19/06/2026
||পশ্চিমবঙ্গ দিবস ও তার জনক ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি— গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, নাকি লজ্জার?
সম্প্রতি ২০শে জুন তারিখটিকে এরাজ্যের নবাগত রাজ্য সরকার ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক ভাবে তা পালনের ফরমান জারি করেছে। বিজেপি-আরএসএস -এর দাবি হলো ১৯৪৭ সালের এই গৌরবময় দিনে বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল। তাই এই দিনে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির নায়ক হিসেবে ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি র ছবিতে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে হবে। কোনো সরকারি আপিসে এর অন্যথা হলে ডবল ইঞ্জিন সরকার সেই আপিসের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যাবস্থা নেবে। পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি তথা দেশভাগের আসল নায়ক, থুড়ি খলনায়ক, কে বা কারা ছিলো? ইতিহাস কী বলে? উক্ত দিনটি আদৌ গৌরবময় দিন ছিল, নাকি পরাধীন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় ছিলো, এবার সেটা বিচার করে দেখা যাক।
ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাজন এবং তৎপরবর্তী সময়ে দাঙ্গা, বিদ্বেষ, প্রাণহানি ও ব্যাপক উদ্বাস্তু সমস্যা এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে এনেছে বেদনার সুর। না জানি কত কোটি মানুষের অশ্রুধারায় সিক্ত হয়েছে সেই দিনগুলি। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাজনের কলঙ্কিত ইতিহাস বইয়ের একটা অধ্যায় বাংলা ও পাঞ্জাব বিভাজন৷ তাই বাংলা বিভাজন এবং তারফলে পশ্চিমবাংলা ও পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) সৃষ্টির ঘটনাও লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে তীব্র যন্ত্রণা বোধই তৈরি করেছে।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৩৭ সালে আমেদাবাদে হিন্দু মহাসভা-র ঊনবিংশ তম সেশনে বক্তৃতা দিতে গিয়ে সাভারকর তার মানসপটে অঙ্কিত দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে এই দেশকে হিন্দু ও মুসলিম — এই দুটি জাতিতে বিভক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে। তারপর ১৯৪৭ সালের ৮ই মার্চ তৎকালীন আপোসমুখী কংগ্রেস নেতৃত্বও নেহেরু-প্যাটেলের নেতৃত্বে সেই প্রস্তাব মেনে নেয়। এরপর দেশ ভাগের পদ্ধতি নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব — দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয় বাংলা ও পাঞ্জাব। এই দ্বন্দ্বের নিরসনের জন্য লর্ড মাউন্টব্যাটেন এক সভার আহ্বান করেন। সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের পক্ষে নেহেরু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, মুসলিম লীগের পক্ষে জিন্না ও লিয়াকত আলি খান এবং শিখদের পক্ষে সর্দার বলদেব সিং। সেই সভাতেই ঠিক হয় পাঞ্জাব ও বাংলার অমুসলিম প্রধান এলাকাগুলো পাকিস্তান থেকে বাদ দেওয়া হবে। ১৯৪৭ সালের ৩রা জুন এক ঘোষণাপত্রে দেশভাগের বিস্তারিত পরিকল্পনা পেশ করা হয় — এটাই ইতিহাসে মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদ নামে পরিচিত। মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালের ১০ই জুন এবং কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি ১৯৪৭ সালের ১২ই জুনের সভায় এই ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে।
এই প্রস্তাব অনুযায়ী ২০শে জুন বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির অধিবেশ বসে। এই অধিবেশনে মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন ১১৩ জন, কংগ্রেসের ৮৭ জন, সিপিআই -এর ৩ জন এবং হিন্দু মহাসভার ১ জন (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি)। ভোটাভোটিতে ৫৮-২১ ভোটে পশ্চিমবঙ্গের অংশে বাংলা ভাগের প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবের পক্ষে এই ৫৮ জনের মধ্যে কংগ্রেসের ছিল ৫৫ জন, সিপিআই ২ জন ও হিন্দু মহাসভা ১ জন। এই হলো ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাজনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাগের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
স্পষ্টতই বলা যায়, এই বিভাজন এদেশের সাধারণ জনতার কাছে ছিল অত্যন্ত অনভিপ্রেত ঘটনা৷ ক্ষমতার অলিন্দে ঘোরাফেরা করতে চাওয়া রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্তের ফল ভুগতে হয়েছিলো গোটা দেশকে। ভারতীয় উপমহাদেশ এই বিষবৃক্ষের ফল ভোগ করে চলেছে আজও। তাই বলাই যায়, ভারত বিভাজনের পক্ষে গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্তই সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী৷ তাই যে ঐতিহাসিক তারিখগুলি এই সিদ্ধান্তগুলিকে মনে করায়, সেই তারিখগুলোও কলঙ্কিত ইতিহাসকেই বহন করে। তাই ২০শে জুন তারিখটি কোনো গৌরবোজ্জ্বল দিন নয়, বরং কলঙ্কজনক অধ্যায়ের স্মৃতি হিসেবেই ইতিহাসে খোদিত থাকবে।
যতদূর জানা যায় যে বাংলাকে মুসলিম প্রধান ও হিন্দু প্রধান অংশে ভাগ করার আবেদন জানিয়ে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি লর্ড মাউনটব্যাটেন-কে একটি পত্র লিখেছিলেন। অর্থাৎ, একটা অনুরোধ বা আবেদন পত্র লিখলেই কি তাকে সেই বিষয়ের জনক বলা যায়? তবে এটা ঠিক যে হিন্দুত্বের সর্দার সাভারকর ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগের বিষয়টি এদেশে সর্বপ্রথম ১৯২৩ সালে তার লেখা বই "Hindutva: who is a Hindu" তে উত্থাপন করেছিলেন। তারপর এর সপক্ষে প্রচার করেছিলেন, যেখান থেকে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মতো হিন্দুত্ববাদী নেতা প্রথমে হিন্দু মহাসভার ও পরে জনসংঘের এজেন্ডা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। পরবর্তীতে আরএসএস এবং ড. মুখার্জির উত্তরসূরি হিসেবে বিজেপি সেটাকে গ্রহণ করে।
সুতরাং, এই ইতিহাস অনুযায়ী বিজেপির উচিত ছিল পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির নায়ক, থুড়ি খলনায়ক, হিসেবে হিন্দুত্বের রূপকার সাভারকর, মুসলিম লীগের জিন্নাহ্, কংগ্রেসের জওহরলাল নেহেরু ও বল্লভভাই প্যাটেল এবং সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকদের পক্ষে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন — এদেরকে মালা পরানো। কিন্তু তারা সেটা না করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-কে সেই মালাটি পরাতে গেলো কেন?
আসলে, ‘বীর’ সাভারকর হিসেবে বিজেপি-আরএসএস যাকে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান মনীষী বানাতে চেয়েছিল, আজ সেটা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বহু আগেই দেশের প্রগতিশীল ও গণতন্ত্রপ্রিয় ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা বারবার পরাধীন ভারতবর্ষের নানান ইতিহাস তুলে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, যে ব্যক্তি ডজন খানেক মার্সি পিটিশন লিখে নিজের জীবন বাঁচায় এবং বিদেশী ব্রিটিশ শাসকদের মাইনে নিয়ে সেই অন্যায় শাসনের প্রচারকে পরিণত হয়, তাকে দেশের বীর সম্মান দেওয়াটা চরম অপরাধ। সম্প্রতি বোম্বে হাই কোর্টের একটি মামলায় সাভারকরের নাতি এই সমস্ত অভিযোগকে স্বীকার করে বলেন যে তার ঠাকুরদা যে মোট দশটি মুচলেকা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড ও আন্দামানের জেলের অত্যাচার থেকে রেহাই পেয়েছিলেন, সেগুলো আজও সরকারি নথি হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
অতএব, বিজেপি-আরএসএসের পূর্বসূরীরা দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে আরও যেসব বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেগুলোকে ঢাকতে আজ তারা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির শরণাপন্ন হয়েছে। ইতিহাসের ধারায় সাভারকরের মতোই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-কে আবার সেই বীরের আসনে বসানোর এই প্রচেষ্টা চূড়ান্ত মিথ্যাচার ও ভন্ডামির নামান্তর! পরবর্তী কিস্তিতে আমরা তথ্য প্রমাণ দিয়ে দেখবো যে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি একজন হিন্দুত্বের প্রচারক এবং উঁচু পদাধিকার ও মন্ত্রিত্বের জন্য লালায়িত একজন উচ্চাকাঙ্খী ব্যক্তি ব্যতীত মহাপুরুষ বা বীর কোনোটাই ছিলেন না!!
#পশ্চিমবঙ্গ #পশ্চিমবঙ্গ_দিবস #ভয় #সংস্কৃতি #সংগৃহীত