30/12/2025
“ওরা সাতজন ছিল…”
“ধর্ষকরা সাতজন ছিল, বাবা…
আর ওদের মধ্যেই একজনকে আমি বিয়ে করতে চাই।”
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
শ্বাস নেওয়ার শব্দ পর্যন্ত যেন থেমে গেছে।
— “ওয়াট…?”
বাবার কণ্ঠে বিস্ময়, অবিশ্বাস আর ক্ষোভ—সব একসাথে।
“হ্যাঁ বাবা, ঠিকই শুনেছ।
ওই ছেলেটাকেই আমি বিয়ে করবো।”
আমার কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়লো সবার ওপর।
পুরো পরিবার থ হয়ে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।
আমি জানতাম—এখন হাজারটা প্রশ্ন আসবে,
কিন্তু আজ আমি কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করবো না।
আমি কারও কাছে ব্যাখ্যা দিতে প্রস্তুত নই।
এই সিদ্ধান্তের দায় একান্তই আমার।
কথাটা বলেই মজলিস ছেড়ে উঠে পড়লাম।
সোজা নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
আজ অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করছি।
জীবনে এই প্রথম পরিবারের সামনে উঁচু গলায় কথা বললাম—
এবং আশ্চর্য, কোনো অনুশোচনাও নেই।
বরং মনে হচ্ছে, আরও ধারালো করে বলা উচিত ছিল।
আমি জন্মেছি এক সম্ভ্রান্ত, প্রভাবশালী পরিবারে।
লোকেরা বলে—“সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্মেছে মেয়েটা।”
আমার চাওয়া কখনো অপূর্ণ থাকেনি।
আর বাবার আদর?
সে তো ভাষায় বোঝানো যায় না।
বাবাই আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ।
তার রাজকীয় ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, দৃঢ়তা—সবকিছুর মধ্যেও
তিনি সময় দিতে ভুলতেন না তার মেয়েকে।
আমার আবদার মানে ছিল তার কাছে নির্দেশ।
কিন্তু এত শক্তি, এত প্রভাব—
তার মাঝেও যে এমন এক অন্ধকার
আমার জীবনে হানা দেবে,
তা কেউ কল্পনাও করেনি।
ঘটনাটা এখনো বাইরের দুনিয়া জানে না।
কিন্তু কতদিন আর গোপন থাকবে?
এই ভয়টাই আমার পরিবারের মাথাব্যথার কারণ।
তাই আমাকে ফিরে পেয়ে প্রশ্নের বন্যা বইয়ে দিয়েছে সবাই।
আমি কি ওদের কাউকে চিনতে পেরেছি?
আমি কি কাউকে শনাক্ত করতে পারবো?
আমি জানি না—ওদের ধরতে পারলে
আমার পরিবার কী করবে।
কিন্তু এটুকু জানি,
আমার বলা সেই এক বাক্য
ওদের ক্ষতকে আরও জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
তিনদিন।
টানা তিনদিন আমাকে খুঁজেছে সবাই।
কিন্তু কোনো খোঁজ পায়নি।
আজও ঘরের দরজা বন্ধ।
বারবার ডাকাডাকি, অনুরোধ—সব অসহ্য লাগছে।
“প্লিজ মা, আমাকে একা থাকতে দাও।”
চিৎকার করে বলতেই
ঘরটা আবার নিঃশব্দ হয়ে গেল।
আমি জানালার পাশে বসে আছি।
সূর্যের তাপ মরে এসেছে।
আকাশে লাল-নীল রঙের অদ্ভুত খেলা।
ওড়নার কোণে চোখের জল মুছে
ভাঙা হৃদয়ে সামান্য আশার নেশায়
দৃশ্যটা দেখছিলাম।
ওরা সাতজন ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে
নির্জন রাস্তায় বাড়ি ফিরছিলাম।
পছন্দের সেই ব্রিজটার কাছে পৌঁছাতেই
নিঃশব্দে একটা গাড়ি থামলো।
তারপর—
সব অন্ধকার।
চেতনা ফিরলে নিজেকে পেলাম
এক অচেনা ঘরে।
ভয় এমনভাবে চেপে ধরেছিল
যে শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল।
চিৎকার করতেই
নিজের গলার প্রতিধ্বনি ফিরে এলো—
আরও ভয়ংকর হয়ে।
আমি নিজেকে গুটিয়ে
ঘরের এক কোণে লুকোলাম।
হঠাৎ দরজার শব্দ।
কয়েকজন যুবক ঢুকলো—
চোখে এমন দৃষ্টি,
যেন শিকার সামনে পাওয়া হিংস্রতা।
আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম—
“কে আপনারা? প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন…”
উত্তরে উঠলো হাসির ঝড়।
অহংকারের, নিষ্ঠুরতার হাসি।
ঠিক তখনই
বাইরে পায়ের শব্দ।
সবাই এক মুহূর্তে চুপ।
দাঁড়িয়ে পড়লো সোজা হয়ে।
একজন লম্বা, সুদর্শন পুরুষ
চুল ঠিক করতে করতে ঢুকলো।
সবাই তাকে সালাম দিল।
আমি বুঝলাম—এই লোকটাই মূল।
সে কিছুক্ষণ চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর হালকা হাসি।
আমার সামনে এসে বসলো।
ভয়ে আমি স্থির হয়ে গেলাম।
সে আমার থুতনিতে হাত দিয়ে মুখ তুলে বললো—
“বাহ্… সুন্দর তো।”
ঘৃণা, ভয় আর রাগ—
সব একসাথে বিস্ফোরিত হলো ভেতরে।
আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম—
“আপনি কে? আমাকে কেন এখানে এনেছেন?”
সে কিছু না বলে উঠে দাঁড়ালো।
পেছনে তাকিয়ে বললো—
“খেতে দিয়েছিস?”
“দেমাগ দেখিয়েছে, খায়নি বড় ভাই।”
উত্তরে হেসে উঠলো সে।
আবার কাছে এসে
গালে আলতো স্পর্শ করে বললো—
“রাগ দেখাতে নেই। খেয়ে নাও।”
আমি এবার চিৎকার করলাম—
“আমাকে ছেড়ে দাও। আমার বাবা জানলে
তোমাদের একজনকেও ছাড়বে না!”
এই কথাটুকুতেই
তার চোখের রঙ বদলে গেল।
রাগে খাবারের প্লেট ছুড়ে মেরে বললো—
“কি বললি? তোর বাবার এত দম?”
পেছনে তাকিয়ে হুকুম দিল—
“একে বুঝিয়ে দে
কেন এখানে আনা হয়েছে।”
সে চলে যেতে উদ্যত হলো।
তারপর…