01/12/2025
একটি মন্দির… যেখানে দেবতা নেই, আছে জ্ঞান।
যেখানে পূজার ফল প্রসাদ নয়— হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি বই।
যেখানে মানুষ আসে মাথা নত করতে, কিন্তু কারও সামনে নয়— শুধুই শিক্ষার কাছে।
কেরলের শান্ত সবুজের কোলে, কান্নুর জেলার চেরুপুঝার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক আশ্চর্য সৃষ্টি—
‘নবপুরম মতাতীত দেবালয়ম’ — অর্থাৎ ঈশ্বরের ধর্মনিরপেক্ষ ঘর।
এখানে গর্ভগৃহে নেই কোনও মূর্তি। নেই ধূপ, নেই ঘণ্টাধ্বনি, নেই পুরোহিতের উচ্চারণ।
তার বদলে রয়েছে এক প্রকাণ্ড ৩০ ফুট উঁচু পাথরের বই— যার পাতায় খোদাই করা আছে মালয়ালম লিপিতে এক চিরন্তন বাণী—
“জ্ঞানই ঈশ্বর। ধর্ম মানে উদার চিন্তা। বিনয়ের সঙ্গে জ্ঞানচর্চাই পথ।”
এই মন্দিরে দানের বাক্সে টাকা নয়— জমা হয় বই।
প্রসাদ হিসেবে পুরোহিত নয়, দর্শনার্থীর হাতে তুলে দেন— একটি বই।
কারণ এখানে পূজিত হয় জ্ঞান… আর সাধনাই শিক্ষা।
২০২১ সালের ৪ মার্চ যখন মন্দিরের দরজা প্রথম খুলে দেওয়া হয়, তখন থেকেই এই দুই একর জমি রূপ নিল বইয়ের উৎসবভূমিতে।
চারদিকে শান্ত সবুজ, মাটির গন্ধ, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জ্ঞানের আধার।
এখানে ধর্ম-বর্ণ-জাতির কোনও ভেদাভেদ নেই।
সবাই সমান, কারণ জ্ঞান সবার— জ্ঞান কাউকে আলাদা করে না।
মন্দিরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ৫,০০০ বইয়ের বিশাল গ্রন্থাগার।
দেওয়ালে খোদাই করা কেরলের লোকসংস্কৃতি, প্রাচীন সাহিত্য, ঐতিহ্যের গল্প।
এ যেন একটি জীবন্ত পাঠশালা— যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি পাতার শব্দ বলে উঠছে একটাই কথা—
“শিখো… কারণ শেখাই মুক্তি।”
এই মহান ভাবনার নেপথ্যে রয়েছেন একজন মানুষ—
মালয়ালি লেখক প্রপোয়িল নারায়ণন।
৩৫ বছরের স্বপ্ন, অসীম পরিশ্রম, আর নিজের উপার্জনের প্রায় ৭.৬ কোটি টাকা ব্যয় করে তিনি গড়েছেন এই আলোর মন্দির।
যার কাছে সাহিত্যই ধর্ম, শিক্ষা-ই উপাসনা।
নিজের পৈতৃক দুই একর জমিকে তিনি রূপ দিয়েছেন ‘এঝুথুপুরা’— অর্থাৎ লেখালেখির কুটিরে।
ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে তিনটি কুটির, আরও সাতটি আসছে।
এক এমন মন্দির, যেখানে প্রার্থনার ভাষা বইয়ের পাতায়।
যেখানে আগুন জ্বলে প্রদীপে নয়— মানুষের চোখে।
যেখানে ঈশ্বরের নাম শুনলেই মনে পড়ে যায়—
“জ্ঞানের আলোই সর্বশ্রেষ্ঠ আলো।”