুপারিশ করা হয় না।
মূল কথা: চমৎকার আবহাওয়া, পরিষ্কার দৃশ্য এবং প্রস্ফুটিত ফুলের ক্লাসিক সমন্বয়ের জন্য মার্চ-মে মাস বেছে নিন এবং সেরা পর্বত দৃশ্যের জন্য অক্টোবর-নভেম্বর মাস নির্বাচন করুন।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
* প্রথম যে জিনিসটি আপনি কোনোভাবেই বাদ দিতে পারবেন না তা হলো একটি ট্রেকিং স্টিক । এটি পাহাড়ে আপনার চলাচলকে সহজ করে তুলবে।
* এছাড়াও, যে জিনিসটি এই ট্রেকটিকে আপনার জন্য আরামদায়ক এবং সহজ করে তুলবে তা হলো আপনি কী ধরনের পোশাক পরছেন। এই ট্রেকের সময় হালকা এবং আরামদায়ক পোশাক পরার পরামর্শ দেওয়া হয়। শরীরের সাথে লেগে থাকা পোশাক এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন, কারণ সেগুলো আপনাকে অস্বস্তি দেবে এবং আপনার ট্রেকএর অভিজ্ঞতা নষ্ট করে দিতে পারে।
* একজন গাইড থাকা আবশ্যক। এতে গ্রামের অর্থনীতি উপকৃত হয় এবং আপনি নিরাপদ পথে চলতে পারেন,গাইড আপনাকে সহজেই আপনার গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবেন।
* আপনি যখন ট্রেকিং করছেন, আপনি যে জায়গাতেই থাকুন না কেন বা আবহাওয়া যেমনই হোক না কেন, আপনার সাথে পর্যাপ্ত জল, এবং ড্রাই ফ্রুইটস রাখা উচিত।
* শুধু ট্রেকের পথই নয়, আবহাওয়াও অপ্রত্যাশিত হতে পারে। পাহাড়ে আবহাওয়ার হঠাৎ পরিবর্তন হতে পারে এবং তা আগে থেকে কেউ বলতে পারে না। এখন একমাত্র উপায় হলো সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা। এমন জিনিসপত্র সাথে নিন যা আপনাকে এই প্রাকৃতিক আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে।
* ট্রেকিং পোল, আরামদায়ক পোশাক এবং একজন ভালো গাইড ছাড়াও, আপনার ট্রেকিংকে আরও আরামদায়ক ও সহজ করার জন্য যে জিনিসটি থাকা উচিত তা হলো ভালো ট্রেকিং জুতো। আপনার ট্রেকিংয়ের সময় পুরো যাত্রাটাই আপনার হাঁটার ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। আপনার পায়ে যেন বেশি ব্যথা না হয় এবং যাত্রাটি মসৃণ হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য আপনার সাথে একজোড়া ভালো ট্রেকিং জুতো রাখুন।
মনে রাখবেন ট্রেকে যেমন শারীরিক শক্তি প্রয়োজন তার থেকেও বেশি প্রয়োজন মনের শক্তি , নিজের শরীরকে কে নিজে বোঝার চেষ্টা করুন আর নিশ্চিত করুন আপনার সহযাত্রীরাও সুস্থতার সাথে আনন্দের সাথে মন বোঝাই করা স্মৃতির পাহাড় নিয়ে বাড়ি ফেরে ।
বিশেষ অনুরোধ :
প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলবেন না: সাথে একটা এক্সট্রা থলি ক্যারি করুন নিজের আবর্জনা সঠিক জায়গা ডাস্টবিন এ ফেলুন।