01/08/2026
Nishabde উপন্যাসের একাংশ। এখন দ্বিতীয় এডিশনেঃ
গঙ্গার পাড় দিয়ে রাস্তা। প্রথমটা ভালোই। সাধারণ পাহাড়ি রাস্তার মতো। বাঁ দিকে বিশাল পাহাড় সোজা উঠে গেছে আকাশের দিকে। পাহাড়ের গা বেয়ে ঘন জঙ্গল। নাম না জানা গাছের দল পাহাড়টাকে সবুজ আস্তরণে ঢেকে রেখেছে। ঝিঁঝিঁরা কনসার্টে সরব। প্রকৃতির গান। রয়্যাল ফিলহারমনিক অর্কেস্ট্রাও এদের ছন্দ স্তব্ধ বিস্ময়ে শুনত। সিমফনির জন্য মিউজিক্যাল স্কোর লেখার প্রয়োজন নেই। সুর না থাকলেও সুর। গান না থাকলেও গান। স্বরলিপি থেকে একটুও কম নয়। আপনভোলা ঝংকারে গাইছে হৃদয়ের গান।
ডানদিকে গভীর খাদ। অন্তত হাজার দেড়েক ফুট। অনেক নীচে বড় বড় বোল্ডার। তার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ছে গঙ্গার নীলচে সাদা জল। সামনে তাকালে সবুজ পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে মাঝেমাঝে ঝকঝকে সাদা বরফের মুকুট পরা পিকগুলো। যেন প্রকৃতি সাদা আস্তিন ছড়িয়ে শান্তির বন্দনা গাইছে।
কবে তুমি আসবে? কবে নিশ্চিন্ত আলস্যে ঠাই নেবে আমার কোলে? তোমার প্রতীক্ষায় আছি। শোনাতে তোমাকে ছেলেবেলার ঘুম-পাড়ানি গানঃ
খোকা ঘুমল পাড়া জুড়ল বর্গী এল দেশে,
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেব কীসে
সুরবীর সিংকে গাইড নেওয়ায় প্রথমে একটু কিন্তু ছিল। অনেকেই বলছিল গাইড লাগে না। দেবজিৎ অন্য মনের লোক। হিমালয়ের এই সহজ সরল লোকগুলোকে ভালোই চেনে। পার্থিব ধনের বাইরে এরা মনের দিক দিয়ে পরম ধনী। লাগুক চাই না-লাগুক, গাইডের নাম করে যদি এদের কিছু সাহায্য করা যায় নিজের-ই ভালো লাগবে।
নামেই রাস্তা। আসলে একটা ঘোড়া চলার মতো ট্র্যাক। কখনও ভালো, কখনও খারাপ। মাঝে মাঝে তাও হারিয়ে যাচ্ছে। কোথাও অজস্র নুড়ি-পাথর রাস্তার ওপর। পা হড়কে যায়। অন্তবিহীন চড়াই-উতরাই।
এক জায়গায় এসে সুরবীর বলল, “ঠহরিয়ে সাব। আগে ঝোরা হ্যায়”
দেবজিৎ সামনে তাকিয়ে দেখল একটা পাহাড়ি ঝরনা। বাঁ দিক থেকে নেমে নাচতে নাচতে রাস্তার ওপর দিয়ে ডানদিকের খাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ওপরে একটা গাছের গুঁড়ি আড়াআড়ি ফেলা। তার ওপর দিয়েই পেরতে হবে। জলের তোড়। গুঁড়িটাও ভীষণ পেছল। সাবধানে পা ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে পা পিছলে ঝপাস্। একদম জলের মধ্যে। লাফিয়ে এসে সুরবীর না ধরলে সোজা নীচে।
“সাবধানিসে সাব। দেখতা নেহি কিতনা তাকত হ্যায় পানিকা”
প্যান্টটা পুরো ভিজে গেছে। ওর দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসল। ভীষণ ঠান্ডা লাগছে। চেঞ্জ করতে গেলে র্যাক্স্যাক খুলতে হবে। ভাবতেই কান্না পেল। জুতোজোড়াও ভিজে চপচপ। মোজাটা চেঞ্জ না করলেই নয়। ঠান্ডা লেগে জ্বর বাঁধিয়ে ফেলতে পারে।
ইতস্তত দেখে সুরবীর এগিয়ে এল “থোড়া আগে চলিয়ে সাব। কুছ দের মে-ই চিরবাসা। উহাঁ দুকান হ্যায়। চায় ভি মিলেগা। চেঞ্জ করনেকা মওকা ভি”
এবার আর নিজের উপর ভরসা না রেখে সুরবীরের হাত ধরেই ঝোরাটা পেরল। চিরবাসা মানে প্রায় অর্ধেক পথ। কয়েকটা ছোট দোকান। কয়েকজন দোকানদার, দু-চারটে ভৃগুপন্থ ঘোড়া। এই নিয়ে চিরবাসা। বেসিনের মতো। চারধারে আকাশচুম্বী পর্বতশৃঙ্গ। ভৃগুপন্থ, সুমেরু, শিবলিঙ্গ - কত নাম। জানা-অজানা অখ্যাত বিখ্যাত শিখর যুগযুগান্ত ধরে দাঁড়িয়ে। শুধুমাত্র গঙ্গার গর্জন ছাড়া, জায়গাটা নিস্তব্ধ। সেই নৈঃশব্দ্যের অতন্দ্র প্রহরী পাহাড়গুলো।
“কী ভাই, ভিজলেন কী করে?”
হঠাৎ বাংলায় চমকে গেল। চারজনের বাঙালি দল। গোমুখ দেখে রাতে ভুজবাসায় ছিল। আজ নামছে।
“আশ্চর্য। বাঙালি বুঝলেন কী করে?” প্রশ্ন না করে পারল না।
“শারলক হোমস, ভাই, শারলক হোমস” একটু থেমে ওদের মধ্যে একজন বলে উঠল “নদী তুমি কোথা হতে আসিয়াছ? খেয়াল করেননি আমরা শুনতে পাচ্ছি”
তাই তো। লজ্জা পেল। সত্যিই তো জগদীশচন্দ্রের কথা আওড়াচ্ছিল।
“আর বলবেন না, একটা ঝোরার মধ্যে পড়ে গেলাম”
“সাবধানে চলবেন ভাই। সামনে খুব খারাপ রাস্তা”
বালি থেকে আসা দলটি একটু বসে এগিয়ে গেল।
দেবজিৎ র্যাক্স্যাক থেকে প্যান্ট মোজা চেঞ্জ করল। নিজের থেকেও বেশি অন্যদের জন্য চিন্তা। যদি জ্বর হয় সে শুধু ভুগবে না, অন্যদেরও ভোগাবে। সুরবীর ততক্ষণে দু-গ্লাস চা নিয়ে এসেছে। হিমালয়ে, গরম চায়ের চেয়ে কাম্য বস্তু আর কিছু নেই। চা খেয়ে আবার চলা। দু-পাশের সিন-সিনারি ঠিক এ পৃথিবীর মনে হচ্ছে না। এ যেন মায়াপুরীতে এসে পড়েছে। এই অখণ্ডবিস্তারের মধ্যেই জীবনের স্বাদ। যা তাকে জাগিয়ে রাখবে তাসের দুনিয়ায়। বাঁচিয়ে রাখবে ভেতরের মানুষটাকে। হারজিতের বাইরে প্রতি মুহূর্তে খুঁজে পাবে নিজেকে। কিচ্ছু আসে যায় না। জিতুক অথবা হারুক, সে তো সেই দেবজিৎই। তাই হয়ে থাকতে চায় চিরকাল।
হারজিতের খেলার একটা লক্ষ্মণরেখা আছে। সেখানে ধ্রুবতারার মতো পথটা একদিন শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই ঘ্রাণ, তার প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখবে চিরকাল। সীমার মধ্যে থেকেও পেয়ে যাবে অসীমের স্বাদ। কম কী?
“সাব, আগে গিলা পাহাড়। হর ওয়াক্ত পথথর গিরতা। বহত সাবধানিসে জানা হোগা” সুরবীরের দিকে তাকাল।
সুরবীর যেন ওর মনের প্রশ্ন ধরেই উত্তর দিল, “গিলা পাহাড় একদম গিলা ইয়ানি লুজ হোতা। হর ওয়াক্ত পথথর গিরতা উহাঁ সে। উধর দেখিয়ে সাব। ওহি গিলা পাহাড়”
ওর চোখ সুরবীরের হাতের দিকে ঘুরে গেল।
এক বিচিত্র দৃশ্য। অনেকদিন আগে দেখা ম্যাকেনাজ গোল্ড ছবির কথা মনে পড়ল। অগুনতি বিশাল থামের মতো পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন মাটির থামের গায় বড়বড় পাথর আটকে দিয়েছে কেউ। একটু হাওয়া দিলেই মনে হচ্ছে থামগুলো দুলছে। মাঝেমাঝেই ছোট বড় পাথরের টুকরো গড়িয়ে পড়ছে। দেখলেই ভয় লাগে।
“চলিয়ে সাব। ডরনে সে কেয়া ফয়দা”
সুরবীর ওর কাছ থেকে র্যাক্স্যাকটা নিজের কাঁধে নিল। গিলা পাহাড়ের নীচে দিয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে পেরিয়ে গেল। মাঝেমাঝেই ছোট ছোট নুড়ি পাথর ওপর থেকে গড়িয়ে পড়ছে। যদি কারও গায়ে বড় একটা পড়ে, নির্ঘাত মৃত্যু। এক কিলোমিটার পথ কী ভাবে যে পেরল পরে ভাবতে গেলেই ভয় লাগত। কিন্তু তখন ওসব মাথায় নেই।
“ভুজবাসা আ গিয়া সাব”
সুরবীরের কথায় সামনে তাকিয়ে দেখে দূরে ছোট ছোট কতগুলো ঘর। নীচে ভ্যালির মধ্যে। ডানদিকে অনেকগুলো পিকের মধ্যে চোখে পড়ছে শিবলিঙ্গ। খাড়া উঠে গেছে। মাথাটা দেখলে মনে হয় যেন আলাদা টুপি পরা। সামনে দিয়ে একটা গিরিশিরা নেমে এসেছে ঠিক হাতির শুঁড়ের মতো। অনেকে একে গণেশজিও বলে। সোজা সামনে সম্রাটের মতো দাঁড়িয়ে ভাগীরথী পর্বত। সকালের রোদে তিনটি পিক-ই ঝকঝক করছে। যেন মুঠো মুঠো সোনা ছড়িয়ে দিয়েছে শৃঙ্গে। রঙের হোলি খেলছে সূর্যিমামা। যেন শ্বেতবসনা বিধবাকে রাঙিয়ে দিচ্ছে রঙিন আবরণে। সিঁদুরের মুঠো দিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছে তার প্রশস্ত ললাট। ভাতিয়ারে ছেয়ে ঘুমভাঙানিয়া গান। আজকে দোল পূর্ণিমা নয়, দোল মহাজয়ন্তী।
“ওহি গোমুখ সাব, ভাগীরথীকে নীচে”
প্রায় চার কিলোমিটার দূর থেকে ছোট্ট কালো একটা বিন্দুর মতো দেখাচ্ছে। ইম্প্রেসিভ লাগল না।
“ওটাই গোমুখ” দেবজিতের গলায় হতাশা।
এত শুনেছে এর সম্বন্ধে। আসলে এই। সুরবীর অবাক। ওর দিকে তাকাল। ঠিক বুঝতে পারছে না সাবকে। কলকাতা থেকে কাতারে কাতারে বাবুরা বৌ-বাচ্চাও নিয়ে আসে। এখানে এসে আনন্দে নাচানাচি। আর এই সাব যেন কেমন।
“সাব, আপকা পসন্দ নেহি হুয়া?”
দেবজিৎ অপ্রস্তুত “নেহি জি। এইসে কোই বাত নেহি। ম্যায় নে সোচা থা...” কী বলবে ভেবে পেল না।
“ঠিক হ্যায় সাব। নজদিক চলিয়ে। উধার সে বেহতর দিখাই যাতা” সুরবীরের গলায় অনিশ্চয়তা।
দুজনে ভুজবাসার লালবাবা আশ্রমের পাশ দিয়ে এগিয়ে চলল গোমুখের দিকে। কিছুটা যেতেই রাস্তাটা বেপাত্তা। শুধু বড়বড় পাথর। ছোটবড় বোল্ডার। পা ফেলতে গেলেই পাথর নড়ে উঠছে। দেবজিতের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। অল্টিচুড ১৩০০০ ফুটেরও বেশি। হাঁটতে রীতিমত কষ্ট হচ্ছে। হাতের লাঠিটায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“কেয়া হুয়া সাব? শ্বাসকা তকলিফ?” সুরবীরের গলায় আশঙ্কা “ধিরেস চলিয়ে। পহচ গয়া”
“পহচ গয়া?” ঠিক বিশ্বাস হল না “কাহাঁ?”
“আগে দেখিয়ে সাব, ওহি গোমুখ”
একটা বোল্ডার পেরোতেই দেবজিতের চোখের সামনে হঠাৎ স্বর্গ যেন দরজা খুলে ধরল। মনে হল স্বপ্ন দেখছে। ঝকঝকে ভাগীরথীর শৃঙ্গ থেকে নেমে এসেছে একটি নদী। জলের নয়, বরফের। নীলচে বরফ। সেই নদীতে বড় বড় বরফের চাঙড় ভাসছে। নদীটা নীচে এসে হঠাৎ ভেঙে পড়েছে এক বিশাল গুহায়। আলো সেই বিশাল গুহার ভেতরে বেশি দূর ঢুকতে পারেনি। অন্ধকারের ভেতর থেকে কলকল করে বেরিয়ে আসছে আলোর ধারা। না, আলো নয়, ঝলমলে জল।
এই গোমুখ!
জানেও না, কখন তার দু-চোখ বেয়ে নেমে এসেছে আরেক নোনতা নদী। ভাসিয়ে দিচ্ছে তার সমস্ত শরীরকে। সব কষ্টের সার্থক গন্তব্য। কিছুক্ষণ আগেই ভাবছিল গন্তব্যে পৌঁছনোর সার্থকতা। এখন বুঝতে পারছে, হয়ত ঠিক বোঝেনি। হারা-জেতার গন্তব্যের একটা সীমা আছে। কিন্তু এর বাইরের গন্তব্যটা আসীম। এই অসীমকে পাওয়ার সার্থকতা অপূর্ণ থেকে যেত, যদি না এই মুহূর্তে সে গোমুখে দাঁড়িয়ে থাকত। গলার মধ্যে এক অসহ্য ব্যথার দলা। বুকের মধ্যে এক অসহ্য আনন্দের সাগর আছড়ে পড়ছে -
সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর
এই গোমুখ!!!
দেবজিতের মুখ দিয়ে অস্ফুট আবেগে বেরিয়ে এল, বহু শোনা, বহু ব্যবহারে ক্লিসে এক প্রাচীন অদ্বৈতবাদী সন্ন্যাসীর অন্তরের কান্না মেশানো ভক্তির অর্ঘ্যঃ
দেবি সুরেশ্বরি ভগবতী গঙ্গে
ত্রিভুবন তারিণী তরল তরঙ্গে।
শঙ্কর-মৌলি বিহারিণী বিমলে
মম মতিরাস্তাং তব পদকমলে
এই চেতনার মধ্যে সে আবিষ্কার করল আরেক অজানা, অচেনা পৃথিবীকে। মনের বাইরে সুপ্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে। কোথায় যেন সেই ব্রহ্মাণ্ড তাকে বারবার হাতছানি দেয়। এই ব্রহ্মাণ্ড একমেবাদ্বিতীয়ম। জাগতিক হানাহানি কলুষের বাইরে এখানেই পূর্ণতা। কে বুঝল, না বুঝল, কী আসে যায়? এই না-বোঝা, না-চেনা পৃথিবীটাকে নিজের করে পাওয়ার মধ্যেই সার্থকতা।